জ্বলদর্চি

আন্তর্জাতিক ভূ-বৈচিত্র্য দিবসে সঙ্গী হোক ভূ-সচেতনতা/প্রসেনজিৎ রায়

আন্তর্জাতিক ভূ-বৈচিত্র্য দিবসে সঙ্গী হোক ভূ-সচেতনতা


প্রসেনজিৎ রায়



"জীববৈচিত্র্যের নীরব অংশীদার" হল ভূ-বৈচিত্র্য বা জিওডাইভার্সিটি। পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক এবং ভূমিরূপতাত্ত্বিক সকল বৈশিষ্ট্য এবং ঘটনার সমষ্টিকে একত্রে আমরা ভূ-বৈচিত্র্য বলতে পারি। পৃথিবীতে জীবনের বিকাশের ক্ষেত্রে ভূ-বৈচিত্র্যের গুরুত্ব জীববৈচিত্র্যের  মতোই । বিশ্বসমাজে ভূ-বৈচিত্র্যের বিভিন্ন আঙ্গিক তুলে ধরতে এবং এর গুরুত্ব প্রচারের লক্ষ্যেই প্রতিবছর ৬ অক্টোবর দিনটিতে ভূ-বৈচিত্র্য দিবস পালন ইউনেসকো এবং রাষ্ট্রসংঘ-এর একটি বিশ্বব্যাপী উদযাপন।

ভূ-বৈচিত্র্য বলতে আমরা বুঝি আমাদের প্রিয় গ্রহ পৃথিবীর প্রাকৃতিক সেই ভাগ যা ভূপৃষ্ঠ এবং গ্রহের অভ্যন্তরে উভয় স্থানেই অ-জীবিত বস্তু বা গঠনগুলির সমাহার। এর মধ্যে আসবে  পৃথিবীর যাবতীয় খনিজ পদার্থ, শিলা, জীবাশ্ম, মাটি, পলি, ভূমিরূপ, ভূ-প্রকৃতি এবং নদী ও হ্রদের মতো জলসম্ভার ইত্যাদি। ভূ-বৈচিত্র্যের মধ্যে বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলিও অন্তর্ভুক্ত হবে এবং বিশ্বপিতার রহস্যময় খেয়ালে এই প্রক্রিয়াগুলির নিয়মিত পরিবর্তনের ধারাটিও এই বৈচিত্র্যের চর্চার বিষয় হবে।  অনুসন্ধিৎসু মনের প্রতিটি মানুষের দৃষ্টিতে ভূ-বৈচিত্র্য একটি প্রাকৃতিক পরীক্ষাগার এবং পাঠ্যপুস্তক হিসেবে কাজ করে।  নতুন প্রজন্মকে পৃথিবীর ইতিহাস, পৃথিবীর সম্পদের সুসংহত ব্যবহার এবং আগামী পৃথিবীতে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট বিপদ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ জ্ঞান সম্পর্কে প্রভূত শিক্ষা দেয়।  প্রকৃতিতে দৃশ্যমান শিলা যেন খোলা বই-এর পাতার মতোই আমাদের এই পৃথিবীর নানা রহস্যের পাঠ দিতে থাকে। পৃথিবীতে ক্রিয়াশীল ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াগুলি শেষপর্যন্ত আমাদের অস্তিত্বের মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়ায়। ভূগর্ভস্থ জলের সরবরাহ যেমন বিভিন্ন নদীর জীবনদায়ী  জলপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনই  ভূপৃষ্ঠ সন্নিহিত অপরিশুদ্ধ জলের প্রবাহ মানুষের সংগ্রহযোগ্য  ভৌমস্তরে পৌঁছানোর আগে তা পরিশ্রুত করার ক্ষেত্রে শিলা এবং পলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
🍂

আমরা জানি, বিশেষ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত শিলাই হলো মাটি, যা আমাদের অস্তিত্বের আধার। মাটি গঠনের জন্য শিলার প্রাকৃতিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভূ-বৈচিত্রের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিভিন্ন কৃষিজাত দ্রব্যের ব্যবহার, উৎপাদনশীলতা নির্ভর করে মাটির ধরণের উপরেই। সেইসব কৃষি পণ্যের উপর নির্ভরশীল মানব  সম্প্রদায়ের জন্য শিলা থেকে মৃত্তিকা গঠনের সাধারণ ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন এলাকা এবং অন্যান্য মহাদেশের উন্নয়নশীল দেশগুলিতে যেখানে মাটির উর্বরতা এবং জলধারণ ব্যবস্থার উন্নতিসাধন আর মৃত্তিকাক্ষয় হ্রাসের মতো বিষয়গুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভূতাত্ত্বিক সম্পদের বৈচিত্র্যের উপরও মানুষের কল্যাণ নির্ভর করে। মানব বিবর্তনের প্রথম  বছরগুলি থেকেই ভূ-বৈচিত্র্যের আশীর্বাদ মানুষ পেয়েছে আর তাকে ব্যবহার করে নিজেদের সভ্যতার অগ্রগতি সুনিশ্চিত করেছে। আধুনিক মানবজাতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ভূ-বৈচিত্র্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিচক্ষণতার সাথে ব্যবহৃত খনিজ সম্পদের ব্যবহার বিভিন্ন সময়ে মানঙষকে কর্মসংস্থান জুগিয়ে সামাজিক ও প্রাকৃতিক উভয় পরিবেশের ক্ষেত্রেই মূল্যবান ভূমিকা নিয়েছে। 

আজকের দিনে প্রকৃতির ভূতাত্ত্বিক এবং ভূমিরূপগত প্রক্রিয়াগুলি  সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ভূমিকম্প, সুনামি, অগ্ন্যুৎপাত, বন্যা, ভূমিধস ইত্যাদির মতো বিধ্বংসী দুর্যোগ প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী। সুসংহত ভূমি-ব্যবহার পরিকল্পনা এবং স্থানিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত যথাযথ পরিকল্পনা রচনা করতে গেলে ভূ-বৈচিত্র্যের ধারণা অন্যতম পূর্বশর্ত। 

ভূ-বৈচিত্র্যের উপর ভিত্তি করেই আধুনিক বিজ্ঞান জলবায়ুর অতীতের পরিবর্তনগুলির ধারা বুঝতে পারে। ভবিষ্যতে জলবায়ু কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে তা বোঝার জন্যও এই জ্ঞান প্রযুক্ত হয়, যার ফলে অর্জিত হতে পারে প্রকৃতির বুকে মানবসমাজের অধিকতর কার্যকরী অভিযোজন। 

বিশ্বব্যাপী মেগাসিটির সংখ্যা এবং আকার বৃদ্ধি বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। বিভিন্ন প্রকৌশলে ভূ-বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের প্রয়োগ, সকল স্তরে অবকাঠামোর নকশা নির্মাণে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা নেয়। যেমন বাঁধ, রাস্তা, টানেল,  অট্টালিকা,বিমানবন্দর ইত্যাদির মতো গুরুত্ববাহী ও স্পর্শকাতর নির্মাণ। 

ভূ-বৈচিত্র্যকে ভূ-পর্যটনের ভিত্তি বললে অত্যুক্তি করা হয় না। পৃথিবীর নানা প্রান্তে রয়েছে নজরকাড়া নানান পর্বত, গুহা পাহাড়,উপকূল ও দর্শনীয় প্রাকৃতিক সমারোহ। ভূ-বৈচিত্র্যের আশীর্বাদ হিসাবে ভূ-পর্যটন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক সংস্থান তৈরি করে। ভূ-বৈচিত্র্যই তো কোনো অঞ্চলের স্থানীয় এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য  স্বতন্ত্র পরিচয় সৃষ্টি করে । এই স্বতন্ত্রতার আকর্ষণেই সারা বিশ্বের সুদূরপিয়াসী মানুষ এই স্থানগুলির প্রতি আকৃষ্ট হন।

সময়ে সময়ে ভূ-বৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মসূচির অঙ্গ হিসাবে ইউনেসকো বিভিন্ন অঞ্চলকে জিওপার্ক হিসাবে ঘোষণা করেছে। সারা বিশ্বে এই মুহূর্তে ৫০টি দেশে ২২৯টি জিওপার্ক রয়েছে। 

ইউনেস্কোর এই  জিওপার্ক গঠিত হয় সেখানকার  ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের সাথে  অঞ্চলের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে। এই সংযুক্তি পক্ষান্তরে সংশ্লিষ্ট মানবসমাজের মুখোমুখি দাঁড় করায় ভূ-বৈচিত্র্যের  গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন আঙ্গিকগুলিকে। মানুষের মধ্যে ভূ-বৈচিত্র্য সংক্রান্ত সচেতনতা এবং বোধগম্যতা বৃদ্ধির জন্য জিওপার্কগুলিকে  ব্যবহার করা হয়। পৃথিবীর সম্পদের সুসংহত ব্যবহার,জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব হ্রাস এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়-সম্পর্কিত ঝুঁকি হ্রাস করার লক্ষ্যে চালিত হয় জিওপার্কগুলি। 

গভীর পর্যবেক্ষণে প্রমাণ হবে, ভূ-বৈচিত্র্য আসলে সম্প্রদায়ের সামগ্রিক অস্তিত্বের অন্যতম ভিত্তি, এবং প্রকৃতির সাথে মানবতার গভীর সম্পর্কের একটি অপ্রত্যক্ষ উপস্থাপন। 

ভূ-বৈচিত্র্য অসংখ্য পরিষেবা প্রদান করা সত্বেও, মানুষ এর সামাজিক উপযোগিতা ইত্যাদি সম্পর্কে এখনো ততটা ওয়াকিবহাল নন। জীব-বৈচিত্র্যের মতোই আমাদের অস্তিত্ব ভূ-বৈচিত্র্যের উপরেও অনেকটা নির্ভরশীল। পৃথিবীতে ক্রিয়াশীল নানা প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রয়োজন আরও  অনেক বেশি সচেতনতার প্রচার। তথ্য ও জ্ঞানই শক্তির উৎস, বিশেষ করে যে শক্তি অস্তিত্ব ও সুসংহত অগ্রগতি নিশ্চিত করবে। 

পরিবেশনীতিগত ভুল  সিদ্ধান্তের খেসারত হিসাবে  মানবজাতি আজ বহু বিপন্নতা ও চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে।  এর সমাধানে ভূ-বিজ্ঞান সচেতনতার গুরুত্বকে স্বীকৃতি  দিতেই ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলন ৬ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক ভূ-বৈচিত্র্য দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। প্রতি বছরেই এই দিবস নব নব প্রাসঙ্গিকতা অর্জন করবে- তা যেন সহজেই বুঝতে পারা যায়।

Post a Comment

0 Comments