মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায়
“ফিলিং লাভ্ড”, “ ফিলিং স্যাড”, সোশ্যাল মিডিয়ায় চটজলদি মনের ভাব প্রকাশের জন্য সাথে একটা অনু কবিতা বা কোন কবিতার চারটি লাইন বা কখনো পুরো কবিতা জুড়ে দেওয়াই দস্তুর। ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড লিস্টের পরিধি সামান্য বড় হলেই কেল্লাফতে—মুহূর্তে লাইক আর কমেন্টের বন্যা। আবার ধরা যাক আপনি একটু আধটু কবিতা লেখেন। ভালোই লেখেন। সেই কবিতা আপনার সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে পোস্ট করলেন আর সাথে জুড়ে দিলেন কবিতার থিম অনুযায়ী একটি গান বা যন্ত্রানুসঙ্গ। এবং অতি অবশ্যই যথোচিত একটি ছবি বা ব্যাকগ্রাউণ্ড। কবিতা ভাইরাল।
আজকের এই ডিজিটাল যুগে কবিতা পড়া ও কবিতার বই বিক্রির হওয়ার মধ্যে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। সময়ের এই নতুন অধ্যায়ে ছাপার অক্ষরে পড়েছে ধুলোর আস্তরণ কিন্তু স্ক্রোলে বইছে লাইকের বন্যা। কলকাতা বইমেলায় রেকর্ড সংখ্যক ভিড়, বিপুল অঙ্কের বিক্রি অথচ বইমেলার স্টলগুলো ঘুরে দেখলে দেখা যায় কবিতার বই বিক্রির সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। এই ট্রেন্ডের মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী লিটল ম্যাগাজিন আর কবিতার বইয়ের অবক্ষয়ের এক সমাজ-সাংস্কৃতিক ছবি।
এখন প্রশ্ন হলো কবিতা পড়ছে কারা। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল অথচ বইয়ের দোকানে, বইমেলায় কবিতার বই বিক্রির সংখ্যা এত কম কেন! প্রকাশকদের বেশিরভাগই মনে করেন, কবিতার বই মূলত কবিরাই পড়েন। অর্থাৎ এটি একটি পূর্ণ, সয়ংসম্পূর্ণ বৃত্ত। যে বইগুলি বিক্রি হয়, তা মূলত উপহার হিসেবে দেওয়ার কারণে। কবি নিজেও বেশ কিছু তাঁর সংগ্রহে রাখেন নিজের লেখা পড়ানোর তাগিদে। এ ছাড়া, চেনা মানুষের, আত্মীয় স্বজনের কবিতার বই, না কিনে উপায়? এটুকুতেই সীমাবদ্ধ কবিতার বইয়ের মুদ্রিত সংস্করণ। প্রকাশকও কবিতার বই, ব্যবসার কথা মাথায় রেখে, সেভাবে ছাপানোর প্রবল উৎসাহ স্বভাবতই দেখান না।
🍂
কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় বিপুল জনতার ভিড়ে যখন কয়েক কোটি টাকার বই বিক্রি হচ্ছে, কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়াল যখন প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ লাইক-শেয়ারের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে চার লাইনের কোনো কবিতায়, তখন প্রকাশকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। এই অদ্ভুত বৈপরীত্যই আজকের সাহিত্যের বাস্তবরূপ। কবিতা , যা ছিল লাইব্রেরির কোণে নিবিষ্ট চিত্তে পড়ার বা কাগজের পাতায় অক্ষরে ভরা এক তীব্র আবেগ, আজ তা ডানা মেলেছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। কিন্তু এই রূপান্তর সাহিত্যের জন্য কতটা আশীর্বাদ আর ব্যবসার জন্যই বা কতটা চ্যালেঞ্জের ? একটু গভীরে গিয়ে দেখা যাক।
শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও এ কথা সত্যি যে কবিতাও এখন 'স্ন্যাক্স' মডেলের। আমাদের ক্রমহ্রাসমান ধৈর্যের পরিমাপ, এর জন্য কিছুটা দায়ী। আজকের দ্রুতগতির জীবনে মানুষের মনোযোগ দেওয়ার সময় কমে এসেছে। তারই প্রতিফলন ঘটেছে আমাদের সাহিত্যচর্চায়। বই পড়ার অভ্যাস যেখানে চিন্তাজনক ভাবে হ্রাস পেয়েছে, সেখানে সময় নিয়ে কবিতা পড়ার রেওয়াজ আজ দুর্দিনের সম্মুখিন। হাতের মুঠোয় যখন গোটা পৃথিবী বন্দি , তখন কবিতাই বা বাদ যায় কেন! সোশ্যাল মিডিয়ার ফিড স্ক্রোল করতে করতে একজন পাঠক বিরহ, বেদনা বা প্রেমের চার লাইনের একটি কবিতা দেখে মুহূর্তের মধ্যেই কবিতার রস আস্বাদন করে ফেলছেন। এই চটজলদি অভিজ্ঞতা আধুনিক পাঠকদের কবিতা পড়ার জন্য টাকা খরচ করে বই কেনার থেকে বিরত রাখছে। ফলস্বরূপ, বইয়ের দোকানে উন্নত গুণমানের কবিতার বইয়ের তাকগুলোতে ধুলো জমছে অথচ নিম্নমানের কবিতাও ইন্টারনেটে ভাইরাল।
কবিতা এখন আবার নিজের ব্যক্তিত্ব প্রকাশের হাতিয়ার বা সোশ্যাল কারেন্সিও বলা যায়। কবিতা এখন শুধু পড়ার বিষয় নয়, এটি দেখারও বিষয়, যাকে বলে ভিস্যুয়াল মিডিয়াম। আধুনিক স্বঘোষিত কবিরা তাঁদের কবিতাগুলো সুন্দর ব্যাকগ্রাউন্ড, নান্দনিক টাইপোগ্রাফি বা ছোট ছোট স্কেচের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। মানুষ এখন মন খারাপ বা আনন্দের অনুভূতি প্রকাশ করতে বইয়ের পাতা উল্টায় না, বরং একটি কবিতার স্ক্রিনশট নিয়ে নিজের স্ট্যাটাসে বা স্টোরিতে পোস্ট করে। কাগজের বই ঘরে নিভৃত কোণে একা বসে পড়া যায় মাত্র, কিন্তু অনলাইনের কবিতা শেয়ার করে নিজের 'ডিজিটাল আইডেন্টিটি' বা রুচিশীল ব্যক্তিত্ব সবার সামনে সহজেই তুলে ধরা যায়। সবেতেই নিজেকে জাহির করার যুগে, এই ‘শেয়ার’ করার সুবিধার কাছে প্রথাগত বই বিক্রি ধাক্কা খাচ্ছে।
বইমেলার চকমকানি ও লিটল ম্যাগাজিনের নীরব লড়াইও কিন্তু উপেক্ষণীয় নয় । কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় অসংখ্য মানুষের ভিড় চিরকালীন। তার সাথে রয়েছে কোটি কোটি টাকার বই বিক্রি। কিন্তু এই বিশাল বাণিজ্যিক সাফল্যের আড়ালে কবিতার বই এর ছবিটা বেশ করুণ। মেলায় ঘুরতে যাওয়া পাঠক থ্রিলার, সায়েন্স ফিকশন বা অনুবাদ সাহিত্য কিনতে যতটা উৎসাহ দেখান, কবিতার বই এর স্টলে সেই ভিড় দেখা যায় কি? উত্তর টা অবশ্যই ‘না’। একসময় লিটল ম্যাগাজিন ছিল নতুন ও নিরীক্ষাধর্মী কবিতার মূল কেন্দ্রস্থল। আজ সোশ্যাল মিডিয়া নিজেই একটা বড় ওপেন প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠায়, অনেক তরুণ কবি এখন আর লিটল ম্যাগাজিনে লেখা পাঠানোর তাগিদ অনুভব করেন না। কোনো ‘গেটকিপার’ ছাড়াই, নিম্ন মানের অপরিশোধিত কবিতাও আজ সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে তাদের ফলোয়ারদের ডিজিটাল পাতায়। ফলে এই ঐতিহ্যবাহী মাধ্যমটিও আজ দুরাবস্থার শিকার। পাঠক এবং লেখক, উভয়ই সংকটে ভুগছেন।
তাই কাব্যগ্রন্থ বিক্রির বাজারের ছবিটা বেশ মলিন। সেখানে সাহিত্যের মানের চেয়ে অনেক সময় ডিজিটাল জনপ্রিয়তার ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। বলা যেতে পারে অ্যালগরিদমের কবি ও প্রকাশনা জগতের এক নতুন সমীকরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রকাশনা সংস্থাগুলোর অনেকেই শুধু লেখার গভীরতা দেখে বই ছাপছেন না। তারা দেখছেন অনলাইনে ওই লেখকের ফলোয়ার সংখ্যা।যেসব 'ইনস্টা-পোয়েট' বা সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের অজস্র ফলোয়ার আছে, তাদের বই বাজারে আসার সাথে সাথেই বেস্টসেলার। অন্যদিকে, তুলনায় উঁচু মানের কবি সাহিত্যিক সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের প্রচার করতে না পারার দরুণ তাদের বই, প্রকাশকরা স্বভাবতই সহজে ছাপতে চান না। ফলে অনেক গুণী কবিরা মূলধারার বইয়ের দোকান থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছেন।
কবিতার এই মলিন দশা দেখে যদি মনে করা হয় কবিতা এখন ব্রাত্য, তবে তা পুরো সত্য নয়। মানুষ কবিতা পড়েন। কবিতা শুধু তার চেনা খোলসটি বদলে ফেলেছে। কবিতার এই ডিজিটাল রূপান্তর কবিতাকে নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষের আরও কাছে পৌঁছে দিয়েছে। না চাইতেই হাতের মুঠোয় উঠে আসছে মুঠো মুঠো কবিতা। কবিতা বিমুখ মানুষও কবিতা নেড়েচেড়ে দেখছেন। কিন্তু ওদিকে আবার কাগজের বইয়ের ঐতিহ্য, লিটল ম্যাগাজিন এবং প্রকাশনা ব্যবসা পড়ছে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে কবিতা হয়তো স্ক্রিনেই বন্দী থাকবে, তবে কাগজের বই এর গন্ধের যে চিরন্তন আবেদন—তা কি সত্যিই কোনোদিন ডিজিটাল অ্যালগরিদম ছুঁতে পারবে? প্রশ্ন টা সহজ কিন্তু উত্তর ও তো জানা।
0 Comments