বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১৪২
গ্যানোডার্মা
ভাস্করব্রত পতি
বর্ষার জল লেগে শুকনো কাঠ বা গাছের গুঁড়ি যখন পচতে থাকে, তখন তার গায়ে জন্মায় এক বিশেষ ধরনের কাঠ ছাতু। ফলদেহগুলি সাধারণত জীবিত বা মৃত গাছের কাণ্ডের উপর পাখা বা খুরের মতো আকারে জন্মায়। অনেকটা গোল থালার মতো অবয়ব। বাদামি রঙের। মাঝের অংশ বাটির মতো গভীর। ফলে সেখানে কখনো বৃষ্টির জলও জমা হয়ে থাকে। এই উদ্ভিদটি গ্রামাঞ্চলে প্রায়ই দেখা যায়। উদ্ভিদবিদ্যার পরিভাষায় ছত্রাকটি হল গ্যানোডার্মা (Ganoderma)।
এটি Ganodermataceae পরিবারের পলিপোর জাতীয় ছত্রাক। এদের নিচের অংশে অসংখ্য ছোট ছোট ছিদ্র থাকে। তাই এটিকে পলিপোরাস বলে। এদের দ্বিপ্রাচীরযুক্ত, ছেদিত রেণু থাকে এবং এর ভেতরের স্তর হলুদ থেকে বাদামী রঙের অলঙ্কৃত হয়।
গ্যানোডার্মার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি বেসিডিওকার্প। যা বড়, বহুবর্ষজীবী, কাষ্ঠল বন্ধনী যুক্ত। এটি "কঙ্ক" নামেও পরিচিত। এগুলির গঠন কাষ্ঠল এবং চামড়ার মতো। কাণ্ডসহ। কাণ্ডসহ বা কাণ্ডবিহীন হতে পারে।
🍂
১৮৮১ সালে কিরস্টেন এর একটি মাত্র প্রজাতি Ganoderma lucidum (Curtis) Karst নামকরণ করেন। এর আগে এটি পরিচিত ছিল Boletus lucidus Curtis এবং Polyporus lucidus (Curtis) নামে।
জাপানের লোকেরা একে বলে Reishi মাশরুম। এখানকার লোকেরা 10,000 Year Mushroom নামেও ডাকে। আমরা বলি কাঠ ছাতু। চিনারা বলে Lingzhi অর্থাৎ Mushroom of Spiritual Potency এবং Herb of Spiritual Immortality। কোনও কোনও গ্যানোডার্মাকে (Ganoderma applanatum) বলে Artist's Conk।
পৃথিবীতে প্রায় ৩৮০০ ধরনের গ্যানোডার্মা মাশরুমের দেখা মেলে। এদের মধ্যে মাত্র ২০০০ জাতের গ্যানোডার্মা মাশরুম খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আমাদের গ্রামাঞ্চলে যেগুলো দেখা যায় সেগুলো অবশ্য খাওয়া হয়না। বিভিন্ন বড় বড় হোটেলে এই গ্যানোডার্মা মাশরুম একটি উপাদেয় খাদ্যের উপাদান। ফলে সেসব দেশে গ্যানোডার্মা মাশরুম চাষাবাদ হয়। প্রায় ২০০ প্রজাতির গ্যানোডার্মা ঔষধি গুন সম্পন্ন। এগুলোর মধ্যে ৬ প্রজাতির লাল গ্যানোডার্মার সবচেয়ে বেশী ঔষধি গুন রয়েছে। এদের ৬ ভাগে ভাগ করা হয়েছে -- Peacock Gano, Kimshen Gano, LIver Gano, Heart Gano, Brain Gano এবং Ruyi Gano।
গ্যানোডার্মার ওষধি গুনের কথা মেলে ২৮৩৪ খৃস্টপূর্বাব্দে চিনের প্রাচীন ইতিহাসে। চিন, গ্রিস ও রোমান ব্যাক্তিরা প্রাচীনকাল থেকেই দৈহিক শক্তি এবং দীর্ঘ জীবনের সাহচর্য পেতে এই গ্যানোডার্মাকে উপকারী খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করত। পরবর্তীতে বানিজ্যিকভাবে বিভিন্ন দেশে গ্যানোডার্মার চাষাবাদ হচ্ছে হার্বাল মেডিসিন সহ অন্যান্য কাজের জন্য। ১৯৭০ সালে চিন ও জাপান, ১৯৮০ সালে তাইওয়ান এবং ১৯৮৩ সালে মালয়সিয়াতে নানা পণ্য সামগ্রী উৎপাদন শুরু হয়েছে।
গ্যানোডার্মা মাশরুমে রয়েছে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, ফসফরাস, বিটা ডি, ফলিক অ্যাসিড, লিংকজাই-৮, গ্লুকেন, ল্যাম্পট্রোল, ইলুডিন এস, ইরিটাডেনিন, লোভাস্টটিন, এডিনোসিন, স্ফিঙ্গলিপেড এবং ভিটামিন বি-১২, এনটাডেনিন, ট্রাইটারপিন, ট্রাইটারপিনওয়েড ও বেনরজাপাইরিন ইত্যাদি উপাদান। যা নানা রোগ প্রতিরোধ করতে সক্ষম। এর মধ্যে থাকা ট্রাইটারপিন বর্তমানে এইডস্ প্রতিরোধক হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
0 Comments