মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২১৩
অনঙ্গমোহন দাস (স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিধায়ক, ময়না) 

ভাস্করব্রত পতি

তমলুক হ্যামিলটন হাইস্কুলের মেধাবী ছাত্র অনঙ্গমোহন দাস পরবর্তীতে জেলার অন্যতম স্বাধীনতা সংগ্রামীর তকমা পেয়েছিলেন। মেদিনীপুরের পাঠ চুকিয়ে কলকাতার সিটি কলেজে পড়াশুনা করতে যান। এরপর ১৯২১ সালে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে বিএসসি পড়ার সময় সরাসরি অসহযোগ আন্দোলনে যুক্ত হন। তিনি ময়নার প্রাক্তন বিধায়ক অনঙ্গমোহন দাস। 

১৯০৩ সালের আগস্ট মাসে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ময়না থানার মাশুমচক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন অনঙ্গমোহন দাস। বাবা ছিলেন তারকনাথ দাস এবং মা তরঙ্গবালা দাস। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিতি ছিল তাঁর। 

হোমিওপ্যাথিক কলেজ থেকে H. L. M. S. ডিগ্রী লাভ করেন ১৯২৬ সালে। অসহযোগ আন্দোলনের দরুন তাঁকে কারাবরণ করতেও হয়। এর সাথে নানা গঠনমূলক কাজে সক্রিয় উদ্যোগ তিনি দেখাতে থাকেন। একদিকে সমাজসেবামূলক কাজ, অন্যদিকে আইন অমান্য আন্দোলনে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকার দরুন অনঙ্গমোহন দাস ময়না থানার নেতৃত্ব হিসেবে উঠে আসেন। 

এর পাশাপাশি ট্যাক্সবন্ধ আন্দোলনের সময় তাঁর বাড়ির যাবতীয় অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করে ব্রিটিশ সরকার। আইন অমান্য আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯৩২ এর ২৬ শে জানুয়ারি ময়না থানার কংগ্রেস সভাপতি অনঙ্গমোহন দাস গ্রেপ্তার হন। এজন্য তাঁকে এক বছর কারান্তরালে থাকতে হয়। 

১৯৩৯ সালে পুলবন্দী কর বিরোধী আন্দোলনেও তিনি নেতৃত্ব দেন। ১৯৪০ সালে বিশ্ব যুদ্ধ চলাকালীন ভারত অংশগ্রহণ করে। এর প্রতিবাদে গান্ধীজি ব্যক্তিগতভাবে সত্যাগ্রহের কর্মসূচী ঘোষণা করেন। তখন সারা মেদিনীপুর জেলার কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের সাথে সাথে ময়না থানাতেও অনঙ্গমোহন দাস ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহ করেন। ফের তাঁকে গ্রেপ্তার হতে হয়। এবার ছ'মাসের কারাদণ্ড (জানুয়ারি ১৯৪১) ভোগ করেন। 

১৯৪২ সালে পাঁশকুড়া থানার খাড়গ্রামে অরুণা আসফ আলি এসেছিলেন। সেখানে এক গোপন বৈঠকে ভারতছাড়ো আন্দোলনের কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়। বৈঠকে পরিকল্পনা করে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মাধ্যমে পুরো ময়না থানা উত্তাল করার দায়িত্ব গোপনে পালন করেন অনঙ্গমোহন দাস। সেসময় তাঁর বাবার মৃত্যু হলে পিতৃশ্রাদ্ধের দরুন বাড়ি এলে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন ১৯৪২ এর ১ লা সেপ্টেম্বর। এই বছরেই এক ভয়াবহ ঘূর্ণীঝড়ের তিন দিন পর ১৯ শে অক্টোবর ১৫ দিনের জামিনে ছাড়া পান তিনি। 

কিন্তু তিনি তো বাড়িতে থাকার লোক নন। তৎকালীন বাংলা সরকারের শিক্ষা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি এবং প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হকের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁদের দিয়ে ত্রাণকার্যের প্রয়োজনে কারারুদ্ধ জেলা নেতৃবৃন্দের মুক্তির জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু ইতিমধ্যে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা তথা কেশপুরে অপহৃত রাইফেল উদ্ধার না হওয়ায় ব্রিটিশ পুলিশ ইনস্পেক্টর মি. গর্ডন শেষ পর্যন্ত এই ব্যবস্থা কার্যকরী হতে দেননি। ফলে অনঙ্গমোহনকে দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন বিচারক। 

স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৪৮ সালে অনঙ্গমোহন দাস জেলা বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান পদে আসীন হন। এরপরে মেদিনীপুরের স্কুল বোর্ডের প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ এব ১৯৬২ সালে ময়না বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক পদে জয়ী হন। তিনি তাঁর কার্যকালে এলাকার বহু বিদ্যালয় ও লাইব্রেরীর প্রতিষ্ঠা করেন শিক্ষা বিস্তারের স্বার্থে। তিনি খাদি সমবায়েরও প্রতিষ্ঠাতা। এছাড়াও ১৯৩৯ - ১৯৪২ এবং ১৯৪৫ - ১৯৪৮ সালে ইউনিয়ন বোর্ডের সভাপতি হিসেবে কার্যভার সামলেছেন  তিনি। তাঁর রচিত গ্রন্থটি হল 'দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ'। ১৯৯১ এর ৯ ই ডিসেম্বর এই মহান বিপ্লবীর জীবনাবসান ঘটে।

🍂