জ্বলদর্চি

ভিবজিওর রহস্য আখ্যান/সোমনাথ মুখোপাধ্যায়


ভিবজিওর রহস্য আখ্যান

সোমনাথ মুখোপাধ্যায় 

VIBGYOR বা বেনীআসহকলা । বাংলা বা ইংরেজিতে এই বর্ণ সংকেতটি উচ্চারণ করলেই মাথার ওপরে থাকা আকাশের দিকে নজর চলে যায়,মন ভরে ওঠে এক আশ্চর্য রঙিন অনুভূতিতে। কিশোরবেলায় ফিরে যাই।কদিন ধরেই সমানে বৃষ্টি হচ্ছে। বাইরে বেরোনো একেবারে বন্ধ। অথচ ভেজা মাঠে নেমে ফুটবল খেলার জন্য মন উসখুস করছে। ঘরবন্দি হয়ে থাকতে কি আর মন চায় ? দুপুর পেরিয়ে ঠিক বিকেলের মুখে বৃষ্টি একটু ধরতেই দেখি পুব আকাশে ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে এক আশ্চর্য রঙিন দৃশ্যপট। সোৎসাহে সবাই মিলে চিৎকার করে উঠি – আকাশে রামধনু দেখা গেছে, আর বৃষ্টি হবে না। চলো মাঠে নেমে পড়ি।

তখন সম্ভবত ক্লাস সিক্স অথবা সেভেনে পড়ি। বিজ্ঞানের ক্লাসে প্রবীর দা আমাদের সবার সামনে প্রিজমের সাহায্যে রামধনু সৃষ্টির রহস্য উন্মোচন করলেন, ভেঙে ভেঙে প্রকাশ করলেন রামধনুর সাত রঙের পরিচিতি – বেগুনী, নীল, আসমানী, সবুজ, হলুদ, কমলা আর লাল – এই হলো সাত রঙ। তখন‌ও আমাদের আকাশপটে এই বর্ণিল আলোকমালা সৃষ্টির পেছনে থাকা জটিল বিজ্ঞানকে ঠিকঠাক বুঝতে পারার বয়স হয়নি – আলোর প্রতিসরণ, আভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন ও তার বিস্তার বা বিচ্ছুরণ – এইসব তখনও আমাদের কচি মনের বোধগম্যতার সীমার বাইরের বিষয়। আমাদের মধ্য থেকে প্রশ্ন অবশ্য উঠেছিল অনেক – কেন রামধনু সব বৃষ্টির দিনেই দেখা যায় না? কেন এমন বৃত্তাকার তার গঠন? কেন সবসময় সূর্য যেদিকে থাকে তার উল্টো দিকেই রামধনু ভেসে ওঠে? রঙগুলোর অনুক্রম ঠিক এমনই কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে সেই সময় আমাদের ক্লাস ঘরগুলোতে প্রশ্নোত্তরের এমন লাগাতার চাপান উতোরের একটা বড়ো পরিসর ছিল,যা বিস্তৃত ছিল ক্লাস ঘরের বাঁধা পরিসীমার অনেক অনেক বাইরে। ওই সময়টাকে আমরা এভাবেই কাজে লাগাতে শিখেছিলাম।

প্রশ্ন থামেনা। আচ্ছা!বাতাসে ভাসমান জলকণা যদি অমন বিচিত্র বর্ণ সমাবেশ ঘটায়, তাহলে তো শীতের ভোরের কুয়াশা বা বাতাসে ভাসতে থাকা শিশির কণা থেকেও রঙিন রামধনু তৈরি হতে পারে? জলপ্রপাতের জল প্রবল গতিতে আছড়ে পড়লে বাতাসে ভাসমান জলকণাতেও আলো ছিটকে পড়ে বর্ণময় আলোকরশ্মির বিচ্ছুরণ হতে পারে? হ্যাঁ পারে বৈকি! তবে এখানে একটি শর্ত আছে। কী সেই শর্ত? রামধনু সৃষ্টির রহস্য হলো ভিউয়ার বা পর্যবেক্ষকের চোখের সামনে ঠিক ৪২ ডিগ্রি কোণে ভেসে থাকা অবস্থায় যদি জলকণার ওপরে সূর্যের আলো এসে পড়ে তাহলেই কিন্তু স্পষ্টভাবে আলোর প্রতিফলন ও প্রতিসরণ হয়, তবেই দেখা মিলবে রামধনুর। বিজ্ঞানীরা বলছেন এটি হলো নিছকই অপটিক্যাল ইলিউশন বা দৃষ্টি বিভ্রম অর্থাৎ যা নেই তাকেই দেখা। সূর্যদেব সেই সময় যেখানে আছেন রামধনু কে দেখা যাবে ঠিক তার বিপরীত স্থানবিন্দুতে (antisolar point) । সূর্য থেকে পৃথিবীতে ধেয়ে আসা আলোক তরঙ্গ বাধা পেলে প্রতিসরিত ও আভ্যন্তরীণ ভাবে প্রতিফলিত হয় । প্রতিসরিত রশ্মিটি এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে যাবার সময় বেঁকে যায়। আর আলোক রশ্মি আভ্যন্তরীণ ভাবে প্রতিফলিত হলে তা আবার উৎসের দিকে ফিরে আসে এক‌ই কৌণিকতায়। আর এক্ষেত্রেই হয় দৃষ্টিবিভ্রম যাকে আমরা সবাই বলি রেইনবো বা রংধনু বা চিরপরিচিত রামধনু। 

🍂

এখানে অবশ্য রহস্যের আরও একটা পর্দা তোলা বাকি রয়েছে। সাধারণ বা স্বাভাবিক আলোকে আমরা বর্ণহীন বা স্বচ্ছ বলে মনে করলেও তা কিন্তু আসলে সাতটি আলাদা আলাদা রঙের মিশ্রণ। আগেই বলেছি যে সূর্যের আলো ভাসমান জলকণার ওপরে পড়লে তা প্রতিসরিত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন কৌণিকতায় বেঁকে যায়। একে বলে বিচ্ছুরণ। সাদা আলো তাদের তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের তারতম্য ভেদে ভেঙে গিয়ে বা বিচ্ছুরিত হয়ে সাতরঙা রামধনুর সৃষ্টি করে। আসলে রামধনু সৃষ্টির রহস্য লুকিয়ে আছে আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ ও বিচ্ছুরণ - এই ত্রয়ী প্রক্রিয়ার কার্যকারণের মধ্যেই। 

একথা মেনে নিতেই হবে যে রামধনু এক আশ্চর্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নিদর্শন। সেই এরিস্টটল থেকে শুরু করে আইজ্যাক নিউটন পর্যন্ত যুগন্ধর বিজ্ঞানীরা রামধনু রহস্য উন্মোচন করার নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা করে গেছেন। আলোর এই রহস্যময়তা বিজ্ঞানীদের তাড়িয়ে ফিরেছে সর্বকালে, সর্বযুগে। আজ‌ও অব্যাহত রয়েছে সেই অনুসন্ধানের পর্ব।

খুব সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ভার্জিনিয়া প্রদেশের আকাশ রঙিন হয়ে উঠেছিল এক আশ্চর্য রামধনুর রংবাহারি চেহারা দেখে। মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তরফ থেকে এই রামধনুর ছবিটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে। নাসা এই দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা রেনবোকে fire rainbow হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের কথায়, আকাশে ভাসমান তুষার কণাবাহী সিরাস মেঘ এক্ষেত্রে একটি ভাসমান প্রিজমের কাজ করেছে। এরফলে দেখে মনে হচ্ছে যে আকাশে আজ আগুনের লীলা খেলা চলছে। এক্ষেত্রে দিগন্ত রেখার সমান্তরালে ভেসে উঠেছে এই চমকপ্রদ রংধনু। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে এমন circumhorizontal arc তৈরি হবার পেছনে সূর্যের অবস্থানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক হিসেবে কাজ করে। এখানে সূর্যদেবকে জমির ওপর ৫৮ ডিগ্রি কৌণিকতায় অবস্থান করতে হবে।আর তার নিচে থাকবে তুষার কণাবাহী সিরাস মেঘ। নাসার বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে, সেদিন পশ্চিম ভার্জিনিয়া প্রদেশের আকাশ জুড়ে সিরাস ফাইব্রেটাস মেঘের আনাগোনা সকলের নজর কেড়েছিলো।

মেঘমুলুকে সিরাস মেঘ থাকে মেঘ মহলের একেবারে উচূ তলায়। সেখানে দাপিয়ে বেড়ায় তুষার কণিকা। ভাসমান জলকণারা এখানে রূপান্তরিত হয়েছে শীতল তুষার কণিকায়। চ্যাপ্টা,ষড়ভূজাকার এই তুষার কণাগুলোর ওপরে আপতিত সূর্যের আলো এক‌ইভাবে প্রতিসরিত হয়ে এমন আশ্চর্য বর্ণময় শোভার সৃষ্টি করে। এমন পরিবেশ পরিস্থিতি সচরাচর দেখা যায় না,তাই ফায়ার রেনবোর দেখা পাওয়া বেশ দুর্লভ। ২০২১ সালে এই পশ্চিম ভার্জিনিয়ার নর্থ ফর্ক মাউন্টেনের কাছেই এমন রেনবোর দেখা মিলেছিল শেষবারের মতো। এবার পাঁচ বছর পর আবারও সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি।

আচ্ছা! সবটাই যখন আলোর খেলা তখন জানতে ইচ্ছে করে – চাঁদের আলোয় রংধনু সৃষ্টি হয়? হয় বৈকি! গ্রীক বিজ্ঞানী তথা দার্শনিক এরিস্টটল তার লেখায় এমন ঘটনার উল্লেখ করেছেন। তবে চাঁদের ওপর থেকে প্রতিফলিত রশ্মির পরিমাণ কম বলে তা খুব ভালোভাবে আমাদের নজরে পড়েনা। সিরাস মেঘের ওপর রাত আকাশের চাঁদের আলো পড়লে তৈরি হতে পারে বিরল চন্দ্রধনু।

আজ শেষ করবো একটা গপ্পো দিয়ে।

বহু বহু বছর আগের কথা, ধরিত্রী তখন একেবারেই অল্পবয়সী, নরম সরম, দুবলা পাতলা। আজকের মতো সর্বংসহা হয়ে ওঠেনি। এমনি একদিন বজ্র, বিদ্যুৎ আর বৃষ্টির দেবতা দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর খাস ছুতোর মিস্ত্রিকে এত্তেলা পাঠিয়ে তলব করলেন। সে বেচারি তো কাঁপতে কাঁপতে এসে হাজির হলো দেবরাজের দরবারে।  তাঁকে সামনে পেয়ে ইন্দ্র বললেন – “ ওহে বাপু! আমার পুরনো ধনুকটায় ছিলা পড়াতে গিয়ে ভেঙে ফেলেছি।ওতে আর কাজ চলবে না।আমায় বেশ বড়সড় আর শক্ত পোক্ত একটা ধনুক বানিয়ে দিতে হবে। কি পারবে তো?

স্বয়ং দেবরাজের আদেশ বলে কথা! না বলা যায়?

ছুতোর মশাই কাজ শুরু করে দিলেন। দিন কয়েকের মধ্যেই ধনুক বানিয়ে ফেললো সে।ধনুক দেখে মনে মনে বেজায় খুশি হলেন ইন্দ্রদেব, কিন্তু তাঁর ধনুক কি শুধু অমন কেঠো চেহারার হলে মানায়? একটু রঙ বেরঙের হতে হবে। একাজের জন্য ডাক পড়লো দেব শিল্পী বিশ্বকর্মার। তিনি হাজির হতেই দেবরাজ তাঁকে বললেন –”শোনো , আমার ধনুকটাকে রাঙানোর জন্য এমন রঙ ব্যবহার করবে যা কোনো দেবতা আগে দেখেননি।” “যথা আজ্ঞা দেবরাজ “। এই বলে বিশ্বকর্মা বিদায় নিয়ে মর্ত্যে এলেন রঙের খোঁজে।

উষাকালে হিমালয়ের শৃঙ্গরাজির ওপর সূর্যের আলো পড়লে সেগুলো যেমন বেগুনি রঙের হয়ে ওঠে তেমন রঙে রাঙানো হলো ধনুকে।

নীল গাছ থেকে নিলেন আসমানী রঙটিকে।

ময়ূরের গলার থেকে ধার করা হলো নীল রঙ।

কাঁচা আমের সবুজ রঙ লাগানো হলো ধনুকের গায়ে।

পঞ্চম র‌ঙ হলুদ নেওয়া হলো নবজাত ব্যাঘ্র শাবকের হলদেটে পশম থেকে।

মেহেন্দি পাতার রসে মিললো কমলা রঙ।

আর শেষ রঙ লাল নেওয়া হলো অশোক ফুল থেকে। সাত সাতটি প্রাকৃতিক রঙে বিশ্বকর্মা নিপুণ হাতে সাজিয়ে তুললেন দেবরাজের ধনুক।

বিশ্বকর্মাতো বেজায় খুশি। সদ্য সদ্য রঙ করা ধনুকটিকে তিনি শুকানোর জন্য ঝুলিয়ে রাখলেন। এদিকে সূর্য উঠতেই গরমে তেতে উঠলো চতূর্দিক।ধনুকটিতো তাপে ফেটে যায় আর কি। এই দেখে বিশ্বকর্মা ইন্দ্রদেবের কাছে গিয়ে মিনতি করলেন বৃষ্টি নামানোর জন্য। ইন্দ্রদেব এই প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। বৃষ্টি নামলো ঝমঝমিয়ে। এই দৃশ্য দেখে ওখানে ভিড় করে থাকা একদঙ্গল কচি কাঁচা হাততালি দিয়ে নেচে উঠলো। গলা ছেড়ে গান গেয়ে উঠলো –

                     ওরে,তোরা সবাই আয় 

                     ইন্দ্রধনুষ ওই উঠেছে -

                     আজ আকাশের গায়।

                     দেখবি যদি আয়।

এসব দেখে ইন্দ্র আর বিশ্বকর্মা দুজনেই বেজায় খুশি। বিশ্বকর্মা ইন্দ্রদেবকে বললেন – “ দেবরাজ এখন থেকে প্রতিবার এই ধনুক ব্যবহার করার পর বৃষ্টির জলে তাকে ধুয়ে নেবেন। তাহলে এই রঙ চিরকালের মতো রয়ে যাবে। 

সেই থেকে বৃষ্টির পরে আকাশপটে ভেসে ওঠে বিশ্বকর্মার হাতে আশ্চর্য রঙে রঙিন হয়ে ওঠা ইন্দ্র তথা রামধনু।

আমার গল্পটি ফুরলো…….।

Post a Comment

0 Comments