অনুপম রায়
এই প্রশ্নটা আমিও নিজেকে করে থাকি। না লিখলে কি হাত আর লিখলেই বা কি হয়? এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি, হয়ত সারা জীবনেও পারব না। আমি চার ভাগে এই লেখাটি ভেঙে নেব।
কবিতা - কবিতা দিয়েই বোধহয় ৯০% বাঙালির শুরু। আমিও প্রথমে খাতা কলম পেয়ে লিখে ফেলি একটা কবিতা, তার গুণগত মান খুবই খারাপ। এরপর আমি আরো আরো খারাপ কবিতা লেখা শুরু করি এবং বন্ধ করি ২০০৮-এ এসে। তখন চারপাশে এত কবিতা, এত গান এবং সেগুলো সবই এত ভালো লাগতে শুরু করে যে মনে হয় আমার আর লেখা উচিত নয়। আমি আবার কবিতা লিখি ২০১১ তে কোলকাতা ফিরে এসে। আমার প্রথম কবিতা, 'কবিতা আমাকে লিখবেই... ', সুতরাং আমার ভেতরে কোথাও দানা বাঁধছিল কবিতার বীজ। আমাকে লিখতে বাধ্য করে। আমি চেষ্টা করি নতুন ভাবে কবিতা লেখার। আমার অনুভূতিগুলোকে এমন ভাবে বলার যা হয়ত আগে বলা হয়নি। সব সময় যে পেরে উঠি তা নয়। তার কারণ আমার কতটুকুই বা বিদ্যে? কতটাই বা পড়া? কেউ নিশ্চয় সব অনেক আগেই করে গেছে। আমি ব্যক্তি হিসেবে খুবই আবেগপ্রবণ। মাফ করবেন। চেষ্টা করি নিজের আবেগটুকু সামলে রাখতে কিন্তু পারি না। কম্পিউটারের সামনে ডকুমেন্ট খুলে বসলেই হুহু করে কেঁদে ফেলি অক্ষরগুলো সাজিয়ে। প্লেনে চেপে দূর দেশে যাওয়ার সময় ঘুম আসে না, কবিতা আসে। ক্ষমা করবেন।
গান — হ্যাঁ সেই ১৯৯৬ থেকে গান লিখছি। প্রথম দিকের সবই প্রায় বাতিল হয়ে গিয়েছে। কেন গান লিখি? আমার গান লেখার সূত্রপাত কিন্তু কবিতা থেকেই। আমি গায়ক নই, মিউজিক ডিরেক্টর নই, লিরিসিস্ট নই। আমি মূলত একজন কবিয়াল। সং রাইটার। আমি গান বেঁধে ফেলি আমার জীবনে যা ঘটেছে বা যা দেখছি তাই নিয়ে। আমার বিশ্বাস নিয়ে। সুর আমাকে খুব টানে। তাই বারবার ছন্দে বাঁধি আমার বক্তব্যগুলো। আবার একই চিন্তাধারা। এমন গান আমি লিখতে চাই যা আগে লেখা হয়নি। চেষ্টা করি। পারি কি না জানি না। কেউ না কেউ আবার লিখে গেছেন সেই একই কথা অন্য ভাবে। শুধু আমি ২০১৩-তে ২০১৩-র কথাই বলছি। সুরের মোচড়ে প্রাণটা কেঁদে ওঠে। আবার আমার অনুভূতিগুলো কাতর হয়ে পড়ে। এমন অনেক গান আছে যেগুলো আমি কাঁদতে কাঁদতে লিখেছি। আমি কিভাবে আমার কলমকে বাঁচিয়ে রেখেছি তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। সকাল ৮টায় উঠে, সারাদিন অফিস করে, বাড়ি ফিরতে রাত ১০টা। তারপর রাত ২টোঅবধি সেই লড়াই, আমার কাছের মানুষরা জানেন।
গদ্য— আমাকে প্রথম স্বীকৃতি দেয় 'কৌরব'। আমার প্রথম গদ্য, 'আমাদের বেঁচে থাকা' ছাপা হয় ২০১০ আগষ্ট মাসে। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই মাসেই মানুষ প্রথম শুনতে পায়, 'আমাকে আমার মত থাকতে দাও'। সুতরাং ছাপা অক্ষরে আমার প্রথম আত্মপ্রকাশ কিন্তু গদ্যের হাত ধরে। আমি মুক্তগদ্য লিখতে ভীষণ পছন্দ করি। আমার নিজস্ব স্টাইল, নিজস্ব হাস্যরস গদ্যের মধ্যে লুকিয়ে রাখি। আমি গল্প বানাই ইচ্ছেমত। রূপকধর্মী লেখা লিখতে সবচেয়ে বেশী পছন্দ করি। অনেকটা ম্যাজিক রিয়ালিটি নিয়েই আমি এখন বেঁচে আছি। আমার লেখার স্টাইল বিভিন্ন লেখকের দ্বারা প্রভাবিত এবং আমি গর্বিত যে আমি তাঁদের অনেকের সংস্পর্শেই আসতে পেরেছি। শব্দ দিয়ে ছবি তৈরি করা গদ্যকারের কাজ তবে কিছুর আড়ালে মূল বক্তব্য রাখতে চাই সব সময় যেটা হয়ত নতুন হয়ত পুরানো কিন্তু একদম নতুন ভাবে উপস্থাপিত।
কলাম / ব্লগ —ব্লগ আমি বহুদিন ধরে লিখি। নিজের ব্লগের নাম দিই- 'অল্টারনেটিভবাংলা প্রিন্ট' অর্থাৎ এ বি পি। আমি ব্যাঙ্গালোরে থাকাকালীন এই ব্লগ চালু করি। টুকরো টুকরো গদ্য দিয়ে শুরু হয় এইসব। তারপর সেটির একটি একটি করে পাঠক বাড়তে থাকে। কিছুদিন দৃশ্য কবিতা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটিও করেছি। লেখার তাগিদ আসে ভেতর থেকেই। আমার জীবন, আমার এই বেঁচে থাকাকে আমি ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন দূরের মানুষের সাথে শেয়ার করতে চেয়েছিলাম বলে। কিন্তু তাতে সাহিত্য থাকতে হবে, না হলে সে লেখার কোন মূল্য নেই আমার কাছে। এরপর এই ব্লগের লেখাগুলো নিয়ে আমি বেশ কয়েকটি গদ্য বানিয়ে ফেলি। তারপর ছাতা ধরে আসে ব্লগে, লেখা হয় না অনেকদিন। এক সাংবাদিক আমাকে এই ব্লগ নিয়ে প্রশ্ন করায় আমি অবাক হই। এখনো পাঠক আছে? সে প্রশ্ন করে, কেন নিয়মিত লেখা আসে না ওখানে? আমি ক্ষমা চাই এবং পরপর কবিতা পোস্ট করতে থাকি ব্লগে। ব্লগটি আমার অনলাইন কবিতার খাতা হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। আমার ছোট গদ্য লেখার খিদে কিন্তু অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে সংবাদ পত্রের কলাম। মাসে দুটো কলাম লিখতেই হয়। সেখানে আমার মুক্তগদ্য লেখার স্টাইলটা বজায় রেখে, অনেকটা ব্লগের মতনই নানা বিষয়ে কথা বলা যায়। এখানেও লেখার তাগিদ সেই রকম, সাহিত্য হওয়া চাই এবং লেখাটা যেন ভেতর থেকে আসে।
সেপ্টেম্বর ২০১৩(কেন লিখি-২ বিশেষ সংখ্যা)
0 Comments