ব্রেক
পূলককান্তি কর
রাস্তাটা ভারী চমৎকার। পথের দুপাশে মেহগিনি আর অশ্বত্থ গাছের সারি। মাঝে মাঝে কয়েকটা শিমূল, অর্জুন। গাছের বেড় দেখে মনে হয় অন্ততঃ শ’খানেক বছরের পুরোনো। বাতাসে বসন্তের হাওয়া। ঝরা পাতাদের উপর দিয়ে বাতাস বইলে যে অদ্ভুত মর্মর ধ্বনি শোনা যায়, তা বড় ব্যাকুল করে তোলে মধুপর্ণীকে। বাসটা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পড়েছিল বলে আরও ভালো করে গাছের পাতাগুলো দেখলো সে। চারপাশে কেমন যেন অলসতা। গাছগুলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে। দূরের মাঠে ধান গাছে কোনও আলোড়ন নেই । শুধু বাতাস বয়ে এলে নড়েচড়ে ওঠে তারা, ফের গতানুগতিক স্থবিরতায় পেয়ে বসে। মধুপর্ণীর পাশে এক বয়স্ক ভদ্রলোক, পঁয়ষট্টি সত্তর বয়স। পাকা চুল, পরিষ্কার করে কামানো দাড়িগোঁফ। ভদ্রলোক যে গায়ে পড়া তা নয়, তবু অনেকক্ষণ মৌনতা সহ্য করার লোক তিনি নন। মাঝে মাঝে একথা ওকথা আগ বাড়িয়েই জিজ্ঞাসা করছেন ওকে, মধুপর্ণী নিজে খুব একটা ওসব কথা শোনার মুডে নেই, আবার ভদ্রতার খাতিরে বলতেও পারছে না কিছু। ওর এই রাস্তাটার চারপাশে মনে মনে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে অনুক্ষণ। ভদ্রলোক বললেন, ‘হঠাৎ সপ্তাহের মাঝখানে বাড়ী যাচ্ছেন যে? স্কুল ছুটি নাকি?’
– না না। ছুটি নিয়েছি দু’দিন।
– কেন?
– মায়ের বাৎসরিক কাজ।
– বাবা বেঁচে?
– না। উনি অনেক বছর আগেই মারা গিয়েছেন। মা মারা গেছেন গত বছর।
– বাড়িতে কে কে থাকে?
এত কথার উত্তর দিতে একেবারেই ইচ্ছে করছে না মধুপর্ণীর। বিনায়কের প্রস্তাবে রাজী হলেই ভালো হত। ও গতকাল কতবার বলেছিল, ‘চল না মধু, আমি তোমাকে বাড়ী দিয়ে আসি! আমারও বহুদিন লং ড্রাইভে যাওয়া হয় না!’
– আরে তুমি গিয়ে কী করবে? আমি তো বাড়িতেই নাইট স্টে করবো। তোমাকে তো আর বাড়ী নিয়ে যাওয়া যাবে না। ভাই এর সংসার। ওরা কী ভাববে?
– না না বাড়ী যাব কেন? তোমাকে তোমাদের বাড়ীর কাছাকাছি নামিয়ে দীঘায় চলে যাবো। তুমি বলছিলে না, দীঘা তোমার বাড়ির কাছাকাছি?
– হ্যাঁ। কুড়ি কিলোমিটার।
– বেশ তো। ওখানেই আমি রাত্রে থাকলাম। পরের দিন তুমি যখন আসবে, জানাবে। আমি কোনও সুইটেবল জায়গা থেকে তোমাকে পিক আপ করে নেবো।
মধুপর্ণী রাজী হয়নি। ছেলেটি খারাপ না। কিন্তু ও এলেও সেই সারাক্ষণ নানান ধানাই পানাই করতো। ওর আর নিজের সঙ্গে থাকা হ’ত না। নিজের মতো করে রাস্তাঘাট দেখা যেত না। কিন্তু বাসে এসেও শান্তি নেই। ভদ্রলোক কথায় কথায় জানিয়ে রেখেছেন উনি একজন ডাক্তার, সার্জেন। কলকাতায় মেডিকেল কলেজে পড়াতেন। ইদানিং রিটায়ারমেন্টের পরে সপ্তাহের বিভিন্ন দিন শহরতলীতে খেপ খেলতে বেরোন। নিজের গাড়ী আছে, তাও বাসে যেতে তাঁর ভালো লাগে। জনগণের সাথে একসাথে চলার অভ্যাসটা থাকা জরুরী ইত্যাদি। জানলা দিয়ে মধুপর্ণী বাইরে তাকাতে তাকাতে ভাবলো, মানুষের তৃষ্ণার শেষ নেই। এ হল মৃগতৃষ্ণা। এই যে ভদ্রলোক এই বয়সে ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছেন এ কী কেবল নিজেকে রিটায়ারমেন্টের পর সুস্থ থাকার তাগিদেই? টাকা উপার্জনের মোহ কি নেই? এই মোহ হল রবারের মতো। যত টানলে তত বাড়ে। তার নিজেরই বা কিংশুককে এত ফোন করতে ইচ্ছে করছে কেন? কিংশুক নিজে তো একেবারে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে। ওর অনুভূতি, ওর প্রতিক্রিয়া – কিছু কি বুঝতে দেয় সে মধুপর্ণীকে? মধুপর্ণীই বরং হ্যাংলার মতো ছুটে ছুটে যায়, নানান বাহানা সাজিয়ে ফোন করে, হোয়াটসঅ্যাপ করে। ও বোঝে কিংশুক বিবাহিত পুরুষ, ওর অকারণ ঔৎসুক্যে ওর সংসারে সমস্যা হতে পারে। তবু মন মানে না। এই শিমূল ফুল দেখে কি ওর ইচ্ছে হয়নি, একবার ফোনটা করে? হোয়াটসঅ্যাপে শিমূল গাছের তলায় ছড়িয়ে থাকা অনেক ফুলের একটা ছবি তুলে সে এইমাত্র পাঠিয়েছে। বারবার হোয়াটসঅ্যাপ খুলে খুলে দেখছে কিংশুক দেখলো কিনা – এও কি একটা মোহ নয়? সত্যি, মোহ এমন একটা জিনিস যেটা মানুষের কর্তব্য-অকর্তব্যের পার্থক্য করতে দেয় না। অবচেতন কেবলই না করার মতো কাজগুলিকে যুক্তিগ্রাহ্য করার একটা বাহানা খোঁজে। এ কেমন যেন নিজেকেই চোখ ঠারা। নিজের বিবেককে কিছুটা গ্লানিমুক্ত করার বিফল চেষ্টা। ভদ্রলোক এবার সম্বোধন তুমিতে নামিয়ে বললেন, ‘সব সময় এত মোবাইল ঘাঁটো কেন? চলন্ত বাসে মুভিং অবজেক্ট এভাবে দেখবে না।’
– খুব বেশী দেখি না। তবে সময় কাটানোর এটা একটা বদভ্যেস – তা মানি।
– এই যে হোয়াটসঅ্যাপে তোমরা দিনরাত কথোপকথনের খেলা খেলো, সিম্পলি ভাবো, কথা বলে নিলে এর থেকে কত কম সময়ে ব্যাপারটা সম্পন্ন হতে পারতো, অথচ প্রত্যুত্তরের আশায় কত সময় এপাশ ওপাশ নষ্ট করতে হয়!
– আসলে সব সময় কথা বলার মতো তো স্হিতি থাকে না!
– তা ঠিক।
ডাক্তারবাবু কোনও অজানা কারণে আর বিষয়টি নিয়ে এগুলেন না। মধুপর্ণী খেয়াল করলো, সত্যিই তো এতক্ষণ ডাক্তার বাবু একবারও মোবাইল ফোন বের করেননি। ও কিছুটা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কোনও সোস্যাল নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকেন না?’
ডাক্তারবাবু একটু হেঁয়ালি করে বললেন, ‘ভার্চুয়াল মিডিয়ায় কি আদ্যৌ সোশ্যাল ইনভলভমেন্ট সম্ভব? আমি সোসাইটির মধ্যে থেকেই ওর মধ্যে জড়িয়ে থাকি, বা এখনও জড়িয়ে আছি।’
– আপনার মোবাইল নেই?
– থাকবে না কেন? তবে একদম সিম্পল। শুধুমাত্র কথাটুকু আদান প্রদান হতে পারে এতে। ক্যামেরা ট্যামেরা কিছু নেই।
– শুনি নাকি ডাক্তার উকিলদের একটু শো-ম্যান শিপ দেখাতে হয়। কম দামী ফোন বা জামাকাপড় দেখলে পেশেন্টরা নাকি ভাবে – এর ঠিক চলে না!
– ব্যাপারটা ঠিকই শুনেছো। তবে কিনা, পৃথিবীর সব সমস্যাই শুধুমাত্র মধ্য-ভাবনার লোকদের জন্য। খুব কম আর খুব বেশীর দলে খুব একটা ফারাক নেই। ওদের মধ্যে ট্যাবু খুব কম।
মধুপর্ণী বলল, ‘আপনার পেশেন্টরা কি তবে সবাই একেবারে নিম্ন বা উচ্চ মার্গের লোক? মধ্যমান তো তাদের মধ্যেও আছে। ওরা বরং সংখ্যায় বেশী। ওরা যদি একরকম ভাবে তাহলেও তো আপনার সমস্যা হওয়ার কথা।’
– তা ঠিক। তবে কী জানো, ঈশ্বরের আশীর্বাদ বলেও তো একটা বিষয় আছে। আমার পেশেন্টের অভাব নেই। বরং বাজারের অন্যদের তুলনায় বেশ খানিকটা বেশী। আমার ক্ষেত্রে বরং লোকেরা উল্টোটা ভাবে, ওরা বলে, দ্যাখো লোকটা কত সাধারণ জীবন যাপন করে!
হোয়াটসঅ্যাপটায় আবার চোখ রাখলো মধুপর্ণী। কিংশুক ছবিটা দেখেছে। কিন্তু কোনও কমেন্ট করেনি। অবশ্য কমেন্ট করলে কী ই বা করতো? ‘খুব ভালো’। বা ‘কী সুন্দর। কোথায় পেলে?’ এর বেশী তো কিছু নয়! ও তো আর লিখবে না ‘এর চেয়ে তোমার ঠোঁট দুটো রাঙা’, কিংবা ‘এর চেয়েও রাঙা তোমার আলতারই দাগ!’ তবে এত দেখতে ইচ্ছে করছে কেন? যে প্রশ্নের উত্তর জানাই আছে, তার জন্য কি এত আগ্রহ, উৎকন্ঠা সাজে? নাকি এর মধ্যে অবচেতনের প্রত্যাশা থাকে, যদি অজানা কিছু হয়? ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মধুপর্ণীর মনের কথা তো বলা হয়ে গেছে সবই। কিংশুক কি শোনেনি সব? শুনেছে, তবু নিজেকে ও সংযত রেখেছে ব্যবহারে, এবং কথাবার্তায়। সামান্য আঁচটুকু কখনও দেয়নি যাতে মনে হয় ওর ভেতরে সামান্য হলেও কিছু বিশেষ অনুভূতি আছে মধুপর্ণীর প্রতি। কখনও কখনও নিজের উপর খুব রাগ হয় মধুপর্ণীর। হঠাৎ বাসটা প্রচন্ড জোরে ব্রেক কষলো। অন্যমনস্ক মধুপর্ণীর কপালটা সামনের সিটটায় ঠোকা খেতে খেতে বেঁচে গেল ডাক্তারবাবু হঠাৎ করে তাঁর হাতটা সামনে বাড়িয়ে দিলেন বলে। পেছন থেকে ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে কটুক্তি ভেসে এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। ডাক্তারবাবু বললেন, ‘মানুষের এই এক দোষ। সামান্য উনিশ-বিশ হলেই মানুষ আগে গালিটা দিয়ে দেয়। ভেবেই দেখে না আসলে ব্যাপারটা ঠিক কী ঘটেছিল।’
মধুপর্ণী জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখছিল বাইরেটা। ও বলল, ‘একটা গরু সামনে এসে পড়েছিল। খুব বাঁচা বেঁচে গেছে।’
ডাক্তারবাবু হঠাৎ নৈর্ব্যক্তিক ভাবে বললেন, ‘জীবনে মাঝে মাঝে এরকম ঝাঁকুনি দরকার। ঈশ্বর সেটা দেনও। তখনই জীবনটা আবার নড়ে চড়ে বসে।’
মধুপর্ণী ভেবে পেলো না হঠাৎ ডাক্তার বাবু এমন উক্তি করলেন কেন। তবু বলল, ‘তাই বলে এইরকম মরনপণ ঝাঁকুনি?
– যার জন্যে যেরকম।
– ঠিক বুঝলাম না ডাক্তারবাবু।
– তুমি অগ্নিশ্বর ফিল্মটা দেখেছো? বা বনফুলের লেখাটা পড়েছ?
– হ্যাঁ।
– দ্যাখো, অগ্নিশ্বর ডাক্তার হিসেবে ভালো ছিলেন। মানুষ হিসাবেও কি খুব খারাপ ছিলেন?
– না। আদর্শবাদী, সত্যনিষ্ট এবং দায়িত্বপরায়ণ।
– কিন্তু দ্যাখো তাঁর ঋজুতার মধ্যে নমনীয়তা ছিল না। তাঁর কঠোরতার প্রকাশ এতখানি তীব্র ছিল যে তাঁর স্ত্রী-পুত্রও তার তল পেতো না। বা পেতে চাইতো না। কিন্তু তাঁর স্ত্রী মারা যেতে লোকটা যেন হঠাৎ করে মানুষ পদবাচ্য হলেন। তার অতিত্বগুলো কোথাও একটা পালিশ পেলো!
– এটা কি সোনায় খাদ মেশানোর মতো?
– এক অর্থে ধরো তাই।
– কিন্তু হঠাৎ এরকম কথা বললেন যে?
– কিছু মনে করো না, একটা ব্যক্তিগত কথা বলব?
– বলুন না।
– তুমি তো বিয়ে করোনি দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু কারণ যাই হোক না কেন, তুমি যে মোহের পেছনে দৌড়াচ্ছো, এখনই যদি বড় একটা ব্রেক না কষো, তবে কিন্তু ওই ‘ছুটেছিলাম পিয়াস ভরে মরীচিকা বারির তরে’ হয়ে যাবে।
মধুপর্ণীর বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। তবু যতটা সম্ভব নিজেকে দমন করে বলল, ‘বুঝলাম না ঠিক।’
– দ্যাখো পর্ণা, এই স্বল্প আলাপে তোমাকে এত ছোট নাম দেবার অধিকার আদৌ আছে কিনা জানিনা, তবে বলার জন্য একটু সংক্ষেপ করতেই হল। দ্যাখো মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হচ্ছে পাশের সহযাত্রী যদি মোবাইল খুলে বসে বা বই পড়তে থাকে, না চাইতেই মানুষের দৃষ্টি ওখানে চলে যায়। এটা যে অসভ্যতা, বা অপরের চৌহদ্দীতে উঁকি মারা – তা কিন্তু নয়। এটা কেমন যেন হয়েই যায়।
মধুপর্ণী অস্থির গলায় বলল ‘তো’?
– তুমি কিছুক্ষণ আগে শিমূল ফুলের ছবি তুললে, দেখতেই পেলাম। কাউকে পাঠালে তাও চোখ এড়ালো না। সেই ব্যক্তিটি সেটা দেখেছে তাও বোঝা গেল। কিন্তু তুমি মনে মনে যেটার প্রত্যাশায় বারবার তার অ্যাকাউন্ট খুলে দেখছো – সেটা কিন্তু এল না।
মধুপর্ণী মাথা নীচু করে চুপ করে বসে রইল। ডাক্তারবাবু বললেন, ‘স্যরি। আমার একটু অনাধিকার চর্চ্চা হয়ে গেল পর্ণা, কিছু মনে করো না।’
বাইরের লোকের সাথে এসব আলোচনার অর্থই হয় না। ভদ্রলোকের অবজার্ভেশনটা নিশ্চিত ভালো। কিন্তু ওর কেমন যেন রাগ হতে থাকলো। পাশ থেকে কোনও কথা ভেসে এল না। আড়চোখে ও টের পেল ডাক্তারবাবু এক মনে বাসের ছাদের দিকে চেয়ে বসে আছেন। মধুপর্ণী রাস্তার দিকে মন দিল। কেমন দ্রুত বেগে পাশের গাছগুলো সরে যাচ্ছে। দূরে একটা গ্রাম দেখা যাচ্ছে। রাস্তার পাশে নয়ানজুলির উপর বাঁশ দিয়ে গড়া সাঁকো। ওই গ্রামের লাল মোরামের রাস্তাটা শুরু হয়েছে ওই সাঁকোর ওপার থেকে। কত বড় বড় অশোক আর আমলকী গাছ। একটু দূরে কলাগাছের সারি। ছোটবেলায় বাড়ীতে অনুষ্ঠান হলে কলা পাতায় খেতে দেওয়ার চল ছিল। ওর তখন একদম ভালো লাগতো না। সব ঝোল ডাল ভেসে গড়িয়ে যেত। আজ হঠাৎ বড় কলাপাতায় খাওয়ার সাধ হল তার। মনে হল, এর চেয়ে ভালো আহার পাত্র আর বুঝি কিছু নেই। কিংশুক ভালোবাসে এইসব। কিংশুক ভালোবাসে কবিতা পড়তে, আঁতেল সিনেমা দেখতে। পুরোনো বিষয়, পুরোনো সংস্কৃতি, ভেঙে পড়া ঘড়বাড়ি নিয়ে ওর বড্ড বেশী টান। সেই মানুষ বোঝে না ওর দিন দিন অট্টালিকা ভেঙে পড়া? ও বুঝছে না প্রতিদিন ওর পাতা একটু একটু করে শুকিয়ে যাচ্ছে মধুহীন হয়ে? ডাক্তারবাবুকে কিছু একটা বলা উচিৎ ছিল। ওর নিরুত্তর অভিতাপ দেখে ওঁর নিশ্চই খারাপ লাগছে। মধুপর্ণী স্বভাবতই গোঁয়ার। এমন পরিস্থিতিতে তার আগ বাড়িয়ে কথা বলা অভ্যেস নয়। তবু ভদ্রলোকের পার্সোনালিটিটা এমন, ঠিক এই মুহুর্তে কিছু একটা বলার জন্য ও ছল খুঁজতে লাগলো। কিছুক্ষণের মধ্যে ভদ্রলোক নিজে থেকেই বললেন, ‘এই বাস একটু বেশী সময়ের জন্য কোথাও দাঁড়াবে না?’
– কোলাঘাটে দাঁড়িয়েছিল তো। আর বোধহয় হল্ট দেবে না।
– যাঃ!
– কেন, চা টা খান নি?
– খেয়েছিলাম। তবে এখন একটু কিছু খাবার খেতে হবে।
– বাড়ী থেকে খেয়ে বের হননি?
– না।
– কেন? বলেই থতমত খেয়ে মধুপর্ণী বলল, ‘আসলে বলতে চাইছিলাম দুপুর বেলার বাস জার্নি, কিছু খেয়ে আসাই তো উচিৎ ছিল।’
– তা ছিল। ভদ্রলোক আর কথা বাড়ালেন না। মধুপর্ণী তার হাত ব্যাগ থেকে একটা কেক বের করে বলল, ‘খেয়ে নিন।’
ভদ্রলোক বেস স্মার্ট। ন্যাকামির ধার না ধরেই বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ। কিন্তু তোমার যে অসুবিধা হবে।’
– আমার আরও আছে। আপনি ভাববেন না।
– ওঃ। বলেই ডাক্তার বাবু কেক এ মনোনিবেশ করলেন। একটু পরে বললেন, ‘আমারই আসলে নিয়ে ওঠা উচিৎ ছিল। সারা জীবন খাওয়া-দাওয়ার এত অনিয়ম করেছি, শরীর এখন তার শোধ নেয়। এক্ষুনি কিছু যদি না খেয়ে নিতাম, পেটে খুব তীব্র ব্যথা শুরু হয়ে যেত। আমি দেখেছি, একবার শুরু হলে কিছুতেই কমে না। শেষ পর্যন্ত ইঞ্জেকশন নিতে হয়।’
– তাহলে তো আপনার আরও বেশী সাবধান হওয়া উচিৎ। খেয়ে টেয়ে বেরোনো উচিৎ ছিল।
– তুমি ঠিকই বলেছো। আসলে সকালে একটা নার্সিংহোমে কেস ছিল। ওটা করে এসে রান্না করার সময় পাইনি।
– রান্না? কেন বাড়ীতে কোনও লোক নেই?
– স্ত্রী ছিলেন। ডিভোর্স হয়ে গেছে চোদ্দ পনেরো বছর।
– ওঃ স্যরি!
– না না, তুমি স্যরি হবে কেন? আমার দোষেই ডিভোর্স হয়ে গেছে।
– কাজের লোক টোক রাখতে পারতেন তো।
– আমার কি ঘরে ঢোকা বেরোনোর ঠিক আছে? চাবি ফাবি কার কাছে দিয়ে আসবো? আগে প্রতিবেশীর বাড়ীতে রেখে যেতাম। পরে ভেবে দেখলাম লোককে নিয়মিত বিরক্ত করার কোনও মানে হয় না। এখন ‘আপনা হাত জগন্নাথ।’
– ঘরে ঝাড়ু টাড়ু দেন?
– সপ্তাহে দু সপ্তাহে দুই একবার। খাওয়াটা বেশীর ভাগই ফোন কলে, নইলে স্বপাক।
– এরকম জীবনের মানে কী? আপনার এইভাবে প্রতিদিনের ফুরিয়ে যাওয়ার মধ্যে আনন্দ আছে কি?
– তুমি পুরু যযাতির গল্প জানো?
– আলেকজান্দার পুরু জানি। যযাতির কথা ঠিক মনে পড়ছে না।
– রাজা যযাতির দুই স্ত্রী ছিলেন দেবযানী আর শর্মিষ্ঠা।
– আচ্ছা ডাক্তারবাবু, ইনি কি সেই কচ ও দেবযানী কবিতার দেবযানী?
– হ্যাঁ। শুক্রাচার্যের কন্যা। কচের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে শেষে যযাতির সাথে ওঁর বিবাহ হয়েছিল। হয় শর্মিষ্ঠার প্রতি বেশী আকর্ষণের কারণে বা অন্য কোনও নিয়ম বহির্ভূত সম্পর্কের জেরে দেবযানী বাবার কাছে স্বামীর নামে কমপ্ল্যান ঠোকেন। শুক্রাচার্য সব শুনেটুনে ক্ষেপে গিয়ে অভিশাপ দিলেন যযাতিকে।
– তাও ভালো, তখনকার দিনে মেয়ের বাপের বাড়ী বিপদে পাশে এসে দাঁড়াতো!
– এখনও এসে দাঁড়ায়, যদি সে সমাজে ক্ষমতাবান হয়। নইলে দাঁড়িয়েই বা কী লাভ? ওকে কেউ মানবে না।
– সে ঠিক কথা। তারপর বলুন।
– শুক্রাচার্য অভিশাপ দিলেন, তুমি যে ইন্দ্রিয়ের জোরে অনাচার করছো, তা তোমার অকেজো হবে। তুমি জরাগ্রস্ত হয়ে যাবে। জাগতিক ভোগ সম্ভোগ তুমি আর ইচ্ছে হলেও করতে পারবে না। তখন যযাতি দেখলেন, সর্বনাশ। ওঁর মাথায় বুদ্ধি খেললো। উনি বললেন, তাহলে তো আপনার কন্যাও সম্ভোগ থেকে বঞ্চিত হবে। আমি ওর সাথেই আনন্দে দিনাতিপাত করতে চাই। শুক্রাচার্য দেখলেন, ঠিক কথা। এই অভিশাপে মেয়েরই আখেরে ক্ষতি ।
– শুক্রাচার্য মেয়ে ন্যাওটা ছিলেন মনে হয়।
– খুব সম্ভব। তখন তিনি বললেন ‘ঠিক আছে, তোমার পুত্রদের মধ্যে কেউ যদি এই জরা গ্রহণ করে, তবে তুমি জরা মুক্ত হবে। তখন পুরু এই জরা নিয়েছিলেন।’
– পুরু কি দেবযানীরই ছেলে?
– না। দেবযানীর ছেলেরা জরা নিতে অস্বীকার করে। পুরু হলেন শর্মিষ্ঠার গর্ভের কনিষ্ঠ সন্তান; তা পুরু স্বেচ্ছায় বাবার জরা নিয়েছিলেন। এদিকে যযাতি দীর্ঘ সহস্রবছর যৌবন সম্ভোগ করলেন।
– তারপর?
– এদিকে পুরু জরা ভোগ করেছেন। বাবার তাই দেখেও দুঃখ কষ্ট হয় না। তিনি নিজের ধুনে মস্ত। আর হাজার বছরও তো চাট্টিখানি কথা নয়। সম্ভোগ করতে করতে এবার যযাতির ক্লান্তি এল। তিনি মনে করলেন এই যে মোহ বা আকাঙ্ক্ষা – এর শেষ নেই। যত টানবে, তত এটা বাড়বে। তখন তিনি পুরুকে ডেকে তাঁর যৌবন প্রত্যর্পণ করলেন। মহাভারতের যে কৌরব বংশ জেনেছো – তারা এই পুরুরই বংশধর। অবশ্য কেউ কেউ বলেন পুরুর ভাই কুরুর বংশ ওরা।
– কিন্তু ডাক্তারবাবু এটা তো আমার প্রশ্নের উত্তর হল না।
– জানি। আসলে এটা একটা গৌরচন্দ্রিকা। তোমার আসল প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমার জীবনের ঘটনাটাও তোমাকে বলতে হবে।
– থাক তাহলে। ব্যক্তিগত কথা শোনার ইচ্ছে আমার একদম নেই।
– কিন্তু কী জানো পর্ণা, আমার কথা তোমাকে বলতে ইচ্ছে করছে। যে কথা বলব, সেটা একেবারেই অল্পপরিচিতাকে বলার মতো নয়, তবে কিনা কিছুক্ষণ আগে আমি তোমার জীবন নিয়ে উপদেশ দিচ্ছিলাম তো, তাই মনে হয় তোমার কাজে লাগবে।
– থাক না ডাক্তারবাবু। কী দরকার তিন সাড়ে তিন ঘন্টার জার্নিটা এতখানি ব্যক্তিগত করার?
– জার্নিটা চাইলে লম্বাও তো করতে পারো। অবশ্য যদি তোমার ইচ্ছে হয়।
– আপনি তো ভারি ব্যস্ত। আপনার সে সময় হবে?
– মনে হয় তোমার জন্য হবে। শুনবে সব কথা?
– আচ্ছা বলুন।
– আমি যখন ডাক্তারি পাশ করে বেরোই, তখন আমার সামনে দুটো অপশন, বেসরকারী বড় নার্সিংহোমে প্রাকটিস, নইলে সরকারী চাকরী। উনিশশো আশি সালে প্রাইভেটে আমি মাসে ত্রিশ হাজার টাকার অফার পাই।
– মানে এখনকার টাকায় কয়েক লাখ।
– হ্যাঁ। সেই সময় আমার মেডিক্যাল কলেজে লেকচারারের চাকরী জুটলো। আমার স্যার বললেন ‘দ্যাখ বাপু বেনিয়া হতে চাইলে হও, মহীরুহ হতে চাইলে কিন্তু কলেজটা ভালো।’
– আপনি কলেজে জয়েন করলেন?
– হ্যাঁ। আমার সহপাঠিনী একজনের সাথে তখন আমার উথাল পাতাল প্রেম। তিনি আমার এই সিদ্ধান্তে আমাকে ত্যাগ করলেন।
– তারপর?
– আমি তখন ভীষণ অবসেসড। তখন তো আজকালকার মতো এত খোলামেলা কিছু ছিল না। আমার সেই বন্ধুটিকে পাওয়ার জন্য আমি প্রায় পাগল হয়ে উঠলাম। কিন্তু আমার পাগলামির ওর কাছে কোনও মূল্য ছিল না। ও একজন সিনিয়রকে বিয়ে করে ইউ.কে.তে সেটলড হয়ে গেল। আমার মাও আমাকে একজন সুশীলা শিক্ষিতার হাতে তুলে দিলেন।
– আপনি সেই সম্পর্কে স্থির থাকতে পারলেন না কেন?
– সেটাই বলছি। আমার তখন বাড়ীতে মন নেই। আমার স্ত্রীকে আমি কোনওদিনই গুরুত্ব দেইনি। আমার সেই বান্ধবীর স্মৃতি কিছুতেই আমার মন থেকে নামছিল না। আমি যখন তখন ওকে আই. এস.ডি করার চেষ্টা করতাম, চিঠি পাঠাতাম।
– কিন্তু এতে তো ওনার সংসারে অশান্তি হতে পারতো।
– সত্যি বলতে কি আমি মনে মনে তাই চাইতাম। ওর সংসার ভেঙে যাক। ও ফিরে আসুক। আমি ওর সাথে আবার ঘর বাঁধবো।
– কিন্তু আপনার স্ত্রী?
– ওর কথা আমার মাথাতেই আসতো না। এমনিতেই সার্জেনদের ডিউটির ঠিক ঠিকানা থাকে না। রাতেভিতে কল আসতো, আমি বেরিয়ে যেতাম। সারাদিন কলেজেই পড়ে থাকতাম। আর জানো তো, ডাক্তার যদি নামকরা হয়, আর সে যদি চায় – তার জীবনে নারীর অভাব হয় না। আমার তখন নার্স, পেশেন্ট, স্টুডেন্ট – কোনও কিছুতে বাছবিচার ছিল না।
– আপনার মা কিছু বলতেন না?
– মা যতদিন ছিলেন, ততদিন একটু রাখঢাক ছিল। মা মারা যেতে একেবারেই বাঁধনছাড়া হয়ে গেল সবকিছু। সপ্তাহে হয়তো দু-তিন দিন বাড়ী ফিরতাম।
– আপনার কোন ছেলেপুলে হয়নি।
– একটা ছেলে হয়েছিল। সে এখন প্রতিষ্ঠিত ইঞ্জিনিয়ার। আমার সাথে অবশ্য যোগাযোগ নেই। মায়ের সাথে ও বেরিয়ে গেছে বাড়ী থেকে।
– পুরু যযাতির গল্পের সাথে মিলটা বুঝলাম না।
– বোঝোনি? আমার তখন যযাতির মতো অবস্থা। সম্ভোগের নেশা থেকে বেরোতে পারছি না।
– তা এখন কি বেরোতে পেরেছেন?
– পেরেছি। ইনফ্যাক্ট আমার স্ত্রী চলে যাওয়ার বছরখানেক মধ্যেই আমার মোহ ভেঙ্গে যায়। আমি আস্তে আস্তে সেই জাল থেকে নিজেকে বের করার চেষ্টা করি। এখন আমার কোনও মোহ নেই।
– তবে এভাবে দিনরাত্রি দৌড়ে বেড়াচ্ছেন কেন? আপনার টাকা পয়সার কি খুব দরকার?
– টাকা-পয়সার জন্য দৌড়ই না পর্ণা। এটা একপ্রকার আমার পাপস্খালন বলতে পারো। সাধারণ মানুষেরা যারা কলকাতায় গিয়ে আমার নাগাল পাবে না অথবা পেলেও টাকা কড়ি দিয়ে সর্বস্বান্ত হবে – এটা তাদের জন্য একপ্রকার ‘ধরা দেওয়া’ বলতে পারো।
– কলকাতায় বা সর্বস্বান্ত হবে কেন? আপনি সস্তায় করবেন বা চ্যারিটি করবেন।
– চ্যারিটি করলে সত্যিকারের সেবা হয় না পর্ণা। কিছু পরিষেবা কিনতে হয়। কিনলে তার যথার্থ মূল্য বোঝা যায়। যার সত্যিকারের চ্যারিটি দরকার তার হয়তো আমি ফিস মুকুব করি না, কিন্তু অন্যভাবে কমপেনসেট করে দিই। আর কলকাতায় আমার এত লাইন থাকে যে ছ-মাসের আগে নাম লেখানো যায় না। আমি যে সব হাসপাতালে কাজ করি, সবই কর্পোরেট; আমি চাইলেও সেখানে ফিস মুকুব করা যায় না।
– এখনকার কাজে কি তবে আনন্দ পান?
– ঠিক জানিনা পর্ণা। তবে সমাজকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্যে একটা তৃপ্তি আছে। আমি হয়তো অগ্নিশ্বরের মতো একেবারে টোটাল চ্যারিটি করতে পারি না, তবে চেষ্টা করি।
– বদলে যখন গেছেন, বউদিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেননি?
– না। ওটা ওর পক্ষে অসম্মান হত।
– ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ আছে?
– না। আমি যোগাযোগ রাখতে চাইওনি। আমার সঙ্গে যত বছর উনি কাটিয়েছেন সেটাই ওনার জন্য দুঃসহ অভিজ্ঞতা। আমি আর সেই বোঝা কোনওভাবে বাড়াতে চাই না। যদি এতদিনে উনি ভুলে যেতে পেরে থাকেন তো সেটা মঙ্গল।
– এই গল্পটা আপনি আমায় শোনালেন কেন এবার বলুন।
– তুমি যে প্রশ্নটা আমাকে করেছিলে, সেটা এবার নিজেকে করে দ্যাখো।
– কোন প্রশ্নটা?
– ওই যে তোমার প্রত্যেকটা দিন ফুরিয়ে যাওয়ার মধ্যে আনন্দ আছে কি?
মধুপর্ণী নিজের অন্তস্থলের দিকে তাকালো। সে নিজে জানে না এই প্রশ্নের উত্তর ঠিক কী। কিংশুকের ভালোবাসা পাওয়া তার জীবনে অসম্ভব। কিংশুক ছাড়া ওর জীবন ভাবা আরও অসম্ভব। বিনায়কের প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেলে ওর প্রতি মস্ত বড় ভুল করা হয়ে যাবে না তো? মোহ বড় কঠিন ফাঁস। এই ফাঁস থেকে বেরোতে সত্যিই বড় একটা ঝাঁকুনি দরকার।
0 Comments