বিশ্ব মেনোপজ দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ১৮ই অক্টোবর, বিশ্ব মেনোপজ দিবস। প্রত্যেক নারীর জীবনে এই দিনটি আসে, সঙ্গে আছে কিছু মানসিক এবং শারীরিক সমস্যা, আসুন এই দিনটি নিয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করি।
নারীর জীবনের এক নতুন অধ্যায়কে জানি, বুঝি ও সম্মান করি। প্রতি বছর ১৮ই অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব মেনোপজ দিবস। নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক অথচ বহুলাংশে অবহেলিত শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন মেনোপজ বা রজোনিবৃত্তি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করাই এই দিনটির মূল উদ্দেশ্য। মেনোপজ কোনও রোগ নয়, কোনও দুর্বলতার লক্ষণও নয়। এটি নারীর জীবনের এক স্বাভাবিক সন্ধিক্ষণ, যা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান, সহমর্মিতা এবং সচেতনতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে নারীর ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। টানা ১২ মাস ঋতুস্রাব না হলে, অন্য কোনও শারীরিক কারণ না থাকলে, তাকে মেনোপজ বলা হয়। এই সময় ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা কমে আসে এবং ইস্ট্রোজেন-সহ বিভিন্ন হরমোনের মাত্রায় পরিবর্তন ঘটে, তবে বয়স ও উপসর্গের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নারীর অভিজ্ঞতা এক নয়। কারও ক্ষেত্রে মেনোপজ স্বাভাবিক সময়ে আসে, আবার কারও ক্ষেত্রে চিকিৎসাজনিত কারণে বা তুলনামূলক কম বয়সেও আসতে পারে।
মেনোপজের আগে ও পরে নারীর শরীরে নানা পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। হঠাৎ গরম লাগা, অতিরিক্ত ঘাম, বিশেষ করে রাতে ঘাম হওয়া, ঘুমের সমস্যা, ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি, মেজাজের পরিবর্তন এবং যোনিপথে শুষ্কতা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। কারও কারও ক্ষেত্রে যৌনজীবনে অস্বস্তি, প্রস্রাবের সমস্যা কিংবা হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এই পরিবর্তনগুলি শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ও সামাজিক জীবনকেও প্রভাবিত করতে পারে। দীর্ঘদিনের অস্বস্তি, অনিদ্রা কিংবা হরমোনের পরিবর্তনের কারণে কেউ উদ্বেগ, বিরক্তি বা মন খারাপের মধ্যে দিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের সমাজে মেনোপজ নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা এখনও অনেক ক্ষেত্রে অস্বস্তিকর বলে বিবেচিত হয়, ফলে বহু নারী নিজেদের সমস্যার কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকেও দূরে থাকেন।মেনোপজ নিয়ে সামাজিক নীরবতা ভাঙা আজকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। দীর্ঘদিন ধরে নারীর প্রজননক্ষমতাকে তাঁর পরিচয় ও সামাজিক ভূমিকার সঙ্গে জুড়ে দেখা হয়েছে, তাই ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়াকে অনেক সময় বার্ধক্য, অক্ষমতা কিংবা জীবনের আকর্ষণ হারানোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই ধারণাগুলি শুধু ভুল নয়, নারীর আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার পক্ষেও ক্ষতিকর। মনে রাখা দরকার, মেনোপজের পরেও একজন নারী কর্মক্ষম, সৃজনশীল, প্রাণবন্ত এবং পরিপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারেন। তাঁর অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, দক্ষতা ও ব্যক্তিত্বের মূল্য কোনওভাবেই হরমোনের পরিবর্তন বা প্রজননক্ষমতার সঙ্গে নির্ধারিত হয় না। মেনোপজের সময় নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা এবং মানসিক সুস্থতার দিকে নজর দেওয়া উপকারী। খাদ্যতালিকায় ক্যালশিয়াম ও ভিটামিন ডি-র পর্যাপ্ত জোগান হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় সাহায্য করে। ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মতো বিষয়গুলির দিকে নজর দেওয়াও জরুরি। তবে জীবনযাত্রায় পরিবর্তনই সব সমস্যার সমাধান নয়। উপসর্গ দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী হরমোন থেরাপি বা হরমোনবিহীন চিকিৎসার বিকল্প থাকতে পারে। কোন পদ্ধতি উপযুক্ত হবে, তা নির্ভর করে ব্যক্তির বয়স, উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার ইতিহাসের ওপর, তাই নিজে থেকে ওষুধ বা হরমোন গ্রহণ না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ। মেনোপজের সময় অস্বাভাবিক রক্তপাত হলে, বিশেষত টানা ১২ মাস ঋতুস্রাব বন্ধ থাকার পর আবার রক্তপাত দেখা দিলে, দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন।
মেনোপজ কেবল একজন নারীর ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজেরও বোঝার বিষয়। পরিবারের সদস্যদের উচিত তাঁর শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনগুলিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা, তাঁর কথা মন দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহিত করা। কর্মক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত বিশ্রাম, আরামদায়ক পরিবেশ এবং সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি নারীদের কর্মজীবনকে আরও স্বচ্ছন্দ করে তুলতে পারে।
একই সঙ্গে বিদ্যালয়, কলেজ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও গণমাধ্যমে মেনোপজ সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা বাড়ানো দরকার। কারণ সচেতনতা কেবল তথ্য জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সচেতনতা মানে ভুল ধারণা দূর করা, সংকোচ কাটানো এবং প্রয়োজনের সময় সঠিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা। বিশ্ব মেনোপজ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা কোনও নির্দিষ্ট বয়স বা জীবনের কোনও একটি পর্যায়ে থেমে থাকতে পারে না। বয়ঃসন্ধি থেকে মাতৃত্ব, মেনোপজ থেকে বার্ধক্য জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই নারীর প্রাপ্য সম্মান, যত্ন ও স্বাস্থ্যসেবা। মেনোপজকে লুকিয়ে রাখার নয়, বোঝার বিষয় হিসেবে দেখতে হবে। ভয় নয়, চাই সঠিক তথ্য,অবহেলা নয়, চাই সহমর্মিতা, কুসংস্কার নয়, চাই বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি। আসুন, বিশ্ব মেনোপজ দিবসে আমরা এমন এক সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করি, যেখানে কোনও নারী তাঁর শারীরিক পরিবর্তনের জন্য লজ্জিত হওয়া উচিত না, নিজের সমস্যার কথা বলতে দ্বিধা করাও উচিত না এবং জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাঁচার অধিকার পাওয়া যায়।মেনোপজ জীবনের সমাপ্তি নয়, এটি জীবনের স্বাভাবিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আরেকটি অধ্যায়।
1 Comments
অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি আলোচনা। আমরা যারা এই পর্যায়ে রয়েছি, আমাদের পরিবর্তনকে সংসার-সমাজ-কর্মক্ষেত্র মোটেই গুরুত্ব দেয় না। তবে একটা জিনিস হয়েছে, আমাদের "না" বলার ক্ষমতা।
ReplyDeleteলেখককে ধন্যবাদ।