বার্তাকু বেত্তান্ত ও আমাদের আশাপুর

সোমনাথ মুখোপাধ্যায়


শীতকাল আসতে এখনও বেশ খানিকটা সময় বাকি আছে। তবে গরমে তেতে থাকা সময়ে একটু স্বস্তির জন্য এখন থেকেই বোধহয় কেউ কেউ শীতের কাউন্ট ডাউন শুরু করে দিয়েছেন। শীতের কথা উঠলেই আমাদের সকলের মনের ভেতর ভেসে ওঠে রকমারি তরতাজা সবজির ছবি – আলগা খোসার নতুন আলু থেকে শুরু করে মাচার ওপর দুলতে থাকা সিম পর্যন্ত। শীতকালীন সবজির পসরা নিয়ে কথা বলতে শুরু করলে তাতে লাগাম টেনে থামানো রীতিমতো কঠিন হয়ে পড়ে। এটুকু পড়েই হয়তো পাঠকদের মধ্যে কেউ কেউ আঙুলের কড় গুণে রকমারি সবজির নামের গুণতি শুরু করেছেন – ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, পালংশাক ……..। গুণতি চলছে চলুক। এই ফাঁকে চলুন পেছনে ফেলে আসা স্মৃতিপথে খানিক পথ হেঁটে আসি।

সে অবশ্য অনেককাল আগের কথা। তখন‌ও আমার বয়স মেরেকেটে দুই সংখ্যার ঘরে পৌঁছয়নি। ঠাকুমাকে তীর্থ ঘুরিয়ে আনতে বাবা গিয়েছিলেন কাশীতে – মা অন্নপূর্ণা আর বাবা বিশ্বনাথের দর্শনে। ঠাকুমা ওখানে কিছুদিন কাটিয়ে ফিরবেন। তাই বাবা দিনকয়েক কাশীবাসী হয়ে কাটিয়ে ফিরে এলেন বাড়িতে – কোলকাতায় । আমরা, তিন ভাইবোন বেজায় খুশি। অবশ্য এই খুশির আসল কারণ বোধহয় ছিল ফেরার সময় বাবার কাশী থেকে স‌ওদা করে নিয়ে আসা কিছু উপকরণ। ভাবছেন তো কী কী ছিল সেই তালিকায়? একটু অপেক্ষা করুন, অনেক কাল আগের কথা তো! বাবার আনা তোফার তালিকায় ছিল – কাশীর বিখ্যাত পেঁড়া – আহা কি সোয়াদ তার! বোনের জন্য কাঠের তৈরি খেলনা বাটি , বেতের তৈরি খুব মজবুত গড়নের একটা বাস্কেট আর এনেছিলেন এক জোড়া মনলোভা , চোখটানা ‘ভান্টা’ বা বাইঙ্গন।

সযত্নে কাপড়ে মোড়া সেই ভান্টা যুগলকে দেখেতো আমাদের সকলের চক্ষু চড়কগাছ! এতো বড়ো বাইঙ্গন ! সাদা রঙের অমন দুই নবাগত অতিথিকে দেখে আমরা তিন ভাইবোন তো বেজায় আহ্লাদিত, রোমাঞ্চিত এবং অবশ্যই বিস্মিত। আমাদের‌ উৎসাহ দেখে বাবা বেশ মজা করে বললেন –” ইয়ে হ্যায় রামনগরকা মশহুর ভান্টা উর্ফ বাইঙ্গন উর্ফ বার্তাকু উর্ফ বেগুন।” বাবার এই ধারাবিবরণী চলার ফাঁকে আমিতো তাকে কোলে নিয়ে বসেছি পড়েছি – ধবধবে সাদা রঙ মাঝে হালকা সবুজের আভা, পেলব মসৃণ মখমলি গাত্র,আর ওজন? এক একটার ওজন ২ থেকে ২ .৫ কিলোগ্রাম। বাপরে বাপ এমন পেল্লাই সাইজের বেগুন উর্ফ ভান্টা! বাবা আবারও মুচকি হেসে বলে ওঠেন –” ইয়ে হ্যায় রামনগরকা মশহুর ভান্টা উর্ফ বাইঙ্গন, সব দেখ বাবুয়া!”

সারাবছর আমাদের খাবার পাতে কোনো না কোনো চেহারায় বেগুনের দেখা মিললেও শীতকালের বেগুন হলো সোয়াদে সত্যিই লা জবাব। ভেজে খান, পুড়িয়ে ধনে পাতা , কাঁচা পেঁয়াজ আর ঝালঝাল লঙ্কা দিয়ে মেখে খান, কড়াইয়ে নেড়েচেড়ে ভর্তা বানিয়ে খান, সর্ষে পোস্ত বাটা দিয়ে গা মাখা , গা মাখা ঝোল করে খান – সবেতেই আমাদের বেগম বেগুন সুপার ডুপার হিট। তবে কথা হলো, আমাদের প্রতিদিনের হেঁসেলের এমন নির্ভরযোগ্য সঙ্গিটি কিন্তু মোটেও এদেশের সবজি নয়, বিদেশি। একথা শুনে আঁৎকে উঠলেন নাকি ? তাহলে একটু খোলাসা করেই না হয় বলি।

🍂

বেগুন এলো কোথা থেকে? – প্রশ্নটা শুনতে যতটা সহজ, 

এর উত্তর মোটেই ততটা সহজ নয়। প্রাথমিকভাবে বুনো প্রজাতির উদ্ভিদ থেকেই পরবর্তীকালের অনেক সবজি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বেগুন‌ও এই তালিকায় স্থান পাবে। মার্কিন মুলুকে বেগুনকে ডাকা হয় Eggplant নামে। আবার ইংরেজদের কাছে তাই হয়ে গেছে Aubergine । শুরুর দিকে, ডিমের মতো গোল গোল সাদা ফলে ভর্তি এই গাছকে নিছকই একটি অর্নামেন্টাল প্ল্যান্ট বা শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ হিসেবেই দেখা হতো। বাহারি গাছের কৃষি মেলায় এজন্য বেগুন গাছের বেশ কদর ছিল। সেই কারণেই হয়তো গোলগাল ডিমের মতো সাদা ফলে ভরা গাছগুলোকে

 ডাকা হতো eggplant নামে। তখন‌ও অবশ্য গুনগুনিয়ে বেগুনের গুণ গাইতে গলা সাধা শুরু করেনি মানুষ। অথচ সেই গাছ‌ই এখন ঝুলি ভরে বিদেশি মুদ্রা আনার স্বপ্ন দেখছে। সময়ের সঙ্গে কি আশ্চর্য রূপান্তর!

একদল খাদ্য ইতিহাসবিদদের মতে ভারত অথবা চিন দেশই নাকি বেগুনের আদি নিবাস। এখান থেকেই ভূ পর্যটকদের হাতে হাতে তা পৌঁছে যায় পৃথিবীর আনাচে কানাচে। তবে 

একেবারে গোড়ার দিকে বেগুনের স্বাদ মোটেই আজকের মতো সুস্বাদু ছিলোনা। বোঁটার চারপাশে থাকা তীক্ষ্ণ কাঁটার জন্য হেঁসেলে তাকে সামলানো বেশ ঝকমারি ছিল, ছিল খানিকটা তিতকুটে স্বাদ। মুন্ডা উপজাতির মানুষদের মধ্যে  আদিম প্রজাতির বেগুনের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। প্রতিদিনের খাবারের পাতে সবজি হিসেবে ঠাঁই পেতে বেগুনকে অবশ্য  দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। বদলাতে হয়েছে নিজের বন্যতা। আর এভাবেই ঠাঁই মিলেছে খানদানি হেঁসেলে, হয়ে উঠেছে আম রসনার বিশ্বস্ত দোসর। মুন্ডারি ভায়া সংস্কৃত শব্দ “বৃন্তক” এসেছে পরবর্তী প্রতিশব্দ হিসেবে। পেটে জমা গ্যাস দূর করার ক্ষেত্রে বিশেষ কার্যকর রূপে গণ্য হ‌ওয়ায় সংস্কৃতে বেগুনের অন্য নাম “বাতিঙ্গন”। ভাষাবিদদের মতে এই বাতিঙ্গন থেকেই এসেছে একাধিক ভারতীয় ভাষায় এর পরিচিতির বিষয়টি, যেমন –

হিন্দিতে – বাইঙ্গন , বাংলায় – বেগুন , কন্নড় ভাষায় – বাদনে কাই , মারাঠিতে – ভাঙ্গি, সিন্ধ্রি ভাষায় – ভাঙ্গান কিংবা তেলেগু ভাষায় – ভানকায়া। এক‌ই অঙ্গে সেই অষ্টোত্তর শতনামের মহিমা নিয়ে দেশ দেশান্তরের পাতে স্বমহিমায় বিরাজমান মূলত বেগুনি গাত্রবর্ণ বিশিষ্ট আমাদের অতি প্রিয় বেগুন। শীতের বেগুনের শরীরের যে জুলুস তা দেখে বিমোহিত হয়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার।

বেগুন নিয়ে আমার এই বাগাড়ম্বরকে যাঁরা ইতোমধ্যেই অহেতুকী বলে মনে করছেন তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানাই যে মাত্র কিছুদিন আগে আমাদের এই বাংলার এক বেগুন জি আই ট্যাগ পেয়েছে অর্থাৎ বিশ্বের দরবারে এবার তার ঠাঁই হলো।

এ যে বড়ো আনন্দের কথা তা বোধহয় আলাদা করে বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই আনন্দ সাগরে এখন অবগাহন করছে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার কৃষি গ্রাম আশাপুর। বেগুন চাষের জন্য আশাপুরের খ্যাতি আজকের নয় বহুবছরের। তবে খুব সম্প্রতি এই গ্রামের বেগুন আন্তর্জাতিক জিওগ্রাফিক্যাল আইডেন্টিফিকেশন ট্যাগ লাভ করায় জেলার কৃষি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জেলার সকল মানুষের খুশি বিপুল তরঙ্গ হয়ে আন্তর্জাতিক উপভোক্তাদের দরজায় দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেছে।

এতো বড়ো স্বীকৃতি লাভের পর স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন আসতে বাধ্য - যে কি এমন বিশেষত্ব রয়েছে এই বেগুনের যার জন্য এতো বড়ো একটা পালক জুড়ে দেওয়া হলো এই গ্রামের মাথায়? আশাপুরের কৃষিজীবী মানুষেরা সবিনয়ে জানিয়েছেন –”এই প্রশ্নের উত্তর আমরা দেবোনা। আশাপুরের ক্ষেত থেকে আপনার পছন্দ মতো যে কোনো একটি - দুটি বেগুন তুলে যেমনটি চাইছেন তেমন করেই রান্না করে খেয়ে দেখে যাচাই করে বলুন আমাদের এই বেগুন সত্যি সত্যিই আন্তর্জাতিক মানের কিনা? আমরা ন‌ই , আমাদের ক্ষেতের ফসল‌ই হলো আমাদের কৃতিত্বের সবথেকে বড়ো পরিচয়।” এই কথাগুলোর বাস্তবতা নিয়ে কারোরই মুখে কোনো কথা নেই, এমন‌ই জোরালো তাঁদের যুক্তি।

আশাপুরে বেগুনের চাষ হয় কেবল শীতের সময়। সেই মোগল আমল থেকেই এমন প্রথা। শীতের মৃদু উষ্ণতায়  গাছের স্বাস্থ্য ভালো থাকে, আর তাই ফলন হয় খুব ভালো। আকারে ছোটো হলেও গোলগাল এবং খোলতাই গড়নের। হালকা সবুজের ছোঁয়া লাগা বেগুনের ফলনে গাছগুলো যখন ভরে ওঠে তখন লক্ষ মরকতের সবুজাভ দ্যূতিতে ভরে ওঠে মালদহ জেলার চাঁচল - ১ নম্বর ব্লকের অন্তর্গত গোটা  আশাপুর গ্রাম । সে বড়ো খুশির সময় আশাপুরের মানুষের কাছে।

আশাপুরের এই সাফল্য একদিনে আসেনি, দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের পথে চলতে গেলে প্রয়োজন হয় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সংগঠক ও আগ্রহী কৃষিজীবীদের। আশাপুরে এই দুয়ের কাঙ্ক্ষিত সংযোগ ঘটেছে, আর তাই আমের পর বেগুনের ক্ষেত্রেও জুটে গেল এমন স্বীকৃতি। বেগুন নিয়ে আমাদের নস্টালজিয়া কম নয়। নেমতন্ন বাড়ির পাতে গরম গরম লুচির সাথে একদা পরিবেশন করা হতো লম্বা লম্বা করে কাটা বেগুন ভাজা। শীতের নরম তুলতুলে বেগুনের সঙ্গে ঘীয়ে ভাজা লুচি – আহা! এ স্বাদের ভাই ভাগ হবেনা! এবার থেকে হয়তো নিমন্ত্রণ বাড়ির মেনুকার্ডে লুচির পরেই লেখা হবে আশাপুরের বেগুন ভাজা। সে যে এক পরম রোমান্টিক বিষয় হবে তাতে আর সন্দেহ কি!