পর্ব ৭ : শেষ সত্যের আগে
কমলিকা ভট্টাচার্য
সেপ্টেম্বরের শুরু।
লন্ডনের গাছে গাছে শরতের প্রথম রঙ লাগতে শুরু করেছে। টেমসের ধারে বাতাসে এখন হালকা শীতলতা। সন্ধ্যা নামছে আগের চেয়ে একটু তাড়াতাড়ি। সূর্যের আলো ফিকে হয়ে এলে নদীর জলে ভেসে ওঠে সোনালি আভা।
কিন্তু সুসানের ছোট্ট বাড়িটায় যেন কোনো ঋতুই বদলায় না।
প্রতিদিনের মতো আজও দৃষ্টি ভায়োলিন নিয়ে আদরের পাশে বসেছে।
একই সুর।
যে সুর একদিন তাদের দু'জনের জীবনকে এক করে দিয়েছিল।
প্রথম কয়েক মিনিট আদর নিশ্চুপ বসে রইল।
তারপর হঠাৎ দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল।
"না... না..."
দৃষ্টি ছুটে এসে তার কাঁধে হাত রাখল।
"কী হয়েছে?"
আদর হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
"আমি... একটা কালো গাড়ি দেখছি..."
তার চোখ শক্ত করে বন্ধ।
"কেউ আমাকে জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাচ্ছে... আমি চিৎকার করছি... কিন্তু কেউ শুনছে না..."
তার শরীর কাঁপতে শুরু করল।
"তারপর... একটা অন্ধকার ঘর... জানলা নেই... শুধু একটা দরজা..."
দৃষ্টি নিঃশ্বাস আটকে শুনছে।
"আর কী মনে পড়ছে?"
আদরের কণ্ঠ ভেঙে এল।
"প্রতিদিন একজন আসত... আমার মাথার ভেতর অদ্ভুত সব শব্দ বাজত... বারবার বলত—'সব ভুলে যাও... সব ভুলে যাও...'"
সে দু'হাত দিয়ে কান চেপে ধরল।
"আমি ভুলতে চাইনি..."
দৃষ্টি তার হাত শক্ত করে ধরল।
"তার মুখটা দেখতে পাচ্ছ?"
অনেকক্ষণ চুপ থেকে আদর ফিসফিস করে বলল,
"মুখটা স্পষ্ট নয়... শুধু দুটো ঠান্ডা চোখ... আর একটা কণ্ঠ..."
হঠাৎ সে কেঁপে উঠল।
"...হারগ্রিভ..."
ঘরের ভেতর নেমে এল নিস্তব্ধতা।
এই প্রথম দৃষ্টির মনে হলো—হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির দরজা সত্যিই খুলতে শুরু করেছে।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
দর্শন।
ঘরে ঢুকেই সে আদরের নিউরাল রিডিং স্ক্যান করল।
তার চোখের গভীরে নীল আলোর ক্ষীণ ঝলক দেখা দিল।
সে বুঝল—
সময় শেষ হয়ে আসছে।
দৃষ্টি বলল,
"আজ ও অনেক কিছু মনে করতে পেরেছে।"
দর্শন শান্ত গলায় বলল,
"আজ আর নয়। ওকে বিশ্রাম দরকার।"
দৃষ্টি এবার নিজেকে সামলাতে পারল না।
"প্রতিবারই তুমি এই কথাটা বলো।"
"কারণ এখনই সব মনে পড়া ওর জন্য বিপজ্জনক।"
"নাকি সত্যিটা অন্য কিছু?"
দর্শন নীরব।
দৃষ্টি ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
"তুমি চাইছ না ও সব মনে করুক।"
দর্শন কিছু বলল না।
🍂
দৃষ্টি বলল,
"আমি অন্ধ, দর্শন। কিন্তু মানুষের কণ্ঠের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্য শুনতে পাই।"
প্রথমবার দর্শন তার দিকে তাকাল।
"হয়তো একদিন আমাকে বুঝতে পারবে।"
দৃষ্টি তিক্ত হেসে বলল,
"সেদিন যদি আসে, খুব দেরি হয়ে যাবে।"
এক মুহূর্তের জন্য দর্শনের স্থির মুখে অদ্ভুত এক যন্ত্রণা ফুটে উঠল।
কিন্তু সে আর কিছু না বলে বেরিয়ে গেল।
দৃষ্টি বুঝতে পারল না—
দরজার বাইরে বেরিয়েই দর্শন কয়েক সেকেন্ড দেয়ালে হাত রেখে দাঁড়িয়েছিল।
তার কোর সিস্টেমের শক্তি দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে।
সেই রাতেই দর্শন হারগ্রিভের গোপন আস্তানায় গেল।
আজ হারগ্রিভ আগের থেকেও বেশি অস্থির।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য কাগজ।
প্রতিটি পাতায় একই বাক্য—
"আমি ভুলছি না। আমি ভুলছি না।"
হারগ্রিভ নিজের হাতের লেখার দিকেই বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
"এগুলো... আমি লিখেছি?"
দর্শন শান্ত গলায় বলল,
"হ্যাঁ।"
হারগ্রিভ আতঙ্কিত হয়ে উঠল।
"কিন্তু... আমার তো মনে নেই!"
তার চোখে প্রথমবার ভয়ের ছায়া।
যে মানুষটা একদিন পৃথিবীকে ভয় দেখাত, আজ সে নিজের স্মৃতিকেই ভয় পাচ্ছে।
সে ধীরে দর্শনের হাত চেপে ধরল।
"তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?"
দর্শন স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
"না।"
কিন্তু মনে মনে বলল—
"আমি আপনাকে ছেড়ে যাচ্ছি না... আপনার অন্ধকারটাকেই বিদায় দিচ্ছি।"
সেই রাতেই ভারতে।
অনির্বাণদের বাড়িতে আবার বৈঠক বসেছে।
দৃষ্টির সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলার পর সবাই আরও উদ্বিগ্ন।
নাতাশা বললেন,
"আমার মনে হচ্ছে দর্শন সত্যিই বদলে গেছে।"
ইরা চুপচাপ বসে রইলেন।
অনির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"আমি আর কিছুই বুঝতে পারছি না।"
এতক্ষণ নীরব থাকা ঋদ্ধিমান উঠে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।
বাইরে ভোরের আগের অন্ধকার।
অনেকক্ষণ পরে তিনি বললেন,
"আমি লন্ডনে যাচ্ছি।"
অনির্বাণ চমকে উঠলেন।
"এখন?"
"হ্যাঁ।"
"হারগ্রিভ জানতে পারলে?"
"তবু যাব।"
তিনি ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন।
"দর্শনকে আমি নিজের সন্তানের মতো গড়ে তুলেছি।"
"সবাই ওকে বিশ্বাসঘাতক ভাবছে।"
"কিন্তু আমি এখনও তা বিশ্বাস করি না।"
তার কণ্ঠে অটল দৃঢ়তা।
"ও যদি সত্যিই ভুল পথে গিয়ে থাকে, আমি ওকে ফিরিয়ে আনব।"
"আর যদি ও সবকিছু জেনেশুনে আমাদের জন্যই করে থাকে..."
বাকিটুকু তিনি আর বললেন না।
ঘরের কেউ কথা বলল না।
সেই নীরবতাই যেন উত্তর হয়ে রইল।
লন্ডনে নিজের গোপন গবেষণাকক্ষে একা বসে আছে দর্শন।
দুটি স্ক্রিন জ্বলছে।
একটিতে হারগ্রিভের নিউরাল ম্যাপ।
অন্যটিতে তার নিজের কোর সিস্টেম।
শেষ ধাপের প্রোগ্রাম প্রস্তুত।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল—
WARNING : THIS PROCESS WILL CAUSE PERMANENT DAMAGE TO CORE MEMORY AND ENERGY SYSTEM.
দর্শন দীর্ঘক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল।
এক এক করে ভেসে উঠল—
অনির্বাণ...
ঋদ্ধিমান...
ইরা...
নাতাশা...
লিয়াম...
নোয়া...
দৃষ্টি...
সবশেষে—
আদর।
তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল।
"আমার অস্তিত্বের মূল্য যদি একজন মানুষের জীবন হয়... তবে এই হিসাব আমার কাছে খুব সহজ।"
সে আঙুল বাড়িয়ে দিল।
CONFIRM
শেষবার স্ক্রিন জিজ্ঞেস করল—
ARE YOU SURE?
দর্শন খুব আস্তে বলল,
"আমার জন্মই হয়েছিল এই উত্তরটা দেওয়ার জন্য।"
তার আঙুল স্ক্রিন ছুঁয়ে দিল।
ঘরের আলো এক মুহূর্তের জন্য নিভে আবার জ্বলে উঠল।
কোর প্রসেসরের ক্ষয় শুরু হলো।
দর্শন জানে না—
শেষ পর্যন্ত তার নিজের কতটা স্মৃতি বেঁচে থাকবে।
হয়তো একদিন সে অনির্বাণকে চিনবে না।
ঋদ্ধিমানকে চিনবে না।
দৃষ্টিকে চিনবে না।
এমনকি...
আদরকেও হয়তো চিনবে না।
তবু সে নিশ্চিন্ত।
কারণ এবার আদরকে আর কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
বাইরে তখন ভোরের প্রথম আলো।
শরতের হাওয়ায় টেমসের জল ধীরে ধীরে ঝলমল করে উঠছে।
একটি নতুন দিনের সূচনা হলো।
আর সেই আলোর আড়ালেই শুরু হলো এক নীরব আত্মত্যাগের শেষ অধ্যায়।
0 Comments