জ্বলদর্চি

তেঁতুল/ভাস্করব্রত পতি

বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১১৮
তেঁতুল

ভাস্করব্রত পতি

'পুরানো চাঁদ দেখে তেঁতুল হল বঙ্ক
গেঁড়িগুগলি এরা বলে আমরা তো শঙ্খ। 
ডেঙরা কাক বলে আমি করব একাদশী
লেজকাটা কুকুর বলে -- যাবো বারাণসী'।। 
আকাশের বাঁকা চাঁদের মতো তেঁতুলের আকৃতি বাঁকা হলেও তেঁতুলের কখনও চাঁদ হওয়ার যোগ্যতা নেই। কিন্তু আমাদের রসনা তৃপ্তি করার যোগ্যতা ষোলো আনাই রয়েছে। টোকো স্বাদের তেঁতুল সবসময়ই প্রিয়। তাইতো বলা হয়ে থাকে 'কন্ঠায় তেঁতুল দিলে দই হয়'। 

সকলের প্রিয় খাবার ফুচকা বা গোলগাপ্পার মূল উপাদান তো তেঁতুল মেশানো জল। এই বিশেষ ধরনের জল ছাড়া ফুচকার কোনও গুরুত্বই নেই। দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন খাদ্যে তেঁতুলের ব্যবহার বিশেষ উল্লেখযোগ্য। রাসম, সম্বর তৈরিতে তেঁতুলের দরকার। গ্রামাঞ্চলে চুনোমাছ আর পুরোনো তেঁতুল দিয়ে টকের আস্বাদন যে এখনও পায়নি তাঁর ভাগ্য খারাপ বলা যায়। আমাদেরই মতো সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডেও মাছের সুস্বাদ আনতে মাছের সাথে তেঁতুল মেশানো হয়। তেঁতুলপাতাও টক স্বাদের। মায়ানমারে তেঁতুলের ফুল ও টোকো পাতা শাক হিসেবে খাওয়া হয়। সরস্বতীর বরপুত্র নদীয়ার বুনো রামনাথ তেঁতুল পাতার ঝোল খেয়েছিলেন। ওড়িশার গ্রামাঞ্চলে গরিব লোকজনের দুরবস্থায় এই তেঁতুল পাতা হয়ে ওঠে অন্যতম সুজনবন্ধু। তাঁরা কচি তেঁতুলপাতা বেটে লঙ্কা ও নুন মিশিয়ে বড়ার মত ভেজে পান্তাভাত দিয়ে খায়। কথায় বলে, 'যদি হই সুজন / তেঁতুল পাতায় দুজন'। 
গাছে ঝুলছে তেঁতুল

গ্রীষ্মের দুপুরে পাকা তেঁতুল, নুন, গুঁড়োলঙ্কা মিশিয়ে রোদে গরম করে চাঁট বানিয়ে খাওয়ার মজাও বেশ অন্যরকম। একসময় দোকানে মিলতো 'তেঁতুল চাঁট'। ছোটবেলায় এই বিশেষ জিনিসটি তৎকালীন ছোটদের কাছে ছিল লটারির মতো। ভাগ্য ভালো থাকলে তেঁতুল চাঁটের মধ্যে মিলতো বাঁশি, পেনসিল, রেজার, নাকছাবি ইত্যাদি। তখন তো আর আজকের মতো ফার্স্ট ফুডের প্রচলন ছিল না। কাগজে মোড়া এই কমদামি তেঁতুল চাঁটের যে কি চাহিদা এবং মহিমা ছিল তা আজ ভাবলে অবাকই হতে হয়। আর খড়ের আগুনে তেঁতুল বিচি পুড়িয়ে খাওয়ার অভিজ্ঞতা তো আজকের প্রজন্মের কাছে অলীক কল্পনা। 

যাইহোক এই ভরা চৈত্রমাসে কিন্তু নুন ছাড়া তেঁতুল খাওয়ার বিধি রয়েছে। আসলে এর পেছনে একটি লোককাহিনির খোঁজ মেলে। কোনও একসময় পার্বতীকন্যা ঊষা গণেশের সঙ্গে খেলায় মত্ত হয়ে ওঠেন। কোনও হুঁশ ছিল না তখন। শিব কাছে এলেও নজর পড়েনি তাঁদের। সামান্যতম তাকানোর প্রয়োজন বোধ করেনি তাঁরা। এতে ভয়ানক রুষ্ট হন দেবাদিদেব মহাদেব। তৎক্ষণাৎ তিনি তাঁর পুত্র গণেশের মাথা কেটে দেন। মাথাহীন গনেশকে দেখে ভয় পেয়ে একটা লবণের পাত্রের মধ্যে লুকিয়ে পড়েন ঊষা। এরপর পার্বতীর অনুরোধে শিব গণেশের আসল মাথার পরিবর্তে হাতির মাথা যুক্ত করে দিলে গনেশ ফিরে পায় নতুন জীবন। আর সেই লবনের পাত্র থেকে ঊষাকে উদ্ধার করে পার্বতী অভিশাপ দেয় ঊষাকে। অভিযোগ, গনেশকে ঠিকভাবে নজর না দেয়নি ঊষা। আজ তাঁর জন্যেই গণেশের এই দশা। অভিশাপ অনুযায়ী বানাসুরের কন্যা হিসেবে  ঊষাকে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করতে হবে। এই অভিশাপ শুনে ঊষা কাতর প্রার্থনা করতে লাগল। মুক্তির উপায় জানতে চাইল। তখন পার্বতী জানায়, অভিশাপ ফেরানো তো সম্ভব নয়। তবে ঊষার কথা ভেবে এবং তাঁর সম্মানে চৈত্র মাসে মানুষ নুন ছাড়া তেঁতুল খাবে। সেই থেকে এই রীতি চলছে। 

প্রাচীন বৈদ্যশাস্ত্রে পাই - 'জীবনং জীবনং হন্তি প্রাণান্ হন্তি সমীরণঃ। / কিমাশ্চর্য্যং ক্ষারভূমৌ প্রাণদা যমদূতিকা'। এখানে তেঁতুলকে বলা হয়েছে 'যমদূতিকা'। যম অর্থাৎ সংযমশক্তি। যা প্রাণবায়ুকে সংযত করে, তাইই সংযমশক্তি। অম্লরসই সংযমের ক্ষেত্রে মূল ক্রিয়াশক্তি। আর 'দূতিকা' হ'ল শক্তিধারিণী বা বাহক। তাই তেঁতুলকে বলা হয় 'যমদুতিকা'।
ধানজমির পাশে তেঁতুল জড়ো করে রাখা হয়েছে

তেঁতুলকে সংস্কৃতে অম্লিকা, চিঞ্চা, তিন্তিড়ী, ইংরেজিতে Tamarind, হিন্দিতে ইমূলী, মালয়লামে চিঞ্চ, গুজরাটিতে অম্বালী, তেলুগুতে চিন্তাচেটু চিন্ট, ওড়িয়াতে কংআং, কন্নড়ে হুনিসে, হুণিসেহেনু, হুণি সিজয়লে, তামিলে পুঠঠি, অসমীয়াতে তমবহি বলে। এছাড়াও তেঁতুলকে আরও যে যে নামে ডাকা হয়, সেগুলি হল - তিন্তিড়ীক, সুতিন্তিড়া, চিঞ্চা, অম্লিকা, আম্লিকা, চুঞ্চু, চুক্রিকা, সুচক্রিকা, চরিত্রা, ভুক্তা, শাকচুক্রিকা, পিচ্ছিল, গুরুপত্রা, ভুক্তিকা, অত্যম্লা ইত্যাদি। এটি Fabaceae গােত্রভুক্ত। তেঁতুলের বিজ্ঞানসম্মত নাম Tamarindus indicus। এছাড়াও আরও কিছু প্রজাতি হল --
Cavaraea elegans
Tamarindus erythraeus
Tamarindus occidentalis 
Tamarindus officinalis 
Tamarindus somalensis 
Tamarindus umbrosa 

এটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আফ্রিকার বাসিন্দা। প্রায় ২০ - ২৫ মিটার উচ্চতার হয়। এই গাছের শীর্ষদেশ বহু আয়তন জুড়ে হয়। ডালপালাও বেশ প্রসারিত। ছায়াদানকারী এই বৃক্ষ বহু পাখির নিরাপদ আশ্রয়। একসময় বেশিরভাগ গ্রামে প্রচুর বড় বড় তেঁতুলগাছ দেখা যেত। তখন ঐ গাছটিই হয়ে উঠত এলাকার প্রধান পরিচয়জ্ঞাপক নিদর্শন। পাঁশকুড়া থানার সাহড়দা গ্রামেও এরকম একটি বিশাল তেঁতুলগাছ ছিল আজ থেকে ৩৫ বছর আগে। বহুদুর থেকে গাছটি দেখা যেত। গাছের মগডালে ছিল শকুনের বাসা। অসংখ্য শকুন থাকত সেখানে। সেই গাছের তলায় শেকড়ের ঘেরাটোপের মধ্যে খেলাধুলা করত গ্রামের ছেলেমেয়েরা। তা থেকেই মাঠটির নামকরণ হয়েছিল - 'তেঁতুলতলা'। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাতেও এরকমই বৃদ্ধ তেঁতুলগাছের বিবরণ মেলে -
'দেখি পথের ধারে তেঁতুলশাখার কোণে
লাজুক একটি মঞ্জরী,
মৃদু বসন্তী রঙ, মৃদু একটি গন্ধ,
চিকন লিখন তার পাঁপড়ির গায়ে
শহরের বাড়িতে আছে
শিশুকাল থেকে চেনাশোনা অনেক কালের তেঁতুল গাছ,
দিক্‌পালের মতো দাঁড়িয়ে উত্তর পশ্চিম কোণে,
পরিবারের যেন পুরোনো কালের সেবক,
প্রপিতামহের বয়সী'। 
তেঁতুলের ফুল

হঠাৎ একদিন সেই তেঁতুলগাছটি কেটে নেওয়ায় এবং সেই জায়গাটি অন্যভাবে দখলিকৃত হওয়ায় সেখানে এখন কেউ খেলেনা। আর কোনওদিন ঐ এলাকার নাম 'তেঁতুলতলা' হিসেবেও উচ্চারিত হয়না। তেঁতুলকে কেন্দ্র করে এরকমই বেশকিছু স্থাননামের সন্ধান পাওয়া যায় বিভিন্ন স্থানে। যেমন - তেঁতুলিয়া, তেঁতুলতলা, তেঁতুলিয়াগিরি, দক্ষিণ তেঁতুলিয়া, তেঁতুলমুড়ি, তেঁতুলবেড়িয়া গ্রামনামগুলির সৃষ্টি 'তেঁতুল'গাছের নাম থেকেই। এই ধরনের স্থাননামের সৃষ্টির পিছনে মূল কারণ তেঁতুল গাছের বিশাল বপু। 

তেঁতুল ফুলের রূপটিও চমৎকার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'শ্যামলী' কাব্যের 'তেঁতুলের ফুল' কবিতায় পাই -
'জীবনের অনেক, ধন পাইনি,
নাগালের বাইরে তারা;
হারিয়েছি তার চেয়ে অনেক বেশি
হাত পাতিনি ব'লেই।
সেই চেনা সংসারে
অসংস্কৃত পল্লীরূপসীর মতো
ছিল এই ফুল মুখঢাকা,
অকাতরে উপেক্ষা করেছে উপেক্ষাকে
এই তেঁতুলের ফুল'। 
এদের পুষ্পদল তিনটি এবং পুংকেশর তিনটি। বসন্তকালে এদের নূতন পাতা গজায়, কিন্তু পুরাতন পাতা একেবারে ঝরে যায় না। 

তেঁতুলের মধ্যে থাকে Amino Acid, Tartaric Acid, Malic acid, Polysaccharide এবং Oxalic acid। এছাড়াও থাকে ভিটামিন এ, সি, থিয়ামিন (Thiamin), নিয়াসিন (Niacin), রাইবোফ্লেবিন (Riboflavin), ফলিক অ্যাসিড (Folic acid) ইত্যাদি। এগুলি সবই খুব উপকারী। পুরোনো তেঁতুলের উপকারিতা দারুণ। হাত পা ফোলা, বুকে সর্দি জমা, পেটে বায়ু জমলে তেঁতুলের কার্যকারিতা লক্ষ্য করা যায়। পুরোনো আমাশা, বসন্ত, কাঁচা সর্দি, হাঁচি, কাশি, পিত্তবিকারজনিত প্রস্রাবের জ্বালা, নাক দিয়ে কাঁচা জল পড়া, রক্তস্রাবী অর্শ রোগ, মচকানো ব্যাথা, বাতের ব্যাথা, পুরাতন ক্ষত, মুখের ক্ষতের নিরাময়ে তেঁতুলের গুরুত্ব অপরিসীম। কাঁচা অথবা পাঁকা তেঁতুল খেলে উচ্চ রক্তচাপ কমতে বাধ্য। এর থেকে অনেক জ্বালানী ও আসবাব তৈরির কাঠ পাওয়া যায়। 
তেঁতুল পাতা

তেঁতুল নিয়ে অসংখ্য প্রবাদ রয়েছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রবাদ হল 'যেমন বুনো ওল, তেমন বাঘা তেঁতুল'। এটিই অন্যভাবে উচ্চারিত হয় 'যেমন আদাড়ে কচু, তেমন বাঘাটে তেঁতুল'। এটির পাঠান্তরে পাই, 'যেমন তুমি বাঘা কচু, তেমনি আমি বাঘা তেঁতুল'। এছাড়াও তেঁতুলকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে 'পর লাগে না পরে / তেঁতুল লাগে না জ্বরে', 'রামচাঁদে তেঁতুল খায় / শ্যামচাঁদে বাড়ি মারে', 'আমগুণে বান / তেঁতুল গুণে ধান', 'কলকাতার ছিস্টি / গুড়ে নেই মিস্টি / তেঁতুলে নেই টক / কলকাতার ঢপ', 'কাঁচা তেঁতুল যেমন তেমন / পুরানো তেঁতুল বিকারে', 'জ্বরো রোগী স্বপ্ন দেখে / চিঁড়ে আর তেঁতুল মাখে', 'তেঁতুল তলা দিয়ে গেলে / দুধ কি বসে যায় গলে' ইত্যাদি। 

নানা বৈদিক সমীক্ষায় কথিত যে, তাল, তেঁতুল ও কুলগাছের পরিমান্ডলিক বায়ু স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। তাই হয়তো প্রবাদের আঙিনায় উচ্চারিত হয় - 'তাল তেঁতুল কুল / তিনে বংশ নির্মূল'। তেমনি তাল, তেঁতুল এবং দই খেলে স্বাস্থ্যের বিপদ অবশ্যম্ভাবী। তাই প্রবাদে রয়েছে - 'তাল তেঁতুল দই / বৈদ্য বলে ওষুধ কই'। ঠিক এরকমই বিষয় নিয়ে আরও কয়েকটি প্রবাদ লোকমুখে শোনা যায়। যেমন - 'তাল তেঁতুল বাবলা / কি করবে দুধুমুখি একলা', 'তাল তেঁতুল মাদার / তিনে দেখায় আঁধার' এবং 'নিম নিশিন্দা তেঁতুল তাল / ঘরে পুঁতোনা কোনো কাল'। 

খনার বচনে পাই, 'যত কুয়া আমের ক্ষয় / তাল তেঁতুলের কিবা হয়'। অর্থাৎ কুয়া বা কুয়াশা হলে আমের ক্ষতি হলেও তেঁতুলের ক্ষেত্রে প্রভাব পড়ে না। নতুন জিনিসের যত্নআত্তি বেশিই হয়। সেটাই প্রবাদের মাধ্যমে পাই 'নূতন নূতন তেঁতুলের বিচি / পুরানো হলে আতায় বাতায় গুঁজি'। বাংলা সাহিত্যেও এটি অনুসৃত হয়েছে। দীনবন্ধু মিত্রের কবিতায় আছে, 'পুরানো তেঁতুলের বিচি আমি হে এখন'। আবার 'বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো'তে পাই 'হাজার হোক নেড়ের জাত কিনা... কথায় বলে তেঁতুল নয় মিস্টি, নেড়ের নয় ইষ্টি'। কথায় কথায় বলতে শোনা যায় এই প্রবাদ 'তেঁতুল নয় মিস্টি / নেড়ে নয় ইষ্টি'।🍂

Post a Comment

0 Comments