দেবার্ঘ্য ঘোষ
ভোরের আলো তখনো ভালো করে ফোটেনি। শিয়ালদহ স্টেশনের আকাশটায় হালকা বেগুনী আর ধূসর রঙের মেলা। কুয়াশার পাতলা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে প্ল্যাটফর্মের চারপাশ। আপ আর ডাউন লাইনের চাকার সেই চেনা খটখট শব্দে কলকাতার ঘুম ভাঙছে একটু একটু করে। ঘড়িতে তখন কাঁটায় কাঁটায় ভোর পাঁচটা।
সমীরণবাবু প্রতিদিনের মতো আজও বিছানা ছেড়ে উঠে কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন ইষ্টদেবতাকে। পকেটে গোজা সামান্য কিছু খুচরো টাকা আর নোট, আজকের পাইকারি বাজার করার পুঁজি। কিন্তু পকেটের শূন্যতাকে ছাপিয়ে তাঁর চোখে ছিল এক বুক আশা, সন্তানদের এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন। দীর্ঘ পঁচিশটি বছর ধরে শিয়ালদহের ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্মের বাইরের ওই একফালি লোহার আর কাঠের তৈরি দোকানটাই ছিল তাঁর সংসার, তাঁর মন্দির, তাঁর বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। স্টেশনের ভেতরে স্টোভ, গ্যাস বা কয়লার উনুন জ্বালানো কঠোরভাবে নিষেধ, তাই বাইরে থেকেই চা-পাতা আর এলাচের সেই চেনা সুবাসের রসদ গুছিয়ে নিতেন তিনি। এই দোকানটির আয়েই তো বড় ছেলেটা কলেজে পা দিল, আর মেয়েটা হাইস্কুলের গণ্ডি ছুঁল। কিন্তু আজ স্টেশন চত্বরের মোড়ে পৌঁছাতেই সমীরণের পা দুটো যেন মাটির সাথে জমে পাথর হয়ে গেল। প্রতিদিন যেখানে এই ভোরেও চায়ের তৃষ্ণার্ত মানুষের হুল্লোড় থাকে, সেখানে আজ এক অদ্ভুত, থমথমে শ্মশানের নীরবতা।
🍂
সরকারি নিয়ম মেনে প্রশাসন থেকে অবশ্য আগেই সর্বত্র নোটিস দেওয়া হয়েছিল, মাইকিং করে সতর্কবার্তাও পাঠানো হয়েছিল। হকারমুক্ত শহর ও স্টেশন চত্বর সুন্দর করার সেই আইনি নির্দেশের মেয়াদ যে শেষ হয়ে এসেছে, তা সমীরণবাবু জানতেন। কিন্তু পঁচিশ বছরের পুরনো মায়া আর পেটের টান তাঁকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বুক বেঁধে রেখেছিল। আজ ভোরে শিয়ালদহের মূল চত্বরে কোনো বুলডোজার চলেনি, ভেতরে তার প্রয়োজনও পড়েনি—কিন্তু উচ্ছেদ অভিযানের কঠোর বাস্তবতায় তাঁর সাজানো দোকানটি আজ ভেঙে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। চারিদিকে ছিটকে পড়েছে ভাঙা কাঠ, দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া টিনের চাল, আর শয়ে শয়ে মাটি ও কাঁচের চায়ের কাপ। যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে, যে ফুটপাথকে ভালোবেসে তিনি এতদিন অনায়াসে নিজের অধিকারের লড়াই লড়েছেন, সেই চেনা মাটি আজ নিমেষেই পর হয়ে গেছে। রাতের অন্ধকারে নিয়মের অলিন্দ থেকে নেমে আসা এক নির্মম আদেশ এসে গুঁড়িয়ে দিয়ে গেছে তাঁর পঁচিশ বছরের তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নকে। বাতাসে তখনো উড়ছে ধুলো আর রুজি-রোজগার হারানোর এক বুকফাটা আর্তনাদ। সমীরণবাবুর মনে হলো, এ যেন শুধু কাঠ-কয়লার দোকান ভাঙেনি, এক ঝটকায় ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁর মধ্যবিত্ত শিরদাঁড়াটাকেও।
বিগত কয়েক মাস ধরেই অবশ্য শিয়ালদহের বাতাসটা বড্ড ভারী আর অস্বস্তিকর ছিল। মাঝেমধ্যেই উর্দিধারী রক্ষী আর অচেনা বাবুরা এসে নোটিসের কথা মনে করিয়ে দিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে যেতেন, "উঠে যাও এখান থেকে, শহর সুন্দর করতে হবে। হকারমুক্ত করতে হবে।" সমীরণবাবু সরল মনে ভেবেছিলেন, পুনর্বাসনের কোনো একটা ব্যবস্থা হয়তো হবে, প্রজাদের এই কান্না হয়তো ওপরমহলে পৌঁছাবে। কিন্তু না, তথাকথিত 'উন্নয়ন' আর 'সৌন্দর্যায়ন'-এর চাকচিক্যের যাঁতাকলে পিষে ফেলা হলো ফুটপাথের এই জ্যান্ত, রক্তমাংসের মানুষগুলোকে। সাজানো শহরের তকমা পাওয়ার লোভে ধুয়ে মুছে সাফ করে দেওয়া হলো হাজারো মেহনতি পরিবারের দু-বেলা দু-মুঠো অন্ন জোগানোর অধিকার। শহরের রাজপথ হয়তো আজ প্রশস্ত হলো, কিন্তু কত মানুষের বুকের পাঁজর ভেঙে যে এই রাস্তা তৈরি হলো, তার হিসেব রাখার প্রয়োজন বোধ করল না কেউ।
শূন্য হাতে, খালি পকেটে আর এক বুক খাঁ খাঁ শূন্যতা নিয়ে সমীরণবাবু যখন বাড়ির পথ ধরলেন, তখন দুপুরের সূর্য মাথার ওপর চড়চড় করে আগুন ঢালছে। চেনা শিয়ালদহ মেইন লাইন ধরে যখন তিনি লোকাল ট্রেনের কামরায় এসে বসলেন, চারপাশের চেনা সহযাত্রীদের মুখগুলোকেও বড্ড অচেনা, দূরবর্তী লাগছিল। ট্রেনের জানলা দিয়ে আসা হাওয়া আজ তাঁর কপালের ঘাম শুকাতে পারল না। পকেটে একটা টাকাও অবশিষ্ট নেই যে আজ রাতে বাড়ি ফেরার পথে অন্তত চাল আর আলু কিনে ফিরবেন। ট্রেনের চাকার আওয়াজ যেন তাঁকে বারবার বিদ্রুপ করছিল - "তুমি আজ নিঃস্ব, তুমি আজ পরাজিত।"
উত্তর ২৪ পরগনার এক চিলতে অজ পাড়াগাঁয়ের ভাড়া বাড়ির সামনে যখন তিনি এসে দাঁড়ালেন, বিকেলের ম্লান রোদ তখন ঘরের চাল ছুঁয়েছে। ঘরের দাওয়ায় অধীর আগ্রহে বসেছিল তাঁর দুই সন্তান। বড় ছেলেটা এবার কলেজে উঠেছে, চোখে বড় চশমা আর একরাশ পড়ার বই; আর ছোট মেয়েটা সবে হাইস্কুলের গণ্ডিতে পা দিয়েছে। ঘরের ভেতরে ছেঁড়া আঁচল গায়ে জড়িয়ে ক্লান্ত শরীরে অপেক্ষা করছিলেন তাঁর স্ত্রী। রোজ এই সময়ে সমীরণবাবু ব্যাগ ভর্তি বাজার নিয়ে বাড়ি ফেরেন। ব্যাগ থেকে মিষ্টির প্যাকেটের আনন্দ বের হতেই সন্তানদের মুখে যে অনাবিল হাসি ফুটে ultrat, সেটাই ছিল সমীরণবাবুর সারাদিনের ক্লান্তির ওষুধ। কিন্তু আজ? আজ তাঁর হাত দুটো শূন্য, অবশ। চোখ দুটো এক চরম অপরাধীর মতো মাটির দিকে ঝুঁকে আছে। কিছুতেই তিনি সন্তানদের চোখের দিকে তাকাতে পারছিলেন না।
স্বামীকে ওভাবে রিক্ত হস্তে, বিপর্যস্ত অবস্থায় দরযা এসে দাঁড়াতে দেখে স্ত্রী আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। থমকে যাওয়া সমীরণবাবু আর নিজের ভেতরের বাঁধভাঙা চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না। পঁচিশ বছর ধরে ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে লড়াই করা সেই শক্তপোক্ত মানুষটা আজ ঘরের চৌকাঠে বসে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। "সব শেষ হয়ে গেল গো... ওরা আমাদের সব সরিয়ে দিল। নোটিস তো দিয়েছিল, কিন্তু যাব কোথায়?" স্ত্রী কোনো সান্ত্বনার মিথ্যে শব্দ উচ্চারণ করলেন না। বোবা কান্নায় ভেঙে পড়া স্বামীর কাঁধে শুধু পরম মমতায় নিজের শীর্ণ হাতখানি রাখলেন। বড় ছেলেটা বাবার এই অসহায় রূপ এর আগে কোনোদিন দেখেনি। যে বাবা জীবনের সমস্ত ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যেও শক্ত ঢাল হয়ে পুরো পরিবারকে আগলে রাখত, সেই পাহাড়ের মতো মানুষটা আজ এক নিমেষে খড়কুটোর মতো ভেঙে পড়েছেন। ঘরের কোণে রাখা কালকের বাসি ভাতের অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িটার দিকে তাকিয়ে ছোট মেয়েটা হয়তো এক লহমায় সবকিছু বুঝে নিল। সে বুঝল, আজকের রাতটা কোনো গল্প নয়, কোনো আনন্দ নয়; আজ রাতে কেবল জল খেয়েই খিদের জ্বালা জুড়াতে হবে।
যাঁরা ক্ষমতার অলিন্দে এসি ঘরের সোফায় বসে শহরকে 'তিলোত্তমা' আর আধুনিক বানানোর রঙিন নীল নকশা আঁকেন, তাঁরা হয়তো কোনোদিন জানতেই পারলেন না, একটা ফুটপাথের দোকান ভাঙার সাথে সাথে কতগুলো নিষ্পাপ শিশুর স্লেট-পেন্সিল ভেঙে যায়, কতগুলো উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন কুঁড়িতেই ঝরে যায়। শিয়ালদহের সেই চেনা ব্যস্ত ফুটপাথ আজ আইনি নিয়মে হয়তো অনেক বেশি ঝকঝকে, অনেক বেশি পরিষ্কার; কিন্তু তার নিচে চিরকালের মতো চাপা পড়ে রইল সমীরণবাবুদের মতো হাজারো পরিবারের নীরব দীর্ঘশ্বাস, কান্না আর এক বুক না-বলা হাহাকার।
0 Comments