জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার/তৃতীয় খণ্ড?পর্ব ৪: শরীরের অনুপস্থিতি/ কমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার
তৃতীয় খণ্ড
পর্ব ৪: শরীরের অনুপস্থিতি 
কমলিকা ভট্টাচার্য 


অ্যালার্মের শব্দটা যেন Facility 47-এর প্রতিটি দেয়াল ভেদ করে অনির্বাণের মাথার ভিতরে ঢুকে পড়ছিল। লাল আলো বারবার ঝলকাচ্ছে, যেন প্রতিটি ঝলক তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—সময় শেষ হয়ে আসছে। ঋদ্ধিমান ইতিমধ্যেই দরজার পাশে পজিশন নিয়ে ফেলেছে, তার চোখ ঠান্ডা, স্থির, হিসেবি। ইরা দ্রুত নাতাশার শরীরের সঙ্গে লাগানো তারগুলো খুলতে শুরু করেছে, তার আঙুলের গতি দ্রুত কিন্তু নিখুঁত। সে খুব নিচু গলায় বলল, “আমাদের সর্বোচ্চ দুই মিনিট আছে।” অনির্বাণ কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু নাতাশার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখ আধখোলা, ভয় আর ক্লান্তির গভীর ছাপ সেখানে জমাট বেঁধে আছে। কিন্তু সেই ক্লান্তির মধ্যেও একটা জিনিস বেঁচে আছে—বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস, যেটা অনির্বাণ একদিন ভেঙেছিল, আর আজ নিজের জীবন দিয়ে হলেও ফিরিয়ে আনতে এসেছে। ঠিক তখনই করিডোরে বুটের ভারী শব্দ ভেসে এল। ধাপ। ধাপ। ধাপ। শব্দটা ধীরে ধীরে কাছে আসছে। ঋদ্ধিমান খুব শান্ত গলায় বলল, “ওরা অন্তত ছয়জন।” ইরা থেমে গেল। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধা ফুটে উঠল। “অসম্ভব…” সে ফিসফিস করে বলল।
ঋদ্ধিমানের মাথার ভিতরে তখন হঠাৎ একটা পুরোনো স্মৃতি জেগে উঠল। সেই রাতটা—যেদিন তারা প্রথম নিজেদের আবিষ্কারটা পরীক্ষা করেছিল। তারা তখনও নিশ্চিত ছিল না, কিন্তু তবু চেষ্টা করেছিল। humanoid প্রযুক্তির সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা। তারা আবিষ্কার করেছিল—তাদের শরীরের কোয়ান্টাম ফেজ কয়েক সেকেন্ডের জন্য পরিবর্তন করা যায়। পুরোপুরি অদৃশ্য নয়, কিন্তু বাস্তবতার সাথে মিথস্ক্রিয়া এত কমে যায় যে মানুষের চোখ, এমনকি বেশিরভাগ সেন্সরও তাদের ধরতে পারে না। তারা ছিল, কিন্তু যেন ছিল না। সেই স্মৃতি মনে পড়তেই ঋদ্ধিমান ইরার দিকে তাকাল। ইরাও বুঝে গেছে। “তুমি কি ভাবছ?” ইরা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল। ঋদ্ধিমান শুধু বলল, “হ্যাঁ।” ইরা এক সেকেন্ড চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল। “এটাই একমাত্র উপায়।” বুটের শব্দ এখন দরজার ঠিক বাইরে। অনির্বাণ বিভ্রান্ত হয়ে তাদের দিকে তাকাল। “কি?” ঋদ্ধিমান বলল, “আমরা কয়েক সেকেন্ডের জন্য অদৃশ্য হতে পারি। কিন্তু শুধু কয়েক সেকেন্ড।” অনির্বাণের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ইরা হালকা হাসল। “আমরা তো পুরোপুরি মানুষ নই, অনির্বাণ।” কথাটার মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। শুধু সত্য। তারপর তারা তাদের ইন্টারফেস সক্রিয় করল। তাদের শরীরের চারপাশে বাতাস যেন বেঁকে যেতে লাগল। তাদের শরীরের প্রান্তগুলো ঝাপসা হয়ে গেল। তারা দৃশ্যমান, অথচ অদৃশ্য।
ঠিক তখনই অনির্বাণের মাথার ভিতরে আরেকটা কণ্ঠস্বর ভেসে উঠল। তিলক বাবার কণ্ঠ। “শরীর আসলে একটি অবস্থান মাত্র। অবস্থান বদলাতে পারলে শরীরও বদলে যায়।” হিমালয়ের সেই নির্জন আশ্রমের স্মৃতি হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠল। তখন সে বিশ্বাস করেনি। ভেবেছিল আধ্যাত্মিক রূপক। কিন্তু আজ, এই মুহূর্তে, সে জানে—এটা বাস্তব। সে জানে, সে নিজেও পারে। কিন্তু এটা বিপজ্জনক। কারণ কয়েক সেকেন্ডের বেশি থাকলে ফেরা যায় না। দরজার বাইরে এখন ছায়া দেখা যাচ্ছে। আর সময় নেই। অনির্বাণ সিদ্ধান্ত নিল। সে ঋদ্ধিমানের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাকে দশ সেকেন্ড দাও।” ঋদ্ধিমান বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল। “কি করবে?” অনির্বাণ শুধু বলল, “বিশ্বাস করো।”
দরজা ভেঙে খুলে গেল। সশস্ত্র গার্ড ঢুকতে শুরু করল। ঠিক সেই মুহূর্তে অনির্বাণ চোখ বন্ধ করল। তার শ্বাস ধীরে হয়ে গেল। সে নিজের অস্তিত্বকে অনুভব করার চেষ্টা করল। তিলক বাবার কণ্ঠ আবার ভেসে এল—“শরীরকে সরিও না। অবস্থানকে সরাও।” হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল। সব আলো নিভে গেল। সে অনুভব করল—সে নেই। তার শরীর নেই। সে শুধু একটা চেতনা। তারপর পরের মুহূর্তেই সে নিজেকে দেখতে পেল ঘরের অন্য প্রান্তে। গার্ডদের পিছনে। মাত্র কয়েক সেকেন্ড। সে দ্রুত একজন গার্ডের হাত থেকে Emergency Override Card নিয়ে নিল। তারপর ফিরে আসার চেষ্টা করল। হঠাৎ সব শব্দ ফিরে এল। সে আবার নিজের শরীরে। সে হাঁপাতে লাগল, তার ফুসফুস আগুনের মতো জ্বলছে। ইরা আর ঋদ্ধিমান বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। গার্ডরা কিছুই বুঝতে পারেনি।
“চলো!” অনির্বাণ চিৎকার করল। সে কার্ডটা ব্যবহার করে Emergency Exit খুলে দিল। দরজা খুলে গেল। ঋদ্ধিমান নাতাশাকে কাঁধে তুলে নিল। ইরা সামনে দৌড়াচ্ছে। পিছনে চিৎকার আর গুলির শব্দ। দেওয়ালে গুলি লাগছে। কাঁচ ভেঙে যাচ্ছে। অনির্বাণ দৌড়াচ্ছে, কিন্তু তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছে। তার চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। তবু সে থামছে না। করিডোরের শেষের দরজা খুলে তারা বাইরে বেরিয়ে এল। ঠান্ডা রাতের বাতাস তাদের মুখে লাগল। তারা গাড়ির দিকে দৌড়াল। গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট হতেই একটা গুলি এসে কাঁচ ভেঙে দিল। নাতাশার মুখের পাশ দিয়ে গুলি চলে গেল। ইরা চিৎকার করল। ঋদ্ধিমান accelerator চাপল। গাড়ি ছুটে গেল।
Facility 47 ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু অনির্বাণ জানে—এটা শেষ নয়। তার মাথা ঘুরছে। তার শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। নাতাশা তার পাশে শুয়ে আছে। হঠাৎ নাতাশার হাত নড়ল। সে অনির্বাণের হাত ধরল। তার চোখ আধখোলা। সে ফিসফিস করে বলল, “তুমি… সত্যি এসেছো…” অনির্বাণের চোখ ভরে গেল। সে খুব আস্তে বলল, “এইবার আমি তোমাকে হারাতে দেব না।” কিন্তু তার মনের গভীরে সে জানে—আজ সে যে ক্ষমতা ব্যবহার করেছে, তার মূল্য তাকে দিতেই হবে। কারণ শরীরের অনুপস্থিতি কখনও বিনামূল্যে আসে না। আর সেই মূল্য খুব শীঘ্রই তার সামনে আসবে।

ক্রমশ ...

Post a Comment

0 Comments