জ্বলদর্চি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -২১৫

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ২১৫
চিত্র গ্রাহক: অমিতাভ সামন্ত

সম্পাদকীয় 

ছোট্ট বন্ধুরা, 
কেমন আছো সবাই? আশা করি সবাই খুব ভালো আছো। আগস্ট মাস মানেই স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস কে মনে করার আর শ্রদ্ধা নিবেদন করার মাস। গত সপ্তাহে তোমাদের বলেছিলাম পরের সপ্তাহে তোমাদের মেদিনীপুরের আরো একজন হিরোর গল্প বলবো। তবে শুরু করি? আজ তোমাদের বলব মেদিনীপুর এর আরো একজন অমর বিপ্লবী প্রদ্যোত ভট্টাচার্যের কথা।  প্রদ্যোত ভট্টাচার্যের বাড়ি ছিল মেদিনীপুর এর দাসপুর থানার রাজনগরে র গোকুলনগর গ্রামে । মেদিনীপুরে এসেছিলেন তিনি কলেজে পড়াশোনা করতে। ১৯৩১ সালে  ১৬ ই সেপ্টেম্বর  হিজলী ডিটেনশন ক্যাম্পে নিরস্ত্র বিপ্লবী কয়েদিদের উপর নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনায় গোটা ভারতবর্ষ  উত্তাল হয়ে উঠেছিল।  ওই ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন সন্তোষ কুমার মিত্র ও  তারকেশ্বর সেনগুপ্ত। স্বয়ং নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু ওদের মৃতদেহ নিতে এসেছিলেন। রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। এই ঘটনা প্রদ্যোত ভট্টাচার্য কে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ১৯৩২ সালের ৩০ শে এপ্রিল, মেদিনীপুরের দ্বিতীয় ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস কড়া নিরাপত্তার মধ্যে মেদিনীপুর এ বোর্ড মিটিং করছিলেন। সেই অখন্ড নিরাপত্তার বেষ্টনী ভেদ করে ভিতরে ঢুকে পড়েন প্রদ্যোত ভট্টাচার্য ও তার সঙ্গী প্রভাংশুশেখর পাল। গুলি করে ডগলাস কে হত্যা করে পালানোর সময় ওই অখন্ড নিরাপত্তার বেষ্টনী ভেদ করা হয়ে উঠলো দূরহ । প্রদ্যোত দেখলেন দুজন একসাথে পালাতে পারবেন না। মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিলেন, নিজে বন্দুক হাতে ঘুরে দাঁড়িয়ে পালাতে পথ করে দিলেন বন্ধু বিপ্লবী প্রভাংশুশেখর পাল কে। ধরা পড়ে গেলেন ইংরেজ পুলিশ এর হাতে। অকথ্য অত্যাচার সহ্য করেও শেষ পর্যন্ত বলেলনি বন্ধু প্রভাংশুশেখর পাল এর নাম। জেলে বসে তিনি চিঠি লিখেছিলেন তাঁর মা কে । দীর্ঘ চিঠির কয়েকটি বাক্য ছিল এইরকম " তোমাকে কেউ যদি আমার চোখের সামনে অত্যাচার করে কেটে টুকরো টুকরো করতে চায় এবং আমি যদি পাগলের মতো না লাফিয়ে বিচার করতে বসি.. তাহলে ধীর মস্তিষ্ক ও বুদ্ধিমত্তা র পরিচয় দেব ঠিকই কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তোমার মাতৃহৃদয় টা ছি ছি করে জ্বলে উঠবে না? ..." 
১৯৩৩ সালের ১২ ই জানুয়ারি প্রদ্যোত ভট্টাচার্যের ফাঁসি হয়। 
আজ তাহলে এই পর্যন্তই। পরের সপ্তাহে আবার আরো এক বীরের কাহিনী শোনাবো তোমাদের। ইতি তোমাদের স্বাগতা দি
রথযাত্রা

নরেশদার কান্ড

সৌমেন রায়

চিত্র – রাখী দে

 স্কুলের বাগানে কাজ করে নরেশদা। সেই সঙ্গে টিফিনে স্যারদের চা করে দেয়। সারাদিন বাগানে কিছু না কিছু কাজ করে নরেশদা। আর সুযোগ পেলেই ছেলেমেয়েদের ডেকে শোনায় কোন গাছটা জল কম খায়, কোন গাছটা বেশি। কে ছায়া পছন্দ করে, কে রোদ। সেই সঙ্গে নানা রকম আজগুবি ধরনের কথাও বলে নরেশদা।ঘাসের মধ্যে থেকে যাহোক একটা গাছ তুলে বলে  এই দেখো, ‘এটা খেলে বুদ্ধি বাড়ে।এই দেখো ওটা খেলে মন ভালো থাকে’। ছেলেমেয়েরা যে নরেশদার চারপাশে ভিড় করে তার কারণ কিন্তু অন্য। নরেশদা হরবোলা। মুখের  কাছে হাত দুটো এনে শব্দ আর হাতের মুদ্রায় দুটো কুকুরের ঝগড়া, বাচ্চার কান্না এইসব নানা রকমের আওয়াজ বের করতে পারে। তবে কিছুক্ষন নরেশদার কাছে গাছের জ্ঞান আর আজগুবি গল্প শুনলে তবেই সেসব শোনার সৌভাগ্য হয়।

 নরেশদা একদিন একটা গাছ দেখিয়ে বলল,  ‘দেখো, এটা খেলে বুড়ো মানুষ বাচ্চা হয়ে যায়’। 

‘দুর তোমার যত সব বাজে কথা’! বলে অমর ।

‘বাজে কথা? তাহলে আজ টিফিনের পর দেখবে’!

টিফিন শেষের দ্বিতীয় ঘণ্টা পড়তেই সবাই একছুটে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। দ্বিতীয় ঘণ্টার পর একদিকে হেডস্যার আর অন্যদিকে দুষ্মন্ত স্যার হাতে  বেত নিয়ে বারান্দায় ঘোরে।দেখলেই মনে হয় যেন দুটো স্টিম রোলার ধেয়ে আসছে। কাউকে বাইরের দেখলেই আর রক্ষে নেই। কিন্তু আজ ঘন্টা অনেকক্ষণ পড়ে গেছে। কোনও স্যার এখনও ক্লাসে আসছে না কেনো? ছেলেরা বসে চুপচাপ তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। কিছুক্ষণ পর মনে হল বাইরে যেন একটা কিছু গোলমাল হচ্ছে।কেউ কেউ জানালা দিয়ে উঁকি দিতে শুরু করল।

 সুতপা  জানালা দিয়ে দেখল অঙ্কের নন্দন স্যার একটা ঘুড়ি নিয়ে ছুটছে আর অঙ্কেরই ভোলা স্যার পিছনে পিছনে ছুটছে আর বলছে, ‘আমায় একবার দেন না, আমায় একবার দেন না!’ সুতপা খবরটা বলতেই দুই একজন সাহস করে বাইরে বেরিয়ে এল। তাদের দেখাদেখি আরো কেউ কেউ বেরোল। আস্তে আস্তে বারান্দা ভরে গেল। তারা চোখের সামনে যা দেখল সে এক অবাক করা কান্ড! সবাই মুখ হাঁ করে দেখতে লাগল।

নন্দন স্যারের পিছনে পিছনে ভোলানাথ স্যার ছুটছে। মুরলী স্যার আর দীপঙ্কর স্যার হাফ প্যান্ট পরে নানা রকমের ঘুড়ি বানাতে বসে গেছে।

 সুনন্দ স্যার হাতে একটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বই নিয়ে আর  সুমন্ত  স্যার হাতে একটা মোবাইল নিয়ে , ‘চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে, কদম তলায় কে? হাতি নাচছে ঘোড়া নাচছে , সোনামণি বে’  - গাইতে গাইতে নাচছে।  বাংলার নীরদ স্যার দাঁড়িয়ে ছিল হাঁ করে। হঠাৎ দুষ্মন্ত স্যার পিছন থেকে মাথায় চাঁটি মেরে ভিড়ে মিশে গেল। পিছন ফিরে কাউকে না দেখতে পেয়ে ভ্যা করে কেঁদে দিল নীরদ  স্যার। 

তখন আবার দুষ্মন্ত স্যার এসে চোখ মুছে দিতে লাগলো। ’ কাঁদেনা সোনা, চকো দেবো’।

 খেলার স্যার  নিবারণবাবু ফুটবলের হুইসেলটা মুখে নিয়ে হাফপ্যান্ট পরে মাঠটা গোল হয়ে চক্কর কাটছে আর ফু - ফু করে বাঁশি বাজাচ্ছে। ইতিহাসের সঞ্জয় স্যার নবনীতা ম্যাডাম আর সুমনা ম্যাডামের সঙ্গে বউ বাচকি খেলছে। সঞ্জয় স্যার এতটুকু হয়ে গেছে। স্যারের যে বয়স হয়েছে বোঝাই যাচ্ছে না।  আদর করতে ইচ্ছে করছে।

 দীপ্তার্ক স্যার হন হন করে হেঁটে যাচ্ছে ,কাঁধে ব্যাগ। প্রসেনজিৎ স্যার তাকে ধরে বলল, ‘চল খেলব।‘ স্যার পাশ কাটিয়ে বলল, ‘না আমার সময় নেই, টিউশন যাবো’। বিমল বাবু ছোট হয়ে যেতে প্যান্টটা কিছুতেই কোমরে হচ্ছে না। ঢোলা প্যান্ট বারবার গলে পড়ার  উপক্রম হচ্ছে,আর স্যার টেনে তুলছে। ভূগোলের প্রিয়ব্রত স্যার কাগজের লম্বা একখানা লেজ তৈরি করে গুটি এগোচ্ছে বিমল বাবুর পিছনের দিক থেকে। বোধহয় লেজটা লাগাবে।সন্দীপন স্যার  থালায় কি একটা নিয়ে এক মনে খাচ্ছে বসে বসে। হঠাৎ বিজিত স্যার এসে তার থালা থেকে একটা কিছু তুলে নিয়ে ছুট। থালা ফেলে সন্দীপন স্যার বিজিত স্যারের পিছনে দে ছুট। নিত্যদা সারাক্ষণ বকবক করে বিদীপদার সঙ্গে। তারা একটা বল নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে।এইসব কান্ড দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ছেলেমেয়েরা। এতো অবাক হয়েছে যে হাসতেও গেছে ভুলে।

এমন সময় হেডমাস্টারমশাই  তার রুম থেকে বেরোলো হামাগুড়ি দিয়ে। হাতে একটা ললিপপ। ধীরে ধীরে দেওয়ালটা ধরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এই আদ তোমাদেল –' বলে ললিপপটা একবার চুষে নিল। তারপর বলল, ‘আদ তোমাদেল থুতি’। বলে আমার ললিপপ চুষতে লাগলো। অন্য দিন ছুটির ঘন্টা পড়লেই সব হই হই করে ছুটে বেরিয়ে আসে। আজ বাড়ি যাওয়ার নাম নেই। সবাই সবার মুখের দিকে  তাকাচ্ছে।

কেউ যাচ্ছে না দেখে হেড স্যার চোখ পাকিয়ে বলে উঠল, ‘বললাম না, তোমাদেল থুতি’।

বলে ললিপপটা চুষতে লাগল। এইবার সবাই মুখ টিপে হাসতে হাসতে ব্যাগ নিয়ে চলল গেটের দিকে। মনে একটাই চিন্তা কাল এসে কি দেখবে!গেটের মুখে মধুমালতী গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে ছিল নরেশদা।

 দীপ্তি তাকে ধরল, ‘নরেশদা তুমি কি সবাইকে ঐ ঘাস পাতা খাইয়ে ছোট করে দিয়েছো?’

উত্তর দেবার আগেই মহসিন জিজ্ঞাসা করল , ‘হেড স্যারের কি হবে গো  নরেশদা?’

 একবার মহসিনকে শাস্তি দিয়েছিল হেডস্যার।তারপর থেকে কেনো জানিনা  মনে হতো স্যার মহসিনকে একটু বেশি ভালোবাসে, আর মহসিন স্যারকে একটু বেশি শ্রদ্ধা করে ।

 ‘হেদ ছ্যার যে  দু কাপ চা খেয়ে  থিল! বলেই হাততালি দিয়ে নেচে উঠল নরেশদা। 

গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ ৩০ 

রতনতনু ঘাটী

মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি আজ কত বছর যে ইডেনে স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখেছেন, এখন আর সে কথা মনে করে বলতে পারেন না। তবু স্মৃতি হাতড়ে এখনও কত কথাই না মনে করতে পারেন। সামনের সারিতে বসেছে এ-সেকশানের রোরো মজুমদার, তার পাশে বসেছে সি-সেকশানের লোকন দাস, তার পাশে তাহিরা দত্ত, রুচিকা গুপ্ত, আরও কত ছেলেমেয়ে। ক্লাস নাইন-টেনের ছাত্রছাত্রীদের অ্যাসেম্বলি হলের মিটিংয়ের পর ছুটি দিয়ে দিয়েছেন হেডস্যার। রেনি-ডের ছুটি। ওদের পড়াশোনার চাপ আছে। ওদের এখন ক্রিকেটের গল্প না শুনলেও চলবে!

   হেডস্যারের দিকে তাকিয়ে মুকুলবাবু অনুমতি নিলেন মাথা নিচু করে। তারপর মুকুলবাবু শুরু করলেন, ‘তোমরা সকলে যে ক্রিকেট খেলো, এই ক্রিকেটের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কত না রূপকথা! আমি তোমাদের যেসব কথা শোনাব, সেগুলো শুনলে মনে হবে, এসব সত্যি নয়, গল্প। তবে আমি বলব, এসব বইয়ে পড়া গল্প নয় ঠিকই। সবই সত্যি গল্প! এসবকে আমি বলি ক্রিকেটের রূপকথা।’  

   একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার, আমি তাহিরা দত্ত। সব রূপকথার গল্পই তো স্যার মনগড়া! যেমন উপেন্দ্রকিশোরের ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ বা লীলা মদুমদারের ‘হলদে পাখির পালক’ সবই তো রূপকথা! আমি পড়েছি।’

     মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘ঠিকই বলেছ তাহিরা। আমি যেসব  ক্রিকেটের গল্প বলব, অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইবে না।’

   রোরো মজুমদার বলল, ‘স্যার আমি রোরো। আমি বলছি-- ‘এখন কেরিয়ারের যুগ, এগিয়ে চলার যুগ। যেভাবে পারো নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাও।’

   ‘তা ঠিক। কিন্তু আমি তোমাদের বলছি, যদি কোনওদিন মন দিয়ে ক্রিকেট খেলো, তা হলে মনে রেখো, এই গল্পগুলোই হল আসল ক্রিকেট। যেখানে সততাই বড়ো, মানবিকতাই প্রধান। তোমরা যদি জীবনে অনেক দিন ধরে ক্রিকেটকে সঙ্গী করে চলতে থাকো, তা হলে সেই ক্রিকেটই খেলো!’ বলে থামলেন মুকুলকৃষ্ণবাবু। গোটা অ্যাসেম্বলি হল নিশ্চুপ। 

   একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, ‘স্যার, আমি রুচিকা গুপ্ত। ঠিক আছে, আপনি সেই ক্রিকেটের গল্প আমাদের বলুন!’

   ছেলেমেয়েরা প্রশ্ন করছে দেখে হেডস্যারের মুখটা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এমন সময় খুব শান্ত গলায় মুকুলবাবু শুরু করলেন, ‘তোমাদের এবার একটা ক্রিকেটের গল্প বলি! একবার আমাদের ভারতের মাটিতে। তখন বোম্বাইয়ের নাম এখনকার মতো মুম্বই হয়নি। বম্বেতে জুবিলি টেস্টের খেলা হচ্ছে ভারত আর ইংল্যান্ডের মধ্যে। উনিশশো আশি সালে। তখন ব্যাট করছেন ইংল্যান্ডের বব টেলর। ইন্ডিয়ান টিমের ক্যাপ্টেন তখন গুন্ডাপা বিশ্বনাথ। তোমরা তো তাঁর  নাম শুনেছ নিশ্চয়ই।  ওই গোল্ডেন জুবিলি টেস্টে আম্পায়ার বব টেলরকে কট বিহাইন্ড (ক্যাচ) আউট দিয়ে দিলেন। কিন্তু ফিল্ডার বল ধরার আগে বল মাটিতে স্পর্শ করেছিল কিনা তা নিয়ে তাঁর সংশয় ছিল। এখনকার মতো তখন অত আধুনিক প্রযুক্তি আসেনি। তখন ভারতীয় অধিনায়ক গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ ‘স্পিরিট অব দ্য গেম’ বা খেলার চেতনা বজায় রাখতে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত মেনে না নিয়ে, প্যাভিলিয়নের দিকে হেঁটে -যাওয়া বব টেলরকে ডেকে আবার ক্রিজে ফিরিয়ে আনলেন।  বিশ্বনাথ ক্যাচ ধরে ফেলেছেন ভেবে আম্পায়ার আউট দিয়ে দিয়ে ছিলেন। বিশ্বনাথ বললেন, ‘আমি  ক্যাচটা ধরতে পারিনি স্যার। এটা আউট নয়?’ বব টেলর ওই ম্যাচে তেতাল্লিশ রান করেছিলেন। ভারত হেরে গিয়েছিল সেই খেলায়। কিন্তু সবাই প্রশংসা করেছিলেন সেদিন ভারতীয় দলের ক্যাপ্টেন গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথের সততার! ওটাই হল ক্রিকেট!’

   অ্যাসেম্বলি হল জুড়ে হাততালির ঝড় উঠল। হেডস্যার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এইটাই হল ক্রিকেট! ক্রিকেট খেলা সততার, মানবিকতার খেলা। আমার ইচ্ছে, তোমরা বড় হয়ে ঠিক এই ক্রিকেটটাই খেলো!’

   মুকুলকৃষ্ণ উপস্থিত সকলকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাদের কেমন লাগল ক্রিকেটের এই সত্যি গল্পটা?’

   ভূগোলের ভুবনস্যার বললেন, ‘আমরা মুকুলবাবু আপনার কাছ থেকে এরকমই ক্রিকেট-জীবনের নানা গল্পই শুনতে চাই।’

মুকুলকৃষ্ণবাবুর মুখেও আনন্দের ঝলক। বলতে শুরু করলেন, ‘এখন যে গল্পটা বলল, আশা করছি সকলেরই ভাল লাগবে! কোর্টনি ওয়ালস ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় দলের বিখ্যাত বোলার। কোর্টনি ওয়ালশ বল করছেন। হঠাৎ বল করতে গিয়ে তিনি দেখলেন, অন্য দিকে পাকিস্তানের যে ব্যাটসম্যান দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি বল করার আগেই রান নেওয়ার জন্যে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন। ওয়ালশ বল নিয়ে উইকেটের উপর ছোঁয়ানোর ভঙ্গিতে ধরে থাকলেন। উইকেযে ছোঁয়ালেন না। কিন্তু উইকেটের ওদিকে খেয়াল হতেই পাকিস্তানের ব্যাটসম্যান তাড়াতাড়ি ফিরে গেলেন ক্রিজে। ইচ্ছে করলেই ওয়ালশ উইকেটে বলটা ছুঁইয়ে দিলেই আউট হয়ে যেতেন ব্যাটসম্যান। কিন্তু ওয়ালশ তা করেননি। সে-খেলায় পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ হেরেও গিয়েছিল। কিন্তু সবাই মনে রেখেছে ওয়ালশের এই উদারতার কথা।’

   দীক্ষা সেন অবাক মুখে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, আমি দীক্ষা। কোর্টনি ওয়ালশ আউট করলে তো আর পাকিস্তান জিততে পারত না। কিন্তু ওয়ালশ আউট করেননি কেন?’

    মুকুলবাবু বললেন, ‘ক্রিকেট খেলা তো এরকমই হওয়া উচিত দীক্ষা। খেলা তো ভ্রাতৃত্ববোধের, মিলনের, সততার এবং মানবিকতারও। তোমরা জানবে, বিশ্বের কোনও ক্রিকেট দলই এক বা দু’জন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে না। গোটা দলটাই সবসময় জেতার জন্য খেলে। ক্রিকেট খেলা নিয়ম আর শৃঙ্খলাবোধেরও। তোমাদের মনে রাখতে হবে, ক্রিকেট খেলতে গিয়ে কখনও যেন শৃঙ্খলাভঙ্গ না হয়। যেমন তোমাদের আর একটা ঘটনা শোনাই—দু’ হাজার এগারো সালের বিশ্বকাপে সচিন তেন্ডুলকরকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি আম্পায়ার স্টিভ বাকনার একটি ভুল সিদ্ধান্তে আউট হওয়ার নির্দেশ দিলেন। এটা ছিল দু’ হাজার তিন-চার মরশুমে ব্রিসবেনে ভারত–অস্ট্রেলিয়া টেস্ট ম্যাচে। সেই সময় তেন্ডুলকর ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বোলার জেসন গিলেসপি ও উইকেটরক্ষক অ্যাডাম গিলক্রিস্টের জোরালো আবেদনের পর বাকনার সচিনকে এলবি ডব্লিউ আউট দেন। মাত্র তিন রান করে সচিন সাজঘরে ফিরে যান। সেই ম্যাচে বড় ধাক্কা খায় ভারত। সেদিন কোনও প্রতিবাদ না জানিয়েই মাঠ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন সচিন। সচিনের ক্রিকেটের এবং আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের প্রতি তাঁর এই সম্মান বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।’

   সকলের হাততালিতে মুখর হয়ে উঠল হলঘর। হেডস্যার উঠে দাঁড়িয়ে গলা তুলে বললেন, ‘সচিন, যুগ যুগ জিও!’

   মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি হাসতে-হাসতে বললেন, ‘না। এই গল্পটা এখানেই শেষ নয় নবনীতস্যার! মজার গল্পটা আরও একটু বাকি আছে। এবার বলি—দীর্ঘ বাইশ বছর পর সেই আম্পায়ার বাকনার বলেছেন, তিনি জানতেন তাঁর সেই সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। কারণ, বলটি স্টাম্প মিস করতই। তিনি স্বীকার করেন, আজও মানুষ সেই ঘটনাটি নিয়ে কথা বলে। জীবনে ভুল হতেই পারে এবং আমার সেই ভুলটি আমি মেনে নিয়েছি।’ 

   মুকুলবাবুর এই শেষের কথাগুলো শুনে সকলে বিষণ্ণ মুখে বলতে লাগল, ‘সচিন! সচিন!’

   মুকুলবাবু বললেন, ‘ক্রিকেট এমন একটি খেলা, যার প্রতিটি ইনিংস থেকেই উঠে আসে এক-একটি নতুন জীবনজয়ের গল্প! আসলে আমরা দর্শকরা খেলা দেখে আনন্দে ঘুমোতে যাই। কিন্তু চ্যাম্পিয়নরা কখনওই ঘুমাোন না, চিরন্তন আত্মা তাঁদের সব সময় সতর্ক ও জাগ্রত করে রাখে।’ তারপর ছেলেমেয়ের দিকে তাকিয়ে মুকুলবাবু বললেন, ‘তোমরা জেনে রাখো, ধৈর্যই একজন ব্যাটসম্যানের সবচেয়ে বড় শক্তি।’

   ইতিহাসের অনুলেখাম্যাম উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমি মহেন্দ্র সিংহ ধোনির এক সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম, উনি সেখানে বলেছেন, ‘কঠোর পরিশ্রমের কোনও বিকল্প নেই। আমি সব সময় নিজের খেলার ওপর আস্থা রেখে চলি।’ 

   মেয়েরা হাততালি দিয়ে উঠল ম্যামের কথায়। এবার দেবোপমসস্যার উঠে দাঁড়িয়ে মুকুলবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার, আপনি কত পুরনো গল্প বলে শোনাচ্ছেন! আমি মুগ্ধ! স্যার, আমি একটা ক্রিকেটের ছোট্ট গল্প বলতে পারি কি?’

   মুকুলবাবু হাসতে হাসতে বললেন, ‘কেন নয়? আরে দেবোপম, বলো না! বলো, বলো!’

   দেবোপমস্যার বললেন, ‘দু’ হাজার এগারো সালের বিশ্বকাপেও একটি দারুণ সততার নজিরের কথা বলি। ভারতের বিপক্ষে একটি ম্যাচে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক মাহেলা জয়াবর্ধনে সেঞ্চুরি করার পথে। আচমকা বল তাঁর গ্লাভসে লেগে উইকেটরক্ষকের হাতে চলে যায়। আম্পায়ার তা বুঝতেই পারেননি। কিন্তু মাহেলা জয়াবর্ধনে নিজে থেকেই আম্পায়ারকে জানিয়ে দেন যে তিনি আউট হয়েছেন এবং মাঠ ছেড়ে চলে যান।’ এই ধরনের ঘটনাগুলো এটাই প্রমাণ করে যে, জয়ের চেয়েও সত্য ও সততা ক্রিকেটের মূল চেতনা।’

   সকলের হাততালিতে মুখর হল অ্যাসেম্বলি হল। মুকুলকৃষ্ণ বললেন, ‘বাঃ! তুমি খুব সুন্দর একটা গল্প শোনালে আমাদের দেবোপম। আমি এবার ক্রিকেটের আর একটা চমৎকার গল্প শোনাই? দু’ হাজার তিন সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলছে শ্রীলঙ্কা। ব্যাট করছিলেন অস্ট্রেলিয়ার তারকা উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। দলের রান তখন বেশ ভালো। শ্রীলঙ্কার বোলার চামিন্ডা ভাসের একটি বল গিলক্রিস্টের ব্যাটের কানায় লেগে সোজা উইকেটরক্ষক কুমার সাঙ্গাকারার হাতে জমা পড়ল। বোলার ও ফিল্ডাররা জোরালো আবেদন করলেও, ফিল্ড আম্পায়ার রুডি কোয়ের্টজেন তাঁকে ‘নট আউট’ ঘোষণা করেন। সবাই ভেবেছিল গিলক্রিস্ট ক্রিজে টিকে থাকবেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে, আম্পায়ারের আঙুল তোলার আগেই গিলক্রিস্ট নিজে থেকেই ক্রিজ ছেড়ে প্যাভিলিয়নের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করেন। তিনি জানতেন, বল তাঁর ব্যাটে স্পর্শ করেছে। এই ঘটনাটি ক্রিকেট ইতিহাসে সততা, স্পোর্টসম্যানশিপ এবং নৈতিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।’

   উইকেটকিপার হর্ষা মণ্ডল উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার, আমি হর্ষা মণ্ডল। গিলক্রিস্ট সততা দেখাতে পেরেছিলেন, কেননা, তিনি অনেক বড় ক্রিকেটার ছিলেন! তাই তো আমরা তাঁর স্পোর্টসম্যানশিপের আজও প্রশংসা করছি। আমরা যারা ভবিষ্যতে ক্রিকেট খেলব বলে মনে-মনে ঠিক করেছি, এ থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত!’

   হেডস্যার হর্ষার কথায় হাততালি দিয়ে উঠলেন। মুকুলকৃষ্ণ বললেন, ‘আমি তো তোমাদের সেই শিক্ষার কথাই বলছি! আমাদের গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ যেন এরকম আদর্শে এগিয়ে চলে।’

   মুকুলকৃষ্ণ বললেন, ‘ক্রিকেট চিরদিনই আদর্শ নিয়ে বেঁচে থাকে। সালটা দু হাজার এগারো সালের।  সততার একটি বিরল নজির দেখলাম, ভারতের বিপক্ষে একটি ম্যাচে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক মাহেলা জয়াবর্ধনে সেঞ্চুরি করার পথে একটু দূরে। বল তাঁর গ্লাভসে লেগে উইকেটরক্ষকের কাছে চলে গিয়েছিল। আম্পায়ার তা বুঝতে পারেননি। কিন্তু মাহেলা জয়াবর্ধনে নিজে থেকেই আম্পায়ারকে জানিয়ে দিলেন যে তিনি আউট হয়েছেন এবং তারপরই মাঠ ছেড়ে চলে যান। এই ধরনের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, জয়ের চেয়েও সত্য ও সততা ক্রিকেটের মূল চেতনা।’

   মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘এবার আমি ছোট-ছোট দু’-একটা রেকর্ডের গল্প বলি? শূন্য রানে আউট হওয়া ক্রিকেটারদের ভাগ্যের পরিহাস। তবু ক্রিকেটে শূন্য রানে আউট হওয়ার উদাহরণ কম নেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি খেলায় সবচেয়ে বেশিবার শূন্য রানে আউট হওয়ার রেকর্ডটি কার বলতে পারো? এনি ওয়ান?’

   বলার জন্যে কেউ হাত তুলল না। মুকুলকৃষ্ণ বললেন, ‘এই রেকর্ডটি মূলত মুত্তিয়া মুরালিধরনের নামে, যিনি একজন বোলার হলেও ব্যাটিংয়ে নেমে উনষাটবার বার ‘ডাক’ আউট হয়েছিলেন। আর ব্যাটসম্যানদের মধ্যে শূন্য রানে বেশিবার আউট হয়েছেন শ্রীলঙ্কার দিলশান তিলকারত্নে এবং বাংলাদেশের মুশফিকুর রহিম। এঁরা আউট হয়েছেন শূন্য রানে চল্লিশবার করে। আমাদের বিরাট কোহলিও শূন্য রানে আউট হওয়ার দৌড়ে পিছিয়ে নেই। চল্লিশবার।’ একটু থামলেন মুকুলকৃষ্ণবাবু। মুখে হালকা হাসি ছড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কেউ বলতে পারো, ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশিবার শূন্য রানে আউট হয়েছেন কে?’

   সকলে নিশ্চুপ। মুকুলবাবু বললেন, ‘কেউ বলতে পারলে না তো? তা হলে আমিই বলি? বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশিবার শূন্য রানে আউট হয়েছেন তামিম ইকবাল। তিনি ২৪৩টি ম্যাচে ১৯ বার শূন্য রানে আউট হয়েছেন, যে রেকর্ড বাংলাদেশের আর কোনও ব্যাটসম্যানেরই নেই।’

শ্রোতাদের চোখের ভাষা পড়ে নিলেন মুকুলকৃষ্ণবাবু। এবার বলতে শুরু করলেন, ‘আমরা কেন, গোটা ক্রিকেটবিশ্ব মান্য করে সচিন তেন্ডুলকরকে ‘ক্রিকেটের ঈশ্বর’ বলে। কারণ ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ের অধিকাংশ রেকর্ডই শচিন টেন্ডুলকরের দখলে। আবার ‘অভাগা’ রেকর্ডের তালিকায়ও রয়েছে সচিনের নাম। তোমরা জানতে চাইছ নিশ্চয়ই, কী সেই খারাপ রেকর্ড? সচিন চারশো তেষট্টিটি ম্যাচের ক্যারিয়ারে মোট আঠারোবার নব্বইয়ের ঘরে আটকে গেছেন। এর মধ্যে একবার ছিয়ানব্বই রানে অপরাজিত ছিলেন। অবাক করা কথা হল, সচিন তিন-তিনবার আউট হয়েছেন ওয়ান ডে-তে নিরানব্বই রানে। সব ক’টি ম্যাচই খেলেছিলেন দু’ হাজার সাত সালে।’

   ‘সত্যিই সচিন তেন্ডুলকরের ভাগ্য খারাপ! নিরানব্বই রানে তিন-তিনবার আউট! ভাবতেই পারছি না!’ বলে কপালে একটা চাপড় মেরে ফের বসে পড়ল লোকন দাস।

   মুকুলকৃষ্ণবাবু লোকনকে ভালবাসেন তার ঝকঝকে ব্যাটিংয়ের জন্যে। কথায় কথায় বৈভব সূর্যবংশীর সঙ্গে তার তুলনাও করেন। লোকনের দিকে তাকিয়ে মুকুলবাবু বললেন, ‘শোনো লোকন, এক ওভারে সব চেয়ে বেশি রানের রেকর্ড শুনবে? উনিশশো নব্বই সালে নিউজিল্যান্ডে। তখন চলছিল ‘শেল ট্রোফি’র আসর। এই ঘরোয়া টুর্নামেন্টের আসরে টিম ওয়েলিংটন এবং টিম ক্যান্টারবারির খেলা চলছিল৷ ম্যাচটা নিশ্চিতভাবে ওয়েলিংটনের হাতেই ছিল৷ তখন জিততে হলে শেষ দু’ ওভারে ক্যান্টারবেরির দরকার পঁচানব্বই রান ৷ তখন বল করতে আসেন ওয়েলিংটনের বোলার বার্ট ভেন্স ৷ সতেরোটি নো বল, আটটি সিক্স এবং ছ’টি চারের সুযোগ দিয়ে ভেন্স ওই এক ওভারে একাই ৭৭ রান দিয়ে বসেন ৷ ভেন্স মোট বাইশটি বল করেছিলেন ৷ এখন পর্যন্ত ক্রিকেটের ইতিহাসে বার্ট ভেন্সের করা এই ওভারটিকে সর্বকালের সবচেয়ে খরুচে ওভার হিসেবে বিবেচনা করা হয়৷’

   ক্লাস এইট সি-সেকশানের বাঁ-হাতি বোলার নাতাশা চক্রবর্তী উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার, এক ওভারে সাতাত্তর? এ তো ভাবতেই পারা যাচ্ছে না? কল্পনারও বাইরে!’

   তোমরা সকলে কল্পনা করতে থাকো! আমরা এবার দেখছি, আকাশের আর মুখভার নেই। হেডস্যার, আজকের মতো আমাদের গল্পের আসরের ছুটি হোক?’

   হেডস্যার বললেন, ‘তোমাদের জন্যে পারলে আর একদিন এরকম ক্রিকেটের গল্পের আসর নিয়ে আসব। আজ মুকুলকৃষ্ণবাবু ক্রিকেটের যেসব অমূল্য গল্প শোনালেন, এসব তোমাদের মনে অক্ষয় হয়ে থাকুক। সময়-সুযোগ পেলে তোমরাও অমন দৃষ্টান্ত গড়ে তুলবে এই আশা রাখলাম!’

   সকলেই উঠে পড়লেন। বড়রা যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরাও বেরিয়ে পড়লেন। বৃষ্টির মুখে দুয়ো দিয়ে আকাশ ঝকঝক করে উঠল!

(এর পর ৩১ পর্ব)

আদ্রিজা জানা 
দ্বিতীয় শ্রেণী। পাহাড়ী পুর প্রাথমিক বিদ্যালয়
চিড়িমারসাই, পাটনা বাজার, মেদিনীপুর

রথযাত্রা 
রাজর্ষি মন্ডল

আজ বসেছে রথের মেলা দারুণ হৈ চৈ 
মায়ের সাথে ঘুরব মেলায় খাব চিড়া দই।

সন্দেশ আর জিভেগজা কিনব অনেক করে
রিনি ঝিনি ছোট্ট চিনি খাবে পেটটি ভরে।

নাগরদোলা চড়ব মেলায় বেলুন নিয়ে হাতে
ভয় পাব না এবারে আর মা যে আছে সাথে।

চকলেট নয় কুলের আচার ভা'য়ের জন্য কিনে
আনলে আবার আনন্দে সে নাচবে তা-ধীন ধীনে। 

আলুর চপ আর পাঁপড় ভাজা ছোট্ট বনুর প্রিয়
সাজাবো রথ ফুল মালিকায় ভরবে মোদের গৃহ।

জিলাপি আর মিহিদানা কী যে ভাল লাগে 
রথে আছে জগন্নাথ দেব মনের মাঝে জাগে।

রথের রশি টানবো যখন ভাই বোনেরা মিলে
পড়শীরা সব দেখতে এলে বলব কোথায় ছিলে।

শাঁখ ঘণ্টা কাঁসর তথন আনবে ছেলের দল
মা যে তাদের বলবে ওরে রথযাত্রায় চল।

🍂

শনিবারের মজা 

লক্ষণ চন্দ্র ওঝা 

স্কুলে এসে স্যার বললেন 
শেখাবো আজ ছড়া ,
আজ শনিবার হবে না তো  
বিশেষ কিছু পড়া। 
এই শনিবার শেখাবো ছড়া 
পরের শনিবার পড়া 
অন্য শনিবার আঁকবো ছবি 
পড়া নয়তো কড়া।

মনের পাঠশালা 8
দীপালি সাহু 
M.A Psychology ( clinical),  MSW 
working as a counsellor at a govt. hospital
Midnapur. 
যোগাযোগ : 7001695687

আগের সংখ্যায় তোমাদের বলেছিলাম যে মনের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য বিশেষ সাবান ও আছে । তোমাদের হয়তো বিশ্বাস হয়নি । আমরা প্রতিদিন কত যত্ন নিয়ে শরীরের যত্ন নিই, সুগন্ধি সাবান দিয়ে শরীর পরিষ্কার করি, ধুলোবালি , নানা রকম রোগ জীবাণু থেকে শরীরকে রক্ষা করি।  
বাবা মায়ের বকুনি , বন্ধুর সাথে ঝগড়া,  ইনস্টাগ্রামে অন্যের সুন্দর ছবি দেখে নিজের অজান্তেই তৈরি হওয়া এক চিলতে হীনম্মন্যতা, কিংবা ভবিষ্যতের কোনো অজানা ভয়—এইরকম সারাদিনে যে রাগ , অপমান, অভিমান , হতাশা, ভয় ,ঈর্ষা এই সবকিছুই হলো মনের একেকটি অদৃশ্য ধুলোবালি। এগুলো আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু দিনের পর দিন জমতে জমতে একসময় মনের দেয়ালে একটা কালচে আস্তরণ তৈরি করে।
তাই শরীরকে পরিষ্কার রাখার জন্য যেমন রোজ সাবান জল লাগে, ঠিক তেমনি আমাদের মনের স্বাস্থ্যকে সুন্দর, উজ্জ্বল ও হালকা রাখার জন্য প্রয়োজন এক জাদুকরী ‘মনের সাবান’।
এসো আজ আমরা মন পরিষ্কার করার উপায় সম্পর্কে আলোচনা করি ।
 
১ গ্লিসারিন সাবান বা 'ক্যাথারসিস'
আমাদের মনের অনেক কথা , ইচ্ছে , অনুভূতি থাকে যা আমরা লজ্জায়, ভয়ে বা সংকোচে কাউকে বলতে পারি না। এগুলো মনের ভেতর পচে গিয়ে দুর্গন্ধ বা ক্ষত তৈরি করে।প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে একটি ডায়েরি নিয়ে বসো। তোমাদের মনের মধ্যে যে রাগ , অভিমান বা খারাপ লাগার কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে—তা সে যতই হিংসাত্মক, দুঃখের বা অদ্ভুত হোক না কেন—কোনো রকম সাজিয়ে লেখার চেষ্টা না করে হুবহু খাতায় লিখে ফেলতে পারো । যদি বন্ধু বা কাছের মানুষ থাকে যাকে সব কথা বলা যায় তাতে বলতে পারো । তবে খেয়াল রেখো সে যেন তোমার ভরসার করার মতো কেউ হয় ।এতে মনের ভিতরের দূষণ কমে যাবে ।মন ফুরফুরে বা চনমনে হবে ।
২. নীরবতার ফেনা  বা meditation 
সারাদিন আমাদের মাথায় কয়েক হাজার চিন্তা আসে। এই চিন্তার ট্র্যাফিক জ্যাম আমাদের মনকে আঠালো ময়লার মতো জাপটে ধরে।দিনে অন্তত দুবার (সকালে ঘুম থেকে উঠে এবং রাতে ঘুমানোর আগে) মাত্র ৫ মিনিটের জন্য একদম মেরুদণ্ড সোজা করে বসো ।চোখ বন্ধ করে আপনার চারপাশের সমস্ত আওয়াজ থেকে মনকে সরিয়ে এনে শুধু নিজের শ্বাসের ওপর মনোযোগ দাও ।পেট ফুলিয়ে গভীর শ্বাস দাও , কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখো তারপর মুখ দিয়ে ফুঁ দেওয়ার মতো করে আস্তে আস্তে ছেড়ে দাও ।এই গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ফলে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের বন্যা বয়ে যাবে । এটি তোমার মন থেকে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার ফেনাগুলোকে এক নিমেষে ধুয়ে দেবে ।
3.ক্ষমার সুগন্ধি বা 'সেলফ-কম্প্যাশন' 
অনেক সময় আমরা নিজেদের ওপর বড্ড বেশি কঠোর হয়ে যাই। কোনো ভুল হলে নিজেকে সারাক্ষণ দোষারোপ করতে থাকি। নিজেকে এই আত্মগ্লানি মনের সবচেয়ে বড় জেদি দাগ।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে বলুন, "মানুষ হিসেবে আমার ভুল হতেই পারে। ভুল ঠিক অনেকটাই আপেক্ষিক। আমি নিখুঁত নই, কিন্তু আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করছি।" নিজেকে ক্ষমা করতে করো ।এই আত্ম-অনুকম্পা সুগন্ধির মতো কাজ করে, যা মনকে ভেতর থেকে এক পরম তৃপ্তি ও সুবাসিত করে।
4.  বডি ওয়াশ বা prosocial activity 
যখন আমরা কাউকে সাহায্য করি সেটা বিভিন্ন ভাবে যেমন খেলা শেষে নিজের খেলনা ও বইপত্র গুছিয়ে রাখা, যাতে মা-বাবার কষ্ট কমে,বাড়ির টবের ছোট গাছগুলোকে প্রতিদিন নিয়ম করে একটু জল দেওয়া,বারান্দায় বা ছাদে বাটিতে করে পাখি বা বিড়ালের জন্য জল ও খাবার রেখে আসা,
কোনো বন্ধু টিফিন আনতে ভুলে গেলে বা পেন্সিল হারিয়ে ফেললে নিজেরটা তার সাথে ভাগ করে নেওয়া,কোনো বন্ধু পড়া না বুঝলে তাকে বুঝিয়ে দেওয়া বা সহপাঠী পড়ে গেলে তাকে হাত ধরে তোলা,
পরিবারে বা স্কুলে নিজের চেয়ে ছোটদের সাহায্য করা এবং দাদু-দিদাকে চশমা বা জলের গ্লাস এনে দেওয়া ইত্যাদি তখন সেই মানুষটার মুখে হাসি ফোটে সাথে সাথে আমাদের মন ও নিজেকে দামি মানুষ বলে মনে হয় । তাতে আমাদের নিজের রাগ , হিংসা , ঈর্ষা কমে যায় ।

গায়ে ধুলো লাগবে জেনেও কি আমরা স্নান করা বন্ধ রাখি? রাখি না। ঠিক তেমনি, জীবনে চলতে গেলে দুঃখ, কষ্ট, হতাশা আর মানসিক চাপ আসবেই—এটা বাস্তবতার নিয়ম। কিন্তু আমাদের কাজ হলো সেই ময়লাকে মনের ভেতর স্থায়ী ভাবে জমতে না দেওয়া। একটা কথা ভাবো যে আমাদের মন নোংরা ডাস্টবিন নয় যে নোংরা পচা আবর্জনা জমিয়ে রাখবে । মন খুব দামি জিনিস তাই সেখানে সুন্দর সুন্দর ভাবনা , স্মৃতি , কথা যত্ন করে রাখতে হবে ।
প্রতিদিন দিনের শেষে মাত্র ১০-১৫ মিনিট সময় বের করে তোমাদের পছন্দের সাবান টি ব্যবহার করো , দেখবে তোমাদের মন আবার নতুন, তাজা ,উজ্জ্বল ও সুগন্ধিত হয়ে উঠেছে ।
পরবর্তী সংখ্যায় আমরা হটাৎ করে মনের কাটা ছেঁড়া হলে কি ফার্স্ট এইড আছে সেটা জানবো । তোমাদের কেমন লাগছে জানিও।  উপরে আমার যে ফোন নম্বর টা আছে সেটাতে হোয়াটস্যাপ ম্যাসেজ করতে পারো।  আমি অবশ্যই তোমাদের উত্তর দেবো।

ক্যুইজ: ১৪ 

১. বাংলার নবজাগরণের পথিকৃৎ কে ছিলেন? 
2. পশ্চিমবঙ্গের কোন শহর জুট শিল্পের জন্য বিখ্যাত? 
৩. পশ্চিমবঙ্গের কোন শহর কে প্রাসাদের শহর বলা হয়? 
৪. পশ্চিমবঙ্গের প্রধান কয়লা ক্ষেত্র কোনটি? 
৫. পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প কোনটি? 


গত সপ্তাহের ক্যুইজ এর উত্তর

১. স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় 
2. শান্তিনিকেতন 
৩. ১৮৫৭ 
৪. ৪২ টি 
৫. রয়েল বেঙ্গল টাইগার

Post a Comment

0 Comments