ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি 

পর্ব ১৭

প্রীতম সেনগুপ্ত 

হিন্দু পত্রিকা সম্পাদক শ্রী যদুনাথ মজুমদার বেদান্ত বাচস্পতি দ্বারা ব্যাখ্যাত ও সম্পাদিত ‘ব্রহ্মসূত্র’ গ্রন্থে এইরকম উল্লেখ আছে ----“কুতশ্চ কোহহং” -- আমি কোথা হইতে আসিলাম এবং আমিই বা কে, এই চিন্তা যেদিন মানবের জ্ঞানক্ষেত্রে প্রথম উদিত হয়, সেই দিন হইতেই তাহার ধর্ম- জিজ্ঞাসার আরম্ভ। মানবের অতি পূর্ব্ববর্ত্তী অবস্থায় যখন জন্ম -মৃত্যু- রহস্যের মীমাংসার্থ কোন চেষ্টারই উন্মেষ ছিল না, তখন এই আত্মচিন্তার অবস্থা কেমন ছিল, তাহা ঠিক অনুমান করা কঠিন; কিন্তু মানবের বিবর্ত্ত - বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সভ্যতার উন্নতির ক্রম-পরম্পরায় ক্রমশ: যে ঐ আত্মচিন্তা পরিস্ফুট হইয়াছে, তাহাতে সন্দেহ নাই। “মানব কি, মানবের অদৃষ্ট কি” ---এই জ্ঞান- পিপাসার প্রবল প্রেরণাতেই মানব কবি, মানব ঋষি, মানব ভবিষ্যদ্বেত্তা। এরূপ মনে করা ভুল যে, অসভ্য জাতির চিন্তা কেবলই বহি-র্বষয়িণী, এবং উহা আদৌ অন্তর্বিষয়ণী নহে। মানব যে কোন দেশীয় বা যে কোন জাতীয়ই হউক্ না কেন, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান যখন তার স্বপ্নাতীত ছিল, তৎপূর্ব্বকাল হইতেও তাহাকে অহংতত্ত্বের আধ্যাত্মিক রহস্য মীমাংসায় কোন না কোনরূপের সচেষ্ট দেখা যায়। এরূপ না হইলে, ইহা অস্বাভাবিকতাজনিত বিস্ময়ের বিষয় হইত।

মানব-জীবন ক্ষণভঙ্গুর, দুঃখ-সঙ্কুল ও ইহার আদ্যন্ত দুর্জ্ঞেয়  রহস্য-সমাকুল। মানবের যদি পুনর্জন্ম না থাকে, কেবল যদি মরিবার জন্যই বাঁচিতে হয়, তবে মানব কি পরিণাম লক্ষ্য করিয়া জীবনধারণ  করিবে? মানবের “মাটির-শরীর“ যদি কেবল মাটি হইবার জন্য সৃষ্টি হইয়া থাকে, তবে ইহার ভোজনার্থ শস্যোৎপাদন , বাসার্থ গৃহপত্তন, আবরণার্থ বস্ত্র-বয়ন, আভরনার্থ অলঙ্কার গঠন ইত্যাদি ব্যাপারে কেন মানব এত বিব্রত হইবে? ইহা যদি এতই অসার, তবে ইহার জন্য কে এত “ভূতের বেগার” খাটিতে চায়? অতএব “মানবজীবনে এই দেহ অপেক্ষা কি স্থায়ী পদার্থ বা সারতত্ত্ব তার কিছুই নাই?” এইরূপে প্রথমে আত্মজিজ্ঞাসার উদয় হয়। এই দেহই কি “আমি”না এই দেহ “আমার”? এইরূপ বিতর্কে মানব-মনের মোহবগুণ্ঠন ধীরে ধীরে অপসারিত হয়, ধীরে ধীরে অধ্যাত্মলোক উদ্ভাসিত  হয়, ধীরে মানব আত্মদর্শনের আভাস পায়, এবং তখন মনে মনে বলে, “আমি দেহ নই, দেহই আমার; আমি দেহাতিরিক্ত স্বতন্ত্র কিছু, নচেৎ আমার এই “আমি”র জ্ঞান কোথা হইতে আসিল? “আমিই নাই” বা “আমি কিছুই না“ এরূপ চিন্তা ত কখনও আমার আসে না। আমি ইহা এই ‘আমি’-- আর আমার এই দেহ ‘আমি’র আধার মাত্র, অতএব আমার এই আধারস্বরূপ  দেহটারই  মৃত্যু ঘটে,  আধেয় “আমি”র মরণ নাই। আচার্য্য শঙ্কর বলেন, “যদি হি নাত্মাস্তিত্ব প্রসিদ্ধিঃ স্যাৎ সর্ব্বলোকঃ নাহমস্মীতি প্রতীয়াৎ” অর্থাৎ যদি আত্মার অস্তিত্বের প্রসিদ্ধি না থাকিতে তবে সকল লোকই ‘আমি নাই’ এরূপ অনুভব করিত।

🍂

মানুষ এইরূপে ক্রমে বুঝিতে পারে যে দেহীই বিষয়ী(Subject ) এবং দেহ বা অন্য যে কোন পদার্থ, সমস্তই বিষয় (Object ); মানুষের আমিত্ব বা আত্মতত্ত্বই জ্ঞাতা এবং আর সমস্তই জ্ঞেয়। মানুষ ক্রমে স্পষ্টই বুঝিতে পারে যে, তাহার এই দেহ একখানি রথস্বরূপ, মন প্রগ্রস্বরূপ এবং আত্মস্বরূপ সে স্বয়ং তাহাতে রথীরূপে অধিষ্ঠিত হইয়া অপর সমস্তের শাসন পরিচালন করিতেছে।

এতাবতা মানুষ বুঝিতে পারে যে, মৃত্যু কেবল তাহার দেহকেই অধিকার করিতে পারে তাহার আত্মাকে নহে। মানুষ ক্রমে “নায়ং হন্তি না হন্যতে” --- গীতোক্ত পরম তত্ত্বের আভাস পায়। আত্মা যদি জন্মেন, স্বীকার করা যায়, তবে তিনি মরেনও বটে, তাহাতে সন্দেহ নাই। অতএব যিনি মরেন না, তিনি জন্মেনও না। আত্মার যদি মৃত্যু নাই, তবে জন্মও নাই।

                         ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ

                                    নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা না ভূয়ঃ।

                           আজো নিত্যং শাশ্বতোহয়ং পুরানো 

                                    ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।।


স্বামী রঙ্গনাথানন্দজী বলেছেন ---‘The people of India have more or less accepted this outlook on life, the thinking people more and the ordinary people less, for which the land became known abroad as a land of philosophers;  for that attitude is the characteristic of a scientific and philosophic mind. Equipped with such a mind and temper, an individual achieves a greater and deeper measure of maturity of knowledge and outlook,  the longer is life and the more varied his experience. Without this temper of reflection, long life means only long existence, nothing more; it just means a repetition of the first round of experience, not capable of producing maturity of outlook and chastening of mind and heart.’