সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন


সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা

ওয়াহিদা খাতুন 


আমিই সুন্দরবন

সপ্তমুখী নদীর তীরে বদ্বীপ সুন্দরবন,
দেখতে পাবে কত খাঁড়ি, নদীনালা, বন,
সন্ধ্যা হলে জোনাকিদের বসে আলোর মেলা,
নোনাজলে দিনেরাতে কত জীবের খেলা ;
বাওয়ালিরা আসে সবে গোলপাতা নিতে,
 বাউল গুনিন আসে সাথে নানান ঔষধ দিতে;
নড়াইলে চিত্রানদী তীরে,পোষা ভোঁদড়ে মাছ ধরে;
দেখতে পাবে জেলে ভোঁদড় কেমন মাছকে তাড়া করে;
কাঁকড়ার খোঁজে বনজীবী,
সঙ্গে থাকেন বনদেবী,
সপ্তাখানের চালেডালে;
দিব্যি কাটায় এই জঙ্গলে;
এটাই তাদের জীবন !
আমিই সুন্দরবন  !!

ভরতপুর কুমির প্রকল্প সজনেখালি পাখিরালয়,
উনিশ শ উননব্বইতে বায়োস্ফিয়ার ঘোষনা হয়;
করমজলে কাঠের ট্রেইল পশুর নদী আছে!
দেশ-বিদেশের জাহাজগুলি থামে এসে কাছে!
হারবাড়িয়া দৃশ্যপটে পর্যটকের ভিড়,
আকর্ষণী গোলাঘরে যেনো শান্তির নীড়;
মাংলাবন্দর থেকে কটকা নব্বই কিমি দূরে,
রেষ্ট হাউসে বসলে পরে মন ভেসে যায় সুরে;
দলে দলে চিত্রল হরিণ বনমোরগের ঝাঁক,
মাঝে মাঝে শুনতে পাবে বাঘেদের-ই হাঁক;
কচিখালির নিরিবিলি সমুদ্র সৈকতে!
বাঘ,হরিণ, শুকর,বানর উঁকি মারে ওতে!
দক্ষিণ দিকে নীলকমলের হিরণ পয়েন্ট যাবে,
নানা জাতের সর্প,পাখি,হরিণ,নৌ ক্যাম্প পাবে;
হরিণ থেকেই তো হিরণ পয়েন্ট, নাম হয়েছে জানো?
পাঁচশো বাইশতম বিশ্ব ঐতিহ্য ফলক, তা মানো ! 
উনিশ শ সাতানব্বই এ ঘোষিত হয় এটা,
নীলকমলে এলে পরে দেখতে পাবে সেটা !
রেণু শিকারিরা দলে দলে,
মাছের খোঁজে নামে গভীর জলে,
জলে কুমির ডাঙায় বাঘ,জীবন মরণপণ ! 
আমিই সুন্দরবন !!

এপ্রিল থেকে জুলাই মাসে;
মৌয়ালিরা ছুটে আসে;
পনেরো দিন ধরে,
বনে শিকার করে;
জীবনখানা বাজী ধরে,
মধুর নেশায় ঘুরে মরে;
কেউ চলে যায় বাঘের পেটে,কেউবা ফেরে শূন্য হাতে ! 
ডিসেম্বর,জানুয়ারি মাসে;
দলবেঁধে ছন কাটতে আসে;
 প্রতিকূলে পদেপদে জখম হয় ঘাতপ্রতিঘাতে ! 
 আঠারো ভাটির দেশ,
রূপের নাইকো শেষ।
জীবন যাদের ভয়াবহ ;
নানানরকম  দুর্বিষহ ;
 অনাহারে অর্ধপেটে,
কর্ম করে গায়ে খেঁটে,
ভয় করেনা অকারণ ;
কর্মে ব্যস্ত সারাক্ষণ !
আমিই সুন্দর বন!!

ব্যস্ততার এই জনজীবন,
থাকে মিলে যে যার মতন;
উৎসবেতে তারাও মাতে,
কেউড়া তলে আসন পাতে;
বাইন,গরাণ,গেওয়া গাছে,
হরেক রকম পাখি নাচে;
ভাটিয়ালি,বনবিবি,ঝুমুর নাচের তালে! 
লোকউৎসবে জোয়ার বহে সুন্দরির ওই ডালে!
ধরে সবাই হাতেহাতে,
নৃত্যকরে একই সাথে;
উচ্চ যেথায় সবার মন!
আমিই সুন্দর বন!!

মাতলা নদীর মাতাল হাওয়ায়,
গোসাবাতে পাখিরালয়;
পিয়ালি,কালিন্দী তীরে,
সুন্দরি আর কেয়া ঘিরে,
চিত্রল হরিণ দলেদলে,
তৃষ্ণা মেটায় শীতল জলে;
প্রকৃতির এই নিবিড় কোলে,
নৈসর্গিক এক ছায়াতলে;
কিযে মনোরম!
আমিই সুন্দরবন!!


বাদাবনের কান্না 

পশুর নদীর কাছে পেলাম বনমোরগের দেখা,
লাল ঝুঁটিতে দেখতে পেলাম প্রাচীন পুঁথির লেখা ;
নোনা মাটি বললো ডেকে শোনো আমার কথা,
খোঁজ করে নাও আড়াই হাজার বছরের সভ্যতা ;
রূপকথা নয় রূপকথা নয় বানর দেখায় খাতা,
কেউড়া রঙে আঁকা তাতে জলদস্যুর মাথা ;
দাঁত খিঁচিয়ে বললো শেষে আরো হদিশ  চাও?
সুন্দরি আর গরান বনে নমুনা পাবে যাও!
নালিশ নিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এলো পাখি;
দস্যুরা সব গাছ কেটেছে আমরা মরবো নাকি?

দলে দলে বনের যতো পশু এলো চলে,
আড়াই হাজার বছর আগের দলিল নিয়ে গলে;
সেই দলিলে লেখা আছে আগের সুন্দর জীবন,
একে একে ধ্বংস হচ্ছে ধেয়ে আসছে মরণ;
এক এক রকম ভঙ্গিমাতে সবাই করে নালিশ ,
বোবামুখের কান্নায় ভেজে বনদেবীর বালিশ ;
জোনাকিরা নালিশ দিয়ে বসলো গাছে গিয়ে,
আদি যুগে চলতে পথে আমার আলো দিয়ে;
মানুষের কর্মফলে-ই আমাদের এই অবস্থা!
বন্যজগৎ ধ্বংস হলে টিকবে তো সভ্যতা? 

নালিশনামা হাতে নিয়ে,
ছুটছি বনের ভিতর দিয়ে;
হোঁচট খেয়ে    পাথর গায়ে
ব্যথা পেলাম   বিষম ঘাঁয়ে;
বললো পাথর শেষে,
ব্যঙ্গ করে হেসে,
আগুনের ব্যবহার শেখানো দলিল খানি;
 অনাদরে ডুবে আছি আগে তলো টানি!
কিযে শিক্ষা পেলাম আমি বন্যের অরণ্যে ;
ম্যানগ্রোভ যে ধ্বংস হবে বর্বরতার-ই জন্যে ;

চারিদিকে হাহাকার বদ্বীপ বাসির চিৎকার,
অস্তিত্বের লড়াই এ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার ;
দ্বীপ গুলি সব ডুবছে জলে প্রকৃতি দেয় হুঙ্কার,
আসছে আওয়াজ উদ্বাস্তুদের বুক ভাসানো কান্নার ;
লোহাচরা,বালিয়াড়ি,ঘোড়ামারা ডুবছে,
চারিদিকে দেখো চেয়ে প্রকৃতি যে ফুঁসছে ;
সুন্দর বন বলছে হেঁকে বাঁচাও অরণ্য ! 
নইলে ডুবে মরবে সকল জীব ও বন্য!!



গানঃ--এটাই সুন্দর বন

এটাই সুন্দর বন,
এটাই বাদাবন,
যেথায় আছে গরান,গেওয়া;
সুন্দরি আর হেতাল,কেয়া;
মৌলি খোঁজে মধু সারাক্ষণ ;
এটাই সুন্দরবন।
এটাই বাদাবন !!

চিত্রল হরিণ দলে দলে,
খেলে বনোছায়া তলে,
গোলপাতার ওই ফাঁকেফাঁকে,
বনোমালী পাখি ডাকে,
জাগে শিহরণ;
এটাই সুন্দরবন !
এটাই বাদাবন !!

ওরা ছন গাছে ঘর বাঁধে,
গোলপাতা বহে কাঁধে, 
উদ্ববিড়ালে মাছ ধরে;
বানর গাছে খেলা করে;
মানে নাযে মন;
এটাই সুন্দরবন !
এটাই বাদাবন !!



ঝুমুর গান

মাঠালে না যাইও বাগাল, না যাইও কালাবন;
লোদির ধারে কল্লা গ্যাড়া, ডরে কাঁন্দে মন;  
ও বাগাল রে না যাইও বা'লেটেরি বন!
কচড়া তরকারি রাঁধি,
মিঠা পান দেবো সাঁজি,
ভোঁতড় ডাকে রাইতে সেথা কাঁপে চাড়াবন !
ও বাগাল রে তুই, না যাইও বা'লেটেরি বন !!

তুই খ'লেন যানা   কাড়া খসে,
জনাইর খাবি   আঁইড়ে বসে;
তুই বারেক ফিরে না আইলে রাইখুম না জীবন!
ও বাগাল রে না যাইও বা'লেটেরি বন!
সুময় যাবে জারীগানে;
ভরবে মড়াই পাকাধানে;
ছাওয়াল পীরের মন্ত্র লইয়্যা করিস রে গমন !
মাঠালে না যাইও বাগাল, না যাইও কালাবন !
ও বাগাল রে তুই, না যাইও বা'লেটেরি বন!!


কবি পরিচিতি: ওয়াহিদা খাতুন, (Wahida Khatun),পিতা:সোয়ারাব হোসেন,মাতা:মর্জিনা বেগম,
 শিক্ষিকা-লেখিকা। মুর্শিদাবাদ,পশ্চিমবঙ্গ, ইংরেজিতে এম.এ, ইংরেজি ও বাংলায় দুটো ভাষায় আলাদাভাবে কবিতা, সনেট ও সংগীত লেখেন। সম্প্রতি তিনটি গ্রন্থ বেরুনোর জন্য প্রস্তুতি চলছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি ।

জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

কথাকার সন্মাত্রানন্দ-এর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্বলদর্চি-র পক্ষে মৌসুমী ঘোষ

বাঙালি জীবনে দামোদর ব্রত/বিভাস মণ্ডল

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

ষষ্ঠীপূজা / ভাস্করব্রত পতি

বিশ সাল বাদ উদার আকাশ : ফারুক আহমেদ/ খাজিম আহমেদ

ইতু পূজা /ভাস্করব্রত পতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

ভীম ঠাকুর /অমর সাহা