জ্বলদর্চি

যুক্তিবাদী প্রবীর ঘোষ || ঋত্বিক ত্রিপাঠী

যুক্তিবাদী প্রবীর ঘোষ || ঋত্বিক ত্রিপাঠী 


বৃত্তের বাইরে ছিলেন...

ঘোর নাস্তিক আমি একজনকে প্রতিদিন প্রণাম করে এসেছি সেই কিশোরবেলা থেকে। তিনিই আমার জীবনে জীবন্ত ঈশ্বর যাঁকে আমি প্রত্যক্ষ ভাবে পেয়েছি। প্রথমত তাঁর লেখা পড়ে। আর শেষ ১০ বছর তাঁকে পেয়েছি জ্বলদর্চির নিয়মিত লেখক হিসেবে। অনেকে অনেক কারণে লেখেন, ইনি সমাজকে কুসংস্কারমুক্ত করার লক্ষ্যে লিখেছেন। এ পোড়া দেশ তাঁকে চিনল না। হয়তো-বা চিনেছিল কিন্তু মানল না। মানতে গেলে মেধা-চর্চা জরুরি। মেধাচর্চার জন্য যুক্তিবাদ ও পরিশ্রম জরুরি। অধিকাংশ মানুষ সহজ বিনোদনে জীবনকে পায় কিংবা বলা ভালো জীবনকে হারায়। জীবনকে অর্জন করতে চাইলে পরিশ্রম জরুরি! অধিকাংশ মানুষ তা-ই গভীরভাবে বিশ্বাস করে -- যা তাকে তার পরিবার ও সমাজ শিখিয়েছে। তাই বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে সে কেন প্রবীর ঘোষ পড়বে!

উল্লেখ্য, ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা প্রবীর ঘোষ (জন্ম ১ মার্চ, ১৯৪৫ — ৭ এপ্রিল ২০২৩) যেকোনও ধরনের অলৌকিক শক্তির প্রমাণ প্রদানকারীকে ৫০ লক্ষ ভারতীয় টাকা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। বলা ভালো চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন। বহু নামী জ্যোতিষবিদ ও অলৌকিক শক্তিধারী ব্যক্তির মুখোশ খুলে দিয়েছেন। মন্ত্রতন্ত্র, ভূত, ভগবান, অলৌকিক শক্তির অসারতা প্রমাণ করেছেন বারবার। 

সবচেয়ে বড় দিক—তিনি শিখিয়েছেন : প্রশ্ন করতে। আমরা সময়ে সময়ে অন্যায় দেখে উত্তেজিত হয়ে প্রতিবাদে সোচ্চার হই। কিন্তু সারা বছর প্রশ্ন করতে ভুলে গিয়ে রসাতলে ডুবে মরি। চরম বিপদ এলে চিলচিৎকার করি। আমরা কুসংস্কার মানি, তার মানে অন্যায়কেও মানি। আমরা ভাগ্যকে মানি, তার মানে খুন-ধর্ষণকেও মানি। পরকাল মানি, তাই ইহকালের অমঙ্গলকে সাগ্রহে গ্রহণ করে, পরজন্মে শুদ্ধিকরণের কথা ভাবি। আমরা ঈশ্বর বিশ্বাসী হয়ে মানুষ ঠকাই। আসলে নিজেরা নিজেদের ঠকাই। আমরা বিজ্ঞানমনস্ক না হয়ে বিজ্ঞানের ডিগ্রি লাভ করি। 

আঙুলে গ্রহরত্নের আংটি পরে ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞান পড়াচ্ছি। আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুন্দর হোক চাইছি কিন্তু তাদের যুক্তি দিয়ে বিচার করতে শেখাচ্ছি না। মেনে নিচ্ছি সব। সয়ে নিচ্ছি। টিকে থাকছি। আমরা মরে বেঁচে থাকছি। স্রোতে ভেসে তলিয়ে যাব, কিন্তু যুক্তির পাড়ে কিছুতেই উঠব না।

তাঁর উল্লেখযোগ্য বই— অলৌকিক নয় লৌকিক (৫ খণ্ড), আমি কেন ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না, জ্যোতিষীর কফিনে শেষ পেরেক, পিংকি ও অলৌকিক বাবা, অলৌকিক রহস্য জালে পিংকি, ধর্ম-সেবা-সম্মোহন, কাশ্মীর সমস্যা: এক ঐতিহাসিক দলিল, প্রভৃতি। 

 তিনি সশরীরে নেই। আছে তাঁর বই। আছে সংগঠন। আছে বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ ও নিরপেক্ষতা। তিনি সমাজকে তাঁর মেজাজ ও মনোবীজ দিয়ে গেছেন। আমরা যদি বীজ থেকে চারা, চারা থেকে বৃক্ষের জন্ম না দিতে পারি, তাহলে আর কোন উপায়ে আমরা নিজেদের রক্ষা করব! আর কোনও উপায় জানা থাকলে, জানাতে পারেন।
🍂

Post a Comment

0 Comments