হরিণীর ঋণশোধ
উগান্দা (আফ্রিকা)
চিন্ময় দাশ
পাহাড়ের ঢালটা গড়াতে গড়াতে এক জায়গায় এসে শেষ হয়েছে। সেখানে একটা গ্রাম। আর, সেই পুরো ঢালটা জুড়ে ঘন বন জঙ্গল। শিকার করাই গাঁয়ের লোকদের পেশা। গ্রামে একজন শিকারি ছিল, তার হাত ভারী পাকা। শিকার ফসকায় না তার কখনও।
একদিন পাঁচজন মিলে শিকারে বেরিয়েছে। প্রতিদিন যেমনটা বেরোয় তারা। একজনই শিকার করছে। অন্যরা তেমন কিছু করে উঠতে পারছে না। সেদিন অনেকগুলো পাখি মেরেছে সেই শিকারি।।
এক সময় হঠাৎ একটা হরিণী চোখে পড়ে গেল সকলের। দলের বাকি সবাই সেই শিকারিকে বলল-- তুমি তাক কর।
শিকারি কিন্তু রাজি হলো না। তার বন্ধুরা তো অবাক-- সামনে এমন একটা হরিণ। তুমি বন্দুক তুলছো না কেন?
লোকটা বলল-- দেখছো না, ওর পেটে বাচ্চা আছে। এমন কাউকে কি মারা যায়?
হই-হই করে উঠলো লোকগুলো—আরে, পেটে বাচ্চা আছে, মানে তো, মাংসের স্বাদ অনেক ভালো হবে। এটা তো তুমিও জানো।
শুনল শিকারি। কিন্তু কিছুতেই মানুষটাকে রাজি করা গেল না।
শিকারিদের কথাবার্তা কানে গিয়েছে হরিণটার। চোখ তুলে চেয়েই, সুড়ুৎ করে জঙ্গলে ঢুকে পড়েছে। কপাল গুণে, নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেল হরিণটা।
একদিন দেশ ভ্রমণে বেরিয়েছে শিকারি। যেতে যেতে এক সাপের সাথে তার দেখা। শিকারিকে চোখে পড়া মাত্রই, এক ঘটনা। সাপটা এক যুবক ভিখারি হয়ে গেল। শিকারিকে জিজ্ঞেস করল-- কোথায় চলেছ তুমি?
শিকারি বলল-- বেড়াতে বেরিয়েছি। দেশ দেখার শখ আমার বহুকালের।
ভিখারি বলল-- আমারও দেশ দেখার ভারি ইচ্ছা। সাথে নেবে আমাকে?
--না নেওয়ার কী আছে? চলো, দুজনে একসাথে যাই।
দুজনে একসাথে চলেছে। যেতে যেতে একটা পুকুর পাড়ে হাজির।একটা ব্যাঙ ভেসে ছিল পুকুরে। দুজনকে যেতে দেখে, ব্যাঙ এক যুবকের রূপ ধরে ফেলেছে। সে বলল-- দুজনে চললে কোথায়?
শিকারি বলল—কোথায় আর যবো? দেশ ভ্রমণে বেরিয়েছি আমরা।
ব্যাঙ বলল—দেশ দেখা ভারি ভালো কথা। আমারও ভাই অনেক কালের সাধ। নিজের দেশটাকে একবার দেখে আসি। তা নেবে তোমরা আমাকে সাথে?
শিকারি বলল-- না নেওয়ার কি আছে? চলোই না।
যেতে যেতে, পথে একটা নদী। সেখানে একটা হরিণী জল খাচ্ছিল। দূর থেকে লোকগুলোকে দেখতে পেয়েছে সে। সাথে সাথেই সুন্দরী মেয়ের রূপ ধরেছে হরিণীটা। নদীর জলে চুল ভেজাতে লেগে গেছে।
তিনজনে নদীর পারে যখন পৌঁছাল, মেয়েটি জিজ্ঞেস করল-- কোথায় চললে গো তোমরা?
শিকারি তাদের দেশ ভ্রমণের কথা বুঝিয়ে বলল মেয়েটিকে। শুনে মেয়েটি হাসিমুখ করে বলল-- আমাকে সাথে নেবে তোমরা? আমিও তাহলে দেশটা দেখে নিতে পারি।
শিকারির সেই ওকই কথা—না নেওয়ার কী আছে? চলো, একসাথে যাই সবাই।
মেয়েটিকেও তারা সঙ্গে নিয়ে নিল।
কত দূর পথ চলবার পর, নতুন এক দেশে হাজির হয়েছে চার জনে। সেখানে কিছুদিন থাকবে, তারা ঠিক করে নিয়েছে। শিকারি বিয়ে করল মেয়েটিকে। একটা ছোট্ট ঘর বানিয়ে চারজনে থাকতে শুরু করল।
দিন কয়েক না যেতেই, এক উটকো বিপদ। চারজন বাইরের লোক এসে গাঁয়ে থাকতে শুরু করেছে-- খবর পেয়ে, মোড়লে এসে হাজির। গোল গোল করে চোখ পাকিয়ে, মোড়ল বলল-- কোথা থেকে এসে জুটে পড়লে তোমরা? আমাকে না জানিয়ে, ঘরও বেঁধে ফেলেছো। শাস্তি পেতে হবে তোমাদের।
শিকারি বলল—শাস্তি? অপরাধটাই বা কী এমন করলাম?
মোড়ল বলল—না জানিয়ে, ঘর বানিয়ে ফেলা, অপরাধ নয়? তবে, হ্যাঁ। রেহাই পেতে পারো, যদি একটা কাজ করে দাও।
শিকারি বলল—কাজটা কী, শুনি তা হলে।
--সামনে আমার খেত আছে একটা। বড় নয় তেমন বিঘা চারেক মতন হবে। মোড়ল বলল-- আজ রাতের মধ্যেই ওটায় চাষ করে, সকালেই ফসল ফলিয়ে দিতে হবে। পারো যদি, এদেশেই থেকে যাও চিরকালের মত। আর না পারলে, সোজা কয়েদখানা।
শিকারির তো মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। চার বিঘা জমির চাষ। তাও আবার এক রাতের মধ্যে ফসল ফলিয়ে পাকিয়ে দিতে হবে। তা আবার হয় না কি?
মেয়েটি বলল—অত ভাবছ কেন? হিল্লে একটা হয়ে যাবেই।
শিকারি বলল-- কাল সকাল হলেই কয়েদঘরে পুরে দেবে আমাদের চারজনকে। কী করে হিল্লে হবে?
মেয়েটি বলল—এ নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না। সব ব্যবস্থা আমি করে দেবো। যা বলছি সেটাই কর।
শিকারি অবাক হয়ে বলল—বল, কী করতে হবে? মেয়েটি বলল-- খেতের কাছে নিয়ে চলো আমাকে। দুজনে যাই। সেখানে তুমি আমার মাথা কেটে ফেলো। তারপরে দেখবে, একেবারে জাদুর মতো হয়ে যাবে সব কাজ। কাউকে কয়েদখানায় যেতে হবে না।
শিকারি তো আকাশ থেকে পড়লো। এমন কাজ আবার করা যায় না কি? কোন রকমে তোতলাতে তোতলাতে বলল-- কী বলছ তুমি? আমি কেটে ফেলবো তোমাকে? মেয়েটি বলল-- এতে অবাক হওয়ার কী আছে? দু’দিনের তো পরিচয়। কথা বাড়িও না। যা বলছি তাই করো। ভালোই হবে তোমার।
কিন্তু বললেই কি আর এমন কাজ করা যায়? শিকারি রাজি নয়। মেয়েটি বলল-- যা বলছি, তাই কর। নইলে সারা জীবন কয়েদখানায় পচে মরবে? আমাকেও তো থাকতে হবে কয়েদে। আমি কিন্তু বাপু, তাতে রাজি নয়।
শিকারি দাঁড়িয়ে আছে চুপ করে। মেয়েটি আবার বলল—তাহলে, আমি কিন্তু চলে যাবো এখান থেকে। এবার ভেবে দেখো, কেটে ফেললেও আমাকে হারাবে। না কাটলেও হারাবে। মাঝখান থেকে জেল খাটবে সারা জীবন।
কী আর করে? মেয়েটিকে নিয়ে খেতের ধারে গিয়ে হাজির হলো শিকারি। আলের উপর দাঁড়িয়েছে দুজনে। মেয়েটি বলল-- খেতের দিকে তাকাবে না। পিছন ফিরে দাড়াও। আমার গলা কেটেই, চলে যাবে এখান থেকে। একেবারেই পিছন ফিরে তাকাবে না। তাহলে কিন্তু কিছুই ফল হবে না।
মেয়েটির কথামতো খেতের দিকে পিছন ফিরে দাড়ালো শিকারি। সামনে মেয়েটি। তার গলা কেটেই, বাড়ির পথে ফিরে গেল শিকারি।
অবিরল ধারায় রক্ত বেরোতে লাগলো মেয়েটির শরীর থেকে। খেতের মাটি ভিজে গেল। ভুট্টার চারা গজিয়ে উঠল সারা মাঠ জুড়ে। চোখের পলক না ফেলতেই, গাছ বড় হয়ে উঠতে লাগল। ফল ধরল গাছে গাছে। সকাল হওয়ার আগেই সোনালী রঙ ধরল পুরুষ্টু ফলগুলোতে।
রাত ভোর হয়ে সকাল হলে, সূর্য উঠল আকাশে। রোদ এসে পড়ল মাটিতে। সেই রোদ লেগে, জীবন ফিরে এল মেয়েটির। খেত থেকে উঠে ঘরে ফিরে গেল সে।
ঘরের তিনজন মানুষ তো মেয়েটিকে দেখে অবাক। হাসিমুখে মেয়েটি বলল—চাইলে, দেখে এসো গিয়ে। পাকা ফসলে মঠ ভরে আছে। আমাদের কাউকে আর কয়েদ খাটতে হবে না।
সারা রাত ভাবনায় কেটেছে। এখন আনব্দে নেচে উঠল মানুষগুলো। মেয়েটির মুখেও হাসি। বলল—চলো, সবাই আমরা এখান থেকে চলে যাই। দুষ্টু লোকেরা বাস করে এখানে।
সবাই এক কথায় রাজি। এমন ধুরন্ধর মোড়লের এলাকায় থাকা মোটেই নিরাপদ নয়। নতুন করে কখন আবার কী ফ্যাসাদ বাধায়, তার নাই ঠিক।
চারজনে বাড়ি ফিরে চলল। চলতে চলতে সেই নদীর পাড়ে এসে হাজির হয়েছে তারা। মেয়েটি বলল-- চিনতে পারছো আমাকে? আমি সেই হরিণী। পেটে বাচ্চা আছে বলে, একদিন প্রাণ বাঁচিয়েছিলে আমার। সেই ঋণ আজ আমি শোধ করে গেলাম। তোমাকেও বাঁচিয়ে গেলাম কয়েকখানা থেকে।
শিকারি অবাক হয়ে চেয়ে আছে মেয়েটির দিকে। মেয়েটি বলল-- এবার আমার ছুটি। আমাকে আমার জঙ্গলের জীবনে ফিরে যেতে দাও।
বলেই মেয়েটি হরিণের রূপ ধরে, এক লাফে জঙ্গলে হারিয়ে গেল।
এবার ব্যাঙ বলল-- অনেক হয়েছে আমার দেশ দেখা। আর নয়, এবার আমারও ছুটি।
বলেই ব্যাঙের রূপ ধরে, নদীর জলে ঝাঁপ দিয়ে দিল ঝুপ করে। এসব দেখে, সাপ বলল—বন্ধু, আমি আর একা থাকি কেন? আমিও আমার নিজের জীবনে ফিরে যাই। সঙ্গে নিয়েছিলে, সেজন্য তোমাকে ধন্যবাদ। ভালো থেকো তুমি। নিজের রূপ ধরে ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়ল সাপও।
একা বেরিয়েছিল বাড়ি থেকে। একাই বাড়ির পথ ধরল শিকারি।
0 Comments