জ্বলদর্চি

বাংলার মিষ্টি: দুর্গাপূজার মধুর উত্তরাধিকার/অভিজিৎ সেন


বাংলার মিষ্টি: দুর্গাপূজার মধুর উত্তরাধিকার

অভিজিৎ সেন

বাংলার মাটিতে গুড়ের গন্ধ যেন ইতিহাসের সুরভি। প্রাচীন নাম গৌড় বঙ্গ—যেখানে “গুড়” শব্দটি নিজেই মিষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই দুর্গাপূজার সময়ে মিষ্টি কেবল খাদ্য নয়, এটি হয়ে ওঠে স্মৃতি, শিল্প, আর উত্তরাধিকার। বাংলার মিষ্টির ইতিহাস আসলে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার প্রতিচ্ছবি।
ভোগের মিষ্টি ও প্রাচীন ধারা
দেবীর ভোগে ছানা ছিল নিষিদ্ধ। তাই গৃহস্থালি রান্নাঘরে নারীরা চাল, ডাল, নারকেল আর গুড় দিয়ে বানাতেন পায়েশ, নারকেল নাড়ু, পাটিসাপটা, মালপোয়া, চন্দ্রপুলি, বাতাসা, কোদমা, মণ্ডা। এই মিষ্টিগুলো দেবীর পায়ের কাছে অর্পিত হতো, যেন উৎসবের পবিত্রতা মধুরতায় ভরে ওঠে।
এই ভোগের মিষ্টি ছিল সহজ, কিন্তু তার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল আচার-অনুষ্ঠানের গভীরতা। নারকেলের শুভ্রতা, গুড়ের গাঢ় মাধুর্য, আর চালের স্নিগ্ধতা—সব মিলিয়ে দুর্গাপূজার ভোগ হয়ে উঠত দেবীর প্রতি ভক্তির প্রতীক।
মিষ্টি দইয়ের ঐতিহ্য ছানা আসার আগেই বাংলার ঘরে ঘরে জন্ম নিয়েছিল আরেকটি দুধজাত মিষ্টি—মিষ্টি দই। এটি ছিল দুধের পবিত্র রূপান্তর, যেখানে দুধকে টক করে ফাটানো নয়, বরং প্রাকৃতিক গাঁজনের মাধ্যমে মিষ্টি দই তৈরি হতো।
🍂

চৈতন্যচরিতামৃত-এ উল্লেখ আছে, ভক্তদের আপ্যায়নে পরিবেশিত হতো মিষ্টি দই, ক্ষীর, আম, আর প্রাচীন মিষ্টি। তাই মিষ্টি দই হয়ে উঠেছিল উৎসবের সেতুবন্ধন—ভোগের পবিত্রতা আর সামাজিক ভোজনের আনন্দকে একত্রিত করেছিল।
ঔপনিবেশিক যুগের ছানার বিপ্লব পর্তুগিজরা দুধ ফাটিয়ে ছানা তৈরির কৌশল নিয়ে আসে। আর ব্রিটিশ আমলে কলকাতার নবধনী সমাজের পৃষ্ঠপোষকতায় জন্ম নেয় ছানাভিত্তিক মিষ্টির নতুন যুগ।
ভীমচন্দ্র নাগ (১৮২৬) তৈরি করেন কিংবদন্তি লেডিকেনি ও অশুভোগ সন্দেশ। সূর্যকুমার মোদকের জলভরা সন্দেশ—যার ভেতরে গোলাপসিরা বা নলেন গুড়ের তরল।  কৃষ্ণনগরের আধারচন্দ্র দাস (১৯০২) বিখ্যাত হন সরপুরিয়া ও সরভাজা দিয়ে। সন্দেশে শঙ্খ, পদ্ম, মাছ, হাতির নকশা খোদাই করে মোইরারা মিষ্টিকে শিল্পে রূপান্তরিত করেন।
কারিগরি নিখুঁততা: ছানা মাখানো ও পাক
ছানা মাখানো ছিল এক শিল্প। মোইরার হাতের তালুর নিচে ছানা ধীরে ধীরে মেঘের মতো কোমল হয়ে উঠত। কম মাখালে মিষ্টি ফেটে যেত, আর সঠিক মাখানো ছানায় আসত চকচকে মসৃণতা।
তারপর আসত পাক—তাপে ছানার রূপান্তর। হালকা রান্নায় জন্ম নিত কাঁচাগোলা, আর দীর্ঘ সময় শুকিয়ে তৈরি হতো শক্ত সন্দেশ, যা ছাঁচে চাপা দিয়ে শিল্পকর্মে পরিণত করা যেত। এই যুগে জন্ম নেয় কিংবদন্তি রসগোল্লা। নোবিনচন্দ্র দাসের আবিষ্কার হিসেবে খ্যাত হলেও, ফুলি গ্রামের হরাধন মোইরার নামও ইতিহাসে উজ্জ্বল। দুর্গাপূজার সামাজিক ভোজনকে রসগোল্লা নতুন মাত্রা দেয়।

স্বাধীনতার পর আধুনিক রূপ স্বাধীনতার পর বাঙালির রুচি বদলাতে শুরু করে। অতিরিক্ত মিষ্টি নয়, চাই হালকা ও স্বাস্থ্যসচেতন খাবার।
বালারাম মল্লিক ও রাধারমণ মল্লিক, কে.সি. দাস প্রমুখ দোকান যান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও আধুনিক ফ্রিজ ব্যবহার করে মান বজায় রাখেন। জন্ম নেয় বেকড সন্দেশ, সুগার-ফ্রি মিষ্টি, আর চকলেট, স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, ম্যাচার মতো আধুনিক স্বাদ।
তবে শীতকালে নলেন গুরের সন্দেশ আজও অমলিন। ২০২৫ সালে এটি পেয়েছে ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) স্বীকৃতি। দুর্গাপূজার সময়ে এই মিষ্টি হয়ে ওঠে বাঙালির আবেগের প্রতীক।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
মিষ্টি বাংলার সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জন্মদিন, বিবাহ, অন্নপ্রাশন, দুর্গাপূজা—সব উৎসবেই মিষ্টি অপরিহার্য। মিষ্টি শুধু খাদ্য নয়, এটি আনন্দের প্রতীক, সম্পর্কের বন্ধন, আর সংস্কৃতির ধারক।
বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা বিনিময়ে মিষ্টি উপহার দেওয়া মানে সম্পর্ককে আরও মধুর করে তোলা।
উপসংহার
দুর্গাপূজার মিষ্টি তাই কেবল জিভের আনন্দ নয়। এটি বাংলার ইতিহাস, শিল্প, আর সংস্কৃতির মধুর উত্তরাধিকার। গুড়-নারকেল থেকে মিষ্টি দই, ছানা, আর আধুনিক স্বাদের অভিযাত্রা—সবই মিলিয়ে দুর্গাপূজার মিষ্টি হয়ে উঠেছে উৎসবের প্রাণ, স্মৃতির আলো, আর বাংলার চিরন্তন মাধুর্য।

Post a Comment

0 Comments