নরেশদার কান্ড
সৌমেন রায়
চিত্র – রাখী দে
স্কুলের বাগানে কাজ করে নরেশদা। সেই সঙ্গে টিফিনে স্যারদের চা করে দেয়। সারাদিন বাগানে কিছু না কিছু কাজ করে নরেশদা। আর সুযোগ পেলেই ছেলেমেয়েদের ডেকে শোনায় কোন গাছটা জল কম খায়, কোন গাছটা বেশি। কে ছায়া পছন্দ করে, কে রোদ। সেই সঙ্গে নানা রকম আজগুবি ধরনের কথাও বলে নরেশদা।ঘাসের মধ্যে থেকে যাহোক একটা গাছ তুলে বলে এই দেখো, ‘এটা খেলে বুদ্ধি বাড়ে।এই দেখো ওটা খেলে মন ভালো থাকে’। ছেলেমেয়েরা যে নরেশদার চারপাশে ভিড় করে তার কারণ কিন্তু অন্য। নরেশদা হরবোলা। মুখের কাছে হাত দুটো এনে শব্দ আর হাতের মুদ্রায় দুটো কুকুরের ঝগড়া, বাচ্চার কান্না এইসব নানা রকমের আওয়াজ বের করতে পারে। তবে কিছুক্ষন নরেশদার কাছে গাছের জ্ঞান আর আজগুবি গল্প শুনলে তবেই সেসব শোনার সৌভাগ্য হয়।
নরেশদা একদিন একটা গাছ দেখিয়ে বলল, ‘দেখো, এটা খেলে বুড়ো মানুষ বাচ্চা হয়ে যায়’।
‘দুর তোমার যত সব বাজে কথা’! বলে অমর ।
‘বাজে কথা? তাহলে আজ টিফিনের পর দেখবে’!
টিফিন শেষের দ্বিতীয় ঘণ্টা পড়তেই সবাই একছুটে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। দ্বিতীয় ঘণ্টার পর একদিকে হেডস্যার আর অন্যদিকে দুষ্মন্ত স্যার হাতে বেত নিয়ে বারান্দায় ঘোরে।দেখলেই মনে হয় যেন দুটো স্টিম রোলার ধেয়ে আসছে। কাউকে বাইরের দেখলেই আর রক্ষে নেই। কিন্তু আজ ঘন্টা অনেকক্ষণ পড়ে গেছে। কোনও স্যার এখনও ক্লাসে আসছে না কেনো? ছেলেরা বসে চুপচাপ তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। কিছুক্ষণ পর মনে হল বাইরে যেন একটা কিছু গোলমাল হচ্ছে।কেউ কেউ জানালা দিয়ে উঁকি দিতে শুরু করল।
সুতপা জানালা দিয়ে দেখল অঙ্কের নন্দন স্যার একটা ঘুড়ি নিয়ে ছুটছে আর অঙ্কেরই ভোলা স্যার পিছনে পিছনে ছুটছে আর বলছে, ‘আমায় একবার দেন না, আমায় একবার দেন না!’ সুতপা খবরটা বলতেই দুই একজন সাহস করে বাইরে বেরিয়ে এল। তাদের দেখাদেখি আরো কেউ কেউ বেরোল। আস্তে আস্তে বারান্দা ভরে গেল। তারা চোখের সামনে যা দেখল সে এক অবাক করা কান্ড! সবাই মুখ হাঁ করে দেখতে লাগল।
নন্দন স্যারের পিছনে পিছনে ভোলানাথ স্যার ছুটছে। মুরলী স্যার আর দীপঙ্কর স্যার হাফ প্যান্ট পরে নানা রকমের ঘুড়ি বানাতে বসে গেছে।
সুনন্দ স্যার হাতে একটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বই নিয়ে আর সুমন্ত স্যার হাতে একটা মোবাইল নিয়ে , ‘চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে, কদম তলায় কে? হাতি নাচছে ঘোড়া নাচছে , সোনামণি বে’ - গাইতে গাইতে নাচছে। বাংলার নীরদ স্যার দাঁড়িয়ে ছিল হাঁ করে। হঠাৎ দুষ্মন্ত স্যার পিছন থেকে মাথায় চাঁটি মেরে ভিড়ে মিশে গেল। পিছন ফিরে কাউকে না দেখতে পেয়ে ভ্যা করে কেঁদে দিল নীরদ স্যার।
তখন আবার দুষ্মন্ত স্যার এসে চোখ মুছে দিতে লাগলো। ’ কাঁদেনা সোনা, চকো দেবো’।
খেলার স্যার নিবারণবাবু ফুটবলের হুইসেলটা মুখে নিয়ে হাফপ্যান্ট পরে মাঠটা গোল হয়ে চক্কর কাটছে আর ফু - ফু করে বাঁশি বাজাচ্ছে। ইতিহাসের সঞ্জয় স্যার নবনীতা ম্যাডাম আর সুমনা ম্যাডামের সঙ্গে বউ বাচকি খেলছে। সঞ্জয় স্যার এতটুকু হয়ে গেছে। স্যারের যে বয়স হয়েছে বোঝাই যাচ্ছে না। আদর করতে ইচ্ছে করছে।
দীপ্তার্ক স্যার হন হন করে হেঁটে যাচ্ছে ,কাঁধে ব্যাগ। প্রসেনজিৎ স্যার তাকে ধরে বলল, ‘চল খেলব।‘ স্যার পাশ কাটিয়ে বলল, ‘না আমার সময় নেই, টিউশন যাবো’। বিমল বাবু ছোট হয়ে যেতে প্যান্টটা কিছুতেই কোমরে হচ্ছে না। ঢোলা প্যান্ট বারবার গলে পড়ার উপক্রম হচ্ছে,আর স্যার টেনে তুলছে। ভূগোলের প্রিয়ব্রত স্যার কাগজের লম্বা একখানা লেজ তৈরি করে গুটি এগোচ্ছে বিমল বাবুর পিছনের দিক থেকে। বোধহয় লেজটা লাগাবে।সন্দীপন স্যার থালায় কি একটা নিয়ে এক মনে খাচ্ছে বসে বসে। হঠাৎ বিজিত স্যার এসে তার থালা থেকে একটা কিছু তুলে নিয়ে ছুট। থালা ফেলে সন্দীপন স্যার বিজিত স্যারের পিছনে দে ছুট। নিত্যদা সারাক্ষণ বকবক করে বিদীপদার সঙ্গে। তারা একটা বল নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে।এইসব কান্ড দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ছেলেমেয়েরা। এতো অবাক হয়েছে যে হাসতেও গেছে ভুলে।
এমন সময় হেডমাস্টারমশাই তার রুম থেকে বেরোলো হামাগুড়ি দিয়ে। হাতে একটা ললিপপ। ধীরে ধীরে দেওয়ালটা ধরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এই আদ তোমাদেল –' বলে ললিপপটা একবার চুষে নিল। তারপর বলল, ‘আদ তোমাদেল থুতি’। বলে আমার ললিপপ চুষতে লাগলো। অন্য দিন ছুটির ঘন্টা পড়লেই সব হই হই করে ছুটে বেরিয়ে আসে। আজ বাড়ি যাওয়ার নাম নেই। সবাই সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে।
কেউ যাচ্ছে না দেখে হেড স্যার চোখ পাকিয়ে বলে উঠল, ‘বললাম না, তোমাদেল থুতি’।
বলে ললিপপটা চুষতে লাগল। এইবার সবাই মুখ টিপে হাসতে হাসতে ব্যাগ নিয়ে চলল গেটের দিকে। মনে একটাই চিন্তা কাল এসে কি দেখবে!গেটের মুখে মধুমালতী গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ছিল নরেশদা।
দীপ্তি তাকে ধরল, ‘নরেশদা তুমি কি সবাইকে ঐ ঘাস পাতা খাইয়ে ছোট করে দিয়েছো?’
উত্তর দেবার আগেই মহসিন জিজ্ঞাসা করল , ‘হেড স্যারের কি হবে গো নরেশদা?’
একবার মহসিনকে শাস্তি দিয়েছিল হেডস্যার।তারপর থেকে কেনো জানিনা মনে হতো স্যার মহসিনকে একটু বেশি ভালোবাসে, আর মহসিন স্যারকে একটু বেশি শ্রদ্ধা করে ।
‘হেদ ছ্যার যে দু কাপ চা খেয়ে থিল! বলেই হাততালি দিয়ে নেচে উঠল নরেশদা।
গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ ৩০
রতনতনু ঘাটী
মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি আজ কত বছর যে ইডেনে স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখেছেন, এখন আর সে কথা মনে করে বলতে পারেন না। তবু স্মৃতি হাতড়ে এখনও কত কথাই না মনে করতে পারেন। সামনের সারিতে বসেছে এ-সেকশানের রোরো মজুমদার, তার পাশে বসেছে সি-সেকশানের লোকন দাস, তার পাশে তাহিরা দত্ত, রুচিকা গুপ্ত, আরও কত ছেলেমেয়ে। ক্লাস নাইন-টেনের ছাত্রছাত্রীদের অ্যাসেম্বলি হলের মিটিংয়ের পর ছুটি দিয়ে দিয়েছেন হেডস্যার। রেনি-ডের ছুটি। ওদের পড়াশোনার চাপ আছে। ওদের এখন ক্রিকেটের গল্প না শুনলেও চলবে!
হেডস্যারের দিকে তাকিয়ে মুকুলবাবু অনুমতি নিলেন মাথা নিচু করে। তারপর মুকুলবাবু শুরু করলেন, ‘তোমরা সকলে যে ক্রিকেট খেলো, এই ক্রিকেটের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কত না রূপকথা! আমি তোমাদের যেসব কথা শোনাব, সেগুলো শুনলে মনে হবে, এসব সত্যি নয়, গল্প। তবে আমি বলব, এসব বইয়ে পড়া গল্প নয় ঠিকই। সবই সত্যি গল্প! এসবকে আমি বলি ক্রিকেটের রূপকথা।’
একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার, আমি তাহিরা দত্ত। সব রূপকথার গল্পই তো স্যার মনগড়া! যেমন উপেন্দ্রকিশোরের ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ বা লীলা মদুমদারের ‘হলদে পাখির পালক’ সবই তো রূপকথা! আমি পড়েছি।’
মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘ঠিকই বলেছ তাহিরা। আমি যেসব ক্রিকেটের গল্প বলব, অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইবে না।’
রোরো মজুমদার বলল, ‘স্যার আমি রোরো। আমি বলছি-- ‘এখন কেরিয়ারের যুগ, এগিয়ে চলার যুগ। যেভাবে পারো নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাও।’
‘তা ঠিক। কিন্তু আমি তোমাদের বলছি, যদি কোনওদিন মন দিয়ে ক্রিকেট খেলো, তা হলে মনে রেখো, এই গল্পগুলোই হল আসল ক্রিকেট। যেখানে সততাই বড়ো, মানবিকতাই প্রধান। তোমরা যদি জীবনে অনেক দিন ধরে ক্রিকেটকে সঙ্গী করে চলতে থাকো, তা হলে সেই ক্রিকেটই খেলো!’ বলে থামলেন মুকুলকৃষ্ণবাবু। গোটা অ্যাসেম্বলি হল নিশ্চুপ।
একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, ‘স্যার, আমি রুচিকা গুপ্ত। ঠিক আছে, আপনি সেই ক্রিকেটের গল্প আমাদের বলুন!’
ছেলেমেয়েরা প্রশ্ন করছে দেখে হেডস্যারের মুখটা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এমন সময় খুব শান্ত গলায় মুকুলবাবু শুরু করলেন, ‘তোমাদের এবার একটা ক্রিকেটের গল্প বলি! একবার আমাদের ভারতের মাটিতে। তখন বোম্বাইয়ের নাম এখনকার মতো মুম্বই হয়নি। বম্বেতে জুবিলি টেস্টের খেলা হচ্ছে ভারত আর ইংল্যান্ডের মধ্যে। উনিশশো আশি সালে। তখন ব্যাট করছেন ইংল্যান্ডের বব টেলর। ইন্ডিয়ান টিমের ক্যাপ্টেন তখন গুন্ডাপা বিশ্বনাথ। তোমরা তো তাঁর নাম শুনেছ নিশ্চয়ই। ওই গোল্ডেন জুবিলি টেস্টে আম্পায়ার বব টেলরকে কট বিহাইন্ড (ক্যাচ) আউট দিয়ে দিলেন। কিন্তু ফিল্ডার বল ধরার আগে বল মাটিতে স্পর্শ করেছিল কিনা তা নিয়ে তাঁর সংশয় ছিল। এখনকার মতো তখন অত আধুনিক প্রযুক্তি আসেনি। তখন ভারতীয় অধিনায়ক গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ ‘স্পিরিট অব দ্য গেম’ বা খেলার চেতনা বজায় রাখতে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত মেনে না নিয়ে, প্যাভিলিয়নের দিকে হেঁটে -যাওয়া বব টেলরকে ডেকে আবার ক্রিজে ফিরিয়ে আনলেন। বিশ্বনাথ ক্যাচ ধরে ফেলেছেন ভেবে আম্পায়ার আউট দিয়ে দিয়ে ছিলেন। বিশ্বনাথ বললেন, ‘আমি ক্যাচটা ধরতে পারিনি স্যার। এটা আউট নয়?’ বব টেলর ওই ম্যাচে তেতাল্লিশ রান করেছিলেন। ভারত হেরে গিয়েছিল সেই খেলায়। কিন্তু সবাই প্রশংসা করেছিলেন সেদিন ভারতীয় দলের ক্যাপ্টেন গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথের সততার! ওটাই হল ক্রিকেট!’
অ্যাসেম্বলি হল জুড়ে হাততালির ঝড় উঠল। হেডস্যার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এইটাই হল ক্রিকেট! ক্রিকেট খেলা সততার, মানবিকতার খেলা। আমার ইচ্ছে, তোমরা বড় হয়ে ঠিক এই ক্রিকেটটাই খেলো!’
মুকুলকৃষ্ণ উপস্থিত সকলকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাদের কেমন লাগল ক্রিকেটের এই সত্যি গল্পটা?’
ভূগোলের ভুবনস্যার বললেন, ‘আমরা মুকুলবাবু আপনার কাছ থেকে এরকমই ক্রিকেট-জীবনের নানা গল্পই শুনতে চাই।’
মুকুলকৃষ্ণবাবুর মুখেও আনন্দের ঝলক। বলতে শুরু করলেন, ‘এখন যে গল্পটা বলল, আশা করছি সকলেরই ভাল লাগবে! কোর্টনি ওয়ালস ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় দলের বিখ্যাত বোলার। কোর্টনি ওয়ালশ বল করছেন। হঠাৎ বল করতে গিয়ে তিনি দেখলেন, অন্য দিকে পাকিস্তানের যে ব্যাটসম্যান দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি বল করার আগেই রান নেওয়ার জন্যে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন। ওয়ালশ বল নিয়ে উইকেটের উপর ছোঁয়ানোর ভঙ্গিতে ধরে থাকলেন। উইকেযে ছোঁয়ালেন না। কিন্তু উইকেটের ওদিকে খেয়াল হতেই পাকিস্তানের ব্যাটসম্যান তাড়াতাড়ি ফিরে গেলেন ক্রিজে। ইচ্ছে করলেই ওয়ালশ উইকেটে বলটা ছুঁইয়ে দিলেই আউট হয়ে যেতেন ব্যাটসম্যান। কিন্তু ওয়ালশ তা করেননি। সে-খেলায় পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ হেরেও গিয়েছিল। কিন্তু সবাই মনে রেখেছে ওয়ালশের এই উদারতার কথা।’
দীক্ষা সেন অবাক মুখে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, আমি দীক্ষা। কোর্টনি ওয়ালশ আউট করলে তো আর পাকিস্তান জিততে পারত না। কিন্তু ওয়ালশ আউট করেননি কেন?’
মুকুলবাবু বললেন, ‘ক্রিকেট খেলা তো এরকমই হওয়া উচিত দীক্ষা। খেলা তো ভ্রাতৃত্ববোধের, মিলনের, সততার এবং মানবিকতারও। তোমরা জানবে, বিশ্বের কোনও ক্রিকেট দলই এক বা দু’জন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে না। গোটা দলটাই সবসময় জেতার জন্য খেলে। ক্রিকেট খেলা নিয়ম আর শৃঙ্খলাবোধেরও। তোমাদের মনে রাখতে হবে, ক্রিকেট খেলতে গিয়ে কখনও যেন শৃঙ্খলাভঙ্গ না হয়। যেমন তোমাদের আর একটা ঘটনা শোনাই—দু’ হাজার এগারো সালের বিশ্বকাপে সচিন তেন্ডুলকরকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি আম্পায়ার স্টিভ বাকনার একটি ভুল সিদ্ধান্তে আউট হওয়ার নির্দেশ দিলেন। এটা ছিল দু’ হাজার তিন-চার মরশুমে ব্রিসবেনে ভারত–অস্ট্রেলিয়া টেস্ট ম্যাচে। সেই সময় তেন্ডুলকর ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বোলার জেসন গিলেসপি ও উইকেটরক্ষক অ্যাডাম গিলক্রিস্টের জোরালো আবেদনের পর বাকনার সচিনকে এলবি ডব্লিউ আউট দেন। মাত্র তিন রান করে সচিন সাজঘরে ফিরে যান। সেই ম্যাচে বড় ধাক্কা খায় ভারত। সেদিন কোনও প্রতিবাদ না জানিয়েই মাঠ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন সচিন। সচিনের ক্রিকেটের এবং আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের প্রতি তাঁর এই সম্মান বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।’
সকলের হাততালিতে মুখর হয়ে উঠল হলঘর। হেডস্যার উঠে দাঁড়িয়ে গলা তুলে বললেন, ‘সচিন, যুগ যুগ জিও!’
মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি হাসতে-হাসতে বললেন, ‘না। এই গল্পটা এখানেই শেষ নয় নবনীতস্যার! মজার গল্পটা আরও একটু বাকি আছে। এবার বলি—দীর্ঘ বাইশ বছর পর সেই আম্পায়ার বাকনার বলেছেন, তিনি জানতেন তাঁর সেই সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। কারণ, বলটি স্টাম্প মিস করতই। তিনি স্বীকার করেন, আজও মানুষ সেই ঘটনাটি নিয়ে কথা বলে। জীবনে ভুল হতেই পারে এবং আমার সেই ভুলটি আমি মেনে নিয়েছি।’
মুকুলবাবুর এই শেষের কথাগুলো শুনে সকলে বিষণ্ণ মুখে বলতে লাগল, ‘সচিন! সচিন!’
মুকুলবাবু বললেন, ‘ক্রিকেট এমন একটি খেলা, যার প্রতিটি ইনিংস থেকেই উঠে আসে এক-একটি নতুন জীবনজয়ের গল্প! আসলে আমরা দর্শকরা খেলা দেখে আনন্দে ঘুমোতে যাই। কিন্তু চ্যাম্পিয়নরা কখনওই ঘুমাোন না, চিরন্তন আত্মা তাঁদের সব সময় সতর্ক ও জাগ্রত করে রাখে।’ তারপর ছেলেমেয়ের দিকে তাকিয়ে মুকুলবাবু বললেন, ‘তোমরা জেনে রাখো, ধৈর্যই একজন ব্যাটসম্যানের সবচেয়ে বড় শক্তি।’
ইতিহাসের অনুলেখাম্যাম উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমি মহেন্দ্র সিংহ ধোনির এক সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম, উনি সেখানে বলেছেন, ‘কঠোর পরিশ্রমের কোনও বিকল্প নেই। আমি সব সময় নিজের খেলার ওপর আস্থা রেখে চলি।’
মেয়েরা হাততালি দিয়ে উঠল ম্যামের কথায়। এবার দেবোপমসস্যার উঠে দাঁড়িয়ে মুকুলবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার, আপনি কত পুরনো গল্প বলে শোনাচ্ছেন! আমি মুগ্ধ! স্যার, আমি একটা ক্রিকেটের ছোট্ট গল্প বলতে পারি কি?’
মুকুলবাবু হাসতে হাসতে বললেন, ‘কেন নয়? আরে দেবোপম, বলো না! বলো, বলো!’
দেবোপমস্যার বললেন, ‘দু’ হাজার এগারো সালের বিশ্বকাপেও একটি দারুণ সততার নজিরের কথা বলি। ভারতের বিপক্ষে একটি ম্যাচে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক মাহেলা জয়াবর্ধনে সেঞ্চুরি করার পথে। আচমকা বল তাঁর গ্লাভসে লেগে উইকেটরক্ষকের হাতে চলে যায়। আম্পায়ার তা বুঝতেই পারেননি। কিন্তু মাহেলা জয়াবর্ধনে নিজে থেকেই আম্পায়ারকে জানিয়ে দেন যে তিনি আউট হয়েছেন এবং মাঠ ছেড়ে চলে যান।’ এই ধরনের ঘটনাগুলো এটাই প্রমাণ করে যে, জয়ের চেয়েও সত্য ও সততা ক্রিকেটের মূল চেতনা।’
সকলের হাততালিতে মুখর হল অ্যাসেম্বলি হল। মুকুলকৃষ্ণ বললেন, ‘বাঃ! তুমি খুব সুন্দর একটা গল্প শোনালে আমাদের দেবোপম। আমি এবার ক্রিকেটের আর একটা চমৎকার গল্প শোনাই? দু’ হাজার তিন সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলছে শ্রীলঙ্কা। ব্যাট করছিলেন অস্ট্রেলিয়ার তারকা উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। দলের রান তখন বেশ ভালো। শ্রীলঙ্কার বোলার চামিন্ডা ভাসের একটি বল গিলক্রিস্টের ব্যাটের কানায় লেগে সোজা উইকেটরক্ষক কুমার সাঙ্গাকারার হাতে জমা পড়ল। বোলার ও ফিল্ডাররা জোরালো আবেদন করলেও, ফিল্ড আম্পায়ার রুডি কোয়ের্টজেন তাঁকে ‘নট আউট’ ঘোষণা করেন। সবাই ভেবেছিল গিলক্রিস্ট ক্রিজে টিকে থাকবেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে, আম্পায়ারের আঙুল তোলার আগেই গিলক্রিস্ট নিজে থেকেই ক্রিজ ছেড়ে প্যাভিলিয়নের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করেন। তিনি জানতেন, বল তাঁর ব্যাটে স্পর্শ করেছে। এই ঘটনাটি ক্রিকেট ইতিহাসে সততা, স্পোর্টসম্যানশিপ এবং নৈতিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।’
উইকেটকিপার হর্ষা মণ্ডল উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার, আমি হর্ষা মণ্ডল। গিলক্রিস্ট সততা দেখাতে পেরেছিলেন, কেননা, তিনি অনেক বড় ক্রিকেটার ছিলেন! তাই তো আমরা তাঁর স্পোর্টসম্যানশিপের আজও প্রশংসা করছি। আমরা যারা ভবিষ্যতে ক্রিকেট খেলব বলে মনে-মনে ঠিক করেছি, এ থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত!’
হেডস্যার হর্ষার কথায় হাততালি দিয়ে উঠলেন। মুকুলকৃষ্ণ বললেন, ‘আমি তো তোমাদের সেই শিক্ষার কথাই বলছি! আমাদের গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ যেন এরকম আদর্শে এগিয়ে চলে।’
মুকুলকৃষ্ণ বললেন, ‘ক্রিকেট চিরদিনই আদর্শ নিয়ে বেঁচে থাকে। সালটা দু হাজার এগারো সালের। সততার একটি বিরল নজির দেখলাম, ভারতের বিপক্ষে একটি ম্যাচে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক মাহেলা জয়াবর্ধনে সেঞ্চুরি করার পথে একটু দূরে। বল তাঁর গ্লাভসে লেগে উইকেটরক্ষকের কাছে চলে গিয়েছিল। আম্পায়ার তা বুঝতে পারেননি। কিন্তু মাহেলা জয়াবর্ধনে নিজে থেকেই আম্পায়ারকে জানিয়ে দিলেন যে তিনি আউট হয়েছেন এবং তারপরই মাঠ ছেড়ে চলে যান। এই ধরনের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, জয়ের চেয়েও সত্য ও সততা ক্রিকেটের মূল চেতনা।’
মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘এবার আমি ছোট-ছোট দু’-একটা রেকর্ডের গল্প বলি? শূন্য রানে আউট হওয়া ক্রিকেটারদের ভাগ্যের পরিহাস। তবু ক্রিকেটে শূন্য রানে আউট হওয়ার উদাহরণ কম নেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি খেলায় সবচেয়ে বেশিবার শূন্য রানে আউট হওয়ার রেকর্ডটি কার বলতে পারো? এনি ওয়ান?’
বলার জন্যে কেউ হাত তুলল না। মুকুলকৃষ্ণ বললেন, ‘এই রেকর্ডটি মূলত মুত্তিয়া মুরালিধরনের নামে, যিনি একজন বোলার হলেও ব্যাটিংয়ে নেমে উনষাটবার বার ‘ডাক’ আউট হয়েছিলেন। আর ব্যাটসম্যানদের মধ্যে শূন্য রানে বেশিবার আউট হয়েছেন শ্রীলঙ্কার দিলশান তিলকারত্নে এবং বাংলাদেশের মুশফিকুর রহিম। এঁরা আউট হয়েছেন শূন্য রানে চল্লিশবার করে। আমাদের বিরাট কোহলিও শূন্য রানে আউট হওয়ার দৌড়ে পিছিয়ে নেই। চল্লিশবার।’ একটু থামলেন মুকুলকৃষ্ণবাবু। মুখে হালকা হাসি ছড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কেউ বলতে পারো, ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশিবার শূন্য রানে আউট হয়েছেন কে?’
সকলে নিশ্চুপ। মুকুলবাবু বললেন, ‘কেউ বলতে পারলে না তো? তা হলে আমিই বলি? বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশিবার শূন্য রানে আউট হয়েছেন তামিম ইকবাল। তিনি ২৪৩টি ম্যাচে ১৯ বার শূন্য রানে আউট হয়েছেন, যে রেকর্ড বাংলাদেশের আর কোনও ব্যাটসম্যানেরই নেই।’
শ্রোতাদের চোখের ভাষা পড়ে নিলেন মুকুলকৃষ্ণবাবু। এবার বলতে শুরু করলেন, ‘আমরা কেন, গোটা ক্রিকেটবিশ্ব মান্য করে সচিন তেন্ডুলকরকে ‘ক্রিকেটের ঈশ্বর’ বলে। কারণ ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ের অধিকাংশ রেকর্ডই শচিন টেন্ডুলকরের দখলে। আবার ‘অভাগা’ রেকর্ডের তালিকায়ও রয়েছে সচিনের নাম। তোমরা জানতে চাইছ নিশ্চয়ই, কী সেই খারাপ রেকর্ড? সচিন চারশো তেষট্টিটি ম্যাচের ক্যারিয়ারে মোট আঠারোবার নব্বইয়ের ঘরে আটকে গেছেন। এর মধ্যে একবার ছিয়ানব্বই রানে অপরাজিত ছিলেন। অবাক করা কথা হল, সচিন তিন-তিনবার আউট হয়েছেন ওয়ান ডে-তে নিরানব্বই রানে। সব ক’টি ম্যাচই খেলেছিলেন দু’ হাজার সাত সালে।’
‘সত্যিই সচিন তেন্ডুলকরের ভাগ্য খারাপ! নিরানব্বই রানে তিন-তিনবার আউট! ভাবতেই পারছি না!’ বলে কপালে একটা চাপড় মেরে ফের বসে পড়ল লোকন দাস।
মুকুলকৃষ্ণবাবু লোকনকে ভালবাসেন তার ঝকঝকে ব্যাটিংয়ের জন্যে। কথায় কথায় বৈভব সূর্যবংশীর সঙ্গে তার তুলনাও করেন। লোকনের দিকে তাকিয়ে মুকুলবাবু বললেন, ‘শোনো লোকন, এক ওভারে সব চেয়ে বেশি রানের রেকর্ড শুনবে? উনিশশো নব্বই সালে নিউজিল্যান্ডে। তখন চলছিল ‘শেল ট্রোফি’র আসর। এই ঘরোয়া টুর্নামেন্টের আসরে টিম ওয়েলিংটন এবং টিম ক্যান্টারবারির খেলা চলছিল৷ ম্যাচটা নিশ্চিতভাবে ওয়েলিংটনের হাতেই ছিল৷ তখন জিততে হলে শেষ দু’ ওভারে ক্যান্টারবেরির দরকার পঁচানব্বই রান ৷ তখন বল করতে আসেন ওয়েলিংটনের বোলার বার্ট ভেন্স ৷ সতেরোটি নো বল, আটটি সিক্স এবং ছ’টি চারের সুযোগ দিয়ে ভেন্স ওই এক ওভারে একাই ৭৭ রান দিয়ে বসেন ৷ ভেন্স মোট বাইশটি বল করেছিলেন ৷ এখন পর্যন্ত ক্রিকেটের ইতিহাসে বার্ট ভেন্সের করা এই ওভারটিকে সর্বকালের সবচেয়ে খরুচে ওভার হিসেবে বিবেচনা করা হয়৷’
ক্লাস এইট সি-সেকশানের বাঁ-হাতি বোলার নাতাশা চক্রবর্তী উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার, এক ওভারে সাতাত্তর? এ তো ভাবতেই পারা যাচ্ছে না? কল্পনারও বাইরে!’
তোমরা সকলে কল্পনা করতে থাকো! আমরা এবার দেখছি, আকাশের আর মুখভার নেই। হেডস্যার, আজকের মতো আমাদের গল্পের আসরের ছুটি হোক?’
হেডস্যার বললেন, ‘তোমাদের জন্যে পারলে আর একদিন এরকম ক্রিকেটের গল্পের আসর নিয়ে আসব। আজ মুকুলকৃষ্ণবাবু ক্রিকেটের যেসব অমূল্য গল্প শোনালেন, এসব তোমাদের মনে অক্ষয় হয়ে থাকুক। সময়-সুযোগ পেলে তোমরাও অমন দৃষ্টান্ত গড়ে তুলবে এই আশা রাখলাম!’
সকলেই উঠে পড়লেন। বড়রা যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরাও বেরিয়ে পড়লেন। বৃষ্টির মুখে দুয়ো দিয়ে আকাশ ঝকঝক করে উঠল!
(এর পর ৩১ পর্ব)
0 Comments