জ্বলদর্চি

গুচ্ছ কবিতা/শান্তা কর রায়

গুচ্ছ কবিতা

শান্তা কর রায়

নথির অমিল

এমনি করে ঠেলতে থাকি মৃত্যুর সময়। ভাইরাস আসে মহানিষ্কাশনের পথে, নথিতে কিঞ্চিৎ অমিল।

পত্রিকায় দেওয়া যাবে না, আত্মজীবনীগুলো সাবজেক্টিভ। সমস্ত সমালোচনা কাটিয়ে খোলাটে চোখ দেখলেই হাসি পেত।

মায়ের মুখে দুপুরের মহাভারত, আপন ভাষার গায়ে রক্তের ছিটে। আন্তর্জাতিক হওয়ার আগে আঞ্চলিক হও। ধূপের গন্ধ উড়িয়ে দেয় প্রথা আর গান।

প্রতিটি মুখের ওপরে অন্য আকাশ লাগানো। শুধু ছবিটা বলে, মৃত্যুর সময় কী নিশ্চিন্ত দেখাচ্ছিল! অথচ ছবির বাইরে একটা আলো ক্রমশ সরে যাচ্ছিল।

 
শৃঙ্খলে প্রথম ফাটল

এই চাঁদ ঠিক আমাদের সম্পর্কের মতো, যার বেশির ভাগই স্পষ্ট। বাকি অন্ধকারে আমরা এখনও খাঁচার পাখি।

বসন্ত এসেছিল, তবু খরগোশটা দৌড়ে পালাল। যে মানুষ জানে সে হারছে, তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন জন্মায় না।

শৃঙ্খলে প্রথম ফাটল, যেন দরজা ঠেলে কেউ ঢুকল। পালিয়ে না গিয়ে মুখোমুখি বসার মধ্যে এখনও কিছু সততা আছে।

মাথায় হাত রাখার সেই মুহূর্ত দীর্ঘ যুক্তিনির্ভর প্রতিরোধের মতো, ভালোবাসার থেকেও বেশি কিছু।

অভ্যাস বদলানো যায়, কিন্তু যে হাত একদিন মাথায় রেখেছিলে তার ওজন কি বদলায়?

 

ঘুমটাও অভিনয়

সব অন্ধকার মানেই এখন তোমার নীরবতা। স্টেশনে দাঁড়াই, তুমি নেই। মাঝপথে কাজ আছে বলে পালাও, আমাকে ভোরে পা টেনে হাঁটতে হয়।

ঘুমটাও অভিনয়। যে রাতে কবিতা হারিয়ে যায় সে রাতে কে আর ঘুমোতে পারে?

নিরিবিলি খুঁজতে ছাদে যাই, ফিরে এসে দেখি সমস্ত তালার চাবি হারিয়ে গেছে। ঘর খামখা হাসে।

অমীমাংসিত সেই দিন নীল শিরা বেয়ে নামে শৈত্যপ্রবাহ। অবজ্ঞার হাসি বিষাক্ত করে ভোর।

সারাদিন রোদ না উঠলেই ভালো। কারণ আলোয় স্পষ্ট হয় কোন জায়গাটায় আর কেউ নেই।

 
ডেথ সার্টিফিকেট

এখন তোমার জায়গায় ডেথ সার্টিফিকেট, চোখের নিচে আয়ুরেখা। আর শরীর উষ্ণ হবে না।

হাত থেকে কিছু পড়ে গেলে আর কেউ বকে না। সকালের চায়ের কাপেও তোমার জন্য খানিকটা জায়গা থাকে।

পাশের বালিশে ঘুমিয়ে থেকো। ঘুমাও, জেগে ওঠো, গান শোনাও। রাত জেগে অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ শুনি, ধূপের ধোঁয়ায় ঝাপসা হয় তোমার মুখ।

তুমি যেন বলো, এভাবে আমার দিকে তাকিয়ো না, শব্দের ভেতর খুঁজে দেখো, আমি আছি।

মৃত্যুর সনদে এত কিছু লেখা থাকে, শুধু লেখা থাকে না কোন অভ্যাসটা কার সঙ্গে চলে গেল।

 
 কচুপাতায় আয়ু

একবার তোমার প্রিয় আচারের স্বপ্নে গিয়ে বলব, এখনও মশলা দেওয়া হয়নি। তুমি নিশ্চয়ই হাসবে। আয়ু দীর্ঘ হলে এত প্রেম হতো কি?

মাধবীলতার পাপড়ি কপালে ঠেকাই, সিঁদুরের রঙে আজও অবাক হই। বিস্কুট ডোবানো চায়ে কতবার ডুবে গেছে আমাদের সকাল।

জল তো সহজ হতেই বলেছিল, এতদিন পর আর হিসেব নিয়ে বোসো না। পাথর ফিরিয়ে যে নদী বয়ে এসেছে তাকে আর প্রতিকূলতা শেখাবে কে?

ভেতরে আগুন নিয়েও শান্ত থাকা যায়। অনেক অমাবস্যা পেরিয়ে আজ কচুপাতায় লিখেছি আয়ু।

জল গড়িয়ে গেল। লেখাটুকু রইল না। তবু পাতাটি এখনও সবুজ।
🍂

Post a Comment

0 Comments