ত্রয়োদশ পর্ব
স্বাতী ভৌমিক
( নৈতিকতার প্রেক্ষাপটে নৈতিক বিচার )
নীতি বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হোলো- নৈতিকতা। নৈতিক বিচারের ক্ষেত্রে সমাজে প্রায় সবাই সোচ্চার। একজন অপরজনের নৈতিক বিচারের ক্ষেত্রে হয়ে যায় নৈতিকতার সর্বোচ্চ বিধানদাতা। কিন্তু কথাটা যত সহজ বলে মনে হয়, ব্যাপারটা ততটা সোজা নয়। নৈতিক বিচার করতে গেলে বিচার কর্তাকে প্রথমেই নিরপেক্ষ হওয়া প্রয়োজন। সমাজে সংসারে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যেটা দেখা যায়, সেটা হোলো- আধিপত্যকামিতা। একজন অপরজনের ক্ষেত্রে তার মতামতকে অবশ্য পালনীয় বলে চালাতে চায়। নৈতিক বিচার হয় ব্যক্তির স্বাধীনভাবে করা কর্মের ক্ষেত্রে। সমাজের যে কাজ তুলনামূলকভাবে বেশি উপযোগিতা বা ভালো ফল উৎপাদন করবে সেটাই নৈতিক কর্তব্য পদবাচ্য। এই বিচার্য ব্যাপারকে সবাই কিন্তু শীর্ষে রেখে কোন কিছু বিচার করে না। যার বিচারে যা সঠিক মনে হয়, অপরের যুক্তির তোয়াক্কা না করেই বিধান দেওয়া হয়- 'এটা ভুল', 'এটা ঠিক', 'এটা খুব গর্হিত অপরাধ', 'এটা খুব ঠিক কাজ' ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু ব্যক্তিবিশেষের মত কখনো সর্বজনীন বিচারের মানদন্ড হতে পারেনা। কিছু কিছু ব্যাপার থাকে যেগুলোতে ব্যক্তি স্বাধীনতার ব্যাপার থাকে। সেগুলো বিচারের সময় ব্যক্তি স্বাধীনতার কথাকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যক্তির মতামতকে বিচারের আওতায় আনা উচিত।🍂
তবে ব্যক্তি স্বাধীনতা কখনোই যেন স্বেচ্ছাচারের নামান্তর না হয়ে যায়, সেদিকে দৃষ্টি রাখা দরকার। সবারই জীবনের মূল্য রয়েছে। কেউ নিজ স্বার্থের জন্য অপরের প্রাণ ছিনিয়ে নিতে পারে না। অপরের মত প্রকাশের অধিকার থাকা উচিত। বিবেকের ক্ষেত্র সবাইয়ের সমান হয় না। সবাইয়ের মতামত একই রকম নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কোন অভিমত বেশি গ্রহণযোগ্য হবে, তা সুষ্ঠুভাবে বিচার্যনীয়। তাই নৈতিক বিচার মানে সমালোচনা নয়, নৈতিক বিচার হল বিচারের দ্বারা- বিবেচনার দ্বারা সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হবার প্রক্রিয়া।
তবে সাধারণভাবে এটা বলা যায়, যে কাজ সমাজে বেশি কল্যাণকর তা-ই বেশি গ্রহণযোগ্য। তবে এ কথা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, নৈতিক বিচার কখনোই সমালোচনা বা বিবাদ এর বিষয় নয়। নৈতিক বিচার কখনোই ব্যক্তিসাপেক্ষ ব্যাপার নয়। আর তা-ই যদি হয়, তাহলে সবার বিচারে সবাই সঠিক বলেই বিবেচিত হওয়া উচিত।
আমরা যে নৈতিক বিচার করি তার মূলে অনেকটাই আমাদের সংস্কার থাকে। কিন্তু সংস্কার 'সু' হতে পারে আবার 'কু'-ও হতে পারে। যার যথার্থ ব্যাখ্যা আমাদের কাছে থাকে না-শুধুমাত্র প্রথাগত পারম্পর্য যেক্ষেত্রে কাজ করে, তাকে আমরা কুসংস্কার বলতে পারি। সুসংস্কার হোলো, যার যথার্থ ব্যাখ্যা আমাদের কাছে থাকেএবং যা কোনো সময়ের সীমানায় সীমিত নয়। তা-ই হলো সুসংস্কার। সাহায্য করা, অযথা কারোর কষ্টের কারণ না হওয়া ইত্যাদি হলো সুসংস্কার। এগুলো মানবতার সাথে, মনুষ্যত্ববোধের সাথে সম্পৃক্ত। এগুলো কালজয়ী সংস্কার। কিন্তু কুসংস্কার হল তা-ই, যা ব্যক্তির বিচার বিযুক্ত চিন্তাধারার উপর প্রতিষ্ঠিত হয় অথবা যা যুগোপযোগী বা সময়োপযোগী সামাজিক সমস্যা গুলোর সমাধানের জন্য কোনো একসময় হয়তো প্রয়োজনীয় ছিল কিন্তু কালিক পরিবর্তনের পরে তা প্রাসঙ্গিক- গুরুত্বপূর্ণ না হলেও শুধুমাত্র কোন এক সময় প্রচলিত ছিল বলে বর্তমানেও তা যুক্তিযুক্ত মনে করাটা কুসংস্কার আচ্ছন্ন মনোভাবের পরিচায়ক।
নৈতিক বিচারের প্রসঙ্গটি শুধুমাত্র মনুষ্য জগতের সাথে যে সম্বন্ধিত তা কিন্তু নয়। নৈতিক বিচারের সীমা বলতে গেলে প্রায় পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তার আওতাভুক্ত। মানুষ সভ্যতার বা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। কারণ তার উচ্চ বুদ্ধিমত্তা আছে। তাই বলে সৃষ্টির বাকি সবকিছু শুধুমাত্র মানুষের ভোগের জন্য- এই চিন্তা ধারা কিন্তু নৈতিক বিচার সম্মত নয়।
সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে ভোগের ক্ষেত্রে মানুষ-ই অগ্রাধিকারী, এটা ভাবা নৈতিকতা বা আধ্যাত্মিকতা কোন দিক থেকেই যথোচিত নয়। সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে প্রকৃতি জগত ও আধ্যাত্মিক জগতের ক্ষেত্রে অনেক দায়বদ্ধতা রয়েছে- এটা অনস্বীকার্য। মানুষের উদগ্র ভোগবাসনার ফলে শুধুমাত্র ব্যক্তির স্বীয় জীবনপথে যে তার প্রভাব পড়ে তা নয়, সমগ্র প্রকৃতিজগতেও এর কুপ্রভাব পরিলক্ষিত হয়।এর প্রমাণ, বর্তমান পরিবেশে স্পষ্ট রূপে দৃষ্ট হয়। পরিবেশ দূষণের মাত্রা এত বেড়ে গিয়েছে যে, প্রকৃতি সুস্থভাবে এর ভারসাম্য রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় মানব সভ্যতা বর্তমানে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের, মহামারীর সম্মুখীন হচ্ছে বারে বারে। আর ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষেত্রে ব্যক্তি নিজস্ব মানসিক স্থিতিশীলতা হারিয়ে সুখ শান্তির খোঁজে দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
তাই সমগ্র প্রকৃতি জগৎ তথা জড় প্রকৃতি জগত ও স্বীয় প্রকৃতি জগত উভয় ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার জন্য নৈতিক চেতনা সমৃদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বাহ্য প্রকৃতি জগত ও মনোজগত উভয় ক্ষেত্রে শ্রদ্ধাপূর্ণ মনোভাব ব্যক্তিকে স্থূল আত্মকেন্দ্রিক হওয়া থেকে রক্ষা করে। পরিণামে প্রকৃতির ভারসাম্য যেমন রক্ষিত হয়, তেমনি নিজের অন্তর জগতেও ব্যক্তি স্বীয় ভারসাম্য রক্ষায় সমর্থ হয়।।
0 Comments