পঞ্চম পর্ব
স্বাতী ভৌমিক
অভাবের ছায়া ধীরে ধীরে ঘিরে ধরছে সুভাষিনীর সংসার। কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না সুভাষিনী। যদি কোন কাজ সে জোগাড়ও করে, প্রকাশবাবুর রক্ষণশীল মন কী তা মেনে নিতে পারবে! আর তাছাড়া কাজ জোগাড় করাও তো খুব একটা সহজ কথা নয়। অফিসের কাজ টেকানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টার কথা বুঝতে তার আর বাকি নেই। সমৃদ্ধির মায়াভরা মুখ তার উদ্বিগ্নতা আরো বেশি বাড়িয়ে দেয়। মেয়ের মুখের অসহায় ভাব তার মনকে বেদনাতুর করে তোলে। পরিস্থিতি সহজ করার প্রচেষ্টা প্রায় সময়ই ব্যর্থ হয়। কারণ প্রকাশবাবুর মানসিক স্থিতিশীলতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
দিনকয়েক হল- প্রকাশবাবুর বামদিক আগের তুলনায় একটু সচল হলেও পুরোপুরি ঠিক হয়নি। ইচ্ছে থাকলেও তিনি নিরুপায়। তাই অযথা তর্জন- গর্জন ছাড়া খুব একটা সান্ত্বনার পথ তিনি ঠিক খুঁজে পান না। সুভাষিনী এদিক ওদিকে কাজের সন্ধান শুরু করেছে। কিন্তু মনের মত ঠিক কাজের সন্ধান পাওয়া বর্তমানে দুষ্কর। আজ সে ঠিক করে রেখেছে, প্রকাশ বাবুর সাথে সময় করে এই নিয়ে আলোচনা করবে। শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা। সমৃদ্ধি যখন ঘুমিয়ে পড়লো, সুযোগ বুঝে সুভাষিনী প্রকাশবাবুর কাছে কথাটা পাড়ার পরিস্থিতি রচনা করতে শুরু করলো। খুব নরম সুরে সে বলল- "দেখো, অনেকদিন ধরে তোমায় একটা কথা বলব বলে ভাবছিলাম। সংসারের অবস্থা তো খুব একটা ভালো নয়। তুমি তো যতক্ষণ পেরেছ আমাদের কোন অভাবই বুঝতে দাওনি। আজ......" কথাটা আর শেষ হল না। প্রকাশবাবু তিক্ততার সুরে বলে উঠলেন, " যতক্ষণ মানে! আমায় তুমি ঠিক কী বলতে চাইছো? আমি কী বাদের খাতায় নাকি!"সুভাষিনী আমতা আমতা করে বলে উঠলো, " না না, তুমি ভুল বুঝছো। আমি তা কখন বললাম? তুমি তো এখনো অসুস্থ। এদিকে সংসারের অবস্থা তো আমার থেকে তুমিই ভালো বোঝো। তাই বলছিলাম আমি যদি একটা কাজ করি, তাতে কি তোমার আপত্তি থাকবে? " প্রশ্নটা করেই ভয়ে ভয়ে স্বামীর দিকে চাইল সুভাষিনী। দেখল প্রকাশবাবু তার দিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে আছে। নীরবতায় ঝড় নাকি সম্মতি তা ঠিক সুভাষিনী বুঝতে পারল না। একটু গলা ঝেড়ে সে বলল, " কিছু বল। চুপ করে আছো কেনো?" প্রকাশবাবু বললেন, " তা কাজটা কে জুটিয়ে দিল? তোমার এখানে আবার কোথা থেকে হিতাকাঙ্খী এসে জুটলো!" কথাটার ইঙ্গিত সুভাষিনীর খুব একটা ভালো ঠেকলো না। তবে সুভাষিনী যতটাই সহ্যশীলা, ততটাই অটল মানসিকতার অধিকারীনী। সংসারকে বাঁচানোর দায় যে তাকে নিতেই হবে। সে বলল, " না, কাজ এখনো জোটাতে পারিনি। তবে ফোনে দিদিকে বলছিলাম- একটা কাজের জন্য। ওতো অফিসে খুব ভালো পোস্টে চাকরি করে। তাই বলছিলাম যদি কোন কাজের সন্ধান দিতে পারে, এই আর কি!" প্রকাশবাবু পুরুষ মানসিকতায় নিজ অসহায় অবস্থা ঠিক ঠিক মানতে পারছিলেন না। স্ত্রীকে কাজে যেতে হবে এটা তো কল্পনাও করতে পারেন না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির সাপেক্ষে সুভাষিনীর সদিচ্ছাকে তিনি কিভাবে স্বাগত জানাবেন তাও বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সবাই তাকে অক্ষম বলবে- স্ত্রীর পয়সায় সংসার চলে- সমাজের- পরিবারের আত্মীয়-স্বজনদের এসব নানা সমালোচনামূলক কথা তিনি কিভাবে হজম করবেন তা তিনি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলেন না।
🍂
অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর সুভাষিনী ব্যস্ত হয়ে আবার মুখ খুলল। বলল, " দেখো, মেয়ের তো বয়স বাড়ছে। তুমি যখন পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাবে তখন আমি আর কাজ করবো না। আগে যেমন চলছিল, তেমনি চলবে। শুধু এ খারাপ সময়টুকু পার করে দিলেই আমার শান্তি।"
প্রকাশবাবু কিছু না বলে চুপচাপ উঠে নিজের রুমে চলে গেলেন। সুভাষিনী কিছু বুঝতে না পেরে যেখানে বসেছিল পাথরের মত সেখানে বসেই থাকলো বেশ অনেকক্ষণ। পর উঠে গিয়ে সে মেয়ের পাশে একটু শুলো। মেয়ের ঘুমন্ত অসহায় মুখ- তার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ -প্রকাশ বাবুর অসুস্থতা- কাজের চিন্তা সব মিলিয়ে সুভাষিনী বেশ অস্থির হয়ে উঠেছে। তার চোখের পাতার থেকে নিশ্চিন্তের ঘুম প্রায় বিদায় নিয়েছে। সুভাষিনী কি করবে কিছুই ভেবে না পেয়ে নির্জীবের মত শুধু চুপচাপ শুয়ে থাকলো।
0 Comments