জ্বলদর্চি

দূর দেশের লোকগল্প— ৩০১/বাদশার মেয়ে আর গোলামের ছেলে/তাজিকিস্তান (এশিয়া)/চিন্ময় দাশ

দূর দেশের লোকগল্প— ৩০১

বাদশার মেয়ে আর গোলামের ছেলে

তাজিকিস্তান (এশিয়া)

চিন্ময় দাশ


এক দেশে এক বাদশা ছিল। একটিই মেয়ে বাদশার। ভারি সুন্দরী সেই মেয়ে। কিন্তু হলে কী হবে। খুবই অহংকারী মেয়েটি। কোনো ছেলেই তার পছন্দ হয় না। ঘটক এসে বিয়ের প্রস্তাব দিলেই, এটা-ওটা বলে সে তাড়িয়ে দেয়।

একদিন বাদশা তার মন্ত্রীদের ডেকে বলল, "মেয়ের তো বিয়ের বয়স পার হয়ে যাবে। এখন কী করি?"

মন্ত্রীরা বলল, "তাহলে, আমরাই মেয়েকেই জিজ্ঞেস করি, সে কেমন ছেলে চায়?"

রাজকন্যা বলল, "আমি দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর আর সবচেয়ে শক্তিশালী ছেলেকে বিয়ে করব। তার চেয়ে কম কাউকে করব না।"

মন্ত্রীরা সারা শহর খুঁজল, কিন্তু এমন ছেলে পেল না। তখন বাদশা নিজেই বের হলেন। ঘোড়ায় চড়ে অন্য শহরগুলোতে চললেন ছেলে খুঁজতে। অনেক দূর গিয়ে বাদশা একটা বড় নদীর ধারে হাজির। নদীর পাড়ে বসে আছে এক বুড়ো। তার দাড়ি সবুজ, জামা সবুজ, হাতে সবুজ লাঠি। সাদা পাথরের ওপর কালো পাথর দিয়ে কী যেন লিখে, নদীতে ফেলে দিচ্ছে।

বাদশা জিজ্ঞেস করলেন, "বুড়ো, তুমি কী করছো?"

বুড়ো বলল, "আমি মানুষের ভবিষ্যৎ লিখি। সাদা পাথরে যা লিখে নদীতে ফেলি, তাই সত্যি হয়।"

বাদশা বললেন, "তাহলে আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ বলো। তার বিয়ে কার সাথে হবে? সেই ছেলেকে পাবো কোনখানে?"

বুড়ো হাসল। একটা সাদা পাথরে কিছু লিখে, নদীতে ফেলল। তারপর বলল, "তোমার মেয়ে কোনো রাজা বা ধনী লোককে বিয়ে করবে না। সে এক গোলামের ছেলেকে বিয়ে করবে।"

🍂

বাদশা তো আঁতকে উঠলেন! তার বাড়িতেই তো এক গোলামের ছেলে কাজ করে। খুব ভালো কাজ করে ছেলেটা। দেখতেও ভারি সুন্দর। কিন্তু সে তো গোলামের ছেলে গোলাম! 

কথা না বাড়িয়ে, বাদশা তাড়াতাড়ি প্রাসাদে ফিরে এলেন। মন্ত্রীদের সব জানিয়ে, বললেন, "হায় হায়! ওই গোলামটা আমার মেয়েকে বিয়ে করবে!"

মন্ত্রীরা বলল, "ওর মাথা কেটে ফেলুন।"

বেচারা গোলাম ছেলেটা কেঁদে বলল, "আমি তো রাজকন্যাকে বিয়ে করতে চাই না।"

মন্ত্রীদের মাথা কুটবুদ্ধিতে ঠাসা। তারা এবার বলল, "কী! এত বড় সাহস! বাদশার মেয়েকে বিয়ে করতে চায় না! ওর মাথা কাটো!"

বাদশাও রাজি হয়ে গেল। প্রাসাদের পাশেই ছিল একটা কুঁড়েঘর। তাতে থাকে এক খুব বুড়ো, খুব জ্ঞানী মানুষ। মানুষটা এত বুড়ো যে হাঁটতেও পারত না। সে ছেলেটাকে কাটবার খবর শুনে, পাড়ার লোকদের বলল, "আমাকে একটা সাদা কম্বলে জড়িয়ে বাদশার কাছে নিয়ে চলো।"

লোকেরা তাকে বাদশার কাছে নিয়ে গেল।

বাদশা বললেন, "বলো, বুড়ো! কী বলবে?"

বুড়ো বলল, "মহান বাদশা, তুমি চাইলে ছেলেটাকে যা খুশি করতে পারো। কিন্তু এই নিরীহ ছেলেটাকে মেরে ফেলো না। তুমি তাকে দুনিয়ার যে কোনও শেষ প্রান্তে পাঠিয়ে দাও। যত কঠিন পারো, কোনো কাজ দাও। পারে কি না, দ্যাখো। কিন্তু প্রাণে মেরে ফেলো না।"

বাদশার মনে ধরল কথাটা। গোলাম ছেলেটাকে ডেকে বললে, "শোন রে, গোলাম! তুই আমার জন্য দুটো মুক্তো নিয়ে আয়। মুক্তোটা কিন্তু আখরোটের মতো বড় হবে। ভেতরে চাঁদের আলো জ্বলজ্বল করবে। যদি আনতে পারিস, তোকে ছেড়ে দেব, স্বাধীন করে দেব। আর না পারলে, তোর গর্দান যাবে।"

বেচারা ছেলে! মাথা নিচু করে বেরিয়ে পড়ল। দিনের পর দিন সে ঘুরল। ঠান্ডা, খিদে, কত কষ্ট! লোকেরা তাকে দেখে হাসাহাসি করল।

ঘুরতে ঘুরতে একদিন সেই নদীর ধারে এসে পৌঁছল ছেলেটা, যেখানে সবুজ জামা পরা বুড়োটা বসে ছিল। ছেলেটা বুড়োকে প্রণাম করে বলল, "আপনি কি বলতে পারেন, আখরোটের মতো বড় আর ভেতরে চাঁদের আলো আছে-- এমন দুটো মুক্তো কোথায় পাব?"

বুড়ো বলল, "বুঝেছি, বাছা। কে তোকে পাঠিয়েছে। তুই বড় সরল ছেলে। ঠিক আছে, আমি তোকে সাহায্য করব। তুই এখানে বসে অপেক্ষা কর।"

এই বলে সবুজ জামা পরা বুড়ো নদীর জলে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর নদীর সবুজ শ্যাওলা সরে গেল, আর বুড়ো উঠে এলো। তার জামার কোঁচড় থেকে মাটিতে ঢেলে দিল একরাশ বড় বড় মুক্তো। প্রত্যেকটার ভেতরেই চাঁদের আলো জ্বলজ্বল করছে! বুড়ো বলল, "এগুলো নিয়ে বাদশার কাছে ফিরে যা।"

ছেলেটার চোখ জোড়া গোল গোল। মুখে কথা সরছে না। দুটো মাত্র মুক্তোর সন্ধান চেয়েছিল সে। এক পুঁটলি মুক্তো এনে দিয়েছে মানুষটা! বুড়োকে প্রণাম ঠুকে ফিরে চলল সে। 

বাদশার প্রাসাদ জুড়ে হইচই। খবর হয়ে গিয়েছে, গোলাম ছেলেটা ফিরে এসেছে। সেপাইদের বলেছে, “বাদশাকে খবর দাও। দরবারেই দেখা করব আমি।“

হৈ-হুল্লোড় শুরু হয়ে গেছে। হবে না কেন? সবাই জানে এমন কঠিন কাজ করা বড় বড় বীরপুরুষেরও সাধ্যে কুলোয় না। ঐ ছেলে পারবে কী করে?

বাদশার প্রাসাদের সামনে বিশাল মাঠ। মন্ত্রীদের কথায়, সেই মাঠের মাঝখানে শূল পোঁতা হয়েছে। ছেলেটা মুক্তো না নিয়ে ফিরে এলে, সবার সামনে শূলে চড়িয়ে দেওয়া হবে তাকে। চিরকালের জন্য আপদ বিদায়। তাই তো রাজ্যশুদ্ধ লোকজন হাঁ করে আছে এমন দৃশ্য দেখবে বলে।

সেদিন ভরা দরবার। বাদশার পাশে আজ এসে বসেছে তাঁর সুন্দরী মেয়েটিও। একদিকে সার দিয়ে বসেছে বুড়ো মন্ত্রী ক’জন। সেনাপতি, উজির-নাজির। অনেকই লোক-লস্কর জমা হয়েছে দরবারে। আর আছে মুশকো মত একটা লোক। চোখ দুটো ভাঁটার মত গোল গোল। গোঁফের কী বাহার তার। সে কোতয়াল। গোলাম ছেলেটাকে শূলে চড়াবে সে। 

ছেলেটা এসে দরবারে ঢুকল। হাতে একটা পুঁটলি। বাদশাকে লম্বা করে একটা সেলাম করল ছেলেটা। তারপর পুঁটলি খুলে, বাদশার পায়ের কাছে নামিয়ে দিল। 

একসাথে এতগুলো মুক্তো। তার আলোর ছটায় ভরে গেল দরবার। এমন আলো কেউ দেখেনি কোনদিন। মুখে কথা সরছে না কারও। বাদশার মেয়ের চোখে পলক পড়ছে না। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে গোলাম ছেলেটার দিকে। 

বাদশাও যেন সম্বিৎ হারিয়ে ফেলেছিলেন। এক পুঁটলি মুক্তো! এতো সম্পদ তো তাঁর নিজের তোষাখানাতেও নাই! আনন্দে বুক ভরে গেল বাদশার। মেয়ের দিকে তাকালেন এবার।

কিছু বলতে হোল না বাদশাকে। মেয়েই বলল—আর কোনও পরীক্ষা নয়। কোনও রকম ছলছুতো নয় আর। এই ছেলেকেই বিয়ে করব আমি। একেই আমার পছন্দ।

আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল দরবারে। বাদশা তো হাঁফ ছেড়ে বাছলেন।

মেয়ে বলল— তুমি বরং একটা কাজ করতে পারো। এই বুড়ো মন্ত্রীগুলোকে ধরে, শূলে চড়িয়ে দাও এক এক করে। বুড়ো হয়ে গেছে তো। বুদ্ধিশুদ্ধি ছিটেফোঁটাও নাই আর মগজে। 

হো-হো করে হেসে উঠল সারা দরবার। 

আমার কথা ফুরোল। বাদশার দেমাকি মেয়ের সাথে গোলাম ছেলের বিয়েও হয়ে গেল।

Post a Comment

0 Comments