জ্বলদর্চি

চাঁদিপুর ও পঞ্চলিঙ্গেশ্বর ভ্রমণ/অয়ন ঘোষ

চাঁদিপুর ও  পঞ্চলিঙ্গেশ্বর ভ্রমণ

অয়ন ঘোষ

কিশোর বয়সে একটা বিজ্ঞাপন ভীষণ মন কেড়েছিল - "ছোট্ট টিপ হালকা লিপস্টিক আর জামিনি শাড়ি"। দামোদর শেঠ অল্পেতে খুশি না হলেও আমরা মধ্যবিত্ত বাঙালিরা মনে হয় অল্পেতেই খুশি ওই জামিনী শাড়ির বিজ্ঞাপনের মত। তাই এলিট ক্লাস আমাদের ছোট ছোট বেড়ানোকে 'দীপুদা' বলে হ্যাটা করলেও আমরা বারবার সংসার বগলে করে ওই একই জায়গায় যাই কারণ ওই জায়গাগুলোর সাথে আমাদের নাড়ীর টান। আসলে জায়গা একই থাকলেও আমাদের দেখার দৃষ্টি যে বদলে যায়। আর বদলে যাওয়ায় পুরনোও নতুন লাগে। তা অনেকেরই মনে হতে পারে ধান ভাঙতে এই শিবের গীত কেন। আসলে এবার জায়গাটার কথা বলব সেটি যে শিবক্ষেত্র, এখানে তিনি বালক বা শিশুরূপে অবস্থান করছেন। অভিজ্ঞজনেরা ঠিকই ধরে ফেলেছেন। তাই আর ভনিতা না করেই বলি - এবার ওই জামিনী শাড়ির বিজ্ঞাপনের মত আমাদের দু-রাত তিনদিনের ছোট্ট ট্রিপ ছিল বালেশ্বর, চাঁদিপুর ও পঞ্চলিঙ্গেশ্বর। পুরাণের একটি মত অনুযায়ী সপ্তশরা নদীতীরে মহামুনি গর্গ ধ্যানস্থ ছিলেন। চক্ষু খুলে তিনি দেখলেন একটি গাভী একটি মাটির ঢিপির ওপর দুগ্ধ বর্ষণ করছে। তখন তিনি এই স্থানের কিরাত-রাজা বানাসুরকে একটি স্থান খনন করতে নির্দেশ দিলেন। খননের ফলে এখানে পাওয়া গেল পাতালফুট শিবলিঙ্গ। কিরাত-রাজ বানাসুর পেয়েছিলেন বলে এই শিবলিঙ্গের নাম হলো বানেশ্বর। জায়গাটিও বানেশ্বর নামে পরিচিত হলো।  পরবর্তীতে অপভ্রংশ হয়ে যা বালেশ্বর। রাজা বানসুর এই জায়গায় আরো চারটি শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন। সবগুলি শিবলিঙ্গ দর্শন করার পর তিনি প্রত্যহ জলগ্রহন করতেন।
 
যারা বাংলার কাছেপিঠে পাহাড়, সমুদ্র, ঝর্না ও নির্জনতা একসাথে খোঁজ করেন তাঁদের জন্য আদর্শ গন্তব্য এই জায়গা। ভরা বর্ষায় আমরাও (স্ত্রী ও কন্যাসহ) রওনা দিলাম শালিমার স্টেশন থেকে ধৌলি এক্সপ্রেসে। ধৌলি সময়ে ছাড়লেও প্রায় চল্লিশ মিনিট লেট করে পৌঁছালো বালেশ্বর। ট্রাভেল ডেস্টিনেশন নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল থেকে ওখানের গাড়ির একজন ড্রাইভার দাদার নং পেয়েছিলাম। ওনার সাথে কথা বলা ছিল, নাম সুশীল কুমার সিং। ভীষণ ভালো মানুষ ও দায়িত্বশীল। চাঁদিপুরে আমরা প্রথম দিন উঠেছিলাম Sand City Resort এ। একেবারে সমুদ্রের বিচের ওপর এই রিসোর্টটি নতুন তৈরি হয়েছে। আর দ্বিতীয়দিন ছিলাম ওরই পাশে খুব সাজানো গোছানো পরিবেশ বান্ধব Purbi Resort এ। এটিও একেবারে বিচের ওপর। এদের নিজস্ব রাস্তা রয়েছে বিচে যাওয়ার। অনেকেই হয়ত চাঁদিপুর অপছন্দ করেন কারণ এখানে সমুদ্র অনেক দূরে চলে যায়, স্নান করা যায় না। কিন্তু যাঁরা নির্জনতা পছন্দ করেন, সমুদ্রের বিশালতা অনুভব করতে চান তাঁদের জন্য চাঁদিপুর আদর্শ। দিনে দুবার চাঁদিপুরে সমুদ্র কাছে আসে জোয়ারের সময়। প্রায় প্রত্যেক হোটেলেই সেই সময়টা বোর্ডে দেওয়া থাকে। কোলাহল বা মানুষের ভিড় নেই বলে এখানে প্রচুর ঝিনুক, কড়ি, বড় সাইজের শামুক ( যেগুলো পুরী বা দীঘায় বিক্রি হয়) নাভি শঙ্খ পাওয়া যায় বিচের ওপর। গোড়ালি ডোবা জলে সমুদ্রের ভিতর অনেকখানি হাঁটা যায় নিজের ছায়ায় সাথে। বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যায় দারুণ লাগছিল। কোন ফটোগ্রাফারের ডাকাডাকি নেই, বিভিন্ন রাইডের আওয়াজ নেই। শুধু আছে প্রকৃতির অকৃপণ উদারতার অনুভব।

দ্বিতীয় দিনের গন্তব্য ক্ষীরচোরা গোপীনাথ, ইমামি জগন্নাথ মন্দির, নীলগিরি জগন্নাথ মন্দির, পঞ্চলিঙ্গেশ্বর। পুরোটা যাতায়াত মিলিয়ে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার মতো।
ক্ষীরচোরা গোপীনাথ:
 "চৈতন্যচরিতামৃত"তে রয়েছে:
গর্গেশ্বর হেরিলেন সত্য গোপিশ্বর।
রামচণ্ডী যোগমায়া হইল গোচর।।
চণ্ডীহাট শ্রীযুমনা পুলিন হেরিলা।
শ্রী গোপীনাথ রাসলীলা নিরেখিলা।।
🍂
এই মন্দিরটি বালেশ্বরের রেমুনাতে অবস্থিত। মনে করা হয় 'রমণীর' নাম থেকে এই রেমুনা শব্দটি এসেছে। এই স্থানটি ভীষণ রমণীয় ও মহাপ্রভুর পাদস্পর্শে ধন্য এই স্থান পবিত্র বৈষ্ণব-তীর্থ। ওড়িশার ইতিহাস থেকে জানা যাচ্ছে রাজা প্রথম লাঙ্গুলা নরসিংহদেব যিনি কোনারক মন্দির নির্মাণ করেছিলেন তিনিই এই গোপীনাথ মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি যখন তাঁর রানীর সঙ্গে চিত্রকুট তীর্থে ভ্রমণ করছিলেন। সেইসময় তাঁকে চিরকুটস্থিত ভগবান মদনগোপাল স্বপ্নাদেশ দিয়ে কোন মনোরম স্থানে নিয়ে যেতে বলেন। তারপর তিনি যখন চিরকুট থেকে ওড়িশায় ফিরছিলেন তখন মদনগোপাল বালেশ্বরের অন্তর্গত বর্তমান স্থানে থেকে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলে রাজা সেই বিগ্রহকে পরম সমাদরে সেই রমণীয় স্থানে প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকে এই স্থানের নাম হয় রমণীয় আর রমণীয় থেকে রেমুনা। প্রতিদিন সেই মদনগোপালের জন্য ১২ ভান্ড ক্ষীরের ব্যবস্থা করেন রাজা। যে রাস্তার ওপর মন্দিরটি অবস্থিত সেই পথ দিয়ে মহাপ্রভু পুরী গিয়েছিলেন তাই এই পথের ও পথের পাশের বসতির নাম গৌড়দান্ড। পরম বৈষ্ণব ভক্তশ্রেষ্ঠ শ্রীমাধবেন্দ্র পুরী যিনি অদ্বৈত আচার্যের দীক্ষাগুরু তাঁর জন্য এই মদনগোপাল যিনি গোপীনাথ নামেও খ্যাত তিনি ক্ষীর চুরি করেছিলেন অর্থাৎ ভগবান ভক্তের জন্য ক্ষীর চুরি করেছিলেন। সেই থেকে এই বিগ্রহের নাম হয় ক্ষীরচোরা গোপীনাথ। "চৈতন্যচরিতামৃতে" বলছে:
“ক্ষীর লহ এই যার নাম মাধবপুরী। 
তোমা লাগি গোপীনাথ ক্ষীর কৈল চুরি।।
ক্ষীর লইয়া সুখে তুমি কর হে ভক্ষণ।
তোমা সম ভাগ্যবান নাহি ত্রিভুবন।।“ 

একটি বিষয় খুবই আশ্চর্যের গোপীনাথের এই বর্তমান সংস্কৃত মন্দিরটি কিন্তু ওড়িশায় যে দেউল কাঠামো সেই অনুযায়ী তৈরি নয়। এটি বাংলার মন্দিরের আদলে তৈরি। সিংহাসনের ওপর মাঝে গোপীনাথ এর সহিত মদনমোহন ও গীরিধারী বর্তমান। রেমুনা খুবই পবিত্র একটি তীর্থভূমি। এই স্থানের পঞ্চতীর্থ - পুরী গোস্বামীর সিদ্ধাশ্রম, রসিকানন্দ গোস্বামীর গদি ও সমাধি মন্দির, দেবী রামচণ্ডীর মন্দির, গর্গেশ্বর মহাদেব ও সপ্তশরা নদী।

ইমামি জগন্নাথ মন্দির: 
বালেশ্বর স্টেশন থেকে সাত কিলোমিটার দূরে এই জগন্নাথ মন্দির তৈরি করেছে ইমামি গোষ্ঠী। বেলে পাথরের তৈরি এই মন্দিরের ভাস্কর্য অনুপম। পুরীর জগন্নাথ মন্দির ও কোনারক মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী মিশেছে এই মন্দির তৈরি। মন্দির চত্বরের মধ্যে রয়েছে হনুমান, গজলক্ষ্মী, মহাদেবসহ আরো অন্যান্য দেবতার মন্দির। জগন্নাথ মন্দিরটি উচ্চতায় প্রায় ৭২ ফুট ও প্রায় চার হাজার তিনশত বর্গফুট জায়গা নিয়ে তৈরি। মন্দিরের প্রবেশদ্বারের সামনেই রয়েছে অরুণ স্তম্ভ। এই মন্দিরের আলোক সজ্জা অতীব সুন্দর। তাই সন্ধ্যা বা রাতের দিকে মন্দিরটি অনন্য সুন্দর লাগে। মনে একটা কথা মনে রাখতে হবে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের যে আবেদন তা এখানে পাবেন না। অন্তর আমি তো পাইনি। বরং সেই আবেদন পেলাম নীলগিরি জগন্নাথ দর্শন করে।
নীলগিরি জগন্নাথ মন্দির ও রাজবাড়ি: 
বালেশ্বর শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে নীলগিরির স্বর্ণচূড়া পাহাড়ের পাদদেশে এই মন্দিরটি অবস্থিত। প্রাচীনত্ব ও খ্যাতির দিক থেকে পুরী, করাপুট ও বারিপদার জগন্নাথ মন্দিরের পরেই ওড়িশা জুড়ে এর স্থান। নীলগিরি রাজ পরিবারের রাজা হরিচন্দন এই মন্দিরটি তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়। তিনি নিজে নিঃসন্তান ছিলেন। তাই ময়ূরভঞ্জের রাজার এক সন্তানকে তিনি দত্তক নেন। পরবর্তীতে তিনিই রাজা হন। মন্দির স্থাপত্যে ওড়িশার মন্দির শৈলীর ছাপ রয়েছে। রত্ন বেদীর ওপর জগন্নাথ, বলভদ্র ও মা সুভদ্রার সঙ্গে সুদর্শন আসীন। মন্দির চত্বরের মধ্যে মা বিমলা, শ্রী গণেশ ও শিবের মন্দির রয়েছে। এখানেও প্রভু জগন্নাথকে নিত্য ছাপান্ন ভোগ নিবেদন করা হয়। মন্দিরের সামনেই প্রধান সড়কের ওপর রয়েছে অরুণস্তম্ভ। এখানের রথযাত্রা বেশ বিখ্যাত। রাজা পুরী পৌঁছাতে পারেন না। তারা এই রথযাত্রা দেখে পুরীর স্বাদ পেতে পারেন। মন্দিরের পিছনেই খাড়া উঠে গেছে স্বর্ণচূড়া পাহাড়। ব্রিটিশ ভারতে নীলগিরি রাজ পরিবারের খুবই খ্যাতি ছিল ও নীলগিরি একটি স্বাধীন করদ রাজ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। ভারত স্বাধীন হওয়ার ঠিক পরে পরেই তৎকালীন ওড়িশার রাজা মহাতব দিল্লী গিয়ে সর্দার প্যাটেলকে বুঝিয়ে নীলগিরি রাজ্যকে ওড়িশায় মধ্যে সামিল করেন। ১৯৪৭ সালের ১৬ই অক্টোবর সম্বলপুরে একটি সর্দার প্যাটেল, রাজা মহাতব ও নীলগিরির রাজা হরিচন্দনের মধ্যে একটি ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের মধ্যে দিয়ে নীলগিরি ওড়িশার অন্তর্ভুক্ত হয়। এই স্বাধীন রাজ্যটির দিকের বিহারের তৎকালীন রাজারও দৃষ্টি ছিল। এই জগন্নাথ মন্দিরের বাঁ'পাশে রয়েছে রাজবাড়ি ও রাজউদ্যান। রাজবাড়ির ভিতরে রয়েছে কনকদুর্গার মন্দির ও একটি পবিত্র কুঁয়ো যা রাজপরিবারের অন্তঃপুরিকাগণ ব্যবহার করতেন। বর্তমানে এই বাড়ির একটি অংশে রিসোর্ট বানানো হয়েছে। তবে পুরো রাজবাড়িতেই রক্ষণাবেক্ষণের অভাব খুবই স্পষ্ট।

পঞ্চলিঙ্গেশ্বর: জায়গাটি বালেশ্বর শহর থেকে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার। প্রায় পুরো পথেই সবুজ নাতিউচ্চ নীলগিরি পাহাড় আপনার সঙ্গী হবে। এই বর্ষায় সবুজে ভরে আছে চারিপাশ। পুরাণ ও লোককথা অনুযায়ী শ্রীরামচন্দ্র যখন অন্তঃসত্ত্বা মাতা সীতাকে নির্বাসন দিয়েছিলেন তখন পরম শিবভক্ত মাতা ওড়িশার এই নীলগিরি পাহাড়ে এসে ঝর্নার মধ্যে স্থিত অতিজাগ্রত এই পাঁচ স্বয়ংভু শিবলিঙ্গের পুজো করেছিলেন। এক অর্থে তিনিই প্রথম এই স্থান লোকসমক্ষে নিয়ে আসেন। অন্য একটি মত অনুযায়ী কিরাত রাজা বানসুর পাতালফুট এই লিঙ্গগুলির প্রথম পূজারী। পঞ্চলিঙ্গেশ্বরে প্রকৃতিই মন্দির। আলাদা করে কোন মন্দির নেই। এখন বর্ষার সময়ে পাঁচটি লিঙ্গই ঝর্নার বেশ অনেকটা নীচে। স্পর্শ করতে গেলে পোশাক পুরো ভিজে যাচ্ছে। ভাড়া গাড়িতে এখানে পৌঁছে প্রথমে কিলোমিটার খানেক হাঁটার পর চড়তে হবে প্রায় সাড়ে তিনশো সিঁড়ি। তবে একজায়গায় ছাড়া সিঁড়ি কোনো জায়গাতেই খুব একটা খাড়াই নয়। মাঝে বিশ্রাম নেবার ব্যবস্থাও রয়েছে। ওঠার পথে প্রচুর ছোটখাটো ঝর্না চোখে পড়বে। প্রাকৃতিক দৃশ্য এতোই সুন্দর যে শরীরের কষ্ট অনেক কম হয়ে যাবে। পথের দুপাশে অসংখ্য পুজোর ডালা, মনোহারী জিনিস খাবারের দোকান। মাত্র ২০ টাকাতেই নারকেল, ফুল সমেত পুজোর ডালা পাওয়া যাচ্ছে। ওপরে যে পূজারীরা রয়েছেন তাঁদের চাহিদা কিছু নেই, যা দেবেন তাতেই খুশি। আসলে প্রকৃতির কোলে বোধহয় সবই সহজ। শ্রাবণ মাসের সোমবার করে এখানেও জলযাত্রীরা জল নিয়ে আসেন। সেইসময় বেশ ভিড় হয়। পঞ্চলিঙ্গেশ্বরে থাকার বেশকিছু হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে।

Post a Comment

0 Comments