দূর দেশের লোকগল্প— ২৮১
মাকড়সা কর্তার হুকুমদারী
সোমালিয়া (পূর্ব আফ্রিকা)
চিন্ময় দাশ
মাকড়সা কর্তার বাড়িটা তাদের পাড়ার একেবারে একটেরে। বউ আর সাতটা ছেলেমেয়ে নিয়ে তার সংসার। চারটা ছেলে আর তিনটে মেয়ে।
গোটা পাড়ায় লোভী বলে বদনাম আছে এই মাকড়সার। সকাল হলেই গোটা পরিবার নিয়ে শিকারে বেরোয় কর্তা। বদনাম ঘোচাবার জন্য, নিয়ম করে দিয়েছে কর্তা—শিকারে বেরিয়ে কেউ কোনও জীব হত্যা করবে না। মশা-মাছি থেকে বাঘ-সিংহ কিছুই না। কেউ যদি হুকুম অমান্য করে, তার কিন্তু খাওয়া বন্ধ।
এমন হুকুমে সবারই মুখ ভার। নিরামিষ খেয়ে খেয়ে মুখ ধরে গেল। কিন্তু উপায় কী। হুকুম না মেনে তো উপায় নাই।
মাকড়সা কর্তার বাবা-মা থাকে নিজের গ্রামে। একদিন কর্তা বেরিয়েছে বাবা-মাকে দেখতে। যাবার বেলায় জীব হত্যা না করার নিয়মটা স্মরণ করিয়ে গেল সকলকে।
ক’দিন বাদে গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরে আসছে। ফেরার পথে এক ঘটনা। বাড়ি পৌঁছতে বেশি পথ নাই তখন। সামনে বিশাল এক হাতি দেখতে পেয়ে গেল মাকড়সা। চোখ চকচক করে উঠল হঠাৎ। আহা, কী নধর আর পুরুষ্টু চেহারাখানি।
জিভে জল এসে গেল কর্তামশাইর। লালা সরতে লেগেছে মুখে দিয়ে। জীব হত্যা নিষেধ—নিজেই ফরমান দিয়ে রেখেছে। মাথা থেকে উবেই গেল সেই হুকুমদারী। এত বড় একটা হাতি আর তার নরম তুলতুলে মাংস ছাড়া, আর কিছুই কাজ করছে না মাথায়।
ছোট-বড় মিলিয়ে চার জোড়া পা মাকড়সার। মনস্থির করে নিয়েছে মাকড়সা। কিন্তু একটা হাতিকে হত্যা করা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। দেখতে দেখতে চেহারাটা একেবারে দানবের মত বড় করে ফেলতে লাগল। খানিক বাদে কোথায় গেল মাকড়সার সেই হালকা-পলকা দুবলা চেহার। একেবারে একটা অক্টোপাসের আকার নিয়েছে সে।🍂
হাতি কিছু বুঝে উঠবার আগেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে মাকড়সা। পেঁচিয়ে ধরেছে অতো বড় জীবটাকে। খানিক ছটফট করে নিথর হয়ে গেল হাতি।
মাকড়সাকে তখন পায় কে। আনন্দে বুক ফেটে যাবার অবস্থা। হাতিটাকে ঘাড়ে ফেলে, বাড়ি ফিরতে লাগল। খানিক পথ পেরিয়েছে, এক বিভ্রাট। মাথার ভিতর চিড়িক করে উঠল। হঠাৎই মনে পড়ে গেল, জীব হত্যা না করার হুকুম জারি করে রেখেছে নিজেই। তাহলে, নিজেই কী করে হাতি শিকার করে নিয়ে ঘরে ফিরবে? বউ-বাচ্চাদের কাছে মুখ দেখাবে কী করে?
একটা নদীর ধারে পৌঁছেছে তখন। ছোট তিনটা বাঁক পেরোলেই তার বাড়ি। যদি চোখে পড়ে যায় কারও। ধপাস করে ফেলে দিল হাতিটাকে।
মনে মনে একটা ফন্দী আঁটতে আঁটতে ঘরে ফিরে এল মাকড়সা। বিছানায় গড়িয়ে গিয়ে, বড়ছেলেকে বলল—একবার ছুটে যা। নদী থেকে এক কলসী টাটকা জল নিয়ে আয় তো। এতটা পথ পেরিয়ে, শরীর একেবারে টাটাচ্ছে।
বউ বলল—এই খানিক আগেই তো মেয়েরা জল তুলে এনেছে নদী থেকে। গায়ে মাথায় ঢেলে নাও। শরীর জুড়িয়ে যাবে।
ফন্দীটা কাজে এলো না। এবার মেজো ছেলেকে বলল—একবার নদীর দিকটায় ঘুরে আয় তো। ভালো করে জরীপ করবি। কিছু চোখে পড়ে কি না।
ছেলেটা ফিরে এলো। বলল—কই না তো। কিছুই তো তেমন দেখলাম না।
মাকড়সা ভেবে পাচ্ছে না, হোলটা কী? এতো বড় একটা হাতি। কারও চোখে পড়ছে না। ব্যাপারখানা কী?
এবার একবার এই ছেলে, তো একবার ঐ মেয়েকে পাঠাতে লাগল। ফিরে এসে সকলের একই জবাব—কই কিছুই তো দেখতে পেলাম না।
এই করে দিনটা কেটে গেল। রাত নামল দেখতে দেখতে। সবাই ঘুমিয়ে কাদা। কর্তার চোখে ঘুম নাই। তখন মাঝরাত। চুপি চুপি পায়ে নিজেই নদীর ঘাটে গিয়ে হাজির। হাতিটাকে তুলে এনে, বাড়ির পিছন দিকে ফেলে রেখে দিল।
সকাল হয়েছে। নিজে উঠল না বিছানা থেকে। বউকে বলল—পেছন দিকটা একবার দেখে আয় তো ভালো করে।
--কেন? পেছন দিকে আবার কী হোল?—বউ জানতে চাইল।
--মাঝরাতের দিকে কিসের যেন ধুপধাপ আওয়াজ কানে এসেছিল। ভয়ে বাইরে বেরুইনি। একবার দেখে আয় না।
বউয়ের মুখে মিটিমিটি হাসি। রাতেই সব জেনে ফেলেছে সে। জানালা খুলে, সবই দেখেছে নিজের চোখে।
সেসব বুঝতে না দিয়ে, বাড়ির বাইরে এক চক্কর দিয়েও এল—কই, কিছুই তো দেখলাম না।
মাথায় কিছু ঢুকছে না মাকড়সার। ব্যাপারখানা কী? মরীয়া হয়ে, বউকে বলল—তাহলে, বাড়ির চারদিকটা ভালো করে ঝাঁটপাট দিয়ে পরিষ্কার করে ফেল দিকি। কিছু চোখে পড়লে, জানাবি আমাকে।
বউ তো জেনে ফেলেছে কর্তার কীর্তি। ছেলেমেয়ে সাতটাও বুঝে গেছে বাবার ছটফটানির কারণটা কী। নিজেরা হাসাহাসি করছে তারা।
ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাড়ির চারপাশ ঝাঁট দিয়ে ফিরে এলো বউ। বলল—একেবারে সাফসুতরো করে দেওয়া হয়েছে চার পাশ। কিচ্ছুটি নাই কোথাও। ভেবে ভেবে মাথা খারাপ করতে হবে না তোমাকে। নিশ্চিন্ত হয়ে শুয়ে থাকো।
এবার বুঝতে কিছু বাকি রইল না মাকড়সার। তড়াক করে উঠে পড়ল বিছানা থেকে। হেঁড়ে গলা করে বলল—সবাই তোরা একজোট হয়েছিস, তাই না। চোখ তোদের কারও খারাপ নয়,সেটা ভালো করেই জানি আমি।
চেঁচাল বটে, মাকড়সার মুখে কিন্তু হাসির আভাস। ছেলেমেয়েরা সবাই হেসে উঠেছে বাবার কীর্তি দেখে। তাদের বাবা বলল—অনেক নাটক হয়েছে। এবার যা, হাতিটা তুলে আন।
ছেলেমেয়েগুলো তো এরই অপেক্ষায় ছিল। কত কাল মাংস পড়েনি পেটে। এত বড় একটা হাতি অনেক অনেক দিন পেট ভরে মাংস খাওয়া যাবে। সবাই দৌড়ে বাইরে চলে গেল।
বউ তো হাসি চাপতে পারছে না। বলল—হাতি তো আনা হবে। কিন্তু জীব হত্যা না করার হুকুম আছে যে। তার কী হবে?
--রাখ তো তোর হুকুম। সে হুকুম কবেই তামাদি হয়ে গেছে। অস্তিত্ব নাই আর ওটার। এখন রান্নাটা জুৎ করে ফেল দেখি। জব্বর ভোজের আয়োজন করব। গোটা পাড়ায় সব্বাইকে নেমন্তন্ন করে আসছি আমি।
0 Comments