জ্বলদর্চি

বাইশে শ্রাবণ/অসিতরঞ্জন ঘোষ

বাইশে শাবণ

অসিতরঞ্জন ঘোষ

জালিওয়ানালার স্মৃতি পথে, সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ

একশো বছর আগে, তোমার সাথে দেখা। 
উদ্ভ্রান্ত, উদ্বিগ্ন তুমি, তোমার চঞ্চল বলিরেখা।।
হাঁপুস নয়ানে কেঁদেছিলে কত? বলেছিলে কত কথা!!
‘মানুষ কাঁড়ে মানুষের প্রাণ’- অসহনীয় এ ব্যথা।
‘রাজবল শুধু বন্দুকের নলে, অনল বর্ষিবে’, হায়!
‘কার কাছে? কোন দরবারে? বিচার খুঁজিবে জনতায়?’ 
‘ভাষা বলিবার ভাষা নাই আর, ভাষাহীন জড়বৎ।
দুর্বার স্রোতে ভুমিহারা আমি, আঁধারে ভবিষ্যৎ’।
সিক্ত নয়ানে বলেছিলে তুমি, ‘এত, এত প্রাণ হায়----
এত ঘৃণা, সঞ্চিত বুকে? রাঙ্গালো হাত রক্তের বন্যায়’???
‘রাজবেশে আজ জলহাদ দেশে, জান্তব উন্মাদনায়,
পাষাণ চিত্তের হীন মনোবৃত্তি, অযোগ্য তা ক্ষমা ও ঘৃণায়’।।
‘মৃত্যু নিয়ে বিশ্রী প্রমোদ, রাজদন্ডের কুশ্রী প্রদর্শন,
নিরীহ প্রজার, অযুত জনতার, ইতিহাস- সাক্ষ্য এ গন- হনন’।
ক্ষমাহীন সে অগাধ অপরাধ, কে কবে ভুলতে পারে?
কিন্তু দাম্ভিক রাজশক্তি! ভোলে তা ফুঁৎকারে!!!
🍂
এমন সময়ের সাক্ষী আমি, মর্মাহত, ক্লিষ্ট, অক্ষম, অভাজন,
কিছুই পারিনি করতে, প্রহর গুনেছি- অশ্রুক্লান্ত দু-নয়ন।।
১৩ই এপ্রিল ১৯১৯, জীবন কেড়েছে ঐ বেনেবেশী জলহাদ,
রক্তে ভেসেছে বাগ, সভ্যতার ইতিহাসে রেখেছে দুঃসংবাদ।।
নেই কোনও অপরাধ বোধ, নেই কোনও পশ্চাৎ তাপ,
দুর্ভাগ্য ভারতবাসীর! দুধ দিয়ে পুষেছিল কালসাপ।।
কতশত আহুতি দিয়েছে, আরও আহুতি দেবে অবহেলে…
স্বদেশে আমরা এতটাই পরাধীন, রাজশক্তি বন্দুকের নলে!
আর কিছু বোলো না আমায়, আর নয় জিজ্ঞাসা,
পড়ে পড়ে শুধু মার খেয়েছি, অহিংস এঁকেছে হতাশা!!
রক্তের হিসাব তো রক্তে নয়, বুদ্ধ- চৈতন্যের দেশ এ ভারতবর্ষ,
দেশ শাসিত বিদেশীর হাতে, ভরেছে অশান্তি- সংঘর্ষ।।
কিন্তু আগ্রাসী শক্তির এ নির্দয় পাশবিক আক্রমণ, 
অনুশোচনায় ভারাক্রান্ত, বেদনাহত তনু-মন…
‘মান্দালয়ে’র কবি সায় দেয় এ অরাজকতা, অবহেলে,
‘শাসক করেছে রাজকাজ তার- ও আমাদেরি ছেলে!’
দেখে ও শুনে শিউরে উঠি, ভাবি আমি কি জীবন্ত?
ঝেড়ে ফেলা চাই রাজমুকূট, তবেই হবে এ হৃদি শান্ত।
যে রাজা অহঙ্কারে মদ-মত্ত, নির্বোধ ও পাশবিক,
তাঁর প্রদত্ত সম্মান, আমার- আমাদের কাছে, ধিক, অযুত ধিক।।
এতটুকুই সম্বল আমার, বাঁচাতে দেশের অভিমান—
দেশ দিয়েছি, রক্ত দিচ্ছি। অখন্ড মায়ের সম্মান।
প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলে উধম নিয়েছে প্রাণ,
ফাঁসির দড়িতে প্রাণ দিয়েছে কতশত সন্তান।।
তবু চেতনা ফেরেনি ঐ স্বার্থ- লোলুপ বিশ্ব-মহারানীর,
কুটিল-হায়নার শকুনি দৃষ্টি আর মরুতপ্ত কুম্ভীর-নীর।।

ভারত রয়েছে ভারতেই তাঁর উজ্জ্বল ইতিহাসে,
সারা পৃথিবী এক হয়ে আছে এই বেদ-পুরানের দেশে।।
তুমি, স্বাধীন দেশের স্বাধীন ছেলে, ভাবতে পারো স্বাধীন…
বাগে এখন ফোঁটাও পুষ্প, বৈশাখীতে আনো বীন।।
চোখের জলে ভেসে গেলাম আমরা দু’জন স্বপনে,
ইতিহাসের গোপন ব্যথা শুধু জিজ্ঞাসুর-ই মনে।।

বাইশে শ্রাবণ স্মরণে-১

আজ শ্রাবণের এমন দিনে বরিষন অবিরত।
হৃদয়ে মোর শ্রাবণধারা, রবি অস্তাগত।
স্মৃতির বানে হৃদয় আমার কাঁপছে থরথরো।
রবির কিরণ থমকে গেছে, মেঘলা আকাশ বড়।

প্রাণের ঠাকুর গানের ঠাকুর, রবিঠাকুর নেই। 
বাদলা দিনে তোমা বিনে, কাঁদছে সকলেই। 
আজ এদিনে তোমার গানে তোমার কবিতায়,
বারে বারে ফিরে পাই, সকাল ও সন্ধ্যায়।

অঝর ধারে বৃষ্টি পড়ে, আজকে সারাক্ষণ। 
কাঁদছি তোমায় স্মরণ করে, "বাইশে শ্রাবণ"।

বাইশে শ্রাবণ স্মরণে-২

আজ বরষার শ্রাবণধারা, অবিরাম এমন!
দিনের শুরু দিনের সারা, কোথায় যে কখন?
শন শন শন বাতাস ছোটে, তুমুল বরিষন।
বিদায়ক্ষণে কাঁদছে সবাই, কাঁদে এ শ্রাবণ। 

গাছের পাতায় মনের খাতায়, অজস্র বর্ষন।
বাদলা মেঘের এমন দাপট, ঝড়ের আলোড়ন। 
আকাশ কাঁপে বজ্রাঘাতে, ভূমিতে প্লাবন!
দিশেহারা, দৃপ্তরবির নীরব সমর্পণ। 

আজ বরষার শ্রাবণধারা, অবিরাম এমন!

Post a Comment

0 Comments