জ্বলদর্চি

স্বপ্ন দেখে মন/মৌমিতা চ্যাটার্জী

স্বপ্ন দেখে মন
মৌমিতা চ্যাটার্জী


স্বপ্ন
ভারি জটিল এক মনস্তত্ব। মস্তিষ্কের ভিতরে এলোমেলো ভাবনাগুলো তোলপাড় করে আর দুনিয়ার ওদিক কেমন ওড়ে। 
চেতনাহীন মনের অতলান্তে ভেসে বেড়ায় অতীতের ক্ষীণ আলো অথবা আগামীর সুপ্ত আশা। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই কত হারিয়ে যাওয়া চেনা মুখের সারি, সাদা চোখে যারা অবাস্তব, অসম্ভব। স্বপ্নের গা ঘেঁষেই  কখনও ওদের ছুঁয়ে দেখি। আবার 
স্বপ্ন মানে অবচেতন মনের ইচ্ছাদের স্ফূরণও বটে। ধরো, সাধ হল এখুনি একবার আল্পসের স্নেহাঞ্চলে বেড়ে ওঠা রূপকথার গ্রামগুলোর একটা বাড়িতে গুছিয়ে বসে পনিরের ফনডু খাব অথবা আইফেল টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে চেখে দেখব ফরাসি প্যানকেক বা স্যান্ডউইচ। কিন্তু আমার তো ভাঁড়ে মা ভবানী। অতঃপর মনের ইচ্ছা মনেই থাকুক। বেশ খানিকটা অকারণ মনখারাপ নিয়ে সেদিনের মত চোখ বুজলাম। ওমা! হঠাৎ দেখি একটা ঝকঝকে দিনের আলোয় আমার হাতে কে একজন তুলে দিয়েছে ক্রোসিয়্যান্ট, পেস্ট্রি, টুন্ মাছের স্যান্ডউইচ আর পিছনে ঝলমল আইফেল টাওয়ার মুচকি মুচকি ফিচেল হাসি আসছে। 
🍂
   সাধে কী বলি স্বপ্ন আমার সাতরাজার ধন মানিক।
কত আচ্ছন্নতায় মোলায়েম মোরামের ওপর হেঁটেছি অজ্ঞান কোনো এক রাজার কুমারের হাতে হাত রেখে। চারচোখের মিলনের সেই লগ্নে ধূসর কুয়াশা কেটে গোলাপের পাঁপড়ির পুষ্পবৃষ্টি করেছেন স্বর্গীয় দেবগণ। পরিবেশ অদ্ভুত সৌমাভ প্রেমজ সুগন্ধ। 
আহা! কী পবিত্রতা।
কতক্ষণ এভাবে কেটেছিল জানিনা চোখ খুলতেই দেখি সেই চিরাচরিত যান্ত্রিকতায় ডুবে আছি। ঐ স্বপ্নীল মুহুর্তটুকুই আনন্দঘন, মুক্ত প্রাণের ঐশ্বরিক অনুভূতি। 
স্বপ্ন নিয়ে বিজ্ঞান বহুকিছুই বলে। এই যেমন ঘুমন্ত অবস্থায় চোখ বন্ধ থাকলেও মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী অংশটুকু স্বক্রিয় থাকে ফলে স্বপ্নের জগতে পৌঁছেও আমরা আবেগতাড়িত হই। ঘুমের মধ্যেই কখনও হেসে উঠি বা অচিরেই চোখের জলে বালিশ ভেজে। সারাদিন আমরা যা কিছুর মধ্য দিয়েই স্বপ্নে মূলতঃ তারই প্রতিফলন ঘটে। 
     আমেরিকান বিজ্ঞানী, নিউরোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিস্ট তথা স্বপ্নগবেষকদ্বয় অ্যালান হবসন ও রবার্ট ম্যাককার্লির মতে, ঘুমন্ত অবস্থায় Brainstem কিছু বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠায় আর মস্তিষ্কের Cortex area সেগুলোকে জুড়ে জুড়ে তৈরি করে বিবিধ ঘটনার ঘনঘটা যা আমাদের প্রাত্যহিক চিন্তাভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত।  এটি একটি স্বতন্ত্র, স্বতঃস্ফূর্ত রাসায়নিক প্রক্রিয়া যা মস্তিষ্ককে আলোড়িত করে। 
    তবে এতকিছুর মাঝেও স্বপ্নের কিছু ভীতিকর, অমঙ্গলজনক প্রভাবকে অস্বীকার করা যায় না।  নাইটমেয়ার শব্দটা শুনলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। এই আতঙ্ক কোনো ভৌতিক আতঙ্কের চেয়ে কম কিছু নয়। 
ইউরোপের মধ্যযুগীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ইনকুয়াবাস আর সুকুয়াবাস দৌরাত্ম্যে স্বপ্ন হয়ে উঠত সাক্ষাৎ বিভীষিকা। তাই দুঃস্বপ্নের কারণ হিসাবে এই দানবদ্বয় আর দায়ী করা হত মেয়ার নামক ডাইনিকে, যে কী না ঘুমের মধ্যে বুকের ওপর চেপে বসে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করত। আধুনিক যুগে এই পরিস্থিতিকেই নাম দেওয়া হয়েছে স্লিপিং প্যারালাইসিস। 
দিন বদলেছে, বদলেছে ব্যাখ্যা, সংজ্ঞা। মূলতঃ মানসিক চাপ, ভীতি, হতাশাগুলোই আজ দুঃস্বপ্নের দানবত্রয়ের প্রতিনিধি হয়ে ধরা দিচ্ছে কোনো না কোনো স্বপ্নে।
স্বপ্নকে বরাবরই ইচ্ছাপূরণের স্বচ্ছ কাল্পনিক মাধ্যম বলেই জেনেছি। আর সেটুকু আঁকড়েই বাঁচতে চাই।
দৃষ্টিটা ঘোলাটে হয়েছে।
মস্তিষ্কে এখন  বার্ধক্যজনিত রোগের বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্য।
কমেছে শখের দাপট, সুখের শাসন।
তবু এখনও মোটা ফ্রেমের চশমা এঁটে জীবন খুঁজে বেড়াই, স্বপ্ন দেখি। 

জীবন খোঁজার আরেক নামও জীবন বই তো নয়।

Post a Comment

0 Comments