খর্জুর বীথির ধারে-১২/মলয় সরকার

খর্জুর বীথির ধারে

মলয় সরকার
(১২শ পর্ব ) দ্বাদশ পর্ব


জর্ডনের খেজুর জগতবিখ্যাত। তার মধ্যে Barhi এবং Mejdool খেজুর হল সমস্ত খেজুরের রাজা। এখানে প্রচুর খেজুরর চাষ হয়, যা সারা পৃথিবীতে রপ্তানী হয়। এখানে, ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রায় সাড়ে চার লক্ষ খেজুর গাছ আছে। কিছু খেজুর গাছ বেঁটে, আবার কিছু গাছ একটু লম্বা।এগুলিতে সাধারণতঃ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্তই ফল হয় এবং একটি গাছ সাধারণতঃ সাত বছর বয়স হলে তবেই তার ফল ঠিকমত হতে আরম্ভ করে। আর এই খেজুর গুলো আমাদের দেশের সাধারণ বাজারের খেজুরের মত গুড়ে বা রসে ফুটিয়ে বিক্রী হয়  না। সোজাসুজি গাছ থেকে পেড়ে পরিষ্কার করেই প্যাক করা হয় বাজারের জন্য। সেজন্য এগুলোকে কোন রকম, অন্য কোন পদ্ধতিতে শুকানো বা পাকানো হয় না।ফলে এগুলো একেবারে শক্ত হয় না এবং নরম অথচ সুমিষ্ট স্বাদের হয়।খেজুরে ফাইবার ছাড়াও নানা ধরণের ভিটামিনের প্রাচুর্যের জন্য বলা হয় এটি সমস্ত বয়সের মানুষের শরীর শক্ত মজবুত রাখার জন্য  খুবই প্রয়োজনীয়। এমন কি যাদের ব্লাড সুগার আছে, তারাও নাকি এটি খেতে পারে।এটি হার্টকে রক্ষা করে কারণ এতে ফাইবার ও এন্টিওক্সিড্যান্ট আছে যথেষ্ট। খেজুর কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।হজমে সাহায্য করে, ইত্যাদি নানা গুণ সমৃদ্ধ বলে সারা পৃথিবীতে এর ভীষণ আদর। শুধু তাই নয় আজকাল খেজুরের বীজের আটাও খুব চালু হয়ে গেছে, যদিও এর ব্যবহার আরবে  বহুদিন থেকেই আছে।
অনেকে জানেন কি, জানি না, বিজ্ঞানীদের দাবী, খেজুরই হল পৃথিবীর সবচেয়ে পুরানো চাষ করা ফসল।পাঁচ কোটি বছর আগেও নাকি খেজুর গাছের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে ফসিল থেকে।প্রায় ৩০০০ ধরণের খেজুর গাছ পাওয়া যায়।
এখানে আমরা অনেক জায়গায় খেজুর খেয়েছি, মন ভরে গেছে।

পথে যেতে যেতে একজায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল রিয়াধ। আমাদের বাইরে আসতে বলে ,দেখাল, দেখুন এখান থেকে ঐ বাঁ দিক টা দেখুন ইস্রায়েল ।আর ওই যে ডান দিক ওটাই ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক। ওখানেই বেথেলহেম , যার কাছেই জেরুজালেম। এর মাঝে দেখুন ডেড সী। এই জর্ডনের একপাশে রয়েছে সিরিয়া, সেটা অবশ্য এখান থেকে দেখা যাবে না।
 আমি মনে মনে ভাবলাম, ইস্রায়েল, জেরুজালেম, বেথলেহেমকে দূর থেকে দেখে, যে এখান থেকে কত কাছাকাছি ছিল আমাদের প্রভু যীশুর জন্মভূমি। আজ এই অঞ্চলটার কথা সব সময় শুনি আমরা, যুদ্ধের খবরে। শান্তির রাজা যেখানে জন্মেছিলেন, তাঁর চারপাশেই আজ অশান্তির আগুন জ্বলছে। কি আশ্চর্য সমাপতন! 

খানিকক্ষণ পরেই রাস্তার মাঝে আবার হঠাৎ গাড়ি থামাল রিয়াধ। আমরা চমকে উঠলাম, বললাম, রিয়াধ, কি হল? ও কিছু না বলে গাড়ীটা রাস্তার পাশে রেখে রাস্তার ধারে এগিয়ে গেল। ওকে দৃষ্টি দিয়ে অনুসরণ করে দেখি, রাস্তার পাশে গাছের আড়ালে একটি পুলিশের গাড়ী দাঁড়িয়ে আছে। রায়েধ কাছে যেতেই ওকে ঘিরে ধরল পুলিশের দল। ওর সাথে কি কথা হল বুঝি নি, তবে দেখলাম ও কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পকেট থেকে কিছু কাগজপত্র বের করল।
খানিকক্ষণ পরে ও যখন ফিরে এল, তখন ওর মুখ একেবারে পাংশু বর্ণ, কোন কথা বের হচ্ছে না মুখ দিয়ে । জিজ্ঞাসা করলাম, কি হল রায়েধ? কি বলছিল ওরা? ও বলল, স্যর আজ আমার দিনটা খারাপ। বললাম, কেন? 
ওরা আমাকে ফাইন করল। জানেন, আমার একটা দিনের যা রোজগার সব চলে গেল।জানেন কেন? 
বললাম, কেন? 
আমি যা স্পীড লিমিট তার থেকে মাত্র দু মাইল বেশী স্পীডে চালাচ্ছিলাম। 
বললাম,  তুমি ওদের আলাদা করে কিছু দিয়ে, বলতে পারতে ছেড়ে দিতে?
ও চমকে উঠে বলল, পাগল হয়েছেন? সেটা করলে, ওরা আমার লাইসেন্সই ক্যান্সেল করে দেবে। এখানে ওসব একদমই চলে না। পুলিশের নিয়ম খুব কড়া। 
আমি ভাবলাম, আমরা কোন দেশে বাস করি!! আমাদের দেশের সঙ্গে ওদের দেশের কত তফাত। এই জন্যেই কিছু না থেকেও একটা দেশ এত বড় হতে পারে। অন্তর সম্পদ ও শৃঙ্খলা সততায় ওরা কত উঁচুতে। প্রতি পদে পদে আমার দেশের সাথে তুলনায় হোঁচট খাই।যদিও এটা জানি, একটা দেশের সবাই সাধু নয় বা অসততা নেই এটা হতেই পারে না। তবুও তুলনায় নিশ্চয়ই কম।

বললাম, তুমি এটা মালিককে বলবে, সে-ই তো দিয়ে দেবে, তাই না? রায়েধ বলল, আমি যদি মালিককে বলি, কাল থেকে আর আমাকে গাড়ী চালাতে দেবে না। বলবে, তোমাকে গাড়ী চালাতে দিয়েছি, নিয়ম ভাঙতে তো বলি নি। শেষে তুমি কোনও সময় কোম্পানীর বদনাম করবে, তার থেকে আর গাড়ী চালিও না। তাহলে তো স্যর, আমার ফ্যামিলি না খেতে পেয়ে মরে যাবে।

আমি বললাম, বুলবুলও বলল, দুঃখ কোরো না, তুমি আমাদের বন্ধুর মত সঙ্গে আছ এত দিন, তোমার আজ যা ক্ষতি হয়েছে, বড় ভাইয়ের মত বলছি, তোমাকে আমরা পুষিয়ে দেব। এবার মন ভাল কর। 
ও মাথা নীচু করে সেলাম করার ভঙ্গী করল। 
আমরা এসে দাঁড়ালাম ডেড সীর একেবারে ধারে। দূরে দেখে যাচ্ছে একটি হোটেল। আমাদের রাস্তার বাঁপাশে ঘন নীল ফিরোজা রঙের ডেড সীর জল আর ডান পাশে উঁচু প্রাচীরের মত পাহাড়। রায়েধ বলল, ওই পাহাড় থেকে সৈন্যরা সব সময় বন্দুক হাতে তৈরী হয়ে চারিদিকে নজর রাখছে কোথাও কিছু সন্দেহজনক দখলেই গুলি চালায়।চারপাশে সব তো শত্রুদেশের বর্ডার। 

আমরা ডেড সীর ধারে দাঁড়িয়ে পাশে ডেড সীকে দেখে কেমন যেন একটা অভিভূত লাগছিল। এখান থেকে মাত্র একঘণ্টার গাড়ী দূরত্বেই রয়েছে জেরুজালেম।ভাবছিলাম, এই কি সেই লেক, যেখানে মানুষ ডুবতেই পারে না, আমার সেই ছোট বেলায়, বইতে পড়া জ্ঞান। সেই জিনিস আজ চোখের সামনে। এর জলে আসলে নুনের মাত্রা এতই বেশী যে, এর ঘনত্ব জলের থেকেও অনেক বেশী , ১.২৩গ্রা/ মি লি। ফলে মানুষ এখানে চেষ্টা করেও ডুবতে পারে না। দেখা গেল কিছু মানুষ দূরে ভাসছে জলে। আর আমাদের পাশে নীচেই লেকের যে জল তার অনেক নীচ পর্যন্ত দেখলাম, জলের ধারে সাদা নুনের কেলাস জমে জমে শক্ত পাথর হয়ে আছে জলে, অনেক উপর থেকে জলের গভীর  নীচ পর্যন্ত। অদ্ভুত সে দৃশ্য। কোথাও কোথাও অন্য হলুদ ধরণের নানা কেলাসও দেখতে পেলাম। 

পৃথিবীতে কত আশ্চর্য জিনিস যে রয়েছে ভাবা যায় না। এর লবণ ঘনত্ব সাধারণ সমুদ্রজলের থেকে প্রায় ১০ গুণ বেশি। ফলে এর জলে নানা রোগ মুক্তি হয় বলে মানুষের বিশ্বাস। পৃথিবীর প্রথম ‘হেলথ স্পা’ এখানে তৈরী করেছিলেন, জুডিয়ার রাজা হেরড (বাইবেলে বর্ণিত) ৭৩খ্রীঃ পূঃ -৪ খ্রীঃ পূঃ তে। ইনিই শিশু যীশুকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন।শোনা যায় রানী ক্লিওপেট্রাও নাকি এর জলের উপর বিশ্বাস রাখতেন নিজের সৌন্দর্য্যের জন্য। এছাড়া এর নুন নাকি কাজে লাগত তখনকার দিনে মিশরের মমি তৈরীতে মৃতদেহকে সুরক্ষিত ও অবিকৃত রাখতে।এর জলে ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম ও সোডিয়াম প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।
এই ডেড সীর তলদেশই নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে নিম্নতম স্থান ( সমুদ্রতল থেকে ৩৯৩ মিটার নীচে)
জর্ডন নদী যদিও এতে জল ঢেলে চলেছে, তবু এর জল বেরিয়ে যাওয়ার জায়গা না থাকায়, একমাত্র শুকিয়ে যাওয়াতেই এই বন্দী জলের মুক্তি। এর ফলে জর্ডনের নিত্য আনা নুনের ভার এর বুকে জমা হতে হতে আজ এই অবস্থা।কিন্তু এই ত্রিশ লক্ষ বছরের পুরানো ডেড সী র আজ মৃত্যু ঘন্টা বাজছে। এর জলস্তর নামছে দ্রুতবেগে, প্রতি বছরে প্রায় এক মিটার করে। আশঙ্কা হচ্ছে সম্ভবতঃ আগামী ৫০ বছরে এটি সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাবে।কারণ নানা কারণে জর্ডনের জলের পরিমাণ কমে গেছে আর এর জল বাষ্পীভূত হওয়ার পরিমাণ যথেষ্ট।

এটি সর্বোচ্চ চওড়া ১৫ কি মি , আর লম্বায় প্রায় ৫০ কি মি। এর গভীরতাও কম নয়, প্রায় ৬৫০ ফুট। এই নুনের ঘনত্বের জন্যই এখানে মাছ বা ঐ ধরণের কোন জলজ প্রাণী বাঁচে না।তাই এর নাম ডেড সী মা মৃত সমুদ্র। যদিও এর বিশালত্বের জন্য নাম সমুদ্র ,আসলে,  এটি কিন্তু একটি লেকই।

এখান থেকে আবার ছুটে চললাম আম্মানের দিকে, পিছনে পড়ে রইল অনন্ত সৌন্দর্য্য নিয়ে নীল আকাশের নীচে তার থেকেও বেশি নীলরঙকে বুকে ধরে, আশ্চর্য লেক, ডেড সী।

আজকে ফেরা আবার সেই আম্মানের প্রথম দিনের ম্যারিওট হোটেলে।ফিরে আমাদের বিদায় দিয়ে  রিয়াধ বলল, স্যর, সিস্টার আমি চলি। কাল কিন্তু ঠিক ন’টায় রেডি থাকবেন।
চলুন যাব কাল সম্পূর্ণ অন্য পর্বে।সঙ্গে থাকুন–
ক্রমশঃ–

পেজে লাইক দিন👇

Comments

  1. অসাধারণ ভ্রমণ কাহিনী, না গিয়েও অনেক উপভোগ করছি। কিছু ছবি কল্পনায় আঁকা হচ্ছে।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল