জ্বলদর্চি

নিষ্পাপ শিশুকণ্ঠে কাঁদে কবিতারা/ কমলিকা ভট্টাচার্য

নিষ্পাপ শিশুকণ্ঠে কাঁদে কবিতারা

 কমলিকা ভট্টাচার্য 

মল্লিকা সেনগুপ্ত একদিন একটি সংবাদপত্রের ছোট খবর থেকে শুনেছিলেন এক বালিকার কাঁপা শ্বাস। সেই শ্বাস কবিতায় পরিণত হয়েছিল—“বালিকা ও দুষ্টু লোক”। শব্দগুলো ছিল সরল, অথচ তীক্ষ্ণ; শিশুর ভয়, লজ্জা, আর মায়ের কাছে আশ্রয় চাওয়ার আর্তি সেখানে কাঁপছিল স্পষ্টভাবে—

স্কুলবাসের বাচ্চা মেয়ে সবার শেষে নামে
সঙ্গীগুলো বিদায় নিলে তার কেন গা ঘামে!
বাসের কাকু বাসের চাচা কেমন যেন করে
হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে দিয়ে আমায় নিয়ে পড়ে।
কাকু জেঠুর মতন নয় দুষ্টু লোক ওরা,
মাগো আমার বাস ছাড়িয়ে দাও না সাদা ঘোড়া!
দুষ্টু কাকু দুষ্টু চাচা থাকুক না তার ঘরে,
বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে কেন অসভ্যতা করে!
এই পৃথিবী সাদা কালোয় মন্দ এবং ভাল,
তবু কেন এই জীবনে ঘনিয়ে এল কালো?
আমার কিছু ভাল্লাগে না স্কুলের বাসে ভয়,
মাগো তোমার পায়ে পড়ি ওই বাসে আর নয়।
আমাকে আর কিছুতেই যেন না ছুঁতে পারে ওরা,
আমাকে দাও সবুজ মাঠ পক্ষীরাজ ঘোড়া।

আজ এত বছর পরে দাঁড়িয়ে মনে হয়—কবিতাটা পুরোনো হয়নি, বরং আরও নতুন, আরও কষ্টকর হয়ে উঠেছে। কারণ শিশুর ভয় বদলায়নি। বদলেছে কেবল মুখ। এখন অনেক সময় সেই ‘দুষ্টু লোক’ বাইরের কেউ নয়—ঘরের ভেতরের মানুষ। সম্পর্কের নাম আছে, বিশ্বাসের চাদর আছে, কিন্তু নিরাপত্তা নেই।
একটি ছোট্ট মেয়ে শব্দ জানে না, আইন জানে না, পাপ-লজ্জার অভিধান জানে না। সে শুধু জানে—“কষ্ট হচ্ছে।” তার শরীর আগে বোঝে, মন পরে। সে বলে ফেলে, সরলভাবে, অকপটে। কিন্তু বড়রা সেই কথাকে ঢেকে দেয়—“চুপ… এটা ঘরের কথা।”
এই ‘চুপ’ শব্দটাই শিশুর বুকের ভেতর সবচেয়ে জোরে বাজতে থাকে।🍂

তারপর আরেকটি কণ্ঠ আমি শুনতে পাই যেন একই শিশুর আরেক জন্ম—

বাবা বলেছিল—
আকাশ নাকি নীল,
কিন্তু তার আঙুলের ছায়া
আমার আকাশ ঢেকে দেয় কালো ধোঁয়ায়।

আমি তখনও শব্দ শিখিনি,
শুধু অস্বস্তির ভাষা জানি—
বলেছিলাম, “ব্যথা হচ্ছে”,
সে বলেছিল, “ভালো লাগে”—
কোন অভিধানে এই মানে লেখা থাকে?

মা-কে বললে মা কাঁপা গলায় বলে,
“চুপ… কারও কাছে বলো না,
এটা ঘরের কথা।”
ঘর কি তবে দরজা বন্ধ করা অন্ধকার?
আমি জানি না পাপ কী, লজ্জা কী,
জানি শুধু—
তার ছোঁয়ায় আমার পুতুলগুলোও কাঁদে,
আমার স্কুলব্যাগ ভারী হয়ে যায়
না-পড়া বইয়ের থেকেও বেশি।

আমি জানালা দিয়ে সবুজ মাঠ দেখি,
দৌড়ে যেতে ইচ্ছে করে—
যেখানে কোনো হাত নেই,
কোনো গোপন কথা নেই,
শুধু হাওয়া, পাখি আর খোলা আকাশ।

আমাকে দাও না সেই মাঠ,
পক্ষীরাজের পিঠে বসিয়ে—
যেখানে ‘বাবা’ শব্দটা আবার
নিরাপদ হয়ে ফিরে আসে।

এই দুই কবিতার মাঝখানে আছে পঁচিশ বছরের সময়, আর অগণিত শিশুর নীরব কান্না। আমরা বড়রা অনেক সময় শুনতে পাই না, কারণ সেই কান্না শব্দ করে না। তা প্রকাশ পায় আচরণে—হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়া, কারও কাছাকাছি যেতে না চাওয়া, রাতের ঘুম ভেঙে কাঁদা, অকারণে ভয় পাওয়া। এগুলো অভিযোগপত্র নয়, কিন্তু এগুলোই সত্য।
আমরা পরিবার বাঁচাতে চাই, কিন্তু শিশুকে বাঁচাতে ভুলে যাই। “সম্মান” শব্দটি অনেক বড় হয়ে যায়, “নিরাপত্তা” শব্দটি ছোট হয়ে যায়। অথচ যে পরিবারে শিশুটি নিরাপদ নয়, সেই পরিবারের সম্মান কিসের?
শিশুর শরীর নিয়ে স্বাভাবিক কথা বলা, তার “না” বলাকে গুরুত্ব দেওয়া, সে কিছু বললে নিঃশর্ত বিশ্বাস করা—এগুলো কোনো আধুনিকতা নয়, এগুলো মানবিকতার ন্যূনতম শর্ত। স্কুল, বাড়ি, সমাজ—সব জায়গায় যদি এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে শিশু নির্ভয়ে বলতে পারে “আমার কষ্ট হচ্ছে”, তবে অনেক জীবন অন্ধকারে হারিয়ে যাবেনা।

কবিতা পৃথিবী বদলায় না—কিন্তু হৃদয় নরম করে। আর হৃদয় নরম হলে মানুষ শুনতে শেখে। হয়তো কোনো মা এই লেখা পড়ে সন্তানের দিকে একটু বেশি তাকাবেন। হয়তো কোনো বাবা সন্তানের ভরসার জায়গা হয় উঠবেন। হয়তো কোনো শিক্ষক বুঝতে পারবেন কোনো শিশুর অস্বাভাবিক নীরবতার মানে। একটু সচেতনতা আর বিবেক জেগে উঠলে বদলের শুরু হয় ,ঘরের ভেতর ছোট ছোট কথোপকথনে—যেখানে শিশুটি নিশ্চিন্তে বলতে পারে, “আমার কষ্ট হচ্ছে”, আর বড়রা নিঃশর্তভাবে বলে, “আমি আছি।” সেই “আমি আছি” কথাটিই একদিন হয়তো প্রতিটি শিশুর জন্য সত্যিকারের সবুজ মাঠ হয়ে উঠবে।

Post a Comment

2 Comments

  1. শুধু মেয়েদের নয়, শৈশব এবং কৈশোরে ছেলেরাও একই অবস্থায় পড়ে। কিন্তু পুরুষদের কষ্ট সহ্য করতে হয় - এই ধারণায় তারা উপেক্ষিত হয় চিরকাল।

    ReplyDelete
  2. কমলিকাMarch 28, 2026

    কিন্তু সেই কথাগুলো আগে ছেলেদেরই সামনে এসে বলা প্রয়োজন।
    আমি আমার স্বামী এবং শ্বশুরমশায়ের কাছ থেকে তাঁদের ছোটবেলার বহু অভিজ্ঞতার কথা শুনেছি—বড় সংসারে মা-বাবার অবহেলা, ভাইবোনদের প্রতি দ্বিচারিতা, আর এক ধরনের উদাসীনতা, যা তাদের মনোজগতে গভীর ছাপ ফেলেছিল। আমার বাবাকেও আমি কাছ থেকে দেখেছি; সেই অভিজ্ঞতার কিছু অংশ নিয়ে আমার লেখালেখিও রয়েছে। তবে যৌন লাঞ্ছনার মতো কোনো ঘটনার কথা আমার জানা নেই।

    ReplyDelete