রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা 

সজল কুমার মাইতি


ভারতে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ও বৈচিত্র্যপৃর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। শিক্ষার বেসরকারিকরন, ব্যাপক বিস্তৃতি, বর্ধিত স্বায়ত্বশাসন এবং নতুন নতুন শিক্ষাক্রমের প্রচলন উচ্চ শিক্ষায় নব ও উদীয়মান ক্ষেত্রে প্রবেশদ্বার বহুলাংশে খুলে দিয়েছে। ফলস্বরূপ, উচ্চ শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা ও উৎকর্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। 1986 ও 2020 সালের শিক্ষা নীতি (NPE, 1986 ও 2020) ও 1992 সালের শিক্ষাক্রম (PoA, 1992) এ এই সকল প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কর্মকৌশলের ব্যবস্থার কথা কর্মনীতি হিসেবে স্পষ্টরূপে বর্নিত হয়েছে। এবং একটি স্বাধীন জাতীয় স্বীকৃতি সংস্থা প্রতিষ্ঠার কথা ও স্বীকৃত হয়েছে। এর ফলস্বরূপ, 1994 সালে রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠান একটি স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা এবং এটি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। 

ন্যাক স্বীকৃতির উদ্দেশ্য 

ন্যাকের  মূল উদ্দেশ্য হল উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির কার্যব্যবস্থার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে  উৎকর্ষতা নিশ্চিতকরন। আমাদের দেশের সকল উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত মূল্যায়ন ও শিক্ষার গুনমানের নিশ্চিতকরন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও প্রতিটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ন্যাকের স্বীকৃতি বাধ্যতামূলক করেছে। ন্যাকের স্বীকৃতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে তাদের নিম্নলিখিত বিষয়ে মানোন্নয়নের সুযোগ করে দেয়।

1. উৎপাদিকা ও দক্ষতার বহু গুন বৃদ্ধি 
2. শিক্ষাদান - শিক্ষাগ্রহণ প্রক্রিয়ার উন্নতি বিধান 
3. শিক্ষামূলক বিষয়ে সামর্থ্য ও দুর্বলতা চিহ্নিতকরন
4. কর্ম পরিকল্পনার ক্রমাগত উন্নয়ন 

ন্যাকের স্বীকৃতি ছাত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বাধিক সাফল্যের একটি নির্ভরঘোগ্য পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

ন্যাকের ভিশন 

ন্যাকের ভিশন স্টেটমেন্টে যা বলা হয়েছে সংক্ষেপে তা নিম্নরূপ:
1. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি শিক্ষাদানের গুনমানের উন্নতিসাধনের কথা চিন্তা করা ও তার রূপায়ন করা 
2. মাঝে মাঝে সময়ানুযায়ী মূল্যায়নের মাধ্যমে কর্মপরিকল্পনার পরিবর্তন 
3. এই সদাসচল প্রক্রিয়া উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে সর্বোৎকৃষ্ট লক্ষ্যপূরণে সহায়তা করবে

ন্যাকের মিশন

শিক্ষা সংক্রান্ত ব্যাপারে ন্যাক কমিটির মিশন সবর্দাই দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য। এর পাঁচটি মূল বিষয় হল:

1. শিক্ষাদান - শিক্ষা গ্রহণ পদ্ধতির পর্যানুক্রমিক মূল্যায়ন 
2. গবেষণা ও পরীক্ষিত শিক্ষামূলক পদ্ধতিযুক্ত শিক্ষা সংক্রান্ত পরিবেশের প্রবর্তন 
3. শিক্ষায় স্বায়ত্বশাসনের ধারণা, উদ্ভাবন, স্বমূল্যায়ন ও টেকনোলজির ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান 
4. ছাত্র সাফল্যের জন্য গবেষণা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ 
5. কর্মোন্নয়ন ও মতামত গ্রহণের জন্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সহযোগিতার বাতাবরন সৃষ্টি 
ন্যাকের লক্ষ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে ' সর্বোৎকৃষ্টের অন্বেষণ ' এর মনোভাব গড়ে তোলা যার ফলে  ছাত্ররা প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়।

ন্যাক (NAAC) এর কার্যপদ্ধতি ও কার্যাবলী 

ন্যাক কাজ করে এর সাধারণ পরিষদ ( General Council) ও কার্যকরী কমিটি ( Executive Committee) এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। এই পরিষদ ও কমিটি গঠিত হয় মূলত আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে বরিষ্ঠ শিক্ষাবিদ, শিক্ষা প্রশাসক ও নীতি নির্ধারকদের নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সভাপতি ন্যাকের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হন। আবার ন্যাকের সাধারণ পরিষদের সভাপতি এর কার্যকরী কমিটির সভাপতি হিসেবে একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদকে মনোনীত করে থাকেন। ন্যাকের ডাইরেক্টর এর সমস্তরকম শিক্ষাসংক্রান্ত কাজ ও প্রশাসনিক কাজের প্রধান। তিনি ন্যাকের সাধারণ পরিষদ ও কার্যকরী কমিটির সদস্য সচিব ও বটে। ন্যাকের কাজকর্ম মূলত পরিচালিত হয় এর বিভিন্ন বিধিবদ্ধ সংস্থাগুলির পরামর্শ ও মূল কর্মকর্তাদের সাহায্যে। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে গঠিত উপদেশক কমিটি ও পরামর্শদাতা কমিটির বিভিন্ন প্রস্তাব বা পরামর্শ ন্যাকের নীতি নির্ধারণ ও কর্মপদ্ধতি ঠিক করতে বহুলাংশে অগ্রনী ভূমিকা নিয়ে থাকে। 
ন্যাকের মূখ্য কাজ আমাদের দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি প্রধানত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি প্রদান। এই সকল প্রতিষ্ঠানগুলিকে তাদের নিজস্ব মূল্যায়ন রিপোর্ট বা সেল্ফ স্টাডি রিপোর্ট ( SSR) তৈরিতে ন্যাক সাহায্য করে থাকে। ন্যাকের মূল্যায়কদের পরিদর্শনের পূর্বে এই সকল প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিভিন্ন দলিল দস্তাবেজ তৈরির পরামর্শ ও দিয়ে থাকে। 

ন্যাকের স্বীকৃতিপ্রদান প্রক্রিয়া 

ন্যাকের স্বীকৃতিপ্রদান প্রক্রিয়া মূলত গুনমান নিশ্চয়তার কাজ। এই কাজের জন্য প্রধানত দরকার হয় প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য ও রিপোর্ট ন্যাক কমিটির কাছে জমা দেওয়া। এই কাজগুলি ধাপে ধাপে বর্নিত হল।
1. প্রথমে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে ন্যাকের নিজস্ব ওয়েবসাইটে নিবন্ধীকরণ 
2. প্রারম্ভিক গুনমান মূল্যায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ডেটা ও তথ্যের সংকলন
3. প্রারম্ভিক গুনমান মূল্যায়নের পর স্বমূল্যায়ন রিপোর্ট ( SSR) দাখিলীকরন ( এই রিপোর্ট প্রথমে গৃহীত হলে ঠিক আছে। নাহলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এক বছরে আর দুটি সুযোগ পাবে এই রিপোর্ট দাখিলের জন্য )।
4. প্রদত্ত ডেটার সত্যতা ও বৈধতা যাচাইকরন
5. এই রিপোর্টের সমর্থনে প্রমাণ ও দলিলাদি জমাকরন
6. আইসিটি যুক্ত শিক্ষার প্রয়োগ 
7. ছাত্রদের মতামত গ্রহণ 
8. ডেটা বৈধতা ও সত্যতা যাচাইকরন প্রক্রিয়া - এই প্রক্রিয়া প্রধানত কম্পিউটার দ্বারা স্কোর নির্ধারিত হয়ে থাকে। একে সিস্টেম জেনারেটেড স্কোর বা SGS বলে। ন্যাকের মূল্যায়নের 70 শতাংশ আসে এইভাবে। আর বাকি 30 শতাংশ আসে  ন্যাকের পিয়ার ( Peer Team) টিমের মৃল্যায়ন থেকে।
a. ডেটা বৈধতা ও সত্যতা যাচাইকরনের পর হয় SSS বা স্টুডেন্টস স্যাটিস্ফ্যাকশন সার্ভে বা ছাত্র সন্তুষ্টি সমীক্ষা
b. এরপরে ন্যাক Peer Team প্রতিষ্ঠান  পরিদর্শনে আসেন আরও কিছু সত্যতা যাচাইকরন ও মূল্যায়নের জন্য 
c. সর্বশেষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানকে গ্রেড প্রদান করা হয় 

ন্যাকের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি প্রদান নব সংযোজন ও কাঠামো 

মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পদ্ধতিতে ন্যাক 2017 সালের জুলাই থেকে কিছু পরিবর্তন এনেছে। নিচে সেই পরিবর্তনগুলি বর্নিত হল।
1. উন্নততর স্বচ্ছতার জন্য peer team এর মূল্যায়নের পরিবর্তে আপলোডেড তথ্যের পরিমাণ ভিত্তিক বিশ্লেষণ চালু
2. ICT এর প্রয়োগের মাধ্যমে অতি দ্রুততার সঙ্গে গুনমান যাচাইকরন
3. রিপোর্টের সরলীকরন
4. ন্যাকের টিম সদস্যদের মূল্যায়ন - 30%
5. আপলোডেড তথ্যের অনলাইন মূল্যায়ন - 70%
6. তৃতীয় পক্ষের দ্বারা তথ্যের বৈধতা যাচাইকরন
7. ছাত্র ও প্রাক্তনীদের ন্যাকের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অধিক অংশগ্রহন 
ন্যাকের টিম সদস্যরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে এসে গত পাঁচ বছরের বিভিন্ন দলিল ও তথ্যের যাচাইকরনের কাজ করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে খুব সতর্কতার এই কাজ করতে হবে। না হলে ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সবকিছু ঠিকঠাক হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সফলভাবে স্বীকৃতি প্রদত্ত হয়।

ন্যাকের মূল্যায়ন শর্তাবলী

ন্যাকের মূল্যায়নের সাতটি শর্ত আছে। যেগুলির ভিত্তিতে মূল্যায়নের কাজ সম্পন্ন করা হয়। এইগুলি নিচে আলোচনা করা হল।
1. পাঠক্রমের বিভিন্ন দিক - পাঠক্রম ও সিলেবাস ছাত্রদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কতটা সহায়ক তার পর্যালোচনা 
2. শিক্ষাদান, শিক্ষাগ্রহন ও মূল্যায়ন পদ্ধতি  - এই শর্তে শিক্ষক ছাত্র উন্নয়নে কি ধরনের শিক্ষা পদ্ধতি গ্রহন করেন ও কিভাবে তার মূল্যায়ন করেন তার পর্যালোচনা করা হয় 
3. গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রসারণ - এই শর্তে ছাত্রদের কিভাবে অধিকতর গবেষণা ও উদ্ভাবন কাজে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং তার প্রয়োগের মাধ্যমে ছাত্র বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে সফলভাবে কিভাবে তার প্রয়োগ ঘটাচ্ছে তার পর্যালোচনা হয় 
4. পরিকাঠামো ও শিক্ষন সামগ্রী - শিক্ষার উপযোগী পরিবেশ যেমন - ক্লাসরুম, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরিতে বইের পর্যাপ্তভাবে প্রাপ্তি, অন্যান্য শিক্ষামূলক সামগ্রী ও পরিকাঠামো যা শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করে তার পর্যালোচনা 
5. ছাত্র সহায়তা ও অগ্রগতি - এই শর্তে ছাত্রদের বিভিন্ন প্রয়োজন কিভাবে মেটানোর ব্যবস্থা আছে ও প্রতি ক্ষেত্রে ছাত্র অগ্রগতিতে তার প্রয়োগের মাধ্যমে ছাত্রদের শিক্ষা জীবন উন্নত করা যায় তার পর্যালোচনা করা হয় 
6. শাসন, নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা - শিক্ষার গুনমান উন্নয়নে শিক্ষকদের ক্ষমতায়ন খুবই জরুরি। এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কি কি কর্মকৌশল গ্রহণ করেছেন তার পর্যালোচনা করা হয় এই শর্তে
7. প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ ও সৎ অভ্যাস - শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার মূল্যবোধের পরম্পরা গড়ে তুলবে তার বিভিন্ন সৎ ও মহৎ অভ্যাস গুনের মাধ্যমে। এই মূল্যবোধ বাড়িয়ে তুলবে ও উত্তরোত্তর তার বৃদ্ধি ঘটাবে এবং অত্যন্ত সৎভাবে তা অনুসরণ করবে- এই বিষয় পর্যালোচনা এই শর্তে করা হয় 
ন্যাক কমিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে তিন ধরনের প্রতিষ্ঠানে ভাগ করে তার মূল্যায়ন করে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়, স্বায়ত্বশাসিত কলেজ ও সম্বন্ধযুক্ত (Affiliated) কলেজ  এই তিন ভাগে ভাগ করে। এবং সেইভাবে তাদের মূল্যায়ন করা হয়।

ন্যাকের গ্রেড দেওয়ার পদ্ধতি 

জুলাই 2017 থেকে ন্যাক নতুন পদ্ধতিতে গ্রেড প্রদান করে। এই পদ্ধতিতে ন্যাকের টিম সদস্যদের মূল্যায়ন থেকে তিরিশ শতাংশ ও প্রতিষ্ঠানের অনলাইন তথ্যের ভিত্তিতে প্রাপ্ত মূল্যায়ন থেকে সত্তর শতাংশ নেওয়া হয়। এরপরে চূড়ান্ত ক্রমবর্ধভান গড় গ্রেড পয়েন্ট (CGPA) নির্ণয় করা হয়। তার ভিত্তিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে সর্বোচ্চ A++ ( গ্রেড পয়েন্ট 3.51- 4.00) এবং সর্বনিম্ন D ( গ্রেড পয়েন্ট 1.50 বা কম) প্রদান করা হয়। D গ্রেড প্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ন্যাক স্বীকৃতি প্রাপ্ত হয়েছে বলে গ্রাহ্য করা হয় না। A++ ও D এই দুই প্রান্তিক গ্রেডের এর মধ্যে  A+, A, B++, B+, B ও C এই গ্রেডগুলিও আছে। গ্রেড পয়েন্টের হিসাবে এই গ্রেডগুলি প্রদান করা হয়।

ন্যাকের পুনর্মূল্যায়ন ও অভিযোগ প্রতিকার পদ্ধতি 
কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার গ্রেড উন্নত করার জন্য ন্যাকের কাছে পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করতে পারে। যে যে বিষয় বা ক্ষেত্রগুলিতে উন্নতিলাভ করতে চায় সেই বিষয় বা ক্ষেত্রগুলিতে উন্নয়ন ঘটিয়ে ন্যাকের কাছে আবেদন করতে পারে। ন্যাকের ওয়েবসাইটে এই সংক্রান্ত সব কিছু বিষয় বিশদে বর্নিত আছে।

কর্তৃপক্ষের সক্রিয়তা

সরকারি কর্তৃপক্ষ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সক্রিয়তা সাম্প্রতিককালে নজর কাড়ার পর্যায়ে পৌঁচেছে। এর সম্ভাব্য কারন RUSA ( Rastriya Uchchatar Shiksha Abhiyan) র এক বা দু কোটি টাকার অনুদান। ইদানিংকালে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বই, ইন্স্ট্রুমেন্ট, গবেষণা ও অন্যান্য অনেক কাজে রাজ্য ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে অর্থ প্রাপ্তি কমতে কমতে প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। খোঁজ নিলে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক চিত্র পরিলক্ষিত হবে। এই অবস্থায় ন্যাকের স্বীকৃতি পেলে এক বা দু কোটি টাকার একটি ভাল গ্রান্ট পাওয়া যাবে। রাজ্য সরকারের দায়ও কিছুটা হালকা হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির আর্থিক সংকট কিছুটা হলেও মিটবে। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষের অতি সক্রিয়তা লক্ষ্য করার মতো। আর্থিক সংকটের মাঝে ন্যাক স্বীকৃতি আদায় করা গেলে এক বা দু কোটি টাকা আনতে পারলে নিজের চেয়ার যেমন নিরাপদ থাকে তেমনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে গুড হিউমারে ও রাখা যায়। সম্ভব হলে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার রাস্তা পরিষ্কার হয়ে যায়। আর কলেজকে ইউ জি সি এর ডিরেকগনিশন থেকে বাঁচানোও  সম্ভব হতে পারে।

কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা 

ইঁদুর দৌড়ে এগিয়ে যাওয়ার এক অদম্য নেশায় অনেক সময় কলেজগুলি অনৈতিক বা অসত্য ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। অধিক পয়েন্টের লোভে অনেক জায়গায় পেশাদারী সংস্থাকে দিয়ে কাগজপত্র সব তৈরি করার কথাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে শোনা যায়। যা বাস্তবের সঙ্গে আদৌ মেলে না। ছাত্র ভর্তি থেকে পরীক্ষা, মূল্যায়ন সবকিছুই অনিয়ম বা অনৈতিকতার শিকার। কিন্তু দেখানো হয় ' বেস্ট প্রাকটিস' এর দুর্লভ পরাকাষ্ঠা। কোনো কোনো  ক্ষেত্রে কলেজ কর্তৃপক্ষ দিনের পর দিন কলেজে  অনুপস্থিত থাকেন ( বিশেষত দূরবর্তী কলেজগুলির ক্ষেত্রে)। দায়িত্বে থাকা শিক্ষকের জন্য কোনো নোটিশই দিতে দেখা যায় না। ছাত্র সংসদের পদাধিকারী বকলমে কলেজ পরিচালনা করেন। নির্ঝঞ্ঝাটে কলেজ পরিচালিত হয়ে যায়। সংসদ পদাধিকারীদের ছাত্র বলা যায় কিনা তা লাখ টাকার প্রশ্ন। কারণ, লিংডো কমিটির কথা মেনে পঁচাত্তর শতাংশ উপস্থিতি তো দূর অস্ত, এদের অনেক ক্ষেত্রে শূন্য শতাংশ উপস্থিতি থাকে। যদিও এরা নিয়মিত কলেজ আসে, তবে ক্লাসে ' তোমার দেখা নাই রে'। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার পরিবেশ।

1. পাঠক্রম ও পাঠসূচী - এই বিষয়ে কলেজের বিশেষ কিছু করার থাকে না। কারণ এর পুরো দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ও খুব বেশি কিছু করার নেই। ইউ জি সি যা ঠিক করে দেয় তা প্রায় হুবহু তারা অনুসরণ করে। বিশেষ করে সি বি সি এস প্রথা চালু হওয়ার পর। তবে কোনো কোনো কলেজের প্রতিনিধি বোর্ড অফ স্টাডিজে মনোনীত বা নির্বাচিত হয়ে থাকলে তারা কিছু ভূমিকা এই বিষয়ে নিতে পারেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কলেজ স্বল্প মেয়াদী কোর্স চালু করে। তার সিলেবাস কিন্তু কলেজই নিজেরা তৈরি করতে পারে। বিশেষত স্বনিযুক্তি প্রকল্পের জন্য।
2. শিক্ষা শিক্ষণ ও মূল্যায়ন পদ্ধতি  - পছন্দসই মিশ্র পাঠ ব্যবস্থা চালু হওয়া থেকে সব কলেজে মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রায় এক রকম হয়েছে। এক বা দুটি অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন, তারপর চূড়ান্ত পরীক্ষা। যত গন্ডগোল এই পরীক্ষা নিয়ে। যদিও এই পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্ব কলেজের। কিন্তু এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। তা সত্ত্বেও ছাত্র স্বার্থে বা চাপের ভয়ে অনুপস্থিত ছাত্রের জন্য একাধিক বার পরীক্ষা নেওয়া হয়ে থাকে। যেহেতু ইনহাউস পরীক্ষা মূল্যায়নে ও বদান্যতার অভাব পরিলক্ষিত হয় না। বেশিরভাগ যদি নাও বলি তবে অনেক কলেজে ক্লাসে ছাত্র উপস্থিতির কথা যত কম বলা যায় তত ভাল। ছাত্রশূন্য ক্লাসে পাঠদান বা পাঠগ্রহনের বিষয়ে কি বিচার্য হতে পারে আমার তা জানা নাই। নতুন ক্লাস শুরুর দিকে কিছু ছাত্র থাকলে ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা উধাও হতে থাকে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিতির নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে কখনও কখনও সামান্য উপস্থিতি বা শূন্য উপস্থিতি র ছাত্রকে ও পরীক্ষা দিতে দেখা যায়। ছাত্র আন্দোলনের ভয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ উপস্থিতির বিষয়ে প্রায় ' তুমি রবে নীরবে'। অতএব, শিক্ষা শিক্ষণ নিয়ে কলেজের দাবি ' স্বল্প লবণ সহযোগে গ্রহণ ' করা বাঞ্ছনীয়। 
3. গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রসারণ  - উদ্ভাবন বিষয়ে কলেজগুলির দাবি সঠিকভাবে যাচাইকরনের পরই গৃহীত হওয়া আবশ্যক। অন্যথায় অন্য অনেক কাগজ কলমে উপস্থিত থাকার মতো হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ক্যারিয়ার অ্যাডভান্সমেন্টের তাগিদে গবেষণায় অনেকেই নিযুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু তার গুনমান নিয়ে প্রশ্ন অবশ্যই থাকবে। ছাত্র দক্ষতা বৃদ্ধি বা গবেষণালব্ধ জ্ঞান বাস্তবায়ন দুর্লভ চিত্র।
4. পরিকাঠামো ও শিক্ষণ সামগ্রী  - কলেজগুলিতে ক্ষমতার চেয়ে  অনেক বেশি ছাত্র ভর্তি করানো হয়। দেড়শোর ক্লাসরুমে পাঁচশো ছাত্র ভর্তি করে ক্লাস করার ব্যবস্থা হয়। সৌভাগ্যের কথা যে এদের অধিকাংশ ভর্তির পর কলেজে আসে না। নাহলে  এদের ক্লাসে বসতে দেওয়ার জায়গা হোত না। অ্যাডমিশন আর এগজামিনের মধ্যিখানে এদের কোন ইন্টারফেস নেই। সেই বিচারে এদের জন্য ওপেন ইউনিভার্সিটি যোগ্য জায়গা। কিন্তু কলেজের 'দাদাদের' কল্যাণে এদের কখনও স্থানাভাব হয় না। সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ও এই বিষয়ে প্রশ্নের মূখে। বছরের পর বছর ভর্তির সিট বাড়িয়ে যাওয়া। তাও পরিকাঠামো না থাকা সত্ত্বে। শিক্ষক ছাত্র অনুপাত শহরের কিছু কলেজ বাদ দিলে বাকিদের ক্ষেত্রে তা ভয়ংকররূপে খারাপ। বিশেষকরে নতুন নতুন কলেজে। অর্থাভাবে শিক্ষণ সামগ্রীর যোগান ও তথৈবচ। লাইব্রেরিগুলির অবস্থা ও আরও খারাপ। বহু কলেজে না আছে লাইব্রেরিয়ান না  আছে লাইব্রেরি অ্যাসিস্ট্যান্ট। শিক্ষকদের বহু ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব পালন করে কাজ সামাল দিতে হয়।
5. ছাত্র সহায়তা ও অগ্রগতি  - ক্লাসের বাইরে ছাত্র সহায়তা বহু কলেজের ক্ষেত্রে কেবল খাতায় কলমে সীমাবদ্ধ। ব্যক্তিগতভাবে কিছু শিক্ষক ছাত্রদের ভবিষ্যত অগ্রগতিতে সাহায্য করে থাকেন। এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ কেবল ন্যাকের গ্রেড পাওয়ার জন্য বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
6. শাসন, নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা - শিক্ষকদের ক্ষমতায়ন যার ফলে তারা নেতৃত্বদান অগ্রনী ভূমিকা নেবে সেই পরিবেশ দূরবীক্ষণের সাহায্যে দেখতে হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষকদের কর্তৃপক্ষের চোখ রাঙানির শিকার হতে হয়।
7. প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ ও সৎ অভ্যাস  - এর উল্টো চিত্র অধিকরূপে প্রতীয়মান হয়। ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে তলানিতে পৌঁচেছে। ছাত্র দ্বারা শিক্ষক প্রহৃত হওয়া বিরল ঘটনা নয়। বহু শিক্ষক প্রাইভেট টিউশনিতে লিপ্ত, এমনকি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকেও এই কাছে নিযুক্ত থাকার কথা ও শোনা যায়। মূল্যবোধ ও এথিক্যাল ভ্যালুর অবক্ষয়ের ভুরি ভুরি নজির খুঁজলে পাওয়া যাবে। সাম্প্রতিককালে ক্যারিয়ার অ্যাডভান্সমেন্টের জন্য কলেজে কলেজে জার্নালের ছড়াছড়ি। অনেকে ISSN ও জোগাড় করে ফেলেছেন। বছরের পর বছর জার্নাল ছাপানো হচ্ছে। কিন্তু ISSN এর শর্ত কিছুই মান্যতা পাচ্ছে না। আদৌ তার ISSN বজায় আছে কিনা জানা নেই। কিন্তু ISSN দিয়ে ছাপা হচ্ছে। পিয়ার রিভিউড বলে দাবি করা হচ্ছে, আসলে নিজেরাই সব। সম্পাদক মন্ডলীতে থাকা ব্যক্তি নিজের পাবলিকেশন করে যাচ্ছে ও তা দিয়ে CAS এর সিঁড়ি উৎরে যাচ্ছে। যে বছরে জার্নাল আসলে ছাপা হলো কিন্তু জার্নালে থাকছে তার অনেক আগের বছরের উল্লেখ। এরফলে অনৈতিকভাবে এর সুবিধে পেয়ে  CAS উৎরে যাচ্ছে। দেখা গেছে কোনো  এক ব্যক্তি যে ওই সময়ে ওই বিশেষ কলেজে ছিল না, অথচ ওই কলেজের শিক্ষক হিসেবে সম্পাদক মন্ডলীতে স্থান করে নিয়েছে। এই  মূল্যবোধের অভাব ছাত্র ও শিক্ষকের ক্ষেত্রে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়া কোনো শুভ সংকেত নয়। অধিকতর মূল্যবোধ শিক্ষা ও আচরণ কেবল এর থেকে সমাজকে বের হতে সাহায্য করতে পারে।
ন্যাক টিম সদস্যদের পরিদর্শনের আগে কলেজে সবকিছুতে রাতদিনের কাজ শুরু হয়ে যায়। কাগজপত্র তৈরি থেকে বাড়ি ঘর রঙ করা। মিটিং থেকে মিনিটস সবই তৈরি হয়ে যায়। মূল উদ্দেশ্য যে এটা কলেজের অভ্যাসে পরিনত হওয়ার পরিবর্তে শুধু ছমাস আগে প্রস্তুতি। রেমেডিয়াল ক্লাস থেকে টিউটোরিয়াল। ভিলেজ এডোপশন (adoption) থেকে নতুন নতুন কোর্স চালু। ছাত্রদের ফিডব্যাক থেকে, প্রাক্তনীদের ও অন্যান্যদের ফিডব্যাক। সবই তৈরি হওয়া দলিল। বাস্তবের সঙ্গে অনেক ফারাক। একবার স্বীকৃতি মিলে গেলেই হোল। তারপর সবই 'পুনর্মূষিক ভব'। ন্যাকের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতির মহতী উদ্দেশ্য কলেজগুলির শুধু গ্রেড অর্জনের হাতিয়ারে পর্যবসিত হয়ে গেছে। সর্বক্ষেত্রে না হলেও অনেক ক্ষেত্রে এটাই বাস্তব। এইজন্য নতুন নিয়মে ন্যাক ও অনেক পরিবর্তন এনেছে। সবকিছু তথ্য আগে পাঠাতে হয়। তার বৈধতা ও সত্যতা যাচাইকরন হয়। AISHE ( All India Survey in Higher Education ) তে আগে থেকে ডেটা আপলোডেড হয়ে থাকে। সেখান থেকে ও সত্যতা যাচাইকরন হয়ে থাকে। এই তথ্য কারচুপি ও তৈরি কাগজপত্র ব্যবহারের কথা ন্যাকের ও অজানা নয়। সেইজন্য  এই পদ্ধতিকে কঠোর থেকে কঠোরতর করা হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন মিটিং এর ছবিতে জিও ট্যাগের ব্যবহারের কথা ও বলা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির এই ধরনের অভ্যাস মূল উদ্দেশ্য থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। শিক্ষার পরিবেশ জটিল ও ছাত্রবান্ধব হতে ব্যর্থ হচ্ছে। তবে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে একসারিতে বসানো কক্ষনো সৎ বিচার বলে পরিগনিত হবে না।

তথ্যসূত্র: ইউ জি সি, ন্যাক, বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য ওয়েবসাইট; শিক্ষকবন্ধু, সহকর্মী ও বিভিন্ন গ্রুপ।

আরও পড়ুন 

Comments

Popular posts from this blog

মেদিনীপুরের বিজ্ঞানীদের কথা

মেদিনীপুরের চোখের মণি বিজ্ঞানী মণিলাল ভৌমিক /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের রসায়ন বিজ্ঞানী ড. নন্দগোপাল সাহু : সাধারণ থেকে অসাধারণে উত্তরণের রোমহর্ষক কাহিনী /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

মেদিনীপুরের পদার্থবিজ্ঞানী সূর্যেন্দুবিকাশ কর মহাপাত্র এবং তাঁর 'মাসস্পেকট্রোগ্রাফ' যন্ত্র /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ঋত্বিক ত্রিপাঠী / আত্মহত্যার সপক্ষে

আসুন স্বীকার করি: আমরাই খুনী, আমরাই ধর্ষক /ঋত্বিক ত্রিপাঠী

শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজই আদর্শ সমাজ 'কালের যাত্রা' নাটকের শেষ কথা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল

অংশুমান কর

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল