জ্বলদর্চি

অনন্তকাল এগিয়ে চলা ও কুবাই দর্শন /ভবেশ মাহাত


অনন্তকাল এগিয়ে চলা ও কুবাই দর্শন 

ভবেশ মাহাত


কবি সুমন রায় এর ' বুকেধরে তোমার রুমাল' বইটি পড়তে পড়তে সহজেই কুবাই নদীর পাড়ে পৌছে যাওয়া যায়। কুবাই নদীতে নৌকা 
চালানোর অভিজ্ঞতা নেই অথবা চালবে কিনা তাও জানি না, তবে কবির স্মৃতির সহায় হয়ে কুবাই ও কুবাই এর পাড়ের রূপ সৌন্দর্য, তার বিভিন্ন সময়ের যে পরিবর্তন তা সহজে আত্মস্থ করা যায় 'অবগাহন'  কবিতায় সুমন বাবু লিখেছেন ' কৈশোরের সেই স্নানবন্ধু কুবাই / এখন ফিতের মতো বয়ে যায় / নেপথ্য নায়িকার মতো।' এরকম বেশ কিছু কবিতা রয়েছে। আর নদী তো নারী-ই। সুতরাং কবির মনে কুবাই নেপথ্য নায়িকা হয়ে থাকলে ক্ষতি কোথায়? 'সেই তুমি' কবিতায় 'তোমার সাথে কথা বলতে বলতে/ অন্যমনষ্ক হয়ে/ দূরের কুয়াশা ঢাকা গ্রামে যেতাম।' 'ছেলেবেলায় প্রানোচ্ছল ছিলে তুমি, কখনো ছুটি চাওনি তুমি, তখনও যমুনার মতো / অজস্র স্রোতে সাবলীল। ' কবিতাগুলি পড়তে পড়তে সুমন বাবু 'নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ' এই প্রশ্নই করে গেছেন কুবাইকে এবং তার উত্তর আজও খুঁজে চলেছেন।🍂
প্রকৃতির সাথে কবির সম্পর্কও নিবিড়। 'একটা চড়ুই' কবিতায় বলেছেন ' পায়ে পায়ে ছাদে গিয়ে দেখলাম কয়েকটা সবুজ পাতা উড়ে গিয়ে পাড়েছে দরজার ফাঁকে। 'দীন দিন' কবিতায় বলেছেন 'কেবলই সবুজ ঘাসে খুশিমতো হাঁটি, তখন গাণিতিক রোদ এসে পিছন থেকে চোখ বন্ধ করে দেয়।' রোদের জন্য গাণিতিক শব্দটির ব্যবহার যথোপযুক্ত। 'বর্ষা' কবিতায় বলেছেন মাটি ভিজে গিয়ে অপমানে গড়াগড়ি খায় কাদা। কবি তাঁর কবিতার লাইন গুলির সাথে জীবনের সুখ দুঃখের সাথে, ভালো-মন্দের সাথে মিলিয়ে দিয়েছেন বলেই কবিতাগুলি এতো জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে। ' পৃথিবী যখন ঘোরে নিজের আবর্তে / তখন বিষন্নতা, উচ্ছাস, তিক্ততা কোথায় যায় এরা?' আসলে এ ঘূর্ণন বাস্তব জীবনের সাথে বড়োই মেলে, আর মেলে বলেই তো কবিতার শেষে বলতে পারেন --- 'সে যখন ঘোরে তখন রক্তিম হয়ে ওঠে সূর্যও / ফের নবারুণ হবে বলে।
কবির মধ্যে আবার প্রেম চেতনাও সুস্পষ্ট। 'তোমার রুমাল' কবিতায় লিখেছেন 'কথা দিচ্ছি ফিরে তাকাবোনা কোনোদিন / অপলক চেয়ে থাকবোনা অজানা ভিড়ে/ আহত হয়েও তলোয়ার শানাবোনা তৈমুরের মতো।' শেষে বলেছেন - ' কথা দিচ্ছি এ বসন্ত পার হয়ে যাবে ঠিক/নদীতীরে অহেতুক ঘুরে/ বুকে ধরে তোমার রুমাল।'
কুবাইকে ঘিরে কবির ভালোলাগা, মন্দলাগা বিভিন্ন আঙ্গিকে তিনি কুবাইকে দেখেছেন। কুবাই এর পাড় জুড়ে তাঁর বেড়ে ওঠা,  তাঁর শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের এক একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছে এখানে। নদীর তো থেমে যাওয়া নেই কবির জীবনে নদীর এই প্রবহমানতা তাঁকে আরও বেশি প্রাণবন্ত ও উচ্ছল করেছে। কুবাই এর গতি কবির অশ্রধারার মতোইবয়ে গেছে, তাঁর আনন্দের দিনেও আবার এই নদী খলখল শব্দে প্রবাহিত হয়েছে। একটি কবিতায় লিখেছেন ' সুধাংশুবাবু/ আপনার অঙ্কের জটিল তত্ত্ব ছাড়িয়ে, কুবাই দুরন্ত গতিতে মশগুল / সে জীবন অঙ্কে যন্ত্রনার দর্শন বুঝেছে।' আসলে ভালো সঙ্গী তো তেমনই হয়। যে কিনা মন বুঝবে, মনের সমস্ত যন্ত্রণা বুঝবে। এ প্রসঙ্গে 'জীবনের মানে' শেষ কবিতাটি বেশ তাৎপর্যবহ। ' শান্ত নদী একরকম উচ্ছল/ শান্ত কুবাই এরকম চঞ্চল/ সে নির্মিশেষ চেয়ে আছে/ জীবনের হাতেখড়ি দেবে/ অশান্ত হয়ে আপাতত ঘুম আর ঘোরের মতন / শান্ত বিপ্লব তার মৈথুন। ' 
বইটির প্রচ্ছদও বেশ সুন্দর। কবি কুবাইকে ঘিরে নানান তথ্য দিয়ে পাঠককুলকে সমৃদ্ধ করেছেন এবিষয়ে সন্দেহ নেই, বইটি সহজেই পাঠকের মনে জায়গা করে নেবে, তাই একবার সংগ্রহ করতেই পারেন।
------


Post a Comment

0 Comments