জ্বলদর্চি

নিসর্গ নির্যাস : জল জঙ্গল পাহাড়/সালেহা খাতুন

নিসর্গ নির্যাস : জল জঙ্গল পাহাড়

সালেহা খাতুন

দিনরাত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং "ভ্রমণসঙ্গী"র পাতা উলটে মানস ভ্রমণকারী এ অধম অন্য কোথাও যাবো না, এই শহরেই থাকবো প্রতিজ্ঞা করে নবনীতা দেবসেনের "হে পূর্ণ তব চরণের কাছে" দুহাতে তুলে নিয়ে হিমালয় ভ্রমণে মত্ত ছিলাম। ও হরি! তিনিই আমায় পথে টেনে বের করলেন। 

কয়েক লিটার জল, শুকনো খাবার আর ওষুধপত্র ভরে নিয়ে একটি চারচক্র যান ডেকে ভোর চারটেয় বেরিয়ে পড়লাম। মেদিনীপুর শহর ছেড়ে গোদাপিয়াশাল, শালবনী, চন্দ্রকোনা, গড়বেতা বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া, রানিগঞ্জ, আসানসোল পেরিয়ে ধানবাদ পৌঁছে গেলাম। পিছু নিয়েছিলাম একটি এসবিএসটিসি বাসের। যানবাহনের পশ্চাদদেশে উৎকীর্ণ লিপিমালার ভক্ত অনেকেই আছেন, আমিও ব্যতিক্রম নই। এবার পড়লাম  "ভেদাভেদ মনে নয়,থাকুক ময়লার বালতিতে"। কী ভালো যে লাগলো! এ বাণী জপ করতে করতে চললাম।

ভাদুতলা পেরোতেই দশম শতকের কেশরী বংশের রাজা কর্ণ কেশরী নির্মিত কর্ণগড়ের মহামায়া মন্দির আর ব্রিটিশ আমলে চুয়াড় বিদ্রোহে প্রধান ভূমিকা পালনকারী রানি শিরোমনির গড় হাতছানি দিতে লাগলো। পারাং নদী বললো চললে কোথায়? একটুকু ছোঁয়া দাও। ছোট্ট বালিকার মতো দিলাম ছুঁয়ে।

আর যৌথ বন ব্যবস্থাপনায় রক্ষিত আরাবাড়ির জঙ্গল-এ  প্রতিবারের মতো এবারেও গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। দুই পাশের ঘন জঙ্গলে সূর্যের প্রবেশ নিষেধ। একটু আগেই অবশ্য সদ্য উদিত সূর্যের আশীর্বাণী পেয়েছি। হাইরোড ধরে ছুটছে গাড়ি। গড়বেতা ঢোকার আগে শিলাবতীর ওপরের সেতুর চারপাশের নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করে রসকুণ্ডুর জঙ্গলের প্রেমে পড়ে গেলাম। ওদিকে গ্র‌্যাণ্ড ক্যানিয়ন গনগনিও গুনগুন স্বরে কানে কানে প্রেমের বার্তা দিয়ে গেল। বললাম, আমিও ভালোবাসি তোমায়; আসছি অপেক্ষা করো। সর্বমঙ্গলার কাছে আমার জন্য প্রার্থনা করো।

মন্দিরময় বিষ্ণুপুর, পাঁচমুড়ার টেরাকোটাশিল্প, মিনি বৃন্দাবন সব পেরিয়ে পথে দেখি দুই বাস ভর্তি তীর্থযাত্রী বাস থামিয়ে সকালের প্রক্ষালন সেরে নিচ্ছেন। মুগ্ধ চোখে তাঁদের অবলোকন করছি আর মিলিয়ে নিচ্ছি হিমালয়ের চারধামের যাত্রীদের সঙ্গে। ট্যুরিস্ট-পর্যটক-তীর্থযাত্রী সবাইকেই পথে নামতে হয়। দুই হাত তুলে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় মনে মনে উচ্চারণ করি  -  
            "পথের সাথি, নমি বারম্বার।
             পথিকজনের লহো নমস্কার।"
দ্বারকেশ্বর নদের ওপরের ব্রিজ পেরিয়ে বাঁকুড়া শহরে ঢোকার মুখে এক্তেশ্বরের দর্শন সেরে শহরকে পাশ কাটিয়ে বাইপাস ধরে ছুটতেই এসে গেলো পশ্চিম বর্ধমান! হঠাৎ দেখি দাঁড়িয়ে পড়েছি সাহেবগঞ্জ-রানিগঞ্জ মোড়ে। সাহেবগঞ্জ চলে যাবো নাকি? না ধানবাদই যাই। 

অবশেষে এসে গেল মাইথন ড্যাম। কিশোরী বেলায় দূর থেকে দেখা ড্যামে এবার বোটিং করবোই এমন বাসনা নিয়েই এসেছি। চারদিকটা একটু ঘুরে দেখে দক্ষ মাঝির হাতে নিজেকে সমর্পণ করে দুঘন্টা ধরে জলে বিহার চললো। ছোটো পাহাড় বড়ো পাহাড় ঘুরে মাইথনের সবুজদ্বীপে নেমে নরম আলোয় নীল জলে সবুজ পাহাড়ে-টিলায় চোখ জুড়িয়ে গেল। জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম ভূগর্ভস্থ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পাশ দিয়ে লকগেট হয়ে উল্টানো চামচের সৌন্দর্য উপভোগ করে স্থলভাগে ফিরে এলাম। কিছুটা এগিয়ে এসে পাঞ্চেতে লকগেটের জল ছাড়ার দৃশ্যে মোহিত হয়ে দেখে নিলাম বিরাট সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পটি কীভাবে রূপায়িত হচ্ছে। 

দামোদর বরাকর দর্শন শেষে এবার চললাম গড় পঞ্চকোট। এ স্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব, সাহিত্যের সাথে সংযোগ কেনা জানে! মধুসূদন দত্ত গড় পঞ্চকোটের রাজাদের এস্টেটে ম্যানেজার হিসেবে কিছুদিন কাজ করেছিলেন। পুরুলিয়া নিয়ে কবিতাও লিখেছিলেন। শেখর রাজবংশের রাজা দামোদর শেখর এই দুর্গের গোড়াপত্তন করেছিলেন। বর্গী আক্রমণে যা ধ্বংস হয়ে যায়। পঞ্চকোট পাহাড়ের কোলের ওয়াচটাওয়ারে উঠে পুরো এলাকার সৌন্দর্য ঈশ্বর প্রদত্ত লেন্সে ধরে লেকের জলে সূর্যাস্ত দেখতে চললাম। মুরাডি ও বড়ন্তি পাহাড়ের কোলের লেকে সূর্য ডোবার অপূর্ব সে দৃশ্যে সমাপ্ত হলো এবারের নিসর্গ ভ্রমণ। আকাশে কোজাগরী পূর্ণিমার চাঁদকে সঙ্গী করে ঘরে ফেরার পালা। আসলে দৃশ্য মানেই নিসর্গ - জল জঙ্গল পাহাড় বুকে নিয়ে অনন্ত পথচলা।
🍂

Post a Comment

0 Comments