জ্বলদর্চি

কামাখ্যায় অম্বুবাচী পালন/পারমিতা রায়

কামাখ্যায় অম্বুবাচী পালন

পারমিতা রায়


যদি দেবী পবিত্র হন, তবে প্রতিটি নারী কেন নয়?


প্রতি মাসে, লক্ষ লক্ষ নারী নীরবে একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান যা জীবনকে সম্ভব করে তোলে। তবুও, অনেক ভারতীয় পরিবারে, ঋতুস্রাব আজও নীরবতা, বিধিনিষেধ এবং কলঙ্কে ঘেরা ও অনেক নারীকে ঋতুচক্র চলাকালীন মন্দিরে প্রবেশ, পূজা করা, পবিত্র মূর্তি স্পর্শ করা বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বারণ করা হয়। কেউ কেউ আবার নিজেরাই দূরে থাকেন, কারণ ছোটবেলা থেকে তাঁরা এটাকেই ঐতিহ্যের অংশ বলে জেনে এসেছেন।

এরপর আসে এক সুন্দর স্ববিরোধ।আসামের নীলাচল পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে আছে পূজনীয় কামাখ্যা মন্দির, ভারতের অন্যতম শক্তিশালী শক্তিপীঠ। এখানে, যে ঘটনাকে অন্য জায়গায় নিষেধাজ্ঞার কারণ মনে করা হয়, সেটিই গভীর ভক্তি সহকারে উদযাপিত হয়।

অম্বুবাচী মেলা বার্ষিক অম্বুবাচী মেলার সময়, বিশ্বাস করা হয় দেবী কামাখ্যা তাঁর বাৎসরিক ঋতুচক্রের মধ্য দিয়ে যান। তিন দিন মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে।  দেবীকে অপবিত্র মনে করা হয় বলে নয়, বরং তিনি বিশ্রাম নেন বলে। এই পবিত্র সময়ে কোনও পূজা-আচার হয় না। চতুর্থ দিনে মন্দির আবার খুললে, হাজার হাজার ভক্ত দেবীর আশীর্বাদধন্য অম্বুবাচী বস্ত্র, এক টুকরো লাল কাপড়, পেতে ভিড় করেন।  এই পবিত্র কাপড় ঘরে রাখা হয় ঐশ্বরিক কৃপা, সুরক্ষা, উর্বরতা, সমৃদ্ধি এবং দেবী মায়ের চিরন্তন শক্তির প্রতীক হিসেবে।

মানবজাতির জন্য কী গভীর বার্তা এটি দেয়?

একই জৈবিক প্রক্রিয়া যা প্রায়শই নারীদের উপাসনালয়ে প্রবেশে বাধা দেয়, সেটিই যখন দেবীর সাথে যুক্ত হয় তখন পূজনীয় হয়ে ওঠে। যদি দিব্য মায়ের ঋতুচক্র এতটাই পবিত্র হয় যে তার জন্য মন্দির বন্ধ থাকে এবং লক্ষ লক্ষ ভক্ত ছুটে আসেন, তবে একজন সাধারণ নারী কেন তাঁরটা নিয়ে লজ্জিত বোধ করবেন?
🍂
আসুন বুঝি , ঋতুস্রাব কোনও পছন্দ নয়। এটি একটি প্রাকৃতিক জৈবিক প্রক্রিয়া যা জীবন সৃষ্টি সম্ভব করে।  এটি কোনও অভিশাপ নয়, শাস্তি নয়। এটি প্রকৃতির অলৌকিক ঘটনা। এটাই সেই ছন্দ যার মধ্য দিয়ে প্রতিটি মানবজীবনের সূচনা হয়।  

 বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতা একসাথে চলতে পারে। ঋতুস্রাবের সময় পরিচ্ছন্নতা জরুরি, কিন্তু নারীকে অপবিত্র ভাবা আলাদা। বরং বিশ্রাম ও নিজের যত্ন নিতে উৎসাহ দেওয়া উচিত। সুস্থ-পরিচ্ছন্নতা, বিশ্রাম ও আত্ম-যত্ন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু লজ্জা ও বিধিনিষেধ নয়।

ভাবার বিষয়, আমরা দেবীদের সৃষ্টি ও উর্বরতার উৎস হিসেবে পূজা করি, অথচ অনেক নারী আজও ঋতুস্রাব নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে লজ্জা পান।  হয়তো ইতিহাসের কোনও এক বাঁকে, আমরা নারীর বিশ্রামের প্রয়োজনকে 'অপবিত্র' ধারণার সাথে গুলিয়ে ফেলেছি। বিশ্রাম হল যত্ন। বিশ্রাম হল সহানুভূতি। কিন্তু লজ্জা কখনোই ঐতিহ্য হতে পারে না।

চলুন দৃষ্টিভঙ্গি বদলাই। ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে সম্মান করুন। কিছু নারী নিজের বিশ্বাস থেকে ঋতুস্রাবের সময় মন্দিরে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। আবার অনেকে মনে করেন ঋতুস্রাব উপাসনায় বাধা হওয়া উচিত নয়। দুটি সিদ্ধান্তই সম্মানের যোগ্য।  পরবর্তী প্রজন্মকে শেখান। লজ্জা দেওয়ার বদলে শিশুদের শেখান যে ঋতুস্রাব স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর জীবনের অংশ।

অম্বুবাচী উৎসব কামাখ্যার একটি উদযাপনের চেয়েও অনেক বেশি কিছু।  এটি একটি স্মারক যে নারীদেহ প্রাণ পালন করার ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী।তাই নারীত্ব বৈষম্য নয়, শ্রদ্ধার দাবিদার।  পরের বার যখন আমরা দেবী মায়ের সামনে হাত জোড় করব, মনে রাখব যে প্রতিটি নারীর মধ্যেই সেই একই পবিত্র শক্তি রয়েছে যা আমরা দেবীর মধ্যে পূজা করি।  হয়তো মন্দিরে ফুল দেওয়া নয়, প্রতিদিন প্রতিটি নারীকে সম্মান করাই আমাদের সবচেয়ে বড় নৈবেদ্য।

অম্বুবাচী

নীলাচল পাহাড়ে মেঘ জমে আজ,
তিন দিনের জন্য থামে ঘণ্টার আওয়াজ।
মন্দিরের দরজা বন্ধ নিরবে,
দেবী কামাখ্যা নাকি বিশ্রামে যাবেন ভৈরবে।
যে রক্তে জন্ম নেয় প্রাণ,
যে ধারায় বাঁচে এই মাটি, এই গান,
তাকে নিয়ে কেন এত লজ্জা, এত ভয়?
দেবী যদি ঋতুমতী হন, তবে নারী কেন নয়?
তিন দিন ধরে ধরিত্রী মা-ও ক্লান্ত,
বর্ষার জলে ধুয়ে নেন নিজের দেহের প্রান্ত।
বীজ বোনা বন্ধ, লাঙল থামে মাঠে,
সৃষ্টির আদি নিয়ম মানে পৃথিবীটাও হেঁটে।
চতুর্থ দিনে খোলে দেবীর দুয়ার,
রক্তবর্ণ বস্ত্রে লেখা আশীর্বাদের সম্ভার।
ভক্তের হাতে ওঠে লাল পুঁটলি,
ঘরে ঘরে জ্বলে বিশ্বাসের শিখা, এক চিলতে।
শুনেছি, দেবী নাকি অপবিত্র নন,
তিনি শুধু বিশ্রামে, শক্তি সঞ্চয়ী ক্ষণ।
তবে কেন আমার বোনের ঠাঁই হয় না ঠাকুরঘরে?
কেন তার ছোঁয়ায় অশুচি হয় ফুল, নৈবেদ্য থরে থরে?
অম্বুবাচী এসে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়,
যে দেহে সৃষ্টির বীজ, সে দেহ কখনও অপবিত্র নয়।
দেবীর যে ধর্ম, নারীরও সেই একই অধিকার,
রক্ত মানেই জীবন, লজ্জা নয়, অহংকার।
তাই এই তিন দিন শুধু মেলার গল্প নয়,
এ এক বিদ্রোহ, এক নতুন ভোরের পরিচয়।
যেদিন দেবী আর মানবী এক সুরে বলবে,
আমার শরীর, আমার নিয়ম পবিত্র, এটাই স্বাভাবিক

Post a Comment

1 Comments