পিতৃতন্ত্র ও সবলের অধিকার/ মিলি ঘোষ

আর কবে ভাবব! ( পর্ব ৪ )

পিতৃতন্ত্র ও সবলের অধিকার 

মিলি ঘোষ

পিতৃতন্ত্র শব্দটার সঙ্গে আজকাল প্রায় সকলেই আমরা পরিচিত। এর সঙ্গে আমি আরো দু'টো শব্দ নিয়ে হাজির হলাম। তা হলো 'সবলের অধিকার'। এরা একই শ্রেণিভুক্ত, কিন্তু সব ক্ষেত্রে এক নয়। বিষয়টা বেশ গোলমেলে। এমনিতেই গোলমেলে, নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে। 

পিতৃতন্ত্র বা পুরুষতন্ত্র বললেই মনে হবে পুরুষেরা একচেটিয়া রাজত্ব চালাচ্ছে আর মহিলারা তাদের হুকুম তামিল করছে। বিষয়টা কিন্তু অত সহজ নয়। পুরুষতান্ত্রিকতা তার মধ্যেই আছে, যে পুরুষতন্ত্রে বিশ্বাসী। সে নারী, পুরুষ যে কেউ হতে পারে। সমাজ সংসারে বহু মহিলা লাঞ্ছিত হয় মহিলাদের দ্বারাই। যারা অত্যাচার করে, তারা নিজেরা হয়তো সংসার থেকে এমনই অত্যাচার সয়ে এসেছে বছরের পর বছর। দুটো বিশ্বাসের জায়গা থেকে অত্যাচারিত মহিলারা অন্য মহিলাদের অত্যাচার করে। এক ) তারা ভাবে, আমি যখন ভুগেছি, তাহলে আমার অবস্থানে এখন যে আছে, সে কেন ভুগবে না। দুই ) তারা বিশ্বাস করে, এটাই নিয়ম এবং শাশ্বত। 

এর সঙ্গে ঈর্ষা নামক মানুষের একটি স্বাভাবিক অনুভূতিও পুরুষতন্ত্রের কারণ। এই স্বাভাবিক অনুভুতিকে প্রশ্রয় দিয়ে যারা অস্বাভাবিক করে ফেলে, তাদের মধ্যে পুরুষতান্ত্রিকতা চরম আকার ধারণ করে। 

যারা ভাবে, আমি ভুগেছি, তাই বাকি মেয়েরাও ভুগবে, তারা যা করে ক্ষোভ থেকে। বহু বছর ধরে লাঞ্ছিত, অপমানিত হতে হতে ভেতরে জমে থাকা রাগটা উগরে দেয়, তাদেরই মতো অন্য কোনও মহিলার ওপর। আসলে তারা পুরুষের ওপর আর্থিক দিক থেকে নির্ভরশীল। তাদের যাবার কোনও জায়গা নেই। বিয়ের পরে বাবার বাড়িতে আর স্থান নেই। থাকলেও সে আরো কঠিন পরিস্থিতি। সুতরাং শ্বশুর বাড়িকেই তারা অত্যাচারের পীঠস্থান হিসেবে মেনে নেয়, শুধু জীবন ধারণ আর সন্তান পালনের জন্য। তাই পরবর্তী সময়ে ছেলের বউ বা বাড়িতে সব সময়ের কোনও কাজের লোকের সঙ্গে ঠিক একই ব্যবহার করে আত্মশ্লাঘা অনুভব করে। তার এতদিন যে অবস্থা ছিল, ছেলের বউ এখন সেই অবস্থানে। আর সব সময়ের কাজের লোক তো সে'ই হয়, যার তিনকুলে কেউ নেই। অর্থাৎ ছড়ি ঘোরানোর আদর্শ জায়গা। অন্যকে দাবিয়ে রেখে যে তৃপ্তি সে পায়, এটুকু তৃপ্তি ছাড়া জীবনে অন্য কোনও মানসিক তৃপ্তি সে হয়তো আর পায়নি। একের আনন্দ বেশিরভাগই অন্যের নিরানন্দের কারণ হয়। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয় না।  

আর যারা ভাবে, এটাই দুনিয়ার নিয়ম, এটাই চিরসত্য, তাদের যুক্তি অসাধারণ। তারা গর্বের সঙ্গে বলে, পুরুষ মানুষ সারাদিন খাটাখাটনি করে এলে কি তার আর মাথা ঠিক থাকে ? একটু গায় হাত তুললই না হয়। তার সোহাগটা বুঝি কিছু না ? হায় রে বুদ্ধিহীনা! তাই ছেলে যখন বৌ পেটায়, সে বারণ তো করেই না, বরং উস্কানি দেয়। আর ছেলে তো ছোটো থেকে বাবাকে, মায়ের সাথে একইরকম আচরণ করতে দেখে এসেছে। তারপরেও সংসার সুখের হয়েছে রমণীর গুণে। বাবা, মা দুজনেই মুড়ি খেতে খেতে গল্প করেছে। ছেলেকে আদর করেছে, মাছ-ভাত খাইয়েছে। মেলা থেকে ভেঁপু কিনে দিয়েছে। কাজেই ছেলের কাছে বৌ পেটানো তো অস্বাভাবিক কিছু নয়। মা'ও মুখ খুলে ঠাকুমার কাছে শুনেছে, মেয়ে মানুষের এত তেজ ভালো নয়। এখন তার বউও শোনে একই কথা মায়ের কাছে। 
উপরোক্ত ঘটনাগুলো থেকে মানুষ একটা সিদ্ধান্তে এসেছে, যা সমাজের অলিতে-গলিতে, আনাচে-কানাচেতে একটা মুখরোচক বাক্য হিসেবে ঘোরাফেরা করে। সেটি হলো-- মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু। 
আসুন একটু তলিয়ে ভাবি। 
যুগে যুগে মেয়েদের বোঝানো হয়েছে , নারী-পুরুষে বৈষম্য থাকবেই। একেবারে জন্মলগ্ন থেকে এবং এই ব্যপারে বাবা মায়ের ভুমিকা অপরিসীম। তাঁরাই ছেলে মেয়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেন, প্রতি ক্ষেত্রে। এর ফলে পুত্রটি বুঝে যায়, সবার উপরে আমি সত্য আর কন্যা শিখে যায়, মেয়েদের বেশি খেতে নেই, ঘুম পেলেও ঘুমোতে নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। বাবা, মায়ের থেকে যে শিক্ষা পায় ছেলে মেয়েরা, তার প্রভাব  সুদূরপ্রসারী। পরবর্তীকালে বিবাহিত জীবনেও এরই প্রতিফলন দেখা যায়। 
তবে বর্তমানে এতটা বৈষম্য খুব কম সংসারেই দেখা যায়। অন্তত শহুরে শিক্ষিত পরিবারে এই ধরনের ঘটনা কমেই এসেছে। তাঁরা পুত্র-কন্যাকে সমান শিক্ষা, সমান খাদ্য ইত্যাদি আরো যা যা হয়, সমান ভাবেই দিয়ে থাকেন। কিন্তু ভাই, বোনের মধ্যে যদি কোনও কারণে মতের অমিল হয়, দেখবেন তো বাবা, মা বা বাড়ির অন্য বয়স্ক সদস্যরা কাকে সমর্থন করে। হ্যাঁ, এই ২০২২ এ দাঁড়িয়েও বলছি, দেখবেন কে সমর্থন পায়। একই ঘটনা ঘটে বিবাহিত জীবনেও। সেখানে শ্বশুর, শাশুড়ি বা অন্য সদস্যরা বাড়ির বৌকে ভালো পোশাক, নানারকম খাদ্য সবই দেয়। অনেক সময় ছেলের থেকে বউকেই বেশি দেয়। কিন্তু ছেলে আর বউয়ের মধ্যে মতোবিরোধ হলে দেখবেন, কে সমর্থন পায়। একেবারে চোখ বন্ধ করে কী বাবা-মা, কী শ্বশুর-শাশুড়ি বাড়ির ছেলেকেই সমর্থন করে। হ্যাঁ, এই ২০২২ এও। মতের অমিল হতেই পারে। ভাই-বোনেও হতে পারে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও হতে পারে। কিন্তু সংসারে বাকিদের ভূমিকাই দুঃখজনক। তবে ব্যতিক্রম থাকে কোনও কোনও সংসারে। 
এগুলো পুরুষতান্ত্রিকতা নয় ? অথচ, মা এবং শাশুড়ি এক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। আর তখনই আমরা বলি, মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু। শুধু মা, শাশুড়ি নয়, আরো বহু মহিলা থাকে, যারা মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক নষ্ট করে তৃপ্ত হয়। একটা বাক্যের মধ্যে একটা শব্দ বাড়তি যোগ করে বা একটা শব্দ বাদ দিয়ে বাক্যের অর্থ পাল্টাতে এরা সিদ্ধহস্ত। দল বেঁধে কোনও একজনকে আক্রমণ করা এদের প্রায় নেশার পর্যায় পৌঁছে যায়। শুধু পরিবার নয়, স্কুল, কলেজ, কর্মক্ষেত্র, সর্বত্র এরা এই ধরনের কাজ নিপুণ দক্ষতায় করে থাকে। যে কোনও উপায়ে সবার কাছে সেরা হবার একটা প্রবণতা এদের মধ্যে দেখা যায়। সংসারে নারদের ভূমিকাটা এরাই গ্রহণ করে। আর সব ক্ষেত্রে তারা কোনও পুরুষ বা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার মহিলাদের সমর্থন পায় অথবা আদায় করে। এদের মুখে অনেক সময়ই নারীবাদী কথাবার্তা শোনা যায়। অথচ ভিতরে এরা চরম পুরুষতান্ত্রিক।
গাছ তো পোঁতা হয়ে গেছে বাবরের আমলেরও বহু আমল আগে। শিকড় যে কতদূর বিস্তৃত হয়েছে তা আমাদের কল্পনার অতীত। এত সহজে গাছ উপরে ফেলা যায় না। যা কিছু আধুনিকতা সব ওপরের ডালপালায়। 
কান খুলে শুনে রাখুন, মেয়েরা মেয়েদের শত্রু নয়। ছেলেরাও মেয়েদের শত্রু নয়। শত্রু তারাই, যারা এই পুরুষতন্ত্রকে পোষণ করে, সে নারী, পুরুষ যে কেউ হতে পারে।  

তবে অত্যাচার মানেই পুরুষতন্ত্র, তা কিন্তু নয়। 
চায়ের দোকানের মালিক, কিশোর কর্মচারীকে চুলের মুঠি ধরে অনায়াসে দু'ঘা লাগিয়ে দেয়, একটা গ্লাস ভেঙে ফেলার অপরাধে। এটা কিন্তু পুরুষতন্ত্র নয়। এ দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার। বৃদ্ধ মা, বাবা অপমানিত হন, রোজগেরে সন্তানের কাছে। পাঁচ বছরের অবোধ বালিকাও মামা, কাকাদের যৌন লিপ্সার শিকার হয়। শুধু তাই নয়, বহু কিশোরও যৌন হেনস্থার শিকার হয় পাড়াতুতো কাকিমা অথবা আত্মীয়ার কাছে। নামকরা কর্পোরেট অফিস একদিনে ছেঁটে ফেলতে পারে হাজার হাজার কর্মীকে। এমন বহু উদাহরণ আছে, যা আমরা নিত্য দেখি। কিন্তু গায় মাখি না। যেন, সবলের অত্যাচারই দুর্বলের গৌরব। কাজের ফাঁকে একটু সময় বার করে বলি, "কী দিনকাল পড়ল!" সমাজে যত ওপরের দিকে তাকাবেন, দেখবেন সবলের কী আস্ফালন! 'এই তো বেশ আছি'র জীবনে সোফায় গা এলিয়ে বসে টিভির পর্দায় চোখ রেখে বলবেন, "চ্যানেলগুলো কী আর কোনও খবর পায় না দেবার!"

পেজে লাইক দিন👇

Comments

  1. খুব ভালো লাগলো।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল