জ্বলদর্চি

শব্দের কোলাজে কবিতার ক্যানভাস/ নিমাই মাইতি

শব্দের কোলাজে কবিতার ক্যানভাস 

নিমাই মাইতি 

বিশেষ করে কবি অরুণ দাস আমার কাছে এক অপরিচিত মুখ এবং এর পূর্বে তার কোন কবিতা বা কবিতার বই আমার পড়া হয়নি। 'চূর্ণীকে লেখা চিঠি' কাব্যগ্রন্থটি দেখে আমি বিস্মিত। পাঁচ থেকে আটচরণের মধ্যে যে এত পরমচেতনার পরশপাথর তুলে ধরেছেন তা না পড়লেই আমার জানা হতো না প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের প্রেমের গ্রহ নক্ষত্রের ভালোবাসা। তিনি এক নতুন চেতনা এবং অনুভবের জন্ম দিয়েছেন প্রতিটি কবিতার মধ্যে। চার ফর্মার বইয়ে তিনি তিনটি বিভাগে ভাগ করেছেন। এক: 'না বলেছে হৃদয় লীনা' ৭ থেকে ১৬ পৃষ্ঠার মধ্যে আটটি কবিতা। দুই: 'হৃদয়ে লেখা ডায়েরী' ১৭ থেকে ৪০ পৃষ্ঠার মধ্যে ২২ টি কবিতা । তিন: 'চূর্ণী সেসব মুগ্ধ দিন। মুগ্ধ রাত'। ৪১ থেকে ৬৩ পৃষ্ঠার মধ্যে ২১ টি কবিতা।

       প্রকৃতিকে নিয়ে মানব প্রেমের যে সংমিশ্রণ অরুণ দাসের এই কবিতার বইটি না পড়লে উপলব্ধি করা যায় না প্রেমের আকুলতা। অনুভব এবং ভাবনার অতল থেকে তুলে এনেছেন হৃদয়ের নির্যাস। সীমাবদ্ধতার মধ্যে অসীমতার প্রয়োগ কৌশল কবি অরুণ দাশের স্বতন্ত্রতা। তিনি নিজে অন্তরালে থেকে কাব্যগুনে পুষ্ট প্রতিটি কবিতাকে এক চিত্রময়তায় তুলে ধরেছেন। যারা এর কবিতাগুলো পড়বেন আমার মনে হয় নেশায় বুধ হয়ে থাকবেন যার হৃদয়ের মধ্যে আলোকিত এক একটি দীপশিখা। 

       দু একটি লাইন যা না বললেই নয়--
প্রথম পর্বে-১. তোমায় নির্মাণ করি অভিমানী জ্যোৎস্নায়/রাত গভীর হলে চোখের জলে আবছা হয় বর্ণমালা। গোপন গভীর প্রেমিকার ভালবাসাকে নির্মাণ করতে পারে অভিমানী জ্যোৎস্নায়। এমন অনেক প্রয়োগ কৌশল কবি অরুণ দাসের কলম থেকে বেরিয়ে এসেছে। ২. শরীর চিনে নেয় প্রতিটি দুর্বল শরীর । ছায়ার মাঝে অবসর চাঁদ। দুজনের ব্যবধানের মধ্যে যেটুকু দূরত্ব সেখানেও জোৎস্নার আলো লেগে থাকে। ৩. পরিযায়ী মেঘে লিখেছেন-নৌকো শিখি ফ্রকহীন ভোরে/শুয়ে থাকে জল পুকুর ফেরত মৌন ছাপ। দুটি হৃদয়ের যে অন্তরঙ্গতা একসময় মনের গভীরে দাগ রেখে যায়।
দ্বিতীয় পর্বে ১. শব্দহীন সন্ধ্যা/ভেজা স্বপ্নে ভেসে যায় ছায়া/কুয়াশা লেখে নদী বা ২. তোকে লিখি এক ইশারায় নদীর গভীরে ডুবে থাকা অন্ধকার । এই ভালোবাসার চিঠির মধ্যে হৃদয়ের গভীরে যে আবছা অন্ধকার তাকেও কি নিপুনভাবে তুলে এনেছেন কবি অরুণ বাবু। প্রায় অধিকাংশ কবিতা এক অদ্ভুত আবেশে ডুবিয়ে রাখে এক নির্জন সৈকতে। উঠতে চাইলেও উঠতে পারিনা এখানেই অরুণ দাস। এক একটা শব্দ কখনো কখনো একটা কবিতা হয়ে ওঠে। আবার মাতাল সন্ধ্যায় এ মৃত্যু এঁকে রাখি চোখের জলে কবিতায়-আজ হৃদয় জুড়ে শুকিয়ে যাওয়া হ্রদ/প্রেমহীন পাথরে মেখে রাখা সবুজ আঘাত । ব্যঞ্জনা এবং দোতনার মাঝে কোমল ভালোবাসার বিরহ। কত সুন্দর নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে তিলে তিলে হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার স্বপ্ন। তবুও তার মধ্যে লেগে রয়েছে না হারানোর চিহ্ন। রাত পাখিদের কথা কবিতায় সহজ চোখে ছুঁয়ে থাকা স্বজনহীন অন্ধকার। গভীরতায় অমোঘ টান যা মন থেকে মুছে ফেলা কখনো সম্ভব নয়। অন্ধকারের মধ্যেও জোৎস্নার দ্যুতি ছড়িয়ে রয়েছে। 
🍂
তৃতীয় পর্বে-ঘামের মধ্যে চিনে নিই টুকরো নারীদের তৃষ্ণা বা তোর শরীরে আঁকা রাত/তোর নিভৃত শরীরে আঁকি দুর্মূল্য দৃশ্যপট । একাকী নির্জন সমুদ্র সৈকতে প্রিয়জনকে নিয়ে এমনই ছবি আঁকা যায় ভালবাসার গভীর টান যেখানে আরো গভীর হয় সেখানে অরুণ দাস বলে ওঠেন, তোর ঘাম ভেজা স্বপ্নক্ষন মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকে যে জীবন। সোহাগ মাখা হৃদয় চঞ্চল কবিতায়-হতাশ হৃদয় খুলে লিখে রাখি স্বপ্নের রাত । দূরত্বের মধ্যেও যেন এক অলিখিত সেতু। যে সেতু কোনদিন দেখা যায় না শুধু স্বপ্নের মধ্যেই বিচরণ করে। নৈঃশব্দের রাত কবিতায়-সোহাগী চাঁদ জেগে ওঠে চুম্বনে । এখানে রাত যতই গভীর হোক নিকষ  অন্ধকার হোক যতই মান অভিমানের দোলাচলে থাকুক একটা চুম্বন যেন ফুটিয়ে তোলে জোৎস্নাকে। মান-অভিমান বিরহের সব বাধা পেরিয়ে দিক চরাচরে জেগে ওঠে শান্ত নির্বাক অনুরণন। আবার শেষ নিঃশ্বাস কবিতায়-শেষ নিঃশ্বাস লিখি ঝুপ করে নেমে আসা অন্ধকারে। যে কোন মৃত্যু বাস্তব জীবনের সমাপ্তি। কবির যেমন মৃত্যু নেই অন্যদিকে কবিতারও মৃত্যু নেই। মৃত্যুর পরেও তোমার মধ্যে আমার শেষ নিঃশ্বাসটুকু থেকে যাবে। বাইরের কেউ না জানলেও কেবল তুমি মনের গভীরে ভালবাসার কুলুঙ্গিতে ভরে রাখবে আমাকে আজীবন। এমন বহু কবিতায় কবি অরুণ দাস তার বহুমূল্য নুড়ি পাথরের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তার কবি প্রতিভা কে আমি আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানাই। আগামী দিনে এই কবির আরও উত্তরণ হোক এইটুকু আমি আশাবাদী। 

      চার ফরমার বইটির প্রকাশক শ্রীলিপি, পশ্চিম মেদিনীপুর। প্রচ্ছদ দীপ। কয়েকটি রেখাতেই এক জীবন্ত প্রেমিকা। মূল্য ১৫০ টাকা।

Post a Comment

0 Comments