জ্বলদর্চি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১৯৭

 ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১৯৭
চিত্রগ্রাহক - নীলাব্জ ঘোষ

সম্পাদকীয়,
ছোটোবন্ধুরা, তোমরা কি জানতে বাঘেদের একটা স্কুল আছে সুন্দরবনে? আমি তো জানতাম না। প্রিয়ান্য বলল, আর নীলাব্জ আঙ্কেল পুরুলিয়ার সুন্দর যে বাড়িটার ছবি তুলে পাঠিয়েছে সেটার কথা জানতে? আমি তো জানতাম না। সৌমেন আঙ্কেল তিতলি আর টুনটুনির যে গল্পটা বলেছে সেটার কথা শেনেছো কখনো?  আমি তো শুনেছি টুনটুনি আর রাজার গল্প। উপেন্দ্রকিশোরের লেখা। এখানে টুনটুনির দারুণ একটা ছবি এঁকে পাঠিয়েছেন অসিত কুমার সেনাপতি।  রতনতনু জ্যেঠু হেলেন কেলারের গল্প বলেছেন ক্রিকেটের ফাঁকে। যারা জানো না জেনে নিও। তাহলে এটা তো মানবে, জানার কোনো শেষ নেই। এসো স্বাগতা পিসির চিঠি পড়ে আমাদের ছোটোবেলা কেমন হচ্ছে জেনে নিই। -- মৌসুমী ঘোষ।

টুনটুনি ও তিতলি
 সৌমেন রায় 

সকাল থেকে একটা পাখি চুইট - চুইট ,চুইট - চুইট করে চারিদিক মাতিয়ে তুলেছে। একবার এপাশ থেকে শব্দ আসে তো একবার ওপাশ থেকে। তিতলি ভাবছিল এত জোরে ডাকছে যখন নিশ্চয় বেশ বড় পাখি হবে।  এদিক ওদিক খুঁজে দেখা পেল অবশেষে। ও মা! এতো রাজামশাইকে নাজেহাল করা টুনটুনি! একটা ছোট্ট পাখি । পিঠের দিকটা একটু জলপাই রঙের । সারাদিন তিতলির ভাইয়ের মতো হুটোপুটি করে। 
তিতলি  ডাকল, 'এই শোন  এদিকে'। 
অবাক কান্ড! ডাকতেই পাখিটা এসে বসল জানালায়। তিতলি জিজ্ঞেস করল, 'এই তোমার  নাম কি? তোমার কি পড়াশোনা নেই? সারাদিন ঘুরে বেড়াও যে বড়।'
 ' তোমাদের মত আলাদা আলাদা নাম হয়না আমাদের।আমরা সবাই টুনটুনি। আর তোমাদের মত  সারাদিন বইতে  মুখ  গুঁজে শিখতেও হয় না আমাদের। আমরা এমনি এমনি শিখি।এই দেখো না গত বছর তোমাদের রবীন্দ্রজয়ন্তীর পরে আমার জন্ম হয়েছিল ।পুজোর আগে থেকেই আমি নিজে নিজে পোকা ধরে খেতে পারি। এই বছরই আমি আমার নিজের বাসা বানাবো বড় বড় পাতাগুলোকে ঠোঁট দিয়ে সেলাই করে।'

চিত্র - অসিত কুমার সেনাপতি

' তোমার মা তোমাকে বকে না ?'
' মা? মা কোথায় থাকে তো জানিনা।সেই ছোটবেলায় তাকে দেখেছিলাম। এখন প্রকৃতিই আমার মা। আচ্ছা তোমরা ঝড় বৃষ্টি হবে কিনা কি করে জানতে পারো?
' কি করে আবার ,আবহাওয়ার খবর শুনে।'
' এই দেখো কান্ড ! আমরা তো এমনিই বুঝতে পারি। কোন দিন ঝড় - বৃষ্টি হবে,কোন দিন রোদ হবে, কখন  কোথায় পোকা পাওয়া যাবে সব আমরা বই না পড়েই জেনে যাই ।'
'কি করে বোঝো তোমরা? শিখে নিলে কি আমি  বুঝতে পারব ?'
' না  ভাই , তোমরা পারবে না। পারবে কি করে, তোমরা তো প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছ। বন্ধু হলে তবে না মন বুঝতে পারবে।'
তিতলি অবাক হয়ে দেখে টুনটুনিকে ।
টুনটুনি বলে, ' চলিগো বন্ধু। আমার এখন অনেক কাজ। সঙ্গী খুঁজতে হবে,  বাসা বানাতে হবে। টা - টা।'


সায়েন্টিস্ট হাঁদা
প্রিয়ান্য দাস
ষষ্ঠ শ্রেণি
পিএমশ্রী জওহর নবোদয় বিদ্যালয়
পশ্চিম মেদিনীপুর

সুন্দরবনের জঙ্গলে এক বাঘ বাস করত তার যত বন্ধু ছিল তার মধ্যে সবথেকে ভিতু ও বোকা ছিল সে। রয়েল বেঙ্গল - যার নাম শুনলেই জঙ্গলের পশুপাখিরা ভয় পায়, সেখানে এই মহাশয় কুকুরের ডাকেই ভয়ে দৌড়ে পালায়। তাই তার নাম রাখা হল হাঁদা। হাঁদার বাবা শিকারের ওপর
নাকি পিএইচডি করেছে। তাই তাঁর ইচ্ছা হাঁদাকেও উচ্চ শিক্ষিত করার। 
সেই কারণে বাঘেদের স্কুল ব্যাঘ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে হাঁদাকে ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু প্রথমদিন হাঁদা স্কুলের রাস্তা ভুল করে নিজের স্কুলে না গিয়ে সুন্দরবন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে উপস্থিত হল। 
তাকে দেখে প্রথমেই দারোয়ান অজ্ঞান হয়ে গেল। তা ভ্রূক্ষেপ না করে হাঁদা সোজা দ্বিতীয় শ্রেনির ক্লাসে ঢুকে টেবিলে উঠে বসে গেল। বাঘ দেখে ছাত্রছাত্রীরা চিৎকার করে পালাতে শুরু করল। ছাত্রছাত্রীদের চিৎকার শুনে অঙ্কের স্যার দৌড়ে এসে দেখেন টেবিলের ওপর হাঁদা বসে আছে। 
অঙ্কের স্যার অত্যন্ত সাহসী ও রাগী ছিলেন। তিনি হাঁদাকে টেবিলে বসার জন্য খুব বকলেন। এবং তাকে ফার্স্ট বেঞ্চে প্রশান্তের পাশে বসতে বললেন। 
ভীতু হাঁদা তাই করল। এবার অঙ্কের ক্লাস শুরু হলে প্রথমেই স্যার হাঁদাকে আটের নামতা বলতে বললেন। হাঁদা হালুম হুলুম করে বলল, আট এক গুণে আট, আট দুই গুণে আশি... অমনি স্যার খুব বকলেন হাঁদাকে। হাঁদা খুব কন খারাপ করে স্কুল ছুটি অব্ধি বসে রইল। পাশে বসা প্রশান্ত অনেক চেষ্টা করল হাঁদার মন ভাল করতে। কিন্তু হাঁদার মন ভাল হল না। 
সে স্কুল ছুটি হতেই কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি গিয়ে বলল, আমি আর স্কুলে যাবনা।
হাঁদার বাবা ছেলে কে স্কুল না যাবার কারণ জিজ্ঞেস করতে, হাঁদা বলল, স্যার খুব রাগী, কেবল বকে। 
হাঁদার বাবা সব শুনে হেসে বলল, তুই বাঘেদের স্কুলে না গিয়ে প্রাথমিক স্কুলে গেছিলিস। 
হাঁদা তখন নিজের ভুল বুঝতে পেরে বলে, সে পরেরদিন বাঘেদের স্কুলে যাবে। বাঘেদের স্কুলে যাবার পথে তার প্রশান্তের সঙ্গে দেখা হয়। এবং সেদিনও প্রাথমিক বিদ্যালয়েতেই যায়। সেদিন সায়েন্স ক্লাস হয়। সায়েন্স স্যার বাঘেদের নিয়ে অনেক গল্প বলেন। হাঁদার সায়েন্স ভাল লেগে যায়। সে সেদিন বাড়ি গিয়ে বাবাকে বলে সে সায়েন্টিস্ট হতে চায়।
হাঁদার কথা শুনে বাবা বলেন, বাঘেদের মধ্যে সায়েন্টিস্ট প্রায় নেই বললেই চলে তাই হাঁদা সায়েন্টিস্ট হলে খুবই ভাল হয়। কিন্তু বেঁচে থাকতে গেলে ভাল শিকারীও হতে হবে। এখন নাহয় বাবা মা শিকার করে এনে হাঁদাকে খাওয়ায় কিন্তু ভবিষ্যতে যখন তারা থাকবে না তখন হাঁদা কীভাবে খাবে?


ধারাবাহিক উপন্যাস - পর্ব ১৩

গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ
রতনতনু ঘাটী

স্কুলের হাফ ডে আজ। শনিবার। দেবোপমস্যার অ্যাসেম্বলি হলেই প্রেয়ারের পর ঘোষণা করে দিলেন, ‘আজ স্কুলের হাফ ডে-র পর তোমরা সকলে মাঠে চলে যাবে। আজ ভরপুর ক্রিকেট কোচিং করাব। কেউ যেন কোচিংয়ে অ্যাবসেন্ট না থাকে!’ একটু থামলেন দেবোপমস্যার। খানিক তাকিয়ে নিলেন হেডস্যারের মুখের উপর। হেডস্যার মাথা নাড়িয়ে সম্মতির ঢঙে কিছু একটা বললেন। সে কথা বুঝে নিয়ে দেবোপমস্যার বললেন, ‘লোকন দাস! ক্লাস এইট সি-সেকশান। উঠে দাঁড়াও তো!’
   প্রেয়ার হলে উঠে দাঁড়াল লোকন। মাথাটা খানিক নিচু। দেবোপমস্যার বললেন, ‘হ্যাঁ, লোকন, আজ থেকে তুমি স্কুলের ক্রিকেট টিমে চান্স পেয়েছ! তুমি সি-সেকশানের দেবক সাহার জায়গায় ক্লাস এইট সি-সেকশানের উইকেট কিপিং করবে! মন দিয়ে খেলবে!’
   ক্লাস এইট এ-সেকশনের রোরো মজুমদার হাত তুলেছিল। আমাদের স্কুলের নিয়ম হল, প্রেয়ার হলে কারও কোনও প্রশ্ন থাকলে প্রথমে হাত তুলতে হবে। তারপর হেডস্যারের অনুমতি মিললে উঠে দাঁড়িয়ে সে বলতে পারবে তার প্রশ্নটা। উঠে দাঁড়িয়ে হাত তুলল রোরো। হেডস্যার বললেন, ‘বলো, তুমি কী বলবে রোরো?’
   ‘আমি জানতে চাইছিলাম স্যার, আমাদের ক্রিকেট টিম থেকে বাদ পড়ল কেন দেবক সাহা? ও তো ক্রিকেট টিমে কোচিং ভালই করত।’ 
   হেডস্যার বললেন, ‘না না, দেবক সাহা বাদ পড়েনি টিম থেকে। ওর মেজদির বিয়ে ঠিক হয়েছে এ মাসে। তাই দেবক মেজদির বিয়েতে মধুপুর চলে গেছে পনেরো দিনের ছুটি নিয়ে। আর ওই সময় দেবোপমস্যার ক্রিকেট কোচিং ক্লাসটা সপ্তাহে বাড়িয়ে দিয়ে দু’ দিন করে দিয়েছেন। সেই কথা ভেবে দেবক ক্রিকেট কোচিং থেকে মোট দিন চারেক কামাই করে ফেলবে। তাই বিবেচনা করে আমি লোকন দাসকে টিমে নিতে বলেছি! লোকনের দিদি পারুলমণি আমার কাছে অনুরোধ জানাতে এসেছিল একদিন, যাতে ওর ভাইকে ক্রিকেট টিমে নিই। আমি নেওয়ার কে? আমি বলেছিলাম দেবোপমস্যারের কথা। বলেছিলাম, দেবোপম ভেবে দেখুক, লোকনকে টিমে নেওয়া যাবে কিনা! দেবোপম ভেবে নিয়ে লোকনকে বলেছিল, না, টিমে জায়গা হবে না। একবার টিম তৈরি হয়ে গেলে তার নড়চড় করা যাবে না। মাঝখান থেকে দেবকের মেজদির বিয়েটা এসে গেল! লোকনের সুযোগ এসে গেল তক্ষুনি। তা ছাড়া লোকন উইকেট কিপিংটা ভালই করে! ও খেলুক না ক’টা দিন! তারপর দেখা যাবে!’
   সম্মতির ঢঙে ঘাড় নেড়ে বসে পড়ল রোরো। সি-সেকশনের বাঁ-হাতি বোলার নাতাশা এবার হাত তুলল। হেডস্যার বললেন, ‘তুমি কী জানতে চাও নাতাশা?’
   একটা লম্বা ঢোক পেটের ভিতর চালান করে দিয়ে নাতাশা গলাটা নামিয়ে নিয়ে বলল, ‘দিদির বিয়ে শেষ হয়ে গেলে মধুপুর থেকে ফিরে এসে দেবক সাহা কি সি-সেকশনের ক্রিকেট টিমে ফের খেলতে পারবে?’
   হেডস্যার হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, পারবে না কেন? তবে ততদিনে লোকন যদি উইকেট কিপিংটা ভাল ভাবে রপ্ত নিতে পারে, এবং দেবোপমস্যার যদি টিমে লোকনকে নেওয়ার দরকার মনে করেন, তখন আমি ভেবে দেখব কে টিমে থাকবে, দেবক না লোকন দাস?’
   এর পর হেডস্যার ঘোষণা করলেন, ‘যাও, সকলে এখন ক্লাসে চলে যাও। তারপর আমরা সকলে ক্লাসের পর মাঠে চলে যাব। আজ আমাদের মাঠে জমজমাট ক্রিকেট কোচিং আছে।’
   সকলে পর পর ক্লাসে চলে গেল। হেডস্যার তাঁর রুমে ফিরে এসে ফোন করলেন নিধিভূষণ প্রাইমারি স্কুলের হেডস্যার দেবেন্দ্রলাল সামন্তকে, ‘দেবেন্দ্রলালবাবু, আপনার স্কুলের পারুলমণি দাস স্কুলে ভালভাবে পৌঁছে গেছে তো? আমি চিন্তা করছিলাম ওর জন্যে। মেয়েটা চোখে তো দেখতে...!’
   দেবেন্দ্রলালবাবু বললেন, ‘জানি স্যার! সে আপনি নতুন করে কী জানাবেন? আমি সব জেনেই তো পারুলমণিকে স্কুলের কাজে নিয়েছিলাম। পিতৃমাতৃহীন মেয়ে, কোথায় যাবে? তাই আমার স্কুলেই জায়গা হয়ে গেল। ও কিন্তু সব কাজ ঠিকঠাকই করে ফেলতে পারে!’ 
   এদিকে তখনও ফোনটা ধরে আছেন হেডস্যার নবনীত মুখোপাধ্যায়। ওদিক থেকে তখনও কথা বলে চলেছেন দেবেন্দ্রলালবাবু, ‘আমি আপনাকে একটা কথা বলি স্যার, চোখের আলো যাদের নেই স্যার, তারা নিজেদের আলোতেই তাঁদের জ্ঞানের আলোর শিখা ছড়িয়ে দেয় চারদিকে। তখন সে আলোকে চারদিক আলোকিত হয়ে ওঠে। আপনাকে আমি কী আর বলব স্যার? কতটুকুই বা জানি? নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন হেলেন কেলার নামের যে মেয়েটি? তিনি তো দৃষ্টিশক্তিহীন ছিলেন! তিনি নাকি নকশিকাঁথাও সেলাই করতেও পারতেন অন্ধ দু’চোখ নিয়ে। একটি বইতে আমি  পড়েছি স্যার, যেসব মানুষের দৃষ্টিশক্তি নেই, তারা কোনও কথা শুনলে তা স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তির মানুষের চেয়েও বেশি মনে রাখতে পারেন।’
   ফোনে নবনীতস্যার দেবেন্দ্রবাবুর কথার উত্তরে বললেন, ‘তবে জানেন তো দেবেন্দ্রলালবাবু, আমাদের পারুলমণি যেসব রাস্তা দিয়ে রোজ যাতায়াত করে, সেসব রাস্তা খুব ভালভাবে ওর জানা হয়ে গিয়েছে। তা না হলে এই তো আমার রুম থেকে পারুলমণি বেরোল আপনার স্কুলে পৌঁছনোর জন্যে খানিক আগে। এর মধ্যেই সে স্কুলে পৌঁছে গেল? আমি তো অবাক হয়ে গেলাম!’
  নবনীতস্যার ফোনে আরও বললেন, ‘ঠিক আছে দেবেন্দ্রলালবাবু, আমি এখন রাখি। পরে এ নিয়ে কথা হবে আপনার সঙ্গে? কেমন?’ 
   ততক্ষণে মনে পড়ে গেল, এই যাঃ! মুকুলকৃষ্ণবাবুকে তো আজকের ক্রিকেট কোচিং দেখতে আসার ব্যাপারে ডাকা হয়নি? আজ তো জমজমাট কোচিং হবে, দেবোপমস্যার বলেছেন! সঙ্গে-সঙ্গে তাঁকে ফোন করলেন হেডস্যার, ‘হ্যালো মুকুলকৃষ্ণবাবু, আজ বিকেলে আপনি কি খুব ব্যস্ত আছেন?’
   ‘ব্যস্ততা খানিক আছেই তো! আজ আমার ডি এম অফিসে একটা মিটিং। একটার সময়।’
   নবনীতস্যার বললেন, ‘আপনাকে আমরা জানাতে ভুলেই গেছি, আজ বিকেলে আমাদের স্কুলের ক্রিকেট কোচিং দেখতে আপনাকে আসতেই হবে কিন্তু! দেবোপম বলেছে, আজ নাকি জমজমাট কোচিং হবে!’
(প্রচ্ছদটি AI এর সহায়তায় এঁকেছেন রাজীব কুমার ঘোষ)

   ‘তা হলে তো যেতেই হবে! আমি যদি কিছুটা আগে স্কুলে পৌঁছ যেতে পারি, তা হলে তো কথাই নেই। আপনার রুমে বসে জমিয়ে এক কাপ চা খেয়ে তারপর মাঠে যাব কোচিং দেখতে। আর যদি দেখেন, তখনও আপনার কাছে পৌঁছতে আমার দেরি হচ্ছে, তা হলে ধরে নেবেন, আমি সরাসরি স্কুল মাঠের কোচিংয়ে গিয়ে হাজির হয়ে যাব। আজ আমার নবীনগঞ্জ ডি এম অফিসে মিটিং আছে বেলা একটার সময় ডি এম সাহেব কর্ণার্জুন পালের সঙ্গে। উনি নাকি ভেবেছেন, স্কুলের ছেলেদের নিয়ে মাধ্যমিক স্তরে নবীনগঞ্জ জেলায় একটা সরকারি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট করবেন। আজই প্রথম মিটিং।’
   ফোনে সে কথা শুনে নবনীতস্যার বললেন, ‘ছেলেদের নিয়ে শুধু কেন ক্রিকেট টুর্নামেন্ট? মেয়েদেরও ওরকম একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্টের প্রস্তাব দিন আজকের মিটিংয়ে। জোর দিয়ে বলবেন, মেয়েদেরও একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হোক! আমাদের মেয়েদের ক্রিকেট টিম মেয়েদের বিশ্বকাপ জয় করে এনেছে। মেয়েদের টুর্নামেন্ট হবে না কেন? আপনিই বলুন?’
   ‘আমি কলকাতা থাকার সময় তখন পুরোপুরি ক্রিকেটে ডুবে থাকতাম। সেটা উনিশশো একাত্তর সাল নাগাদ। তখনই কলকাতায় ইন্ডিয়া ওমেনস ক্রিকেট ফেডারেশন গড়ে উঠেছিল। এরপর ভারতে, বিশেষ করে বাংলা ও কলকাতায় এই খেলাটি সাংগঠনিকভাবে চালু হয়।’
   আপনি আজকের মিটিংয়ে মেয়েদের ক্রিকেট টুর্নামেন্টের পক্ষে যদি সুপারিশ করেন, আমি তা হলে আপনার সঙ্গে যাব ওই মিটিংয়ে আপনার কথা শুনতে!’
   ওদিক থেকে হাসি ভেসে এল। মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি বললেন, ‘চলুন না! আমি এখনই ডি এম সাহেব কর্ণার্জুন পালকে ফোন করে বলছি আপনার যাওয়ার কথা!’ একটু থেমে থাকার পর বললেন, ‘মন্দাকিনীকে বলছি, এক্ষুনি আমাকে খেতে দিতে। তারপর আমি আপনার স্কুল থেকে আপনার সঙ্গে ডি এম অফিসে রওনা দেব!’
   ফোন রেখে দিয়ে কথামতো তড়িঘড়ি সব ব্যবস্থা করতে বললেন দেবোপমস্যারকে। বললেন, ‘দেবোপম, তুমি আজকের ক্রিকেট কোচিংয়ের সব ব্যবস্থা করো! আমি আর মুকুলকৃষ্ণস্যার, আমরা ডি এম অফিসে যাচ্ছি! ওখানে নবীনগঞ্জ জেলায় সরকারিভাবে স্কুলের ছেলেদের নিয়ে একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু করা যায় কিনা, সে বিষয়ে আলোচনা হবে। ডি এম কর্ণার্জুন পাল জেলার ক্রীড়া-অনুরাগীদের ডেকেছেন। সেই হিসেবে মুকুলকৃষ্ণস্যারও ডাক পেয়েছেন। আমি ওঁর সঙ্গে যাচ্ছি ওই মিটিংয়ে। ওই টুর্নামেন্ট শুধু ছেলেদেরই নয়, যাতে মেয়েদের নিয়েও ওরকম একটা টুর্নামেন্ট করা যায়। মুকুলকৃষ্ণ স্যার আমি সুপারিশ করব!’
   দেবোপমস্যার ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে বললেন, ‘স্যার, মুকুলকৃষ্ণবাবুকে বলবেন, উনি যেন আমাদের দেশের মিতালি রাজের কথা তোলেন। উনিই তো ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের কিংবদন্তি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান করেছেন মিতালি রাজ। তাঁর তেইশ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি দশ হাজারের বেশি রান করেছেন। ওরকম একটা মেয়েদের টুর্নামেন্ট সত্যিই যদি করা যায়, তা হলে মিতালি রাজকেই টুর্নামেন্ট উদ্বোধন করতে বলা হয় যেন! তা হলে স্যার, আমাদের স্কুলের মেয়েদের নিয়ে আমরাও একটা ক্রিকেট-টিম দেব!’
   ততক্ষণে দেখা গেল মুকুলকৃষ্ণস্যার সাইকেল চালিয়ে গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠের মাঝখান দিয়ে স্কুলের দিকেই আসছেন। সঙ্গে-সঙ্গে হেডস্যারও তাঁর সাইকেল নিয়ে প্যাডেলে পা রাখলেন। দেবোপমস্যার দেখলেন, দু’জন ক্রিকেট পাগল মানুষ বাঁইবাঁই করে সাইকেল চালিয়ে মাঠের কর্পূর গাছের নীচ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে চলেছেন ডি এম অফিসের দিকে!
( এর পর ১৪ পর্ব)


পাঠপ্রতিক্রিয়া
আলোচক - স্বাগতা ভট্টাচার্য

বহুদিন ধরে মৌসুমী ঘোষ নিঃশব্দে একটা ভালো কাজ করে চলেছে, "ছোটবেলা"র সম্পাদনা সুন্দর ভাবে করে  যাচ্ছে।  এই অনলাইন ম্যাগাজিনের মাধ্যমে আগামী দিনের সাহিত্য পাঠক বা লেখক, শিল্পীদের আমরা খুঁজে পাচ্ছি এইভাবে সাহিত্যের সলতে পাকানো র কাজ ঘটে চলেছে! ছেলেবেলার এই সংখ্যায় প্রথমেই রয়েছে রামতনু ঘাটীর লেখা ধারাবাহিক, "গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ"এই লেখাটি পড়ার জন্য অপেক্ষায় থাকি নিজেদের স্কুল বেলার কথা মনে পড়ে পাশাপাশি একসময় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা মনে পড়ে যাচ্ছে। 
সপ্তম শ্রেণির সম্বিত মাহাতোর লেখা "সুভাষের ঠিক বেঠিক" কবিতাটা বেশ ভালো লাগলো, 
একজন পাঠক হিসেবে যথেষ্ট উপভোগ করেছি, এরপর আছে ধ্রুবজ্যোতি দের ধারাবাহিক লেখা "নির্মল স্যারের ক্লাস"এই সংখ্যায় লেখাটা শেষ হল তাই একটু মন খারাপ লাগলো, এক নিঃশ্বাসে পড়ার মতোই বেশ শিক্ষামূলক একটি লেখা, দ্বিতীয় শ্রেণীর আয়ুস্মিতা সামন্ত আমাদের মুগ্ধ করে দিয়েছে সরস্বতী ঠাকুর এঁকে !অর্ঘ্য দের লেখা "ঈদের চাঁদ" কবিতাটি  বেশ ভালো লাগলো, এভাবেই ছোটবেলা আরো সমৃদ্ধ হোক, প্রত্যেক রবিবার অপেক্ষা থাকুক..আজকের এই সময়ে এই নিরলস চর্চা প্রশংসার দাবী করে। 

🍂

Post a Comment

0 Comments