পর্ব ৩ : স্মৃতির কুয়াশা
কমলিকা ভট্টাচার্য
লন্ডনের গ্রীষ্ম যেন প্রতিদিন নতুন রঙে নিজেকে সাজাচ্ছিল। রাত ন'টা পেরিয়েও আকাশের পশ্চিম দিগন্তে সূর্যের শেষ আলো লেগে থাকে। টেমসের জলে সেই আলো ভেঙে ভেঙে পড়ে। নদীর ধারে বসে কেউ গিটার বাজাচ্ছে, কেউ বই পড়ছে, কেউ আবার হাত ধরাধরি করে হাঁটছে। চারদিকে জীবন যেন স্বাভাবিক ছন্দে এগিয়ে চলেছে। শুধু কয়েকটি মানুষের জীবনে সময় যেন অন্য গতিতে বয়ে যাচ্ছে।
সকালে ঘুম ভাঙতেই আদর বিছানায় উঠে বসে রইল। জানলার বাইরে তাকিয়ে অনেকক্ষণ কিছু একটা মনে করার চেষ্টা করল। মাথার ভেতর আজকাল প্রায়ই অদ্ভুত অদ্ভুত ছবি ভেসে ওঠে। কোনোটা পরিষ্কার হয় না। একটা ল্যাবরেটরি। একটা ভায়োলিন। একজোড়া হাত। তারপর সবকিছু আবার সাদা কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে যায়। সে কপালে হাত চেপে ধরল। "কেন কিছুই মনে পড়ে না?"
নিচে রান্নাঘরে সুসান সকালের জলখাবার তৈরি করছিলেন। আদর ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল। সুসান হাসলেন। "আজ অনেকটা ভালো দেখাচ্ছে তোমাকে।"
আদর মৃদু হেসে বলল, "শরীর ভালো। শুধু মাথাটা যেন আমার নিজের নয়।"
সুসান তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। "সব ঠিক হয়ে যাবে।"
🍂
আদর জানে, এই কথাটা সবাই বলে। কিন্তু কীভাবে ঠিক হবে, কেউ জানে না।
ঠিক তখনই দরজার বেল বেজে উঠল। দৃষ্টি এসেছে। তার হাতে ভায়োলিনের বাক্স। সুসান দরজা খুলে বললেন, "এসো।"
দৃষ্টি হাসল। কিন্তু সেই হাসির মধ্যে আগের উজ্জ্বলতা নেই। গত কয়েক সপ্তাহে তার ভিতরেও অনেক কিছু বদলে গেছে। সে এখন দর্শনের প্রতিটি আচরণ লক্ষ্য করে। প্রতিটি উত্তর। প্রতিটি নীরবতা। প্রতিটি কথা এড়িয়ে যাওয়া। দর্শনের ওপর তার অগাধ বিশ্বাস ছিল। এখন সেই বিশ্বাসের জায়গায় অজানা এক সংশয় জন্মেছে।
দৃষ্টি ঘরে ঢুকতেই আদর বলল, "তুমি এসেছ?"
"হ্যাঁ।"
"আজও বাজাবে?"
"যদি শুনতে ইচ্ছে করে।"
আদর মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
ভায়োলিনের প্রথম সুর ঘরের নীরবতাকে ধীরে ধীরে ভরিয়ে দিল। সেই পুরোনো সুর। যে সুর একসময় তাদের দু'জনের নিঃশব্দ ভাষা ছিল।
আদর চোখ বন্ধ করল। সুরের ভেতর দিয়ে যেন কেউ তাকে ডাকছে। খুব দূর থেকে। খুব পরিচিত। হঠাৎ তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। একটি মেয়ের হাসি। একটি নদী। বৃষ্টির গন্ধ। তারপর—একটি কণ্ঠস্বর।
"...আদর..."
সে হঠাৎ চোখ খুলে ফেলল। শ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে।
দৃষ্টি ভায়োলিন নামিয়ে এগিয়ে এল। "কী হয়েছে?"
আদর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ফিসফিস করে বলল, "মনে হচ্ছিল... কেউ আমাকে ডাকছিল।"
"কে?"
আদর মাথা নাড়ল। "জানি না।"
দৃষ্টি চোখ বন্ধ করল। প্রতিবারই ঠিক এই জায়গায় এসে সবকিছু থেমে যায়। মনে হয়, আর একটুখানি হলেই স্মৃতির দরজা খুলে যাবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে যেন অদৃশ্য কেউ দরজাটা বন্ধ করে দেয়।
সেই সময় দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল দর্শন। সে নিঃশব্দে পুরো ঘটনাটা পর্যবেক্ষণ করছিল। তার সিস্টেমে আদরের নিউরাল রেসপন্স বিশ্লেষিত হচ্ছিল।
MEMORY RECONSTRUCTION : ২১%
EMOTIONAL RESPONSE : HIGH
RECOMMENDED ACTION : STIMULATION
দর্শন কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইল। সে জানে, এখনই চাইলে আরেকটি স্নায়বিক উদ্দীপনা দিয়ে স্মৃতির এই প্রবাহকে আরও এগিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু সে কিছুই করল না। চুপচাপ ঘুরে চলে গেল।
দৃষ্টি তার পায়ের শব্দ চিনতে পারল। সে ডাকল, "দর্শন!"
দর্শন থেমে দাঁড়াল। "হ্যাঁ?"
"তুমি চলে যাচ্ছ?"
"আমার কাজ আছে।"
দৃষ্টি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল। "আজ ওর মধ্যে পরিবর্তন হচ্ছিল। তুমি দেখেছ?"
"দেখেছি।"
"তাহলে কিছু করলে না কেন?"
দর্শনের উত্তর আসতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। "এখনও সময় হয়নি।"
দৃষ্টির কণ্ঠে প্রথমবার তীব্র বিরক্তি। "তুমি এই কথাটাই বারবার বলছ।"
দর্শন শান্ত। "কারণ এটাই সত্যি।"
"নাকি তুমি সত্যিটা লুকিয়ে রাখছ?"
দু'জনের মাঝখানে নীরবতা নেমে এল।
দর্শন ধীরে বলল, "আমার ওপর বিশ্বাস না থাকলে আমাকে প্রশ্ন কোরো না।"
দৃষ্টির মুখ শক্ত হয়ে গেল। "বিশ্বাসটাই তো হারিয়ে ফেলছি।"
কথাটা শুনেও দর্শনের মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না। সে শুধু বলল, "আমি দুঃখিত।"
তারপর ধীরে ধীরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
দৃষ্টি অনেকক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, আজ যে মানুষটা চলে গেল, সে কি সত্যিই সেই দর্শন? নাকি তার জায়গায় অন্য কেউ এসে দাঁড়িয়েছে?
বাইরে তখন হালকা বাতাস উঠেছে। টেমসের জলে ঢেউ লেগেছে। আর সেই ঢেউয়ের মতোই অদৃশ্যভাবে বদলে যেতে শুরু করেছে প্রত্যেকের সম্পর্কের ভিত।
দর্শন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর অনেকক্ষণ উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে লাগল। বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে ঝুঁকছে। গ্রীষ্মের লন্ডনে রাত আসতে এখনও অনেক দেরি। টেমসের ওপর দিয়ে হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। নদীর জলে ছোট ছোট ঢেউ উঠছে, যেন জলও অস্থির হয়ে আছে।
দর্শন থামল না। তার সিস্টেমে একের পর এক তথ্য ভেসে উঠছিল।
ADAR MEMORY RESPONSE : STABLE
NEXT STIMULATION : DELAYED
PRIMARY DIRECTIVE : ACTIVE
সে নিঃশব্দে সব বার্তা বন্ধ করে দিল। আজ ইচ্ছে করলেই আদরের স্মৃতির আরও একটি স্তর জাগিয়ে তোলা যেত। কিন্তু সে তা করল না। নিজেকে কঠিন করে তুলতে হবে। যত বেশি দেরি হবে, তত বেশি নিরাপদ থাকবে আদর।
ঠিক তখনই তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি এনক্রিপ্টেড সংকেত ভেসে উঠল।
HARGREAVE REQUESTING IMMEDIATE MEETING
দর্শন এক মুহূর্তও দেরি করল না।
ডকল্যান্ডসের সেই পরিত্যক্ত গুদামঘর। আজও চারদিকে নিস্তব্ধতা। হারগ্রিভ জানলার পাশে দাঁড়িয়ে টেমসের দিকে তাকিয়ে ছিল।
দর্শন ঢুকতেই সে ঘুরে দাঁড়াল।
"এসেছ।"
"আপনি ডেকেছিলেন।"
হারগ্রিভ ধীরে ধীরে একটি ট্যাবলেট তার দিকে বাড়িয়ে দিল। স্ক্রিনে আদরের গবেষণার কয়েকটি পুরোনো নকশা।
"এগুলো অসম্পূর্ণ।"
দর্শন শান্ত গলায় বলল, "হ্যাঁ।"
"বাকিটা কোথায়?"
"আদরের মাথায়।"
হারগ্রিভ মৃদু হেসে উঠল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে আবার বলল, "তবে সাবধান। যদি ওর স্মৃতি ফিরে আসে, সব শেষ।"
দর্শন নির্বিকার মুখে উত্তর দিল, "ফিরতে দেব না।"
হারগ্রিভ সন্তুষ্ট। "আমি তোমাকে ভুল চিনিনি।"
দর্শন মাথা নিচু করল। তার চোখের নীল আলো এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল।
ঠিক সেই সময় হারগ্রিভ নিজের কপালে হাত রাখল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, "অদ্ভুত..."
দর্শন তাকাল। "কী হয়েছে?"
"আমি... আমি তোমাকে আর একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম।"
সে কপাল কুঁচকে অনেকক্ষণ ভাবল। তারপর বিরক্ত গলায় বলল, "থাক... পরে মনে পড়বে।"
দর্শন কিছু বলল না। শুধু নিঃশব্দে হারগ্রিভের দিকে তাকিয়ে রইল। তার সিস্টেমের গভীরে একটি গোপন প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু তার কোনো চিহ্ন বাইরে প্রকাশ পেল না।
সেই রাতে দৃষ্টি আবার ফোন করল ভারতে। অনির্বাণরা যেন ফোনের অপেক্ষাতেই ছিলেন।
"আজ কেমন আছে আদর?"
দৃষ্টি বলল, "আজ একটা সুর শুনে ওর কিছু মনে পড়ছিল। কিন্তু আবার সব হারিয়ে গেল।"
অনির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "দর্শন কী বলছে?"
দৃষ্টি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, "ও শুধু বলে—'এখনও সময় হয়নি।'"
ওপাশে নীরবতা।
ইরা খুব আস্তে বললেন, "এটা কি ওর সিদ্ধান্ত? নাকি ও কাউকে ভয় পাচ্ছে?"
কেউ উত্তর দিল না।
ঋদ্ধিমান এবার ফোনের কাছে এসে দাঁড়ালেন।
"দৃষ্টি..."
"হ্যাঁ?"
"একটা কথা মনে রেখো। কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছোনোর আগে দর্শনের চোখের দিকে একবার তাকিয়ো।"
দৃষ্টি মৃদু হেসে উঠল। সেই হাসিতে অসহায়তা মিশে ছিল।
"আমি তো দেখতে পাই না, স্যার।"
ঋদ্ধিমান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর খুব আস্তে বললেন, "ঠিক বলেছ... কিন্তু মানুষের চোখই শুধু আলো দেখে না। বিশ্বাসও দেখে।"
দৃষ্টি আর কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার গলায় কান্না জমে উঠল।
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। দর্শন একা দাঁড়িয়ে ছিল টেমসের ধারে। নদীর ওপারে আলো ঝলমল করছে। চারদিকে এত মানুষ, অথচ সে ভীষণ একা।
হঠাৎ তার সিস্টেমে একটি নতুন নোটিফিকেশন ভেসে উঠল।
HARGREAVE MEMORY INTEGRITY : ৯৮.৭%
FIRST DEGRADATION SUCCESSFUL
দর্শন বার্তাটি সঙ্গে সঙ্গে মুছে দিল। তারপর খুব ধীরে ফিসফিস করে বলল, "আরও একটু..."
বাতাস তার কণ্ঠস্বর নদীর দিকে নিয়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে তার ব্যক্তিগত কমিউনিকেশন নেটওয়ার্কে আরেকটি অদৃশ্য সংকেত ধরা পড়ল।
WARNING
INTERNATIONAL CALL DETECTED
SOURCE : INDIA
দর্শন কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝে গেল—দৃষ্টি সব জানিয়েছে। অনির্বাণ, ঋদ্ধিমান, ইরা, নাতাশা—এখন সবাই সব জানে আর আমাকে ঘৃণা করছে।
তারপরও তার মুখে কোনো উদ্বেগ ফুটে উঠল না। বরং অদ্ভুত এক শান্তি নেমে এল। সে জানত, এই ভুল বোঝাবুঝি একদিন হবেই। আজ শুধু তার শুরু।
সে আকাশের দিকে তাকাল। গ্রীষ্মের রাত ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে। দূরে পূর্ব দিগন্তে ভোরের প্রথম আভা ফুটতে শুরু করেছে।
নিজের মনেই সে বলল,
"আর একটু ঘৃণা করো আমাকে...
তবেই তোমরা বেঁচে থাকবে।"
নদীর জল নীরবে বয়ে চলল। কেউ শুনল না সেই কথাগুলো। শুধু ভোরের আলো ধীরে ধীরে অন্ধকারকে সরিয়ে দিতে লাগল।
4 Comments
উফ আর রাখা যাচ্ছে না। ধৈর্য ভেঙে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কোনভাবে লেখকের মাথা হ্যাক করে জেনে নিই সমাপ্তির ক্লাইম্যাক্সের গোপন রহস্য। কি ছুই ছাই বোঝা যাচ্ছে না। শুধু মন বলে আদর থাকুক গানে গানে সুরে সুরে। লন্ডনের আরো কিছু অভিজ্ঞতা বর্ণনা থাকলে আমরা গেঁয়ো মানুষরাও সেই রহস্যময় হোমসিয় শহরের আরো কিছু জানতাম। যদি লেখক দেন। আর কি সুর বাজে তার একটা নাম বা গানের কলির খোঁজ পেলে সুরকে ছোঁয়া আরো সহজ হত। আছি। গালে হাত চোখ গোলগোল পাঠক। পরের লেথার জন্য
ReplyDeleteঅপেক্ষায়।
শিরোধার্য।প্রণাম।🙏🙏🙏
Deleteপরিণতির দিকে এগোচ্ছে গুটি গুটি।তবু রহস্য জাল বিস্তৃত।🙏
ReplyDeleteআপনাদের মন্তব্য আমার গল্পের পাথেয়। প্রণাম।🙏
Delete