দৃশ্যমান জগতে দুঃসাহসিক কোয়ান্টাম অভিযান
পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা
ফিজিক্সের এক বিশেষ শাখা কোয়ান্টাম বিজ্ঞান। জার্মান ফিজিসিস্ট ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক-এর হাত ধরে 1900 খ্রিস্টাব্দে এ হেন বিজ্ঞানের পথ চলা শুরু। বিশ্ববিখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন একে সাবালক বানিয়েছেন 1905 সালে। পদার্থের অভ্যন্তরে অতি ক্ষুদ্র পরিসরে এর ব্যাপ্তি, আজব কাণ্ডকারখানা ও ব্যাপক খ্যাতি। স্বাভাবিকভাবেই এর কদর আমজনতার ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিজ্ঞানের এলিট শ্রেণীর কাছেও সরাসরি ধরা দেয় না সে। সবসময় যেন এক আলো-আঁধারী খেলা চলে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা এবং পণ্ডিতকূলে। সেজন্যে একদা আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান বলেছিলেন –
"কোয়ান্টাম বলবিদ্যা নামের যে আজব নিয়ম মেনে অতিপারমাণবিক কণারা নিজেদের ক্যারিশমা দেখিয়ে বেড়ায়, সেই সব আজব নিয়ম আসলে দুনিয়ার কেউই বোঝে না।" একধাপ এগিয়ে তিনি আরও বলেছেন, "কেউ যদি দাবি করে যে তারা এসব নিয়ম বোঝেন, তাহলে সেটা ডাহা মিথ্যা কথা!" বোঝো কথা! বিজ্ঞানের পণ্ডিতদের যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কী দশা হবে! তবে কি ওই বিষয়ে মাথা না ঘামানোই ভালো? কিন্তু মাথা যখন আছে, তখন বুদ্ধি না খাটিয়ে উপায় কী? দেখা যাক, ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম-সীমা ছাড়িয়ে কীভাবে বড় পরিসরে পা দিয়ে হৈচৈ ফেলে দিয়েছে এই বিজ্ঞান।
🍂
এবছর (2025) পদার্থবিদ্যার নোবেল পুরস্কারের বিষয় মনোনিত হয়েছিল বৈদ্যুতিক সার্কিটে ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং এবং শক্তির পরিমাণ নির্ধারণ। আর তাতেই বাজিমাত করেছেন তিন পণ্ডিত। পদার্থের অভ্যন্তরে বড় পরিসরে ব্যতিক্রমী সুড়ঙ্গের সন্ধান দিয়ে নোবেল জিতে নিয়েছেন জন ক্লার্ক, মিচেল ডেভোরেট এবং জন মার্টিনিস। সুইডেনের নোবেল কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানাচ্ছেন, "ওঁদের আবিষ্কার কোয়ান্টাম বলবিদ্যার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।"
(১)
কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং-এর সেকাল-একাল :
সকল মৌল ও কতিপয় যৌগ পদার্থের ক্ষুদ্রতম সংস্করণ অ্যাটম বা পরমাণু। এক মিটার দৈর্ঘ্যের এক হাজার কোটি ভাগের এক ভাগ মাত্র স্থান। পরমাণুর চাইতে আরও ক্ষুদ্র জায়গা নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রক। পরমাণুর কেন্দ্রে একটুকরো স্থান। পরমাণুর তুলনায় বেজায় ছোট। পরমাণুর যা আকার, তার প্রায় দশ হাজার ভাগের এক ভাগ মাত্র স্থান কেন্দ্রক। নিউক্লিয়াসকে একটি মশা কল্পনা করলে সাইজে পরমাণু যেন আস্ত এক হাতি। এ হেন হাতির পুরো ভর মশা ধারণ করলে মশার ঘনত্ব কত হতে পারে বলে মনে হয়? তেমনই বেজায় ভারী নিউক্লিয়াস। পরমাণুর ভরের প্রায় সমান। ব্যাপারটা তাহলে কী দাঁড়াল? বিশালাকার পরমাণুর প্রায় পুরো ভরটাই তার কেন্দ্রে রয়েছে। তাই নিউক্লিয়াস দারুণ ঘন। এত ঘন হওয়ার দরুণ নিউক্লিয়াসকে ভাঙ্গা প্রায় অসম্ভব। আবার, নিউক্লিয়াসের এত ক্ষুদ্র জায়গার ভেতর বেশ কিছু মৌলিক কণার বাস। এদের কেউ স্থায়ী; কেউ বা অস্থায়ী। স্থায়ী কণিকা মূলত দুটি। প্রোটন ও নিউট্রন। প্রথমজন ধনাত্মক তড়িৎগ্রস্থ। দ্বিতীয়জন নিস্তড়িৎ। ওরা দুজন প্রায় সমান ভারী। তড়িতের তারতম্য থাকলেও নিউক্লিয়াসের ভেতর এদের আচরণ মোটামুটি একই রকম। কোনো পার্থক্য নেই। এদের দুজনকে তখন এক নামে চেনে সবাই। নিউক্লিয়ন।
বেশ কিছু অস্থায়ী কণিকার বাসও নিউক্লিয়াসে। ইলেকট্রন। পজিট্রন। নিউট্রিনো। মেসন। কেউ ধনাত্মক তড়িদাহিত। কেউ ঋণাত্মক। কেউ বা তড়িৎ নিরপেক্ষ। ক্ষেত্রবিশেষে নিউক্লিয়াসে প্রকট হয় এরা। আরও এক জাতের কণা যৌগিক কণিকা। যেমন আলফা পারটিক্যাল। সমসাময়িক মৌলিক কণার চেয়ে বেশি ভারী আলফা কণা। বেজায় মোটা। প্রোটনের ভরের চারগুণ। ধনাত্মক তড়িৎগ্রস্থ। এর পজিটিভ আধান একটি প্রোটনের আধানের দুই গুণের সমান। তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? আলফা পারটিক্যালের আচরণ এবং আয়নিত হিলিয়াম পরমাণুর স্বভাব হুবহু এক। কোনও তফাৎ নেই। আসলে দ্বি-আয়নিত হিলিয়াম পরমাণুই বকলমে আলফা কণা, যা তেজস্ক্রিয় মৌলের নিউক্লিয়াস থেকে শর্তহীন স্বতঃস্ফূর্ত নির্গত হয়। এ হেন আলফা পারটিক্যাল বেশ ধূর্ত ও চালাক। স্বভাবে স্বাধীনচেতা। মুক্তমনা। নিউক্লিয়াসের চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দী জীবন তার তীব্র অপছন্দ। সে চায় মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়াতে। নিউক্লিয়াসের বাঁধন খুলে খোলা বাতাসে দুদণ্ড শ্বাস নেওয়াতেই তার স্বস্তি। সে সব সময় ফন্দি আঁটে কীভাবে নিউক্লিয়াস থেকে বের হবে? আপাত দৃষ্টিতে নিউক্লিয়াসের বেড়া টপকানো একটিমাত্র আলফা কণার শক্তিতে কুলোয় না। কেন সম্ভব নয় আলফা কণার নিষ্ক্রমণ? একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক। অতি পরিচিত একখানি ভারী মৌল ইউরেনিয়াম। জাতে তেজস্ক্রিয়। প্রকৃতিতে মাটির নীচে পিচব্লেন্ড যৌগ হিসেবে মেলে। পরিমাণে অত্যন্ত কম। সব জায়গায় মেলেও না। তাই বেশ দামী। এক গ্রামের মূল্য কোটি কোটি টাকা। তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়ামের দুটি জাত – বিজ্ঞানের ভাষায়, সমস্থানিক বা আইসোটোপ। এক জাতের আইসোটোপে 92 টি প্রোটন ও 146টি নিউট্রন থাকে। অপর জাতে রয়েছে 92 টি প্রোটন ও 143টি নিউট্রন। প্রথমজনের উপস্থিতি প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত পিচব্লেন্ডে তুলনামূলক বেশি। দ্বিতীয়জনকে খুঁজে পেতে মাইক্রোস্কোপ লাগে। এক গ্রাম সংগ্রহ করতে খুব বেগ পেতে হয়। সুতরাং প্রথমজনের সাপেক্ষে দ্বিতীয় সমস্থানিকের পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। জাপানের হিরোশিমায় এই শেষোক্ত ইউরেনিয়ামের তৈরি পরমাণু বোমা 'লিটল বয়' লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ নাশ করে। তা, ইউরেনিয়ামের কেন্দ্রক থেকে একটি আলফা পারটিক্যাল বের হতে চাইলে কেন বেগ পেতে হয়?
নিউক্লিয়াসকে ঘিরে নিউক্লিয় বল নামক গগনচুম্বী অদৃশ্য কাঁটাতারের যে বেড়া রয়েছে, তাকে টপকানো কোনো স্বাভাবিক কণার পক্ষে সম্ভব নয়। দুর্ভেদ্য নিউক্লিয় প্রাচীর ভাঙতে প্রচুর শক্তি লাগে। কত শক্তি? ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয় প্রাচীর ভাঙতে তা প্রায় 28 মেগা ইলেকট্রন-ভোল্ট শক্তি লাগে। অথচ, একটি আলফা পারটিক্যালের সর্বসাকুল্যে চার মেগা ইলেকট্রন-ভোল্ট শক্তি! এত অল্প শক্তি নিয়ে নিউক্লিয়াসের বেড়া টপকানো কিংবা ভাঙ্গা আপাত দৃষ্টিতে অসম্ভব। এ গোপন খবর আলফা পারটিক্যালেরও অজ্ঞাত নয়। ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স এখানে হাত গুটিয়ে নিয়েছে; কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্স? এর নিয়মে নির্দিষ্ট অথচ অতি ক্ষীণ পজিটিভ সম্ভাবনা রয়েছে। তাই আলফা পারটিক্যাল নিঁখুত প্ল্যান কষে। একসময় সফল হয় নিউক্লিয়াস থেকে চিরতরে মুক্ত হওয়ার। কীভাবে? কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং-ই এর একমাত্র সমাধান।
তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াস থেকে আলফা কণার টানেলিং
নিউক্লিয়াসের আকাশ-সমান প্রাচীর কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের ভাষায় এক ত্রিমাত্রিক পোটেনশিয়াল বাক্স (3D Potential Box), যা দুর্ভেদ্য কাঁটাতারের বেড়া ব-ই অন্য কিছু নয়। এই গভীর শক্তি কূপে একটি আলফা পারটিক্যাল ফেললে সে কি প্রাচীর টপকে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারবে? না, পারবে না। কেন? কারণ, বাস্তবে একটি আলফা পারটিক্যালের যা শক্তি (পড়ুন, উচ্চতা), একটি নিউক্লিয়াস তার থেকে প্রায় সাত থেকে দশ গুণ বেশি উঁচু। ফলে কম শক্তির আলফা কণার পক্ষে অধিক উচ্চতার বেড়া টপকানো রীতিমতো চ্যালেঞ্জের বিষয়। স্বভাবতই বিকল্প পথ এখানে একমাত্র সমাধান। সেই বিকল্প ভাবনার হাত ধরে উঠে আসে সুড়ঙ্গের পরিকল্পনা। আলফা পারটিক্যাল নিজের শক্তির সমান উচ্চতায় সুড়ঙ্গ খোঁড়ে নিউক্লিয়াসে। গোপনে। একাকি। একসময় টানেল খোঁড়া সম্পূর্ণ হলে'পর নিজের খোঁড়া সুড়ঙ্গ দিয়ে তেজস্ক্রিয় মৌলের নিউক্লিয়াস ভেদ করে অনায়াসে বের হয়ে আসে সে। সুড়ঙ্গ কেটে আলফা কণার এ হেন নিষ্ক্রমণের ঘটনা পদার্থবিদ্যায় 'মাইক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং' (Microscopic Quantum Mechanical Tunneling Phenomenon) নামে পরিচিত। রাশিয়ার পদার্থবিদ জর্জ গ্যামো আলফা কণার নিষ্ক্রমণ ব্যাখ্যা দেন 1928 খ্রিস্টাব্দে।
অর্ধপরিবাহীর ভেতরেও কোয়ান্টাম টানেলিং ঘটনা অনবরত ঘটে। দুটি অর্ধপরিবাহীর সংযোগ ঘটিয়ে তৈরি হয় অর্ধপরিবাহী ডায়োড। ব্যাটারির সঙ্গে অর্ধপরিবাহী ডায়োড জুড়ে দিলে ডায়োডের মধ্যিখানে বিভব প্রাচীরে (Potential Barrier) সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ইলেকট্রন ও হোল বা গর্ত চলাচল করে। তার ফলে তড়িৎ প্রবাহিত হয় ডায়োডে। আরও ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। এ হেন কোয়ান্টাম বিজ্ঞানটি কেউ না বুঝলেও কম্পিউটারে, মোবাইল ফোনে, আলোক নিঃসারক ডায়োডে (LED) পুরোদস্তুর কোয়ান্টাম বলবিদ্যার আজব নিয়ম মেনেই চলে। সকলের অজ্ঞাতে। আমাদের শয়নে-স্বপনে-জাগরণে সর্বত্র কলকাঠি নাড়ছে কোয়ান্টাম বিজ্ঞান।
(২)
ক্লাসিক্যাল বনাম কোয়ান্টাম : এক অসম লড়াই
বস্তুর গতি কী অংক মেনে চলে? গ্রহ উপগ্রহ সূর্য – কোন নিয়মে অন্তহীন ঘুরে চলেছে? একটি লাট্টু নিজ অক্ষের চারিদিকে বনবন ঘোরে কোন গণিত মেনে? এসকল প্রশ্নের উত্তর মেলে ক্লাসিক্যাল মেকানিক্সে। চারপাশের অপেক্ষাকৃত বড় দৃশ্যমান বস্তুসমূহের আদব কায়দা তথা নিয়মকানুন জানান দেয় ওপরের বলবিদ্যাটি। অপরদিকে, বস্তুস্থিত বিভিন্ন পারমাণবিক ও অতিপারমাণবিক কণাগুচ্ছের আচরণের সঙ্গে পেল্লাই সাইজের বস্তুর গতি কখনও এক হয় না। অতিপারমাণবিক কণাগুচ্ছের অদ্ভুত আচরণের ব্যাখ্যা চিরায়ত বলবিদ্যার ক্ষমতায় কুলোয় না। তখন আসরে নামে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। কোয়ান্টামের অদ্ভুত জগতের পরিসর অত্যন্ত ছোট। অতি ক্ষুদ্র পরিসরে কাজ করে চলেছে সে। ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র কণিকার অনিশ্চয়তা ও অদ্ভুত আচরণের সঠিক ব্যাখ্যা দেয় কোয়ান্টাম মেকানিক্স। একটি অতিপারমাণবিক পার্টিক্যালের অতি ক্ষুদ্র পরিসরই মাইক্রো-দশা (Microstate)। তরঙ্গ অপেক্ষক (Wave Function) দিয়ে এ হেন কণিকার মাইক্রো-দশা বোঝানো যায়। পার্টিক্যালের যাবতীয় ধর্ম, শক্তি, অবস্থান, গতি, অনিশ্চয়তা, সম্ভাবনা ইত্যাদির খোঁজ মেলে এই তরঙ্গ অপেক্ষকে। অনেকসময় একগুচ্ছ উপপারমাণবিক কণা একসঙ্গে একটি কণিকার মতো আচরণ করে। তারা একসঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। একসঙ্গে ওঠে ও বসে। দূর থেকে তাদের আলাদা অস্তিত্ব নজরে পড়ে না। তখন এদের ঐক্যবদ্ধ কণিকা বললেও অত্যুক্তি হয় না। এদের দশা মাইক্রো-দশার চাইতে ভিন্ন। অর্থাৎ, ভিন্ন এক দশা এদের অনিশ্চয়তা ধর্মের ব্যাখ্যা প্রদান করে। এই দশার নাম ম্যাক্রো-দশা (Macrostate)। জোটবদ্ধ ম্যাক্রো-কণিকার অনিশ্চয়তা কোন গণিত মেনে চলে? চিরায়ত বলবিদ্যার সমীকরণ, না কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ভুতুড়ে নিয়ম? দীর্ঘ সময় যাবৎ এর উত্তর মেলেনি।
কোয়ান্টাম ম্যাক্রো-টানেলিং :
একখান ক্যাম্বিস বল নেওয়া হল। একজন বালক বল হাতে একটি উঁচু কংক্রিটের দেওয়ালের সম্মুখে দাঁড়িয়ে। ছেলেটি দেওয়াল লক্ষ্য করে ক্যাম্বিস বলটি ছুঁড়ে দেয়। এক্ষেত্রে কী ঘটবে?
ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং
দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ক্যাম্বিস বল নিক্ষেপকারীর হাতে পৌঁছতে পারে কিংবা দেওয়ালে প্রতিক্ষিপ্ত হয়ে অন্য যেকোনো দিকে চলে যাবে। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। প্রথাগত বলবিদ্যা এ তথ্য জানায়। এখন অন্য আরেকটি সম্ভাবনার কথা উত্থাপন করি। আচ্ছা, ক্যাম্বিস বলটি কি কখনও কংক্রিটের দেওয়াল ভেদ করে উল্টো দিকে চলে যেতে পারে? মানে, বলটির দেওয়াল ভেদ করার ন্যূনতম সম্ভাবনা আছে কি? এক্ষেত্রে ক্যাম্বিস বলটিকে লক্ষ নিযুত কোটি কণার সমষ্টি ধরলে ক্লাসিক্যাল মেকানিক্সে শেষের সম্ভাবনা কখনও সম্ভব নয়। কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যার আলোকে অতি ক্ষীণ অথচ পজিটিভ সম্ভাবনা আছে। কীভাবে? যদি কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অতি ক্ষুদ্র পরিসর ছেড়ে ম্যাক্রোস্কোপিক কিংবা বড় স্কেলে পর্যবেক্ষণ করা যায়, তবে এর সমাধান সম্ভব। এবছরের নোবেলজয়ী পণ্ডিতগণ দেখিয়েছেন, ক্যাম্বিস বল সংঘাতের মূহুর্তে একটি সুড়ঙ্গ খুঁড়ে কংক্রিটের দেওয়ালের অপর প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়মে। এটাই, সোজা কথায়, ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং। সংক্ষেপে কোয়ান্টাম ম্যাক্রো-টানেলিং। পদার্থবিদ্যার নিরীখে কীভাবে কাজ করে ম্যাক্রো-টানেলিং? ফিজিক্সে কোথায় রয়েছে এমন অদ্ভুতুড়ে নিয়ম? অতিপরিবাহী (Superconductor) পদার্থে দেখা মেলে জোসেফসন জংশন। এই জংশনে ঘটে অত্যাশ্চর্য ঘটনা – ম্যাক্রোস্কোপিক টানেলিং। যোসেফসন জংশন কী?
যোসেফসন জংশন :
অতিপরিবাহী (Superconductor) এক বিচিত্র পদার্থ। অতিপরিবাহীর সঙ্গে সংকট উষ্ণতার দারুণ সখ্যতা। একে অপরের পরিপূরক। সংকট উষ্ণতার নীচে সব পদার্থ অতিপরিবাহী বনে যায়। সংকট উষ্ণতা এমন এক হিমশীতল উষ্ণতা যে তাপমাত্রায় পৌঁছলে নাকি সকল পদার্থের রোধ বা বাধা শূন্য হয়ে যায়। তখন ওই পদার্থের ভেতর দিয়ে অসীম মানের তড়িৎ চলাচল করতে দেখা যায়। আমেরিকার বার্কলে'তে তিন পণ্ডিত ব্রিটিশ পদার্থবিদ জন ক্লার্ক, পোস্ট ডক্টরেট করতে আসা ফরাসি ফেলো মিচেল ডেভোরেট এবং আমেরিকান পিএইচডি স্কলার জন মার্টিনিস শুরু করলেন এক আজব এক্সপেরিমেন্ট। সময়টা ছিল 1985 সাল। তাঁরা বানালেন অতিপরিবাহী নির্ভর এক তড়িৎ-বর্তনী। দুটি স্লাইস পাউরুটির মধ্যে যেভাবে একটুকরো বাটারের পাতলা স্তর যুক্ত করে তৈরি হয় বাটার স্যান্ডউইচ, ঠিক সেভাবেই দুটি অতিপরিবাহী পদার্থের মাঝখানে অন্তরক পদার্থের পাতলা সর দিয়ে বানালেন এক আজব মেশিন – যোসেফসন জংশন। 1962-তে ব্রিটিশ পদার্থবিদ ব্রায়ান যোসেফসন এ হেন জংশনের তাত্ত্বিক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তাই এর নাম রাখা হয়েছে যোসেফসন জংশন। দুটি অতিপরিবাহীর মাঝে যেহেতু একটি অন্তরকের পাতলা স্তর আছে, সেক্ষেত্রে পরিবাহীর দুপাশে তড়িৎ কণার চলাচল সম্ভব নয়। ফলে তড়িৎ প্রবাহ জিরো। তাহলে কীভাবে কাজ করে যোসেফসন জংশন?
বাঁদিক থেকে : জন ক্লার্ক, মিচেল ডেভোরেট ও জন মার্টিনিস
এই মহাবিশ্বে দু'জাতের কণিকা রয়েছে। ফার্মিয়ন ও বোসন। ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন ইত্যাদি কণিকা জাতে ফার্মিয়ন। এরা সব অর্ধেক-স্পিন পার্টিক্যাল। মেসন, ফোটন ইত্যাদি হল বোসন কণিকা। এদের স্পিন অখণ্ড। তাই এরা ইন্টিগ্রাল বা অবিভাজ্য স্পিন পার্টিক্যাল। স্পিনের আবার রকমফের আছে। আপ স্পিন ও ডাউন স্পিন। এক শ্রেণীর কণিকা রয়েছে যারা নিজ অক্ষের সাপেক্ষে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরে। এরা ডাউন স্পিন কণা। ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘোরে যে কণা, তারা আপ স্পিন পার্টিক্যাল।
প্রতিটি ইলেকট্রনের স্পিন কোয়ান্টাম সংখ্যা অর্ধেক (Half)। হিসেব মতো একজোড়া ইলেকট্রনের মোট স্পিন অখণ্ড অর্থাৎ এক। কারণ, অর্ধেক + অর্ধেক = এক। এ হেন একজোড়া ইলেকট্রনের একটি আপ স্পিন পার্টিক্যাল এবং ডাউন স্পিন পার্টিক্যাল ধরলে এই ইলেকট্রন জোড় তখন অন্য নামে পরিচিত হয়। কুপার-যুগল (Cooper Pair)। পাউলি'র অপবর্জন নীতি মেনে দুটি ইলেকট্রনের আচরণ এক না হলেও প্রতিটা কুপার-যুগলের চরিত্র কিন্তু একই। এক্সপেরিমেন্টে 'কুপার-যুগল'-এর এক বিশেষ চরিত্রের দেখা পেলেন পণ্ডিতত্রয়। যোসেফসন জংশন সার্কিটে অন্তরক পদার্থের আপাত অভেদ্য যে প্রাচীর আছে, তা ভেদ করতে সক্ষম কুপার-যুগল। অতি কম তাপমাত্রায় – শূন্য কেলভিন উষ্ণতার কাছাকাছি – এক কেলভিন উষ্ণতার এক হাজার ভাগের কুড়ি ভাগের কম তাপমাত্রায় (প্রায় 20 মিলি-কেলভিন তাপমাত্রা) লক্ষ্য নিযুত কোটি কুপার-যুগল ঐক্যবদ্ধ কোয়ান্টাম সংস্থার (Unified Quantum System) মতো বিচরণ করে। ইলেকট্রনের একক ধর্ম তখন সম্পূর্ণ লোপ পায়। পরিবর্তে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যোসেফসন জংশন ভেদ করে কণামেঘ।
ঐক্যবদ্ধ কোয়ান্টাম সংস্থার লালিত্য এর দ্বৈত কোয়ান্টাম দশা। প্রথমত, পণ্ডিতগণ ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম টানেলিং-এর নকশা এঁকে বানিয়ে ফেলেন এক অতিপরিবাহী বর্তনী। এ হেন বৈদ্যুতিক বর্তনীতে প্রথমে কোনো ভোল্টেজ ছিল না। স্বভাবতই শূন্য ভোল্টেজ থেকে অশূন্য ভোল্টেজে উত্তোরণের জন্য যথেষ্ট শক্তি বর্তনীতে থাকার কথা নয়। অথচ, পরীক্ষায় অত্যাশ্চর্য ঘটনা লক্ষ্য করা গেল। বলা নেই, কওয়া নেই, আকস্মিক সেখানে ভোল্টেজ এসে হাজির! এ তো রীতিমতো ম্যাজিক! কীভাবে সম্ভব হল এমন অসম্ভব কাজ। পণ্ডিতরা দেখলেন, সিস্টেমটি শূন্য বিভব দশা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এক অশূন্য বিভবে উত্তীর্ণ হয়েছে কোয়ান্টাম টানেলিংয়ের কারণে। বৈধ চিরাচরিত শক্তি ব্যতীত বিভব পার্থক্যে এই উত্তোরণ সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র অন্তরকের দেওয়ালে সুড়ঙ্গ খননের করে। আকস্মিক উদ্ভূত ভোল্টেজ পরিমাপ করে এই পরিবৃত্তি বৃহৎ পরিসরে কোয়ান্টাম টানেলিং-এর সরাসরি প্রমাণ। লক্ষ নিযুত কোটি ইলেকট্রন-মেঘের সুড়ঙ্গ পথ তৈরির প্রয়াস এই স্থানান্তরের মূল লক্ষ্য।
দ্বিতীয়ত, ম্যাক্রোস্কোপিক সংস্থায় শক্তির কোয়ান্টায়ন লক্ষ্য করেন পণ্ডিতগণ। নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের মাইক্রোতরঙ্গের ফোটন কণা বর্তনীতে চালনা করে তাঁরা এক অদ্ভুত নিয়ম লক্ষ্য করলেন। তাঁরা প্রত্যক্ষ করলেন যে, সংস্থাটি 'কোয়ান্টা' বা প্যাকেট আকারে নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তির শোষণ বা বিকিরণ করে; নিরবচ্ছিন্ন (Classical) ভাবে নয়। একটি পরমাণু নীলস বোর-এর শর্ত মেনে যেমন কিছু সুনির্দিষ্ট স্থায়ী কক্ষে অবস্থান করে এবং কক্ষান্তরে গমনকালে কতিপয় বৈশিষ্ট্যমূলক রেখা বর্ণালী নির্গমণ বা শোষণ করে, তেমনই যোসেফসন জংশনের ইলেকট্রনগুচ্ছ অবিকল স্থিরীকৃত শক্তি স্তরগুলিকে প্রদর্শন করে এই সার্কিট। এমন ঘটনা দস্তুরমত প্রমাণ করে ম্যাক্রোস্কোপিক সিস্টেম কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নিয়মকানুন মেনে চলে। এই প্রথম বৃহৎ পরিসরে কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য দেখা গেল। দৃশ্যমান জগতে খুলে গেল কোয়ান্টাম বলবিদ্যার 'প্যান্ডোরার বাক্স'।
0 Comments