স্বপন ঘোষ
আমার স্বপ্ন আকাশ থেকে দায়িত্বের মাটিতে—এক অনন্ত টানাপোড়েনের উপাখ্যান। ইচ্ছের ডানায় ভর করে একদিন অনেক দূর উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। ভেবেছিলাম, জীবন মানেই নিজের মতো করে বাঁচা, নিজের স্বপ্নের রঙে প্রতিটি সকালকে রাঙিয়ে তোলা। কিন্তু সময় বড় কঠিন শিক্ষক। সে শিখিয়েছে—সব স্বপ্ন পূরণ হওয়ার জন্য জন্মায় না; কিছু স্বপ্ন জন্ম নেয় মানুষকে দায়িত্বের পথে অবিচল রাখার জন্য।
ছোটবেলা থেকেই রোগে-জর্জরিত একটি শরীর নিয়ে বেড়ে উঠেছি। জন্ম হয়েছিল গ্রামের এক খেটে-খাওয়া, সংগ্রামী পরিবারে। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, কিন্তু মানবিকতার অভাব ছিল না। চোখের সামনে দেখেছি অসুস্থ মানুষের অসহায়তা, চিকিৎসার অভাবে নিভে যাওয়া কত প্রাণ, দারিদ্র্যের কাছে হার মানা কত স্বপ্ন। সেই বাস্তবতা থেকেই একদিন হৃদয়ে বুনেছিলাম একটি স্বপ্ন—একদিন চিকিৎসক হব, মানুষের কষ্ট লাঘব করব।
কিন্তু স্বপ্নের পথ সবসময় মসৃণ হয় না। জীবনের ধাপে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে করতে সেই স্বপ্ন একসময় বাস্তবতার কঠিন মাটিতে থেমে গেল। ডাক্তার হওয়ার সাধ অপূর্ণই রয়ে গেল। তবুও জীবন আমাকে হার মানাতে পারেনি। কারণ বুঝেছিলাম, মানুষকে সেবা করার পথ শুধু একটি নয়; পথের রূপ বদলায়, কিন্তু লক্ষ্য বদলায় না।
তখন নতুন করে স্বপ্ন দেখলাম—মানুষ গড়ার কারিগর হওয়ার। শিক্ষার আলোয় আলোকিত মানুষই পারে একটি সমাজ, একটি জাতি, এমনকি একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে। সেই বিশ্বাসকে সঙ্গী করে পথ চলেছি। দীর্ঘ সংগ্রাম, নিরলস অধ্যবসায় আর অবিচল নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এবং শিক্ষাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছি। পরবর্তীকালে সর্বোচ্চ শিক্ষাগত সম্মান ডক্টরেট লাভের সৌভাগ্যও হয়েছে। আজও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে লেখালেখি করি, গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থাকি এবং নানান সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার চেষ্টা করি।
জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় আমি সর্বদাই চেষ্টা করেছি স্ত্রী, পুত্র-কন্যা এবং পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রতি আমার সকল দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করতে। পরিবারের সুখ-দুঃখ, প্রয়োজন ও কর্তব্য পালনে কখনো অবহেলা করিনি। একই সঙ্গে সমাজের প্রতিও নিজের নৈতিক দায়িত্ব থেকে কখনো সরে দাঁড়াইনি। আমার বিশ্বাস, একজন মানুষের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন তিনি পরিবার ও সমাজ—উভয়ের প্রতিই সমান নিষ্ঠা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে জীবনযাপন করেন। তাই পারিবারিক বন্ধনের উষ্ণতা অটুট রেখেই শিক্ষার্থী, সমাজ এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত রাখার চেষ্টা করেছি। মানুষের ভালোবাসা, পরিবারের আস্থা, সমাজের সম্মান এবং শিক্ষার্থীদের আন্তরিক শ্রদ্ধা—এসবই আমার জীবনের অমূল্য প্রাপ্তি।
আজ ফিরে তাকিয়ে দেখি, সব স্বপ্ন পূরণ হয়নি। হয়তো কোনোদিন হবেও না। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নটি আজও মনের গভীরে নীরব ব্যথা হয়ে রয়ে গেছে। কিন্তু তার জন্য কোনো আক্ষেপ নেই। কারণ ঈশ্বর হয়তো আমার জন্য অন্য এক দায়িত্ব নির্ধারণ করেছিলেন—জীবন বাঁচানোর নয়, জীবন গড়ে তোলার দায়িত্ব।
একটা বয়সের পর বুঝেছি, নিজের স্বপ্ন আর দায়িত্বের মাঝখানে প্রতিদিনই এক অদৃশ্য টানাপোড়েন চলে। একদিকে অপূর্ণ ইচ্ছার দীর্ঘশ্বাস, অন্যদিকে বাবা-মায়ের মুখের হাসি, পরিবারের নিশ্চিন্ততা, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ব। সেই লড়াইয়ে ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রত্যাশা অনেক সময় ক্ষণস্থায়ী হয়ে যায়, কিন্তু মানুষের কল্যাণে সামান্য অবদান রাখার আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী শান্তি এনে দেয়।
🍂
আমার জীবন গড়ে উঠেছে মা-বাবার আশীর্বাদ, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ, মা সারদা এবং স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শের আলোয়। তাঁদের শিক্ষা আমাকে শিখিয়েছে—নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্য বাঁচাই জীবনের সর্বোচ্চ সাধনা। সেই আদর্শই আজও আমার পথচলার প্রেরণা, আমার সংগ্রামের শক্তি, আমার আত্মবিশ্বাসের উৎস।
আমি জানি, ইতিহাস হয়তো আমার নাম আলাদা করে লিখে রাখবে না। কিন্তু যদি একজন শিক্ষার্থীর জীবনে আলোর দিশা দেখাতে পারি, যদি কোনো তরুণের মনে স্বপ্ন জাগাতে পারি, যদি সমাজের একজন মানুষ হিসেবেও সামান্য উপকারে আসতে পারি—তবেই আমার জীবন সার্থক।
এই আমার স্বপ্ন বুননের ইতিকথা—এক অপূর্ণ স্বপ্নের ভেতর থেকে নতুন স্বপ্নের জন্ম দেওয়ার গল্প; দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার গল্প; দায়িত্ব, আত্মত্যাগ, শিক্ষা, সমাজসেবা এবং মানবিকতার পথ ধরে আজও অবিচল এগিয়ে চলার গল্প। সব স্বপ্ন পূরণ হয়নি, হয়তো কোনোদিন হবেও না; কিন্তু মানুষ হয়ে বাঁচার, মানুষ গড়ার এবং মানুষের পাশে থাকার যে স্বপ্ন, সেই স্বপ্ন আজও প্রতিদিন নতুন করে বুনি, নতুন করে বাঁচি।
1 Comments
Very nice 👍
ReplyDelete