বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১৪৫
আপাং
ভাস্করব্রত পতি
আপাং গাছের শিকড় হাতে বা কোমরে ধারণ করলে নাকি অনেক উপকার হয়। বিভিন্ন জ্যোতিষি এবং গ্রামীণ টোটকাতে তা ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। বিয়ে বা সম্পর্কের বাধা দূর করতে ডান হাতে আপাং গাছের শিকড় বাঁধার রেওয়াজ আছে। এরফলে নাকি বারবার বিয়ে ভেঙে যাওয়া আটকে যাবে। পড়াশোনায় অমনোযোগী শিশুর ক্ষেত্রেও এর শিকড় বাঁধার পরামর্শ দেন মুরুব্বিরা। কুদৃষ্টি থেকে রক্ষাতেও নাকি এই শিকড় খুবই কার্যকরী। এগুলির কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সম্পূর্ণ অন্ধবিশ্বাস এবং কুসংস্কার। তবে আপাং গাছ একটি অন্যতম ভেষজ উদ্ভিদ। এর পাতা, শিকড় এবং ডাল আয়ুর্বেদ অনুসারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রামবাংলার অতি পরিচিত আপাংকে সংস্কৃতে অপামার্গ (अपामार्ग) বলা হয়। এছাড়াও হিন্দিতে চিড়চিড়ে, চিরাচিটা, লটজিরা, কন্নড়ে উত্তরণে, চিচিরা, ফারসিতে খারবাস-গোতা, অসমীয়াতে অৎকম, মারাঠীতে অষদ, আঘাড়া, ওড়িয়াতে অঘেজে, পাঞ্জাবিতে কুদ্রি, তেলুগুতে অপ খারেরাজ্জম, তামিলে যুবিভট এবং ইংরেজিতে Prickly Chaff Flower, Devil's Horsewhip, Chaff Flower বলে। এছাড়াও আপাং পরিচিত অপাঙ্গ, অপাং, আপাদ, ময়ূরক, খরমঞ্জরী, শিখরী, কীশপণী, কাণ্ডীরক, মর্কটী, প্রত্যপুষ্পী, কিনিহী, পত্তিকণ্টক, ক্ষরক, ধামার্গব, কটুমঞ্জরিকা, কন্ঠী, পাণ্ডুকন্টক, কুব্জ, অবশলয়, পরাক্পুষ্পী নামেও। Amarantaceae পরিবারের আপাং গাছের বিজ্ঞানসম্মত নাম Achyranthes aspera।
আপাং গাছের ফুলে ফড়িংয়ের দোল খাওয়া
ভারতের উষ্ণ এবং নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে এদের দেখা মেলে। এটি বর্ষজীবী এবং ২-৩ ফুট উঁচু। সোজা হয়ে জন্মায়। ডালপালা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ডিম্বাকার এবং গোলাকার পাতাগুলি বিপরীত দিকে বিন্যস্ত থাকে। যা ৪-৫ ইঞ্চি লম্বা এবং ২-৩ ইঞ্চি পর্যন্ত চওড়া হয়। গাছের অগ্রভাগ থেকে যে শীষ বা পুষ্পদণ্ড তাতে সবুজাভ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য ফোটে। এদের Spike পুষ্পবিন্যাস পরিলক্ষিত হয়। ফুলগুলি আকাশের দিকে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে থাকে। আর যখন বীজে পরিণত হয়, তখন বীজগুলি নিম্নাভিমুখী হয়ে পুষ্পদণ্ডের গায়ে জড়িয়ে থাকে। মূলত জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় মাসে এই গাছ জন্মায়। আশ্বিন থেকে ফুল ফোটে। তারপর বীজ হয়। পরে তা পেকে শুকিয়ে পড়ে যায়। যদিও সারা বছর ধরেই এই গাছের দেখা মেলে রাস্তার পাশে বুনো গাছের জঙ্গলে। এদের বীজগুলি শক্ত ও ছোট ছোট কাঁটাযুক্ত। চোরকাঁটার মতো বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। মানুষের গায়ে বা পোষাক পরিচ্ছদে লেগে গেলে সহজে ছাড়তে চায় না। এভাবেই একস্থান থেকে অন্যস্থানে বিচরণ করে এবং বংশবিস্তার করে।
আপাংয়ের ফুল
অন্যতম ক্রিমিনাশক ভেষজ হল এই অপামার্গ বা আপাং। এর বীজ মস্তিষ্কের শঙ্খক রোগের নিরাময় করে। আপাং গাছ তিন প্রকারের হয়। শ্বেত, রক্ত ও কৃষ্ণবর্ণ। তিনটিই উপকারী। অথর্ববেদে রয়েছে, "অগ্রমেষ্যোষধীনাং জ্যোতিষেবাভি দীপয়ন। / উত তোসি পাকস্যাথো হন্তাসি রক্ষসঃ।।"।।"
অর্থাৎ, ওহে অপামার্গ! তুমি ওষধি। সূর্য যেভাবে জ্যোতির দ্বারা দীপ্ত করে, তুমিও পাকের দ্বারা আমাশয়জাত পুরীষজাত ক্রিমিকে দূর ক'রে অগ্নিকে দীপ্ত কর।
বর্তমান সময়ের এনকেফালাইটিস্ রোগ প্রাচীনকালে পরিচিত ছিল শঙ্খক রোগ নামে। এই রোগটির বিশেষত্ব হ'লো- আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে যে মেনিনজাস্ রয়েছে এবং তারও মধ্যে যে ঘিলু (Brain) আছে, তা বিসর্পিত করা। চরকসংহিতাতে স্পষ্ট করে এই শঙ্খক রোগের কথা লেখা রয়েছে -- "স শিরো বিষবদদ্বেগী নিরুধ্যাশ্ গলং তথা। / ত্রিরাত্রাং জীবিতং হন্তি শঙ্খকো নাম নামতঃ।" অর্থাৎ প্রচণ্ড বিষের বেগের মত গতিশীল হ'য়ে পুরো মস্তিষ্ককে ব্যথায় এবং যন্ত্রণায় ভারাক্রান্ত ক'রে মৃত্যুর মুখে ফেলে। এটিই হল শঙ্খক রোগ। যার মূল কারণ ক্রিমি। গা বমি বমি ভাব, অর্শ, শরীরে মেদ জমতে থাকলে, খোস পাঁচড়া, চুলকানি, শিরাবাত, বুক ধড়ফড়ানি, রাক্ষুসে খিদে নিরাময়ে এই গাছটির ব্যবহার বহুল প্রচলিত।
0 Comments