জ্বলদর্চি

মেঘপাখিদের গান/পল্লব গোস্বামী

মেঘপাখিদের গান 

পল্লব গোস্বামী

বালি হাঁসের ভাইবোন

কাঠের সাঁকোর নীচে, বুনো নদী। নদীর নামটি কাঁসাই। আমার কাঁসাই। কাঁসাইয়ে এখন কাদাজল। নদী থেকে জল বয়ে যায়, নালায় নালায়। নালার জলে, নাইতে নাইতে এগিয়ে চলে কয়েকটি বালিহাঁস। বালিহাঁসের ছানা। একটির সাথে যেন আরেকটি মিশে থাকে। আমিও মিশে থাকি, ওদের সাথে। পেরিয়ে যাই কাশফুল। করমচার মিষ্টি বন।

কোথায় এগিয়ে যাই আমরা, নিজেরাও জানি না। তবু এগিয়ে যাই। যেভাবে এগিয়ে যায়, বাদলী হাওয়া। আমরা শুধু ক'জন—একা একা বাবা-মা হারা, ভাইবোন…


 সারাদিন ডাহুকের ডাক

আমাদের খামারবাড়ির পিছনে যে মাটির পাঁচিল, তার ঠিক পিছনেই, এক প্রাচীন ডোবা। ভরা বর্ষায়, ডোবার জলে ভাসতে থাকে কলমি ফুল। বেগুনি বেগুনি কলমির ফুল, কচুরিপানা— তারই উপর দুই ডাহুক যুগল। 
কতদিন দেখি, ডাহুক দু'টিতে, ছুটিতে লুটিতে, পরম স্নিগ্ধতায় সাজিয়ে তুলেছে এক শিমুল মেলা। উঁকি দিয়েছে ডিম। উড়ে গিয়েছে পালক সকল। এক পাখির মা, অনেক পাখির শিশুকে করছেন পালন। 
শুধু তিনিই লালন করতে পারলেন না আমাকে। কখনো বুঝলেনও না, কীভাবে ভুগছি আমি তাঁর অসুখে— অনন্ত মাথুরে তাঁর।

🍂
ঘুঘু পাখির দুঃখ

বহুদিন হয়েছে এমন, ঘুমের ভেতর জেগে উঠেছে জবাবন। জবাবনের পাশে, সারি সারি লাল জারুলের গাছ। গাছের ফাঁকে, ঘুঘু দু’টিতে বেঁধেছে বাসা। 
বাসায় এসেছে ডিম। সারারাত জেগে, মা ঘুঘুটি দিয়েছেন তা। সারাদিন ঘুরে, বাবা ঘুঘুটি এনেছেন খুদ। 
তারপর একদিন, ক্ষুধার রাজ্যে, ঘুঘুর ঘরেই চরে গেছেন ঘুঘু। সবকটি ডিম নিয়ে হাওয়া হয়ে গেছে, বনেরই কয়েকটি দুষ্টু ছেলে। 
দুষ্টু সেই ছেলেগুলির মতো, তুমিও তেমন। চুরি করে নিয়ে চলে গেছ, আমার সমস্ত উম। 
ঊর্মিমুখর একা আমি—একা জবাগাছ—একা জারুলবন। শুধু শুধু, পাখিকে কাঁদাও। 


বাবুই পাখিরে ডাকি

আজকাল শুধু ঠাকুমার পানের বাটার ভিতর খয়ের দানাটি হয়ে থেকে যেতে ইচ্ছে করে। আজকাল শুধু ইচ্ছে করে, একটি খোঁজহীন বিকেলে ভাসিয়ে দিই আমার ডিঙি নৌকাটি।

নৌকাটি আমার শরীর। শরীরের ওপর আমি। আর চারদিকে কান্নাজল।

আমি কান্নার করুণা নিয়ে শিল্প খুঁজি। শিল্প খুঁজতে খুঁজতে মানুষ খুঁজি। মানুষ খুঁজতে খুঁজতে হারিয়ে ফেলি নিজেকেও। হারিয়ে ফেলে বাবুই পাখিরে ডাকি।

বাবুই পাখির ঠোঁটেই আমার ঠাকুমা। ঠাকুর ঠাকুর অনেক তালগাছ থেকে,
ঝরে পড়তে থেকে, গুঁড়ো গুঁড়ো সব
তালমিছরির ভোর…


কালিম বন্ধুয়া

জলের অপার সিঁড়ি বেয়ে যারা চলে যায়, তারা আর ফেরে না কভু। তবু কোনে কোনো দিন, তাদের ফিরে যাওয়া পথের পানে, শুধু ইচ্ছে করে অপলকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি, কাদাতে মাটিতে মিশে থাকা, নটি বারোটি ফুল। ফুল ফুল শৈশবের সরে যাওয়া।

যেতে যেতে পথে পথে, পোড়ো ষষ্ঠীবটতলায় সেই শিশুগুলির কথা ভাবি। দেখতে দেখতে যে শিশুগুলিকে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। অকালমৃত্যুর শিশুগুলিকে।

অকাল মৃত্যুর স্বপ্ন বড় ভয়ঙ্কর। এখন দিনে-রাতে আমি, সেই সব স্বপ্নই দেখি। স্বপ্ন দেখি এলোমেলো, স্বপ্ন দেখি সবুজ, স্বপ্ন দেখি এক কালিম বন্ধুয়ার। জলশালুকের পাতায় হেঁটে হেঁটে, যে পাখিটি হারিয়ে গেছে, তার অসুস্থ
শিশুটির, মরামুখটি না দেখেই…

Post a Comment

0 Comments