জ্বলদর্চি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১৯৩


ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১৯৩
চিত্রগ্রাহক - ঋপণ আর্য

সম্পাদকীয়,
ছোটবন্ধুরা, আজ খেলার গল্প বলব। কারণ বসন্ত এসে গেছে। কী খেলা? হোলি খেলার ছবি পাঠিয়েছে ঋপণ আঙ্কেল। রঙ দিয়ে কেবল দোল খেলা হয় তা কিন্তু নয়। রঙ দিয়ে সাদা পাতায় আঁকায় মেতে উঠেছিল অণুরণন আর পার্থ তার বন্ধুকে নিয়ে ছড়া লিখে পাঠিয়েছে। ছোটদের ছবি ছড়া দিয়ে আজকের ছোটোবেলা খেলায় মেতে উঠলেও। রতনতনু জ্যেঠু ক্রিকেট খেলার গল্প বলতে বলতে দোলের ছড়াও লিখলেন তোমাদের আনন্দ দিতে। প্রতাপ আঙ্কেলও বসন্তের ছড়া পাঠিয়েছেন। দোলনচাঁপা আন্টির চিঠি তোমাদের আরো আরো আঁকতে আর লিখতে উৎসাহ দেবেই। এসো তবে দোল খেলা শেষে ছড়া পড়া খেলা শুরু করি। কারণ বসন্ত এসে গেছে। -- মৌসুমী ঘোষ।

দোলের মাস
রতনতনু ঘাটী

সকালেরও আগে তখনও সকাল হতে বাকি 
প্রজাপতি ফুলে ডানা মেলবার ফাঁকে
দোয়েলকে ডাকে, ‘ও দোয়েলদাদা শোনো, 
রঙ মাখাব তো আজকেই এ কথা জানতে নাকি?’
দোয়েল বলল, ‘ও হো হো, আজই তো দোলের মাস! 
কখন ভুলেছি আজ হবে রঙগোলি
মনেই যখন করিয়ে দিলি রে তুই 
হাত ধরে গাঁদাকেও দোপাটির বাড়ি নিয়ে যাস!’
মাসতুতো বোন ছুটকির রাগে হবে মুখ ভার!
দোল খেলবে সে বলেছে তো আগেভাগে 
মউমাছি পিসি এখনো ঘুমিয়ে কেন?
গুনে ফ্যাল দিকি সেজেগুজে সঙ্গে কে যাবে আর?
জামাটামা পরে রেডি ওরা ফুল-পাখি-প্রজাপতি!
আজ ইশকুলে ছুটি আছে সকলের
বাবাও বলেনি অঙ্ক-খাতাটা আন--
রঙ খেলবার মানা নেই, কিচ্ছুটি নেই ক্ষতি!

অনুরণন মুখার্জী
নবম শ্রেণি, নোনাচন্দনপুকুর উমাশশী হাই স্কুল, উত্তর ২৪ পরগণা

বসন্ত এসে গেছে
প্রতাপ সিংহ 

১ 
বসন্ত এসে গেছে 
বোলপুরে যাচ্ছি, 
পায়ে-চলা পথটায়
লাল রং পাচ্ছি। 

বসন্ত এসে গেছে
সুবাসিত হাওয়া,
এ সময় ভালো লাগে 
লঘু গান গাওয়া।

বসন্ত এসে গেছে 
চারদিকে রং,
পার্কে গল্প করি 
এখন বরং।

বসন্ত এসে গেছে 
ফুরফুরে মন তাই, 
উল্লাস ছাড়া আজ
আর কোনো কাজ নাই। 

বসন্ত এসে গেছে 
কত ফুল ফুটছে, 
মৌমাছি প্রজাপতি 
সব মধু লুটছে।

বসন্ত এসে গেছে
দিকে দিকে আলো, 
উঠেছে সুগোল চাঁদ 
ভারী জমকালো।

বসন্ত এসে গেছে  
চারপাশে ছন্দ, 
মুছে ফ্যালো বিদ্বেষ 
মুছে ফ্যালো দ্বন্দ্ব।
ধারাবাহিক উপন্যাস

গগণজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ
পর্ব ৯

রতনতনু ঘাটী

দেবোপমস্যার মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ক্রিকেটের পিচটা ভাল করে নজর করলেন। হেডস্যার আর দেবোপমস্যার মিলে প্রথম যেদিন ক্রিকেট ম্যাচের প্ল্যান করেছিলেন, তখনই স্কুলের মাঠে ক্রিকেট খেলার জন্যে একটা পিচ তৈরির কথা উঠেছিল। কথাটা তুলেছিলেন হেডস্যারই, ‘দেবোপম, ক্রিকেট শুরু করতে চাও স্কুলে, তা করে!। কিন্তু অন্য অনেক দিক দেখতে হবে তো? যেমন ধরো, একটা ক্রিকেট পিচ তৈরি করতে হবে তো?’
   উত্তরে দেবোপমস্যার বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ স্যার। ক্রিকেট ম্যাচ হবে, অথচ মাঠে একটা ক্রিকেট পিচ থাকবে না, তা তো হয় না।’
   ‘তা হলে তুমি একটা প্ল্যান করে ফ্যালো। মাঠের কোন দিকটায় পিচ তৈরি করবে? আমি বরং আমাদের বিভূতি গিরিকে বলে দিচ্ছি, ও ওর দলবল নিয়ে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করুক। বিভূতি তো আমাদের স্কুলের ওই সব কাজ করে। তুমি যে জায়গাটা পিচ তৈরি করার জন্যে সিলেক্ট করবে, সেখানে মাটি খুঁড়ে মোরাম বিছিয়ে ওরা একটা পাকাপোক্ত পিচ তৈরি করে দিক।’
   সেইমতো গগনজ্যোতি স্কুলের খেলার মাঠে একটা ক্রিকেট পিচ তৈরি হয়েছিল। এখন দেবোপমস্যার পিচে দাঁড়িয়ে আজকের ক্রিকেট কোচিং শুরু করতে চাইলেন। স্যার সিন্ধুজার হাত থেকে ব্যাটটা নিয়ে ঝোড়ো বোলিংয়ের বিপক্ষে কেমন করে পিচে ব্যাট ধরে দাঁড়াতে হয়, নিজে ব্যাট হাতে নিয়ে দেখালেন। বললেন, ‘দ্যাখো সিন্ধুজা, এইভাবে বাঁ পা-টা এগিয়ে এনে ডান পা উইকেটের সামনে একটু এগিয়ে রাখো! আর বোলার চন্দ্রেশের চোখে চোখ রেখে দাঁড়াও। কেমন? ওর দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে থাকো, যেন তুমি চন্দ্রেশকে দেখছ না, আমাদের ক্রিকেট মাঠও তোমার নজরে পড়ছে না, তুমি দর্শরদেরও দেখতে পাচ্ছ না, তুমি শুধু চন্দ্রেশের বলটাই দেখতে পাচ্ছ!’
   সিন্ধুজা স্যারের কথা বুঝতে পেরেছে, এমন ভাবে ঘাড় নাড়ল। তার পরেও দেবোপমস্যার নাছোড় গলায় বললেন, ‘তুমি মহাভারতের সেই কাহিনি পড়োনি সিন্ধুজা? শর্ত ছিল অর্জুন স্বয়ম্বর সভায় তীরন্দাজির দক্ষতা প্রমাণ করে লক্ষ্যভেদে সফল হলে তবে দ্রৌপদীকে বিয়ে করতে পারবেন। অনেক রথা-মহারথী এসে লক্ষ্যভেদে অংশ নিলেন। সকলেই দ্রুপদ রাজার কন্যার পাণিগ্রহণ করতে চান। একে-একে পরাস্ত হলেন সকলেই। যখন অর্জুনের পালা এল, অর্জুন ধনুকে তখন তীর স্থাপন কলেন। অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য অর্জুনকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী দেখতে পাচ্ছ?’ উত্তরে অর্জুন বললেন, ‘আমি কেবল মাছের চোখটাই দেখতে পাচ্ছি।’ অর্জুনের এই মনোযোগের কথা শুনে খুশি হলেন দ্রোণাচার্য। তারপর শুধু মাছের চোখের উপর স্থির দৃষ্টি রেখে, অর্জুন তাঁর তীর নিক্ষেপ করলেন এবং নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু বিদ্ধ করলেন?’
   ‘মনে পড়েছে স্যার! মহাভারতে পড়েছি।’ স্যারের কথা শেষ হতেই সিন্ধুজা সঙ্গে-সঙ্গে বলল।
   ‘তুমি অমন ভাবে চন্দ্রেশের বলের দিকেই নজর স্থির রাখো!’ এ কথা বলতে গিয়ে যেন গলার স্বর বেড়ে গেল দেবোপমস্যারের।
   এবার দেবোপমস্যার বাঁ হাত তুলে বল করার নির্দেশ দিলেন চন্দ্রেশকে। চন্দ্রেশ দৌড়ে এসে খুব জোরে প্রথম বলটা করল। সিন্ধুজা প্রথমটায় চোখ পিটপিট করছিল বটে! কিন্তু এই বলটা মনের জোরে মারবে বলেই ঠিক করে নিয়েছিল। বলটা ছাড়ল না সিন্ধুজা। ব্যাটে-বলে হয়েও গেল। বলটা ব্যাটে লেগে সোজা ছুটে চলে গেল বাউন্ডারি সীমানা টপকে। চার রান! হেডস্যারের চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘বাউন্ডারি!’
   সঙ্গে ভূগোলের ভুবনস্যারও দু’ হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘চার! চার!’ 
   গীতিকাম্যাম চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে-দিতে চিৎকার করে উঠলেন, ‘সিন্ধুজা, সিন্ধুজা, সিন্ধুজা!’
   হেডস্যার বললেন, ‘দেখলে গীতিকা, সিন্ধুজা কেমন কায়দা করে ব্যাটটা চালাল? ঠিক যেন আমাদের মেয়েদের বিশ্বকাপ টিমের দুরন্ত ব্যাটার রিচা ঘোষের মতো। এক্ষুনি আমার তো মনে হল, আমাদের গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠে এই মুহূর্তে ব্যাটিং করতে নেমে এসেছে রিচা ঘোষ!’
   পাশ থেকে অনুলেখ্যম্যাম বলে উঠলেন, ‘একদম ঠিক কথা বলেছেন স্যার! জিও, সিন্ধুজা জিও!’
   পরের বলটা করার জন্যে তৈরি হয়ে দৌড় শুরু করল ফের চন্দ্রেশ সূত্রধর। পাশের চেয়ার থেকে জীবনবিজ্ঞানের মনোজেশস্যার চিৎকার করে উঠলেন, ‘জোরে বল করো চন্দ্রেশ! আরও জোরে!’
   মাঠের ওধারে দর্শকদের দিক থেকে চিৎকার উঠল, ‘ছক্কা চাই! সিন্ধুজা ছয় মারো! এই বলটায় তোমাকে ছক্কা হাঁকাতেই হবে!’
      সাঁ করে এবারের বলটা চন্দ্রেশের হাত থেকে ছুটে এসে সিন্ধুজাকে বোকা বানিয়ে অতর্কিতে প্রায় ঢুকে যাচ্ছিল উইকেটে। চন্দ্রেশ এমন ভাবে বলটা ডেলিভারি করল, হঠাৎ উইকেটে ঢোকার আগে ম্যাজিকের মতো বলটা যেন এক পাক ঘুরে সিন্ধুজার ব্যাটের নাগালের বাইরে দিয়ে বেরিয়ে গেল। সিন্ধুজা বলটা মারার কোনও চেষ্টাই করল না। ছেড়ে দিল বলটা। 
   পাশ থেকে দেবোপমস্যার বলে উঠলেন, এভাবে বল ছাড়লে রান উঠবে কেমন করে সিন্ধুজা? খেলায় রান তোলাই বড় কথা। উইকেটে টিকে থাকাটা কোনও কাজের কথা নয়! মেরে খেলার চেষ্টা করো সিন্ধুজা!’
   এবারে দৌড়ে দু’ রান চলে এল সিন্ধুজার পকেটে। পরের বলটা মারার জন্যে মনে-মনে সিন্ধুজা তৈরি হল। সিন্ধুজা বার কয়েক ব্যাটটা পিচে ঠোক্কর দিতে-দিতে হঠাৎ বলটা নিজের গ্রিপে পেয়ে কব্জির সব শক্তি দিয়ে বলটায় হিট করল। বলটা উড়ে গেল বাউন্ডারি সীমানার দিকে। ওখানে ফিল্ডিং করছিল ডি সেকশানের ইরাবান বিষয়ী। সে প্রাণপণে দৌড়ে গেল বলটাকে ধাওয়া করে। অত জোরে দৌড়নোর জন্যে কিনা কে জানে, বলটা ধরেও ধরতে পারল না ইরাবান। হাত ফসকে বলটা গড়িয়ে গেল বাউন্ডারির দিকে। অনেকটা রিকি পন্টিংয়ের ফিল্ডিং করার মতো নিজেকে ছুঁড়ে দিল ইরাবান। বলটা বাউন্ডারি লাইন ছুঁতে পারল না। তার আগে বল চলে এল ইরাবানের হাতের মুঠোয়। ততক্ষণে দৌড়ে তিন রান তুলে নিল সিন্ধুজা আর রকি দেববর্মা।
   রান উঠছে। মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শক চিৎকার করছে। এবার ওভারের শেষ বল করতে চন্দ্রেশ দৌড় শুরু করল। একটু স্টেপিংয়ে ভুল হয়ে গেল। যেন পায়ে পা জড়িয়ে গেল বলে মনে হল। বলটা উইকেটের দিকে ঢুকে গেল সাঁ করে। না, উইকেট কিপার অর্ক ধাড়া কোনও ভুল করল না। দ্রুত বলটা লুফে নিল। চন্দ্রেশের ওভার শেষ হল।
   হেডস্যার হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। দেবোপমস্যারকে বললেন, ‘দেবোপম, আমার একটা জরুরি কাজ আছে পঞ্চায়েত অফিসে। ভুলেই গিয়েছিলাম। আমি আসছি! তোমরা খেলা চালিয়ে যাও!’ বলেই হেডস্যার তড়িঘড়ি স্কুলের বারান্দার দিকে হাঁটতে লাগলেন। ওখানেই সব স্যারেদের সাইকেল পার্ক করা থাকে। তারপর হেডস্যার তাঁর সাইকেলটায় চড়ে বাঁইবাঁই করে পঞ্চায়েত অফিসে যাওয়ার পথ ধরলেন।
   ততক্ষণে ডি-সেকশানের অতিমান সেনকে বল করতে ডাকলেন দেবোপমস্যার। অতিমান চন্দ্রেশের হাত থেকে বল নিয়ে তৈরি হল। দেবোপমস্যার ব্যাটিং বদলে দিলেন। মনে হয়, এখন তো কোচিং চলছে! তাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যাটিং প্র্যাকটিস করাচ্ছেন স্যার।   
   এবার ব্যাট করতে ডাকলেন সি-সেকশানের মারকাটারি ব্যাটার জিতিন বসুকে। সিন্ধুজাকে তুলে নিলেন ব্যাটিং থেকে। ওদিকে বল নিয়ে অনেকটা দৌড়ে এসে প্রথম বলটা করল ডি-সেকশানের সুজাত পাল। প্রথম বলটা ফেশ করার জন্যে তৈরি হয়েই ছিল জিতিন। প্রথম বলটা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না জিতিন। তাই ব্যাটটা ফসকে গেল। ইউকেট কিপার অর্ক ধাড়া বলটা লুফে নিতে কোনও ভুল করল না। এ বলে কোনও রান এল না। পরের বল করল সুজাত। এ বলটাও ঠিক মতো উইকেটে এল না। 
   দেবোপমস্যার চেঁচিয়ে বললেন, ‘এটা ওয়াইড বল! খেলো না জিতিন!’ তারপর সুজাতর দিকে তাকিয়ে দেবোপমস্যার বললেন, ‘ওয়াইড বল দেওয়া বন্ধ করো সুজাত। এক রান-এক রান করে ওরা তো রান বাড়িয়ে নেবে?’ 
   এবার থার্ড বলটাও ওয়াইড হতেই দেবোপমস্যার একটু রেগে গেলেন বলে মনে হল। স্যার বললেন, ‘তোমার এ ওভার আর কমপ্লিট করার দরকার নেই সুজাত। তুমি বলটা ঠিক মতো করতেই পারছ না। পর পর অমন ওয়াইড বল করছ কেন? বলটা উইকেটে ফ্যালো!’
   দেবোপমস্যার এবার চোখ ঘুরিয়ে সাদিয়াকে বল করতে ডাকলেন, ‘সাদিয়া এসো তো! তুমি এবার এক ওভার বল করো তো দেখি!’
    সুজাতর মুখটা ভার হয়ে গেল স্যারের কথা শুনে। অপরাধীর মতো মুখ করে বলটা সাদিয়ার দিকে তুলে দিয়ে মাঠের বাঁ দিকে ফিল্ডিংয়ে চলে গেল সুজাত।
   গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠের বাইরে দিয়ে সাইকেল চালিয়ে কোথাও যেন যাচ্ছিলেন মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি। হেডস্যারের সঙ্গে দেখা হতে ঝপ করে সাইকেল থেকে নেমে পড়লেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় চললেন নবনীতবাবু?’
   হেডস্যারও সাইকেল থেকে নেমে পড়লেন। তারপর বললেন, ‘আমি যাচ্ছি পঞ্চায়েত অফিসে। এখন আমাদের স্কুলের মাঠে চলছে ক্রিকেট কোচিং। আমি এতক্ষণ মাঠেই ছিলাম। আপনার হাতে যদি সময় থাকে, তা হলে একবার ঘুরেই আসুন না। ছেলেমেয়েরা উৎসাহ পাবে। আপনার মতো মানুষকে পেলে ওরা মেতে ওঠে। সেদিন অনুষ্ঠানের দিন দেখলেন না? আরও ক্রিকেটের গল্প শোনার জন্যে ওদের ব্যাকুলতা?’
   ‘আমি সকাল থেকে বাড়ি থেকে বেরিয়েছি। গিয়েছিলাম আমার শাঁখাপোতা গ্রামের বাড়িটা কেমন আছে দেখতে। অনেকটা পোড়ো বাড়ির মতোই পড়ে আছে তো। ঠিক আছে, আপনি যখন বললেন নবনীতস্যার, আমি তা হলে বাড়ি ফেরার পথে একবার ক্রিকেট কোচিংটা দেখেই যাই। আসলে কী জানেন তো স্যার, ক্রিকেটের কথা শুনলে বুকের ভিতরটা চলকে ওঠে। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারি না। কতদিন কলকাতার ইডেন গার্ডেনে ক্রিকেট দেখেছি। সে একদিন শোনাব। আজ আপনি কাজে বেরিয়েছেন যখন, যান। আমি না হয় স্কুলের মাঠে ক্রিকেট কোচিংটা এক পলক দেখেই যাই!’
   বলেই মুকুলকৃষ্ণবাবু সাইকেলে প্যাডেল করে স্কুলের মাঠের দিকে আসতে লাগলেন। হেডস্যার সাইকেলে চড়ে বললেন, ‘আপনি যান মুকুলকৃষ্ণবাবু। আমি এক্ষুনি কাজটা সেরেই ফিরে আসছি স্কুলমাঠেই!’ 
   এত দূর থেকে ভেসে আসছে ক্রিকেট দর্শকদের উল্লাস। এখনও বিকেল ততখানি রাঙা হয়ে আস্তে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করেনি। স্কুলের মাঠের পাশে গিয়ে সাইকেল থেকে নেমে পড়লেন মুকুলকৃষ্ণবাবু।
( এর পর দশ নম্বর পর্ব)

বন্ধু আমার

পার্থ মন্ডল
ষষ্ঠ শ্রেণি, পি এম শ্রী জওহর নবোদয় বিদ্যালয়
পশ্চিম মেদিনীপুর

নামটি তার অঞ্জন
ভালোবেসে ডাকে সবাই রঞ্জন।

মন বসে না তার পড়ায়
ইচ্ছা - সারাদিন ঘুরে বেড়ায়।

গলাটি তার কাকের মতো
নাচত ঠিক বকের মতো।

ঘুমায় সে সারাদিন
পড়াশুনা? সে বাদ দিন।

কিন্তু ছিল সে মস্ত পান্ডা
দুষ্টুদের করে দিত ঠান্ডা।

ভালোবেসে ডাকে সবাই রঞ্জন,
যদিও নামটি তার অঞ্জন।

পাঠ প্রতিক্রিয়া 
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

 ‘ছোটোবেলা’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা (১৯২এর সম্পাদকীয় অংশ যা মৌসুমী দি (মৌসুমী ঘোষ) বরাবর লিখে আসছেন এবং যা, বরাবরের মতোই সুন্দর। এখানে মূলত পত্রিকার সাম্প্রতিক সংখ্যা, ছুটির আনন্দ এবং বিভিন্ন লেখক,চিত্রশিল্পীর অবদানের কথা বলা হয়েছে।
আলোচ্য অংশে প্রথমেই বলা হয়েছে, স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলেই ছুটির আনন্দ শুরু হয়। সেই ছুটিকে ঘিরে খেলাধুলা, বিশেষ করে গ্রামের ক্রিকেট খেলা,এইসব বিষয় শিশুদের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সম্পাদক পাঠকদের আহ্বান জানিয়েছেন, শুধু মোবাইল ফোনে সময় নষ্ট না করে গল্প, ছবি ও খেলাধুলার মধ্যে নিজেকে যুক্ত করতে। অর্থাৎ এখানে শিশুদের সক্রিয় ও সৃজনশীল জীবনের দিকে আহ্বান জানানো হয়েছে এবং সম্পাদকীয়তে একটা সুন্দর মেসেজ দিয়েছেন সম্পাদক।
এরপর পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন লেখা ও ছবির উল্লেখ আছে। নীলাঞ্জ মোষের আঁকা ছবিতে গ্রামের একটি সুন্দর ছবি আঁকা আছে। গগনজ্যোতি স্কুলের পথ দেখানোর দৃশ্য ফুটে উঠেছে। সৌরদীপ ও মোনালীর লেখার কথাও বলা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, পত্রিকাটি শিশু-কিশোরদের সৃষ্টিশীল কাজকে গুরুত্ব দেয় এবং তাদের লেখালেখি ও মতামতকে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে দেখে।
পরবর্তী অংশে বিশিষ্ট সাহিত্যিক রতনতনু ঘোষের লেখার উল্লেখ আছে। তিনি ‘কাকতালীয়’ শব্দের ব্যাখ্যা এবং ক্রিকেটের কিছু মজার ঘটনা তুলে ধরেছেন, যা শিশুদের কাছে আকর্ষণীয়। এছাড়া সুকন্যা মাইতির ছবি ও অস্মিতা ঘোষের কল্পনাধর্মী রচনার প্রশংসা করা হয়েছে। বিশেষ করে সাদা ও কালো মেঘের কথোপকথনের মাধ্যমে ভিন্নতার মধ্যেও সৌন্দর্য ও ঐক্যের বার্তা দেওয়া হয়েছে। এতে বোঝানো হয়েছে,ভিন্নতা কারও ছোট-বড় হওয়া নয়,বরং ভিন্নতার মিলনেই সৌন্দর্যের সৃষ্টি।
সার্বিকভাবে, সম্পাদকীয়টি শিশুদের আনন্দ, সৃজনশীলতা, খেলাধুলা ও মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানায়। এটি কেবল একটি পত্রিকার পরিচিতি নয়, বরং শিশুদের কল্পনা, অংশগ্রহণ ও ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলার বার্তা বহন করে।
পত্রিকার প্রচ্ছদে ধূপন আচার্যের ক্যামেরার কাজের উল্লেখ আছে। ছবিতে শিশুদের স্বাভাবিক, প্রাণবন্ত অভিব্যক্তি ধরা পড়েছে,যা কৃত্রিম নয়, খুবই বাস্তব ও জীবন্ত। শীতের রোদ, কমলালেবুর রং এবং শিশুর হাসি,এই তিনটি মিলিয়ে ছবির সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে।
পুরোনো পাঠকদের মধ্যে নস্টালজিয়া বা আগের দিনের স্মৃতি জাগ্রত হয়েছে।
শেষাংশে ভবিষ্যতে আরও ভালো সংখ্যার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে।
মলয় সরকারের পাঠ প্রতিক্রিয়াটি একটি ইতিবাচক লেখা, লেখক পত্রিকার গুণাগুণ তুলে ধরেছেন এবং শিশুদের জগৎকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের জন্য প্রশংসা করেছেন। একই সঙ্গে আগের সংখ্যাগুলোর তুলনাও করেছেন। ভাষা সহজ, আবেগপূর্ণ এবং প্রশংসামূলক।

“ঘঁচুর পাগলামি” — মোনালী প্রধান
এটি একটি মজার গল্পধর্মী রচনা।
ঘঁচুর আসল নাম গণেশ, কিন্তু বেশি কথা বলা ও একটু অদ্ভুত স্বভাবের জন্য সবাই তাকে “ঘঁচু” বলে ডাকে। একদিন মা তাকে বাজারে সবজি আনতে পাঠায়।বাজারে গিয়ে সে পেঁয়াজের দোকানে নাচতে ও গান গাইতে শুরু করে—পেঁয়াজ নিয়ে মজার ছড়া বানায়।পরে আলুর দোকানেও একই রকম কাণ্ড করে। ফেরার পথে আরেক “পাগল” বুড়োর সঙ্গে ধাক্কা খায়। দুজনেই পড়ে যায়।
বুড়োর নাক ভেঙে যায়, আর ঘঁচুও চোট পায়। তবুও ঘঁচু হাসতে হাসতে বুড়োকে নিয়ে ছড়া কাটে, ফলে বুড়ো আরও রেগে যায়।

এটি হাস্যরসাত্মক গল্প। ঘঁচুর অদ্ভুত স্বভাব, ছড়া বানানো, বাজারে নাচ-গান করা,এসব মিলিয়ে গল্পে কৌতুক তৈরি হয়েছে। তবে গল্পের মধ্যে একটি শিক্ষা লুকিয়ে আছে।
অতিরিক্ত দুষ্টুমি বা অসাবধানতা বিপদ ডেকে আনতে পারে।
অন্যের বিপদ দেখে হাসাহাসি করা ঠিক নয়।
ভাষা সহজ, ছন্দময় এবং শিশুতোষ। সংলাপ ও ছড়া গল্পটিকে প্রাণবন্ত করেছে।
দ্বিতীয়টি কৌতুকময় গল্প, যেখানে আনন্দের সঙ্গে শিক্ষাও আছে।

দুষ্টু লোক” 
এই গল্পে প্রথমে আকাশ ভদ্র নামের এক ছাত্রের স্কুলে না,আসা নিয়ে রহস্য তৈরি হয়। পরে বোঝা যায়, সে “ম্যাজিক পয়েন্ট” স্কুলে ক্লাস ফোরে পড়ায়। গল্পের মূল আকর্ষণ নামের প্রসঙ্গ “সম্মিতিরণ দাস” নামটি ছোট হয়ে হয়ে হয়ে যায় “ঘণ্টিদা”।
নাম ও পরিচয়ের সম্পর্ক – একজন মানুষের পরিচয় তার নামে, কিন্তু সমাজ তাকে সহজ করে নিতে নাম বদলে দেয়।
হাস্যরসের ব্যবহার পুরো গল্পজুড়ে হালকা মজার ঢঙ আছে। হেডস্যার নাম ছোট করতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারেন, নামের মধ্যে মানুষের আত্মসম্মান জড়িয়ে থাকে।
গল্পটি ছোট হলেও সমাজের একটি বাস্তব দিক তুলে ধরে আমরা অনেক সময় কাউকে সহজভাবে ডাকতে গিয়ে তার আসল পরিচয় বা অনুভূতির কথা ভাবি না।

“গণনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ – পর্ব ৮” 
এটি একটি ধারাবাহিক উপন্যাসের অংশ। এখানে স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। হেডস্যার নিজে মাঠে উপস্থিত থাকবেন,এতেই বোঝা যায় ম্যাচটি কত গুরুত্বপূর্ণ।
খেলাধুলার গুরুত্ব, পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাও ছাত্রজীবনের বড় অংশ। স্কুলের ঐক্য ও উচ্ছ্বাস,ছাত্র-শিক্ষক সবার মধ্যে মিল ও উত্তেজনা কাজ করছে। গল্পে বাস্তবতা ও আবেগ মিলিয়ে স্কুলজীবনের সহজ-সরল আনন্দকে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
দুটি লেখাতেই স্কুলজীবন, সরলতা ও হাস্যরস প্রধান উপাদান। একটিতে ব্যক্তিগত পরিচয় ও আত্মসম্মান, অন্যটিতে খেলাধুলা ও মিলনমেলার আনন্দ ফুটে উঠেছে। ভাষা সহজ ও প্রাঞ্জল, তাই পড়তে ভালো লাগে এবং কিশোর পাঠকদের জন্য বিশেষ উপযোগী।

Post a Comment

0 Comments