জ্বলদর্চি

অটিস্টিক প্রাইড ডে/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

অটিস্টিক প্রাইড ডে

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ১৮ই জুন, অটিস্টিক প্রাইড ডে। অটিস্টিক কি, সমাজে অটিস্টিক মানুষদের কি চোখে দেখা হয়,আসুন সবকিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।

অটিস্টিক বলতে, অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD) সম্পন্ন ব্যক্তিদের বোঝায়। এটি মস্তিষ্কের বিকাশজনিত একটি ভিন্নতা, যা মানুষের চিন্তা, যোগাযোগ এবং পৃথিবীকে অনুভব করার পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে। এটি কোনো রোগ বা অসুস্থতা নয়, বরং আজীবন থাকার একটি স্নায়বিক অবস্থা।
 এই দিনটিতে অটিজমকে কোনো রোগ বা ত্রুটি হিসেবে নয়,বরং মানুষের স্বাভাবিক বৈচিত্র্যের একটি অংশ হিসেবে দেখার বার্তা দেয়। অটিস্টিক ব্যক্তিদের অধিকার, মর্যাদা, সক্ষমতা এবং স্বতন্ত্র পরিচয়কে সম্মান জানাতেই এই বিশেষ দিবসের সূচনা হয়।
অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD) হলো, একটি স্নায়বিক বিকাশজনিত বৈশিষ্ট্য, যা একজন মানুষের যোগাযোগ, আচরণ, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং চিন্তাভাবনার ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে অটিজম কোনো একরকম নয়। প্রত্যেক অটিস্টিক ব্যক্তির অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও চ্যালেঞ্জ আলাদা। কেউ হয়তো ভাষা ব্যবহারে অসুবিধা অনুভব করেন, আবার কেউ অসাধারণ স্মৃতিশক্তি, সৃজনশীলতা বা বিশেষ কোনো বিষয়ে গভীর দক্ষতার পরিচয় দেন।
অটিস্টিক প্রাইড ডে প্রথম পালিত হয় ২০০৫ সালে। এর মূল লক্ষ্য ছিল, সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটানো। দীর্ঘদিন ধরে অটিজমকে শুধুমাত্র একটি সমস্যা বা সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু অটিস্টিক ব্যক্তিরা এবং তাদের সমর্থকেরা মনে করেন, মানুষের মস্তিষ্কের কাজ করার ধরন ভিন্ন হতে পারে, আর সেই ভিন্নতাকে সম্মান করা উচিত। এই ধারণাকেই বলা হয় “নিউরোডাইভার্সিটি” বা স্নায়বিক বৈচিত্র্য।
🍂
নিউরোডাইভার্সিটির ধারণা অনুযায়ী, মানুষের চিন্তা, শেখা ও অনুভব করার পদ্ধতিতে স্বাভাবিকভাবেই বৈচিত্র্য রয়েছে। যেমন সমাজে বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারা রয়েছে, তেমনি মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালীতেও ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক। তাই অটিস্টিক ব্যক্তিদের পরিবর্তন করে তথাকথিত “স্বাভাবিক” করে তোলার চেষ্টা না করে, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অটিস্টিক ব্যক্তিদের জীবনে সবচেয়ে বড় বাঁধা প্রায়ই তাদের অটিজম নয়, বরং সমাজের অজ্ঞতা ও বৈষম্য। অনেক সময় তারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। আবার ভুল ধারণা ও কুসংস্কারের কারণে তাদের প্রতিভা ও সম্ভাবনাও যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না। অটিস্টিক প্রাইড ডে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই দিবস আমাদের শেখায় যে, প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব শক্তি ও সক্ষমতা রয়েছে। অনেক অটিস্টিক ব্যক্তি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। তাদের অর্জন প্রমাণ করে যে ভিন্নভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা সমাজকে নতুন ধারণা ও উদ্ভাবনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাই অটিস্টিক ব্যক্তিদের সীমাবদ্ধতার পরিবর্তে তাদের সম্ভাবনার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
পরিবার, বিদ্যালয় এবং সমাজ অটিস্টিক ব্যক্তিদের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পরিবারের ভালোবাসা, শিক্ষকদের সহানুভূতিশীল মনোভাব এবং সহপাঠীদের গ্রহণযোগ্যতা একজন অটিস্টিক শিশুর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্র ও জনপরিসরে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করলে অটিস্টিক প্রাপ্তবয়স্করাও নিজেদের দক্ষতা অনুযায়ী অবদান রাখতে পারেন।
বর্তমান বিশ্বে অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে, তবে এখনও অনেক কাজ বাকি। অটিস্টিক প্রাইড ডে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন আমরা বৈচিত্র্যকে সম্মান করব এবং প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করব। একটি সহনশীল ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে অটিস্টিক ব্যক্তিদের কণ্ঠস্বর শোনা, তাদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাদের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা অপরিহার্য। অটিস্টিক প্রাইড ডে শুধু একটি সচেতনতা দিবস নয়,এটি সম্মান, গ্রহণযোগ্যতা এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক। এই দিন আমাদের শেখায় যে ভিন্নতা কোনো দুর্বলতা নয়,বরং মানবসমাজের শক্তি। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে প্রত্যেক মানুষ অটিস্টিক হোক বা না হোক,সমান মর্যাদা, ভালোবাসা এবং সুযোগ নিয়ে বাঁচতে পারে।

Post a Comment

0 Comments