উপস্থাপনার সাতকাহন -৬

উপস্থাপনার সাতকাহন

ষষ্ঠ পর্ব  

"কথা"....কথা বলে...

উপস্থাপন, ইংরেজি ভাষায় প্রেজেন্টেশন। নেমন্তন্ন বাড়ি যাবার সময় প্যাকেটে মুড়ে ছোটবেলা থেকে নিয়ে যাই। বড়বেলায় ভালো-মন্দ রান্নাবান্নায় ভালো থালার ব্যবস্থা। বয়স কালে কুটুম জন এলে সোফার ঢাকা, কুশন কভারের যত্ন..... এসবই প্রেজেন্টেশন।আর দরকারে যখন নিজেকে হাজির করতে হয় মানুষজনের সামনে, তখন একটু চুল ঠিক করা, শাড়ির কুচিতে আলতো চাপ... হ্যাঁ সবটাই প্রিপারেশন অফ প্রেজেন্টেশন। আলাদা করে এসব নিয়ে ভাবার দরকার পড়ে না। কিন্তু অনুষ্ঠান উপস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রিপারেশন পথটাকে আমল না দিলে সমূহ বিপদ।কন্ঠ চর্চার পাশাপাশি ভাষার ঠিকঠাক ব্যবহার আর চলমান পৃথিবীর প্রতিদিনের ঘটনাগুলো মাথার কোষে কোষে খেলা না করলে কাজকম্মো ঠিকমতো উত্তর দেওয়া কঠিন। মনে রাখতে হবেই, শব্দ ব্রহ্ম! আর উপস্থাপন সেই ব্রহ্মের উপাসনা। শব্দের উচ্চারণ, শব্দের ভারকে পৌঁছে দেয় তার কেন্দ্রে। এমনিতেই বাংলা ভাষায় বর্ণমালার চমৎকার বাঁধন। সেই বর্ণ বাক্য হয়ে আবেগগুলোর ঝুঁটি ধরে খেলা করে। ওই খেলাগুলোকে কণ্ঠস্বরের স্তরে স্তরে ফুটিয়ে তুলতে না পারলে চলবে কেন!
জীবনটা তো চেনা খাতে নাড়া বাঁধা থাকে না ।  তাই আবেগ তার সব আবেদন নিয়ে টুপ করে হাতের চেটোতে এলেই তাকে তালুবন্দি করার কাজ উপস্থাপকের। নাটকীয়তা, কণ্ঠ সম্পদ সবকিছুই একসঙ্গে কাজে লেগে যায়। দূর-দূরান্তের অচেনা মানুষটি কখন যে পরমাত্মীয় ভেবে ফেলে একটা ''কণ্ঠ''কে , কেউ বুঝতেই পারে না। ছোট্ট ছোট্ট অব্যয়.... অব্যর্থ ওষুধের মত সারিয়ে দেয় কত অচেনা দুঃখ। আর সেটা সম্ভব হয় বিশ্বসাহিত্যের বলয় ধরে হাঁটতে হাঁটতে নিজস্ব জীবন দর্শনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে। একটি বিষয় নিয়ে কথা বলার আগে বিষয়সংক্রান্ত আদ্যন্ত পড়াশোনা। তারপর বাক্য আর অনুভবের পরিমিতি। এই প্রসঙ্গে বারবার কানে বাজে, রত্না মিত্রদি, বিজয়লক্ষ্মী বর্মনদির কণ্ঠস্বর। আবার,
কটি তো মাত্র কথা, কিন্তু, কি দুরন্ত গতিতে বাঙালির আবেগে দাপিয়ে বেড়াতে পারে, এক যুগ ধরে...তা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন  পুষ্পেন সরকার , কমল ভট্টাচার্য , অজয় বসুরা।
ধারাবিবরণী বা রানিং কমেন্ট্রি। খেলার বর্ণনার পাশে পাশে মাঠের পরিবেশের প্রত্যক্ষ বিবরণ। শ্রোতার কাছে পুরো বিষয়টিকে জীবন্ত করে তোলা।
ব্রিটিশ ধারাভাষ্যকার  ফিল ব্লাকার জানাচ্ছেন, "অনেক রিসার্চের কাজ করতে হয় ধারাভাষ্যকারকে। প্রতিটি ম্যাচের আগেই কয়েকঘন্টার মানসিক প্রস্তুতি চলে। ইউরোপের কোন দলের খেলার সময় অসুবিধা হয় ওদের খেলোয়াড়দের নাম আগে থেকে জানা না থাকলে। এই কাজগুলো ম্যাচ শুরুর আগেই করে নিতে হয়। তাদের নাম ,বয়স ,কতো বার খেলেছে ইত্যাদি।  এরপর খুঁজতে হয় এমন সব তথ্য যা শ্রোতার কাছে ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠবে।" রেডিও ধারাভাষ্য শব্দ দিয়ে ছবি আঁকে।এমন অনেক সময় হয়, যখন কিছুই তেমন ঘটছে না, তবু কথা দিয়ে ভরাট রাখতে হয় সময়। আর এই কাজে বস্তুনিষ্ঠ হয়ে সত্যের  মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখা ধারাভাষ্যকারের প্রাথমিক কর্তব্য।
খেলার বাইরের ধারাবিবরণী একেবারেই রেডিওর নিজস্ব সম্পদ। বিশ্বকবির মৃত্যুর পর তাঁর শবদেহ নিয়ে যে জনস্রোত কলকাতা শহর প্রত্যক্ষ করেছিল, তার ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন আকাশবাণীর পক্ষ থেকে শ্রীবীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। আর ওই ধারাবিবরণী চলাকালীন স্টুডিও থেকে "রবিহারা" তাৎক্ষণিক রচিত কবিতাটি পাঠ করেছিলেন স্বয়ং কাজী নজরুল।
স্পোর্টস ইভেন্টের বাইরে আজও ধারাবিবরণীর প্রয়োজনকে অস্বীকার করার কোন জায়গা নেই। দিল্লির জনপথ থেকে প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজ, স্বাধীনতা দিবসে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ধারাবিবরণী এখনো গমগম করে রেডিওতে। সোশ্যাল মিডিয়ার হইচইয়ের বাইরে সেই উপস্থাপনের মেদুর গাম্ভীর্য এখনো সমানভাবে টানে জনমানস। আর সেই জন্যেই অষ্টমীর সকালে বেলুড় মঠের কুমারী পূজা কিংবা দশমীর গঙ্গার ঘাট থেকে উপস্থাপকের গলার আওয়াজ এখনো বছর বছর অন্য ঢেউ তোলে। হাজার একটা দৃশ্য মাধ্যমকে কাঁচকলা দেখিয়ে দূর-দূরান্তের ঢাক একসঙ্গে বাজে টাকি থেকে টরেন্টো।

অনুষ্ঠান উপস্থাপনার ক্ষেত্রে কথার সঙ্গে সঙ্গে গানের ভূমিকাকে সরিয়ে রাখার কোন প্রশ্নই ওঠে না। শ্রুতি মাধ্যমে শুধু কথা শোনার ধৈর্য বড়জোর তিন মিনিট স্থায়ী! কাজেই সবসময়ই অনুষ্ঠানের গতি এবং বিষয় অনুযায়ী গান নির্বাচন। অনুরোধের আসর এর ক্ষেত্রে শ্রোতাদের ফরমায়েশি গানে উপস্থাপকের বোধের তেমন পরিচয় দেবার সুযোগ থাকে না। কিন্তু টকশোতে বিষয়-কথার আশপাশ দিয়েই হেঁটে যায় সুর। গান নির্বাচন,কথার সঙ্গে কতটা বিষয়ানুগ সময়ানুগ তা নির্ভর করে উপস্থাপকের ব্যক্তিগত মেধার ওপর। চড় চড়ে রোদ্দুরের সকাল দশটায় "বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ" গানটি বিসদৃশ। আবার ভোরবেলায় অনুষ্ঠান শুরুর মুখে "মহাসিন্ধুর ওপার হতে" কিংবা  "তৃষিত এ মরু" ...র মত গান যে বিশেষ চেতনাকে ইঙ্গিত করছে তা খেয়াল রাখার দায়িত্ব উপস্থাপকের ই।
কাজেই, সঠিক বাক্য প্রয়োগ, সুরের চমৎকার চলন আর
সর্বোপরি উপস্থাপকের নিজস্ব শৈল্পিক বোধের ত্র্যহস্পর্শে ই...."কথা", কথা বলে.... সেকালে এবং একালে।

Comments

  1. কথা চলে, কথা শুশ্রূষা করে।

    ReplyDelete

Post a Comment

Trending Posts

মেদিনীপুরের কৃষিবিজ্ঞানী ড. রামচন্দ্র মণ্ডল স্যারের বর্ণময় জীবনের উত্থান-পতনের রোমহর্ষক কাহিনী /উপপর্ব — ০১ /পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১১

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

শিবচতুর্দশী /ভাস্করব্রত পতি

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

জঙ্গলমহলের 'জান কহনি' বা ধাঁধা /সূর্যকান্ত মাহাতো