জ্বলদর্চি

মুক্তি/চতুর্থ পর্ব /স্বাতী ভৌমিক


মুক্তি
চতুর্থ পর্ব 

স্বাতী ভৌমিক
 
 প্রকাশবাবুর দীর্ঘদিন বাড়িতে বসে বসে আর ভালো লাগছিল না। দিনের পর দিন আরও বেশি খিটখিটে বদমেজাজি স্বভাবের হয়ে পড়ছিলেন তিনি। সামান্য সামান্য কথাতেও তিনি উত্যক্ত হয়ে ওঠেন। প্রায় সময় একাকী থেকে কী যে ভাবেন তিনিই জানেন। সুভাষিনীও ইদানীং অনেকটাই অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে। প্রকাশবাবু বা সুভাষিনী কাউকেই তেমন একটা দোষী বলা যায় না। কারণ প্রকাশবাবু মানুষটাকে দীর্ঘদিনের রোগভোগ আরো বেশি বদমেজাজি করে তুলেছে, আর সুভাষিনীই বা আর কত সহ্য করে!

 আজ সকালবেলা থেকেই প্রকাশবাবুর মেজাজটা বেজায় বিগড়ে রয়েছে। অফিস থেকে ফোন এসেছিল, স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে- প্রকাশবাবুকে অফিসের কাজে আর রাখা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ সহানুভূতি থাকলেও অফিসের কাজ তো আর সহানুভূতি দিয়ে চলে না! স্বামীর মেজাজ বুঝে খুব শান্তভাবে প্রকাশবাবুকে এসে সুভাষিনী বলল, " ঘরে যে চাল প্রায় বাড়ন্ত, আজ না আনলে কাল হাঁড়ি চড়বে না। আর মেয়ের ওষুধটাও শেষ হয়ে গিয়েছে।" প্রকাশবাবু নিরুপায়ভাবে শুধু নীরবে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। ঠিক বলার মত ভাষা পাচ্ছিলেন না। কী করেই বা বলবেন যে-সঞ্চিত খরচের জন্য রাখা অর্থ প্রায় শেষের দিকে!এদিকে অফিস থেকে কাজ ছাঁটাই এর খবর এসেছে। সব মিলিয়ে প্রকাশবাবুর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। কী করে সংসার সামলাবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। মুখে শুধু বললেন, " দেখছি টাকার কতটা কী ব্যবস্থা করা যায়।" সুভাষিনী এটুকু সান্ত্বনাবাক্য শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
🍂
 দুপুরবেলা সুভাষিনী স্বামী আর কন্যার থালায় প্রায় সবটুকু ভাত সবজি সাজিয়ে দিয়ে নিজে অল্পটুকু বেঁচে থাকা ভাত সবজি নিয়ে খেতে বসলো। সমৃদ্ধি মায়ের থালার দিকে তাকিয়ে বলল, " মা, মা তুমি তো ছোটো হয়ে যাবে! তুমি এত কম খাচ্ছ যে!" মেয়ের কথা শুনে মায়ের মুখের মানচিত্র একটু বদলে গেল। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু প্রকাশ বাবু অত্যন্ত রুক্ষ মেজাজে চিৎকার করে উঠলেন, " দয়া দেখানো হচ্ছে, মেয়ের সামনে আমাকে ছোট করার চেষ্টা! আমি কী রাক্ষস- যে আমায় এত খাবার দিয়ে নিজে এতোটুকু খাবার নিয়ে বসে গিয়েছো!" সুভাষিনী বলল, "এতে ছোট করার কী আছে! আমার খিদে তেমন নেই।" তার কথা শেষ হবার আগেই প্রকাশবাবু  বলে উঠলেন-"বড়লোক ঘরের মেয়ে কিনা, গরীবের খাবার মুখে রুচবে কেন! নিজের কোন মুরোদ নেই, এদিকে শখ ষোল আনাই বজায় রাখা চাই। " সুভাষিনীর আর সহ্য হচ্ছিল না, অযথা অপবাদে সে আহতচিত্তে আর্তনাদের মত চিৎকার করে উঠলো, " কী শখ আছে আমার! আমার স্বামী- সন্তান যেন পেট ভরে খেতে পারে, তার জন্য ইচ্ছে যদি শখ হয় তো না হয় তা-ই। আর মুরোদ নিয়ে প্রশ্ন তুলছো! কোনদিন তোমরা কেউ আমায় সংসারের বাইরে কিছু করতে -ভাবতে দিয়েছো? " প্রকাশবাবু অবুঝের মত বলে উঠলেন" হ্যাঁ, হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি এখন তেমন  আর আমার ইনকাম নেই, তাই সংসারের বাইরে তাকাতে ইচ্ছে হচ্ছে। যাও না, যাও দেখবো তোমার কত ট্যালেন্ট!" সুভাষিনী বেশ জোর গলায় বলে উঠল, " হ্যাঁ,তা-ই হবে। " সমৃদ্ধি কিছু তেমন বুঝতে না পেরে বাবা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। সুভাষিনী খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে গিয়ে শোবার ঘরে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে শুরু করল। প্রকাশবাবুও কেমন একটা অস্বাভাবিকভাবে গুম হয়ে বসে থাকলেন। 

 সুভাষিনীর নিজেকে খুব অসহায় মনে হতে লাগলো। স্বামীর অবস্থা তার অজানা নয়। এতদিন স্বামীর রক্ষণশীল মনোভাবের জন্য সুভাষিনী কাজের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তেমন কোন কাজে যুক্ত হতে পারেনি। আজ সে কোথা থেকেই বা হঠাৎ করে কাজ জোগাড় করবে!- কিছুই ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলো না সুভাষিনী।কিন্তু এভাবে চুপচাপ বসে থাকাও তো যায় না। মেয়ের ভবিষ্যৎ, স্বামীর চিকিৎসা,সংসারের খরচ- এসব কিছু প্রকাশবাবুর পক্ষে যে আর জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, এটুকু সুভাষিনী বেশ ভালো মতোই বুঝতে পারছে। সমৃদ্ধি এসে ভয়ে ভয়ে মায়ের কাছে ঘেঁষে বসলো। বলল," মা, বাবা এতো রেগে যায় কেন?" সুভাষিনী কিছু না বলে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠলো।

 কিছুক্ষণ পরে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে সুভাষিনী একটুখানি হাসির চেষ্টা করে মেয়েকে বলল, " আয় তোকে একটা গল্প বলি। ঘুমোবি আয়।" মায়ের মুখে হাসি দেখে সমৃদ্ধি একটু আশ্বস্ত বোধ করল। মায়ের কোলে সে শুয়ে পড়ল। আর মায়ের মুখে গল্প শুনতে শুনতে সে ঘুমিয়ে পড়ল।মেয়েকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে গভীর চিন্তান্বিতভাবে চুপচাপ বিছানার এক প্রান্তে বসে সুভাষিনী আনমনাভাবে কীসব আপন মনে ভাবতে শুরু করল।

 ক্রমশ

Post a Comment

0 Comments