জ্বলদর্চি

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ১০ই অক্টোবর, বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। একজন মানুষের জন্য তার মানসিক স্বাস্থ্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আমরা বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
 সুস্থ মনের যত্ন, সুন্দর জীবনের অঙ্গীকার।
মানুষের সুস্থতার কথা উঠলে আমরা সাধারণত শরীরের স্বাস্থ্যের দিকেই বেশি গুরুত্ব দিই, কিন্তু সুস্থ শরীরের পাশাপাশি সুস্থ মনও যে একটি সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনের অপরিহার্য শর্ত, তা অনেক সময় ভুলে যাই। মানুষের চিন্তাভাবনা, অনুভূতি, আচরণ, সম্পর্ক এবং জীবনযাপনের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের গভীর যোগ রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা নিয়ে প্রতি বছর ১০ই অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস প্রথম পালিত হয় ১৯৯২ সালে, ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথের উদ্যোগে। পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দিনটি বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এই উপলক্ষকে কেন্দ্র করে মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রসার, মানসিক সমস্যার প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো, শুধু মানসিক রোগ সম্পর্কে মানুষকে জানানো নয়, বরং মানসিক সুস্থতাকে মানবজীবনের একটি মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
🍂
মানসিক স্বাস্থ্য বলতে বোঝায়, এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে মানুষ নিজের সামর্থ্য উপলব্ধি করতে পারে, দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক চাপ মোকাবিলা করতে পারে, কাজকর্মে অংশ নিতে পারে এবং সমাজের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে দুঃখ, উদ্বেগ, হতাশা কিংবা মানসিক চাপ অনুভব করা স্বাভাবিক, কিন্তু এই অনুভূতিগুলি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে দৈনন্দিন জীবন, পড়াশোনা, কাজকর্ম কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ককে প্রভাবিত করলে সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
মানসিক সুস্থতা মানুষের আত্মবিশ্বাস, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করে। তাই মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা করা মানে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে উপেক্ষা করা।
আধুনিক জীবনে মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট
বর্তমান সময়ে দ্রুতগতির জীবন, কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক সমস্যা, একাকিত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব অনেকের মানসিক চাপ বাড়িয়ে তুলছে। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফল, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং অন্যের সঙ্গে নিজের সাফল্যের তুলনা মানসিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। কর্মজীবী মানুষকে কাজের চাপ, দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে একাকিত্ব, প্রিয়জনের বিচ্ছেদ এবং সামাজিক যোগাযোগের অভাব মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করতে পারে, তবে, প্রত্যেক মানুষের অভিজ্ঞতা আলাদা। একই পরিস্থিতিতে সবাই একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান না। তাই মানসিক সমস্যাকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখে সহমর্মিতা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে তার মোকাবিলা করা জরুরি।
সামাজিক কুসংস্কার ও আমাদের দায়িত্ব
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজে এখনও নানা ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি দুর্বলচিত্তের মানুষ অথবা ইচ্ছাশক্তির অভাবে ভুগছেন। এই ধারণাগুলি সম্পূর্ণ অনুচিত। মানসিক সমস্যার পেছনে জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত নানা কারণ কাজ করতে পারে।
অনেক মানুষ লোকলজ্জা, সমালোচনা কিংবা অবহেলার ভয়ে নিজের সমস্যার কথা প্রকাশ করেন না। ফলে তাঁরা প্রয়োজনীয় সাহায্য পেতেও দেরি করেন। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজের প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হবে।
কোনও মানুষ মানসিক কষ্টের কথা জানালে তাঁকে উপহাস না করে মন দিয়ে শোনা, তাঁর অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনে পেশাদার সাহায্য নিতে উৎসাহিত করা আমাদের মানবিক দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে, সহমর্মিতা কখনও দুর্বলতা নয়, বরং এটি একটি সুস্থ সমাজের পরিচয়।
মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে দৈনন্দিন জীবনে কয়েকটি অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, শরীরচর্চা, প্রকৃতির সান্নিধ্য এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো মানসিক প্রশান্তিতে সহায়তা করতে পারে। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা, কাজের ফাঁকে বিশ্রাম নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সময় সীমিত রাখাও উপকারী।
তবে, শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাসের ওপর নির্ভর করলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা অন্য কোনও মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানী, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কিংবা উপযুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীর সাহায্য নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করে তোলার জন্য সরকার, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলিরও সক্রিয় ভূমিকা থাকা দরকার।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানসিক সুস্থতা কোনও বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অপরিহার্য অংশ। শরীর অসুস্থ হলে যেমন চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তেমনই মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রেও প্রয়োজন যত্ন, সহমর্মিতা এবং উপযুক্ত চিকিৎসা। আসুন, এই বিশেষ দিনে আমরা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতা ও কুসংস্কারের পরিবর্তে সচেতনতা ও সংবেদনশীলতার পরিবেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করি। নিজের মনের যত্ন নিই, অন্যের কথা মন দিয়ে শুনি এবং প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই। কারণ, একটি সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে শুধু সুস্থ শরীর দিয়ে নয়, সুস্থ মন, মানবিক সম্পর্ক এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতেও। মনের যত্ন হোক প্রতিদিনের অভ্যাস, আর মানসিক সুস্থতা হোক সবার অধিকার।

Post a Comment

0 Comments