দীপালি সাহু
কৈশোরে শরৎচন্দ্রকে পড়া মানে শুধু গল্প পড়া ছিল না—ছিল এক অন্য পৃথিবীতে চুপচাপ ঢুকে পড়া। বই হাতে নিলেই কখন যে চারপাশের পৃথিবীটা দূরে সরে যেত, টের পেতাম না। উপন্যাসের চরিত্র গুলোর সাথে যেন কল্পনায় কখনও নদীর ঘাটে, কখনও অচেনা পথের ধারে, কখনও বা মানুষের জীবনের এমন সব অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতাম, যেগুলোর অস্তিত্ব তখনও নিজের জীবনে জানতাম না।
ছোটবেলায় কেমন করে জানিনা বাংলার প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। স্পষ্ট মনে আছে সেটা ষষ্ঠ সপ্তন শ্রেণীতে পড়ার সময় থেকে। তবে সেই আগ্রহ পাঠ্য পুস্তক ও সহায়ক পুস্তকে যেসব গল্প কবিতা থাকতো তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল । দাদারা লেখাপড়া করলেও গল্প বই পড়ার নেশা ছিল না । তাই বাড়িতে পুরানো বই এর মধ্যে বিভিন্ন সিলেবাসের পাঠ্য পুস্তকই থাকতো। মনে আছে শরৎ রচনার সাথে প্রথম পরিচয়, তখন আমি শাড়ি, নাহ ....নবম শ্রেণী নয় ,অষ্টম শ্রেণী ।লাল পাড় সাদা শাড়ি, দুপাশে সাদা ফিতে বাঁধা বিনুনি। শরীরে মনে পাহাড়ি ঝর্ণার মতো জলতরঙ্গ । সদ্য ঋতুমতী । কিশোরী বেলার সেই সময়রা বড়ো অদ্ভুত। তখন নিজের ভেতরে কত অজানা , অচেনা চিলেকোঠার ঘর। কত প্রশ্ন,কত ভয় কত লজ্জা , কত স্বপ্নের জন্ম সেই ঘরে । গ্রাম বাংলায় মেয়ে ঋতুমতী হওয়ার সাথে সাথে , তার মেলামেশা ও চলাফেরায় মা কাকিমারা অলিখিত একটা গন্ডি টেনে দেন। অনেকটা নজরবন্দী রাখার মতো। সেই সময় শরৎ রচনা ছিল আমার কাছে আশ্রয় এর মতো। কৈশোরের সেই দক্ষিণমুখী চিলেকোঠার ঘরে হ্যারিকেনের আলোয় আমি আর শরৎ বাবু মুখোমুখি, সারারাত প্রেমালাপ ।
অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় আমার বড়দার বিয়ে হয়। তখন বিয়েতে গল্প বই দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। যেহেতু বাবা শিক্ষক ছিলেন তাই আমন্ত্রিত অন্য শিক্ষক মশাইরাও উপহার হিসেবে বই দিয়েছিলেন। বই হিসেবে শরৎচন্দ্রের লেখা থাকতোই। প্রথম হাতে পাই বড়দিদি ও পথের দাবি । তার আগে "মহেশ" গল্পটা পাঠ্যপুস্তকে পড়ার মাধ্যমে লেখকের নামের সাথে পরিচয়।বড়দিদি পড়তে গিয়ে সুরেন্দ্র ও মাধবীর সম্পর্ক আমাকে অন্য রকমের অনুভূতি দেয় । অন্যদিকে পথের দাবি ছিল সম্পূর্ণ অন্য অনুভূতি । সব্যসাচী চরিত্র ছিল রহস্য, সাহস ও আদর্শের মিশ্রণ ।দৈনন্দিন খাওয়া পরার বাইরে দেশভক্তি, আদর্শ, সমাজ বদলানোর স্বপ্ন ইত্যাদি বিষয়গুলো প্রথম ভাবতে শিখি ।
তখনো শরৎ রচনার সাথে আমার সম্পর্ক গাঢ় হয়নি । নবম শ্রেণীতে আমার এক মামার কাছে দেখি শরৎ রচনা সমগ্রের দ্বিতীয় খন্ড। সেখানে ছিল গৃহদাহ উপন্যাস। ভালোবাসা ও সম্পর্কের জটিলতা সহ এক ত্রিকোণ প্রেমের গল্প । মহিম , সুরেশ ও অচলা ।অচলাকে ঘিরে মহিম ও সুরেশ এই দুই বন্ধুর সম্পর্কের টানাপোড়েন ।পড়া শুরু করার পর প্রবল ভাবে মহিম চরিত্রের প্রেমে পড়লাম । মহিমের শান্ত ও সংযমি স্বভাব, নীরব ভালোবাসা , গভীর অনুভতি ও দার্শনিক বোধ আমায় মুগ্ধ করলো। পছন্দের পুরুষ নিয়ে ভাবনা যেন সেখান থেকেই ।
🍂
এমন সময় দাদারা পড়াশোনার জন্য বাড়ির বাইরে যাওয়ার কারণে ছাদের একটা ছোট্ট ঘর আমার দখলে আসে। তিনতলা মাটির বাড়ি । বাবারা চার ভাই, পরিবার ছেলে মেয়ে নিয়ে প্রায় 32 জনের একসাথে বসবাস । সেখানে থাকা ,খাওয়া, শোওয়া কোনো কিছুতে নিজস্বতার কোনো গল্প ছিল না। সবকিছু যেন সার্বজনীন। এমনকি ভাবনার রাজত্বে ও যেন আর একজন জোর করে মাদুর পেতে বসে পড়ে । সেখানে একটা মেয়ের জন্য আলাদা ঘর, ভাবনার বাইরে । ওই যে বললাম দাদাদের বদান্যতায়।
সেই ছোট্ট ঘরটাই হয়ে উঠলো আমার কুহক সাম্রাজ্য। আমি তখন শরৎ বাবুর নায়িকা। এই কারণে নিজেকে নিয়ে ওপার মুগ্ধতা। এর পর পুরো কিশোরীবেলা জুড়ে একটার পর একটা উপন্যাস পড়েছি। রাত যেন আরব্য রজনীর এক হাজার এক রাতের মতো রোমাঞ্চকর । অধীর আগ্রহে রাতের অপেক্ষা।রাত যত গভীর হতে থাকতো উন্মাদনা ততই কানায় কানায় পূর্ণ হতে থাকতো। আমি যেন জিনে পাওয়া কোনো মেয়ের মতো। রাত যে এতো সুন্দর হতে পারে , রাতের নিঃশব্দতা এতো মুখর হতে পারে তা সেই সময়ে উপলব্ধি করেছিলাম। সন্ধ্যা থেকে অধীর হয়ে অপেক্ষা করতাম কখন বাড়ির সবাই ঘুমাবে আর আমি উপন্যাস নিয়ে বসবো । ছোট্ট সেই ঘরটাতে দুটো জানালা ছিল । একটা দক্ষিণ দিকে আর একটা পশ্চিম দিকে। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে আমি পড়ার ছল করে গল্পের বই নিয়ে বসবো। চারদিক নিঃস্তব্দতার মাঝে শেয়ালের ডাক ঝিঁঝিঁ পোকার ঝিঁ ঝিঁ....শব্দ ,হ্যারিকেনের মৃদু আলোয় একধরণের মায়াবী পরিবেশ তৈরী হতো । দক্ষিনের জানালা দিয়ে দেখা যেত তুলসী মঞ্চ , গোয়াল ঘর ,ধানের মরাই আর বিস্তীর্ণ ধানের ক্ষেত। আর পশ্চিমের জানালা দিয়ে একটা লাল জবা ফুলের গাছ , পুকুর ঘাট , কলতলা সাথে কয়েকটা বাড়ি। শ্রীকান্ত পড়তে গিয়ে অন্ধকারের সৌন্দর্য দেখতে শিখলাম। এখনো মনে আছে সেই উক্তি - "হঠাৎ চোখের উপর যেন সৌন্দয্যের তরঙ্গ খেলিয়া গেলো।মনে হইলো কোন মিথ্যাবাদী প্রচার করিয়াছে আলোর রূপ , আঁধারের রূপ নাই। এই যে আকাশ - বাতাস, স্বর্গ - মর্ত্য পরিব্যাপ্ত কোরিয়া অন্তরে বাহিরে আঁধারের প্লাবন বহিয়া যাইতেছে ,মরি মরি এমন রূপের প্রস্রবণ আর কবে দেখিয়াছি। এ ব্রহ্মান্ডে যাহা যত গভীর , যত অচিন্ত্য, যত সীমাহীন তাহা তো ততই অন্ধকার " এই বর্ণনা পড়ার পর থেকে জানালার পাশে বসে অন্ধকারকে উপভোগ করতে শিখেছিলাম। কত রাত হ্যারিকেন নিভিয়ে জানালার পশে বসে অন্ধকার দেখেছি। অন্ধকার এ কিছু বসার পর চোখ সয়ে যায়। তখন অন্ধকারের অনেক স্তরভেদ চোখে পড়ে। কোথাও পাতলা , কোথাও ঘন। গাছ এক ধরণের কালো , পুকুরের জল অন্যরকম, আবার দূরের ধান ক্ষেত অন্য ধরণের কালো। এক একটা উপন্যাস পড়ার সময় সেই উপন্যাসের অস্তিত্বহীন চরিত্রের সাথে যেন আমার বসবাস। কখনো মহিমের ( গৃহদাহ ) স্থিতধী , প্রজ্ঞা ও গভীরতার প্রেমে পড়েছি , কখনো ইন্দ্রনাথের ( শ্রীকান্ত ) সাহসী , সততা ও ডানপিটে স্বভাবের , কখনো সতীশের (চরিত্রহীন ) অকপটতা , নীরব প্রেম আবার কখনো উপেন্দ্রের ( চরিত্রহীন ) গভীরতায় , শ্রীকান্তের (শ্রীকান্ত )দার্শনিকতার প্রেমে পড়েছি। 'দেবদাস' পড়ে ভীষণ কেঁদেছি, 'অরক্ষণীয়া' পড়ে অতুলের প্রতি তীব্র অভিমান হয়েছে, 'চরিত্রহীন' পড়ে সতীশ সাবিত্রীর অনুচ্চারিত ফাল্গুধারার মতো বয়ে চলে প্রেমে মন আমোদিত হয়েছে।এভাবেই নিশিযাপন।রাতের পর রাত কেটেছে রমেশ রমা, কুসুম বৃন্দাবন, সতীশ সাবিত্রী, উপেন্দ্র কিরণময়ী, অভয়া রোহিনী, শ্রীকান্ত রাজলক্ষ্মী, মহিম অচলাকে নিয়ে।বহুবার এমন হয়েছে যে রাত কখন শেষ হয়েছে বুঝতে পারি নি। ভোরবেলায় মা কাকিমার গোবরজল ছিটানোর ছপ ছপ শব্দে , শাঁখ বাজানোর শব্দে ঘোর কেটেছে। মনের মধ্যে মুঠো মুঠো আনন্দ। রাত ছাড়াও স্কুল থেকে ফেরার পর বিকেল বেলা মাঠের আলে বসেও পড়তাম। মাঠে তখন এতো বোরো চাষের প্রচলন হয়নি। আমন ধান কাটার পর আবার বর্ষাকাল আসার আগে পর্যন্ত ছেলেমেয়েরা মাঠের মধ্যে খেলাধুলা করতো। একটু বড়ো ছেলেরা ধান জমির কিছু অংশ ধানগাছের গোড়া পরিষ্কার করে ক্রিকেট খেলতো। যেদিকে গরুর গাড়ি গিয়ে মসৃন রাস্তা তৈরী হতো সেখানে ছোটরা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে সাইকেলের টায়ার গড়িয়ে গড়িয়ে ছুটতো। কেউ আবার ডাংগুলি খেলতো। এতেছোট মেয়েরাও অংশ নিতো। দক্ষিণ দিক থেকে বাতাস বইতে শুরু করলে ছেলেরা ঘুড়ি ওড়াতো। খবরের কাগজ দিয়ে হাতে বানানো। লাটাই এর জায়গায় একটু মোটা গাছের ডাল। বেশিদূর উড়তো না , কাটাকাটি ও হতো না। যতটুকু উড়তো তাতেই হৈ হৈ রৈ রৈ কান্ড।সবার বাড়ির সব গরু গুলো ছাড়া থাকতো। খেলার ফাঁকে ফাঁকে সবাই গরুগুলোকে খেয়াল রাখতো। অনেক সময় বৌদিরা আমার কাছে এসে বসতো। দুপুরে খাওয়ার পর এঁটো বাসন মেজে , দুয়ার ঝাঁট দিয়ে , প্রদীপ,লম্ফ ,হ্যারিকেন এ তেল ভরার পর স্নান করে কিছু সময় বিশ্রাম করতো। একদিন এইরকম এক বিকেল বেলা মাঠের আলে বসে শ্রীকান্ত পড়ছি। আমার মুখ পশ্চিম দিকে। ঘটনাটা এইরকম .... অভয়া তার স্বামীকে খুঁজতে রেঙ্গুন যায়। সাথে এক প্রতিবেশী যুবক রোহিনী। রোহিনী অভয়াকে ভালোবাসে। কিন্তু অভয়া যখন স্বামীর খোঁজ পায় তখন স্বামীর কাছে ফায়ার যায়। রোহিনী একা কেমন আছে জানার জন্য শ্রীকান্ত রোহিণীর বাসায় যায়। গিয়ে দেখতে পায় যে সবগুলো ঘরের দরজা হা হা করছে। শুধু রান্না ঘরের একটা জানালা দিয়ে ধুঁয়া বার হচ্ছে। উনুন প্রায় নিভে এসেছে কিন্তু রোহিণীর খেয়াল নেই। সে মেঝের উপর বঁটি পেতে একটা বেগুন দুখান করে হাতে নিয়ে চুপ করে হাতে নিয়ে বসে আছে। সংলাপটা এখনো মনে আছে - "যখন ঘর দুটোর মধ্যে দাঁড়াইলাম , তখন চোখের উপর স্পষ্ট দেখিতে পাইলাম সমস্ত সমাজ ,সমস্ত ধর্মাধর্ম , সমস্ত পাপ পুণ্যের অতীত একটা উৎকট বেদনা বিদ্ধ রোদন সমস্ত ঘর ভরিয়া যেন দাঁতে দাঁত চাপিয়া স্থির হইয়া আছে।" পড়ার পর আমিও বেশ কিছু সময় চুপ করে বসে আছি। কখন সূর্যাস্ত হয়ে গেছে। সবাই খেলা শেষ করে বাড়ি চলে গেছে। হটাৎ শুনি মা হাঁক দিচ্ছে।
মা কাকিমার শেখানো ভালো মেয়ের সংজ্ঞাকে ( লজ্জাশীলা, মাথা নিচু করে চলে , সাত চড়ে রা না কাড়া, বড়োদের কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে ) ব্যর্থ করে শরৎ সাহিত্যের কত নারী চরিত্র আমায় সমৃদ্ধ করেছে নানা ভাবে। প্রথম যখন পার্বতীকে দেখলাম ,বুঝলাম অভিমান কত গভীর হতে পারে , ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয় কখনো তা নীরবে বয়ে বেড়ানো ।ললিতাকে দেখে মনে হয়েছিল শক্তি সব সময় উচ্চস্বরে কথা বলে না । অনেক সময় তা নীরবতা , অপেক্ষা ওঃ আত্মসম্মানের হতে পারে । রাজলক্ষ্মী আমাকে অবাক করেছিল। সেটুকু সময়ে মনে হয়েছিল মানুষকে সবসময় এক লাইন ব্যাখ্যা করা যায় না । । আর অভয়া ..... এক সাহসী নারী চরিত্র । বুঝেছিলাম যে সমাজের তৈরী সব নিয়ন্ত্রণগুলোকে সবসময় সত্যি মনে করতে নেই। সেই সময় ও সেসবকে তুচ্ছ মনে করার সাহস আত্মবিশ্বাস এর জন্ম দিয়েছিলো।
তারপর কমলকে পড়ার পর সমাজের কত কিছু নিয়ম কানুন স্বচ্ছ হয়ে গেছিলো। তখন কিছুটা বড়ো হয়েছিলাম তাই বুঝতে পেরেছিলাম ওর মধ্যে এক স্বাধীনতার বোধ আছে যা একই সাথে সুন্দর ও ভয়ঙ্কর। বুঝেছিলাম কেন একজন নারী নিজের মতো বাঁচতে চাইলে সমাজ অস্বস্তি বোধ করে ।
এভাবে আমার কিশোরীবেলা কে রূপে, রসে , মাধুর্যে ও অহংকারে, আত্মবিশ্বাসে ভরিয়ে দিয়েছিলো এই লেখাগুলো । শুধু কিশোরীবেলা বলছি কেন, জীবনে কতবার যখন কামনা, আকাঙ্খা কখনো মনে এসেছে,চরিত্রহীন উপন্যাসের একটা অংশ মনে পড়েছে।, “শুনেই তোমার ঘাড় হেঁট হয়ে গেল ঠাকুরপো, তবু তো সেই আনন্দ ডাক্তারকে তুমি চেন না। চিনলে বুঝতে পারতে, কত বৎসরের দুর্দান্ত অনাবৃষ্টির জ্বালা আমার এই বুকের মাঝখানে জমাট বেঁধে ছিল বলেই এমন অসম্ভব সম্ভব হতে পেরেছিল। কি জানো ঠাকুরপো, যে তৃষ্ণায় মানুষ নদীর পাঁক কালো জলও অঞ্জলি ভরে মুখে তুলে দেয়, আমারও ছিল সেই পিপাসা। কিন্তু সে খবর পেলুম সেই জল গলায় ঢেলে। তার পরে—উঃ, সে কি গা-বমি-বমির দিনগুলোই কেটেছে। বলতে বলতেই তাহার আপাদমস্তক বারবার শিহরিয়া উঠিল।" এখান থেকেই আকাঙ্খা নিয়ে তলিয়ে ভেবেছি। মন যা চাইছে তা কি কারণে পেতে চাইছে। অনাকাঙ্খিত আকাঙ্খা থেকে নিজেকে সংযত করেছি।
অনেক বছর পরে বহু প্রতীক্ষিত দেবানন্দপুর যাবে সুযোগ ঘটেছিল। কেন জানি না যাওয়ার দিন সকাল থেকেই মনে এক ফুরফুরে নস্টালজিক অনুভূতি । যেন কোনো পুরানো প্রেমিকের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। আলমারি থেকে গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি বের করলাম । সাথে লাল রঙের ব্লাউজ।চোখে কাজল, ছোট্ট টিপ,হালকা লিপস্টিক ও গায়ে সুগন্ধি। সেই কিশোরীবেলার উন্মাদনা অনুভব করছিলাম মনে প্রাণে। দেবানন্দপুরে গিয়ে মনে হয়েছিল, এতদিন পরে যেন সেই কিশোরীটির সঙ্গেই দেখা করতে এসেছি—যে লালপাড় সাদা শাড়ি পরে, দুপাশে ফিতে বাঁধা বিনুনি নিয়ে,কখনো হ্যারিকেনের আলোয়, মাঠের আলে শরৎচন্দ্র পড়ত। সে জানত না সামনে কত সম্পর্ক, কত প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, কত আনন্দ, কত অভিমান অপেক্ষা করে আছে। শুধু জানত—একটা বই খুললেই অন্য একটা পৃথিবীর দরজা খুলে যায়। আজ এত বছর পর দাঁড়িয়ে বুঝি, সেই দরজাটাই হয়তো আমার ভিতরের পৃথিবীর প্রথম দরজা ছিল।আজ যদি আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ পাই, যদি প্রদীপের দৈত্য এসে বলে" হুকুম হো আকা "তবে বলবো আমাকে সেই স্বপ্নের মায়ানগরীতে নিয়ে চলো। বাস্তবে তা হয়তো সম্ভব নয় তবু আমার জীবনে, মনে, উপলব্ধিতে জীবন দর্শনে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হয়ে থাকবেন চিরকালীন।সেই কিশোরীটি আজ আর নেই। কিন্তু হ্যারিকেনের আলোয়, চিলেকোঠার ঘরে, মাঠের আলের পাশে যে শরৎচন্দ্রকে আবিষ্কার করেছিল—তিনি আজও মনের ভিতর ঘরের জানালায় আলো-আঁধারির মতো জেগে আছেন।
1 Comments
Dipali, Salute
ReplyDelete