ঠাণ্ডামনি বাস্কে (ফুটবলার, কোলাঘাট)
ভাস্করব্রত পতি
দিনের বেলায় দুয়ার ভেজে রোদের আলোয়। রাতের উঠোন সিক্ত হয় চাঁদের জোছনায়। বর্ষায় ছাদ ফুঁড়ে জল চুঁইয়ে পড়ে। আর হিমেল কুয়াশা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আবাহন করে শীতের কনকনানি। নিতান্ত ছাপোষা ঘরের সন্তান। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর জঠরানল খোঁজে একমুঠো ভাতের। এভাবেই ভোর হয়, দুপুর গড়ায়, বিকেল আসে, রাত্রি নামে ঠাণ্ডামনির 'বরফঠাণ্ডা' জীবনে।
ঠাণ্ডামনি বাস্কে। ভারতের এক অন্যতম আদি সম্প্রদায়ের কন্যা সন্তান। কোলাঘাটের কুঁড়েঘর থেকে উত্তরনের বৈঠা বেয়ে আজ সে কিছু করে দেখানোর কাজে নেমেছে। এই মুহূর্তে ভারতীয় মহিলা ফুটবল টিমের U17 দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার। জীবন সংগ্রামের দোলাচলতায় যাঁর সোজা পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি অর্জন করাই ছিল অন্যতম চ্যালেঞ্জ, সে আজ তাঁর সেই দুপায়ের জোরালো ভলিতে বিপক্ষের জাল ছিঁড়তে বদ্ধপরিকর। এবং সে কাজে সে সফল।
বাবা ঠেলাগাড়ি চালায়। 'নুন আনতে পান্তা ফুরায়' অবস্থা। দুবেলা উনুনে হাঁড়ি চড়ার নিশ্চয়তা ছিল না। এহেন বাড়ির মেয়ে আজ ফুটবল খেলে। ক্রিকেটের এই ভরা বাজারে ব্যাট বলের 'মোহ' উপেক্ষা করে মোহন বাস্কে তাঁর একমাত্র মেয়েকে ফুটবলার বানানোর ছাড়পত্র দিয়েছেন। দশম শ্রেনীর সেই একরত্তি মেয়ে আজ ভারতের সিনিয়র মহিলা ফুটবল দলের দরজায় কড়া নাড়ছে।
কোচ শুক্লা দে'র সাথে ঠাণ্ডামনি
এই মুহূর্তে আই ডাবলু এল তথা ইণ্ডিয়ান ওমেন্স লিগ'কে পাখির চোখ করে ওড়িশা গিয়েছেন ভারতীয় দলের মহিলা ফুটবলার ঠাণ্ডামনি বাস্কে। গত ১১ ই অক্টোবর U17 এ এফ সি কাপের মূলপর্বে ভারতকে কোয়ালিফাই করানোর পেছনে পূর্ব মেদিনীপুরের কোলাঘাটের এই ছাত্রী ঠাণ্ডামনি বাস্কের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। উল্লেখ্য, গতবারে ভারত এই টুর্নামেন্টে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছিল। সামনে এখন কঠিন লড়াই।
ঠেলাচালক বাবার কাঁধেই সংসারের জোয়াল। বাড়িতে মা সলমা বাস্কে ও দুই দাদাকে নিয়ে চূড়ান্ত অভাবের সংসার। এর মাঝেই খেলাপাগল মেয়েটি ভারতীয় ফুটবল দলের অন্দরমহলে। এ যেন গলি থেকে রাজপথে আসার অন্যতম কথাকাহিনি ঠাণ্ডামনির জীবনে। অসম্ভব ঠাণ্ডা মেয়েটি অবশ্য বেশ লাজুক প্রকৃতির। সহজে 'রা' বেরোয়না। গলা তুলে কথা বলতেও কেউ এখনও দেখেনি। কিন্তু মাথা উঁচু করে মাঠে লড়াই করতে সবাই দেখেছে। ফুটবল মাঠের লিকপিকে ঠাণ্ডামনি সত্যিই আজ কোলাঘাটের 'নীলকান্তমনি'! মেদিনীপুরের মানুষ রতন। তাঁর অদম্য জেদ, মাঠের লড়াই আর ভালো কিছু করার তাড়না তাঁকে ঊষর মাটির পলেস্তারায় প্রতিদ্বন্দিতার আস্বাদন করাতে পেরেছে।
ফুটবলার ঠাণ্ডামনি বাস্কে
আগামী নভেম্বর মাসের ১৩ তারিখ থেকে কল্যাণিতে শুরু হচ্ছে আই ডাবলু এল ফুটবল টুর্নামেন্ট। ফলে আগামী ছয়মাস ঠাসা শিডিউল তাঁর। এজন্য দরকার আরও নিবিড় অনুশীলন। চাই আরও আধুনিক কোচিংয়ের সুযোগ। তাই তাঁর ওড়িশা যাত্রা। কোলা ইউনিয়ন হাইস্কুল মাঠে স্থানীয় কোচ শুক্লা দে'র কাছেই তাঁর ফুটবলের হাতেখড়ি। তাঁর 'বড়' হওয়া। শুক্লা বলেন, ঠাণ্ডামনি সবাইকে নিয়ে চলতে পারে। সকলকে সম্মান করতে জানে। যতক্ষণ শরীরের ক্ষমতা থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত খেলা চালিয়ে যায়। বিশ্রাম নেয় না। কোনও বাহানা দেখায়না। যখনই খেলতে ডাকা হয়, তখনই মাঠে হাজির। এটাই একজন সত্যিকারের খেলোয়াড়ের অন্যতম গুণ। আমি চাই ভারতের জাতীয় দলে সুযোগ পাক ঠাণ্ডামনি। এজন্য আরও আধুনিক মানের অনুশীলন করতে হবে তাঁকে। কটকের ফুটবল আকাডেমিতে অনুশীলনের সেই সুযোগ পাবে বলে আমি আশাবাদী।
ঠাণ্ডামনির সাথে...
মূলতঃ উন্নত অনুশীলনের সুযোগের লক্ষ্যেই এবার আই ডাবলু এল'এ ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে নিতা ফুটবল আকাডেমিতে যোগ দিয়েছে ঠাণ্ডামনি। আই ডাবলু এল-এ গতবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইষ্টবেঙ্গল। সেই জয়ী টিমের সদস্যা ছিল ঠাণ্ডামনি। এছাড়াও ইস্টবেঙ্গলের হয়ে U16 (২০২৩, নেপাল), U17 (২০২৪, ভূটান) এবং U19 (২০২৬, নেপাল) সাফ চ্যাম্পিয়ন্স টিমের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিল মেদিনীপুরের এই সোনার মেয়ে।
২০১০ এর ৯ ই মার্চ জন্ম। মাত্র ১৬ বছরের ঠাণ্ডামনি ইতিমধ্যে ভারতের হয়ে ২০২৫, ২০২৬ সালে এ এফ সি টুর্নামেন্ট খেলেছে। ২০২৭ এর ৩১ শে মার্চ - ১৭ ই এপ্রিল চিনে আয়োজিত হবে U17 এ এফ সি'র মূলপর্বের খেলা। ইতিমধ্যে চলতি অক্টোবরে মালয়েশিয়াতে আয়োজিত কোয়ালিফাইং রাউন্ডের খেলায় ভারত মূলপর্বে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। এখানে 'ই'-গ্রুপে ভারত ইরাককে ১৪ - ০, সিরিয়াকে ২ - ০ এবং মালয়েশিয়াকে ৪ - ০ গোলে হারিয়েছে। ভারতীয় দলের অন্যতম অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ছিলেন পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ঠাণ্ডামনি বাস্কে। ইরাকের বিরুদ্ধে একটি দুর্দান্ত গোলও করেছিলেন তিনি। এবার মূলপর্বের খেলায় পুল 'সি'-তে ভারতের প্রতিপক্ষ ভিয়েতনাম এবং ফিলিপিন্স। এখানেও ভালো ফলাফলের বিষয়ে আশাবাদী সে।
ড্রিবলিং, হাই ভলি, ব্যাকপাস, ব্যকহিল, হাই ফুট, গোলকিক, বাইসাইকেল কিক, হলিউড বল, নাটমেগ, ম্যান মার্কিং ইত্যাদি ফুটবলীয় প্রতিশব্দের সঙ্গে নিত্যদিন পরিচিত হতে হচ্ছে তাঁকে। বিপক্ষের ফুটবলারদের বোকা বানিয়ে পায়ে পায়ে বল নিয়ে যাওয়ার টেকনিক করায়ত্ত করতে হচ্ছে তাঁকে। এহেন ঠাণ্ডামনির ফুটবল জীবনের নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন স্কুলের শিক্ষক সুজন বেরা। তাঁর কথায়, অমানুষিক পরিশ্রম করতে পারার বিরল ক্ষমতাই তাঁকে আজ এই পর্যায়ে উন্নীত করেছে। অভাবের সংসারের বেড়া ডিঙিয়ে আলোর খোঁজে তাঁর ফুটবলের সাথে সখ্যতা। তাঁর এই ফুটবলপ্রেম এবং ভারতের হয়ে সাফল্য অর্জনে আপ্লুত কোলাঘাটবাসীরাও। 'সংকেত' ক্লাবের কর্ণধার অসীম দাসও ঠাণ্ডামনির শ্রীবৃদ্ধি কামনায় পাশে থাকেন সবসময়। এ এফ সি কাপে দুর্দান্ত সাফল্যের জন্য সম্প্রতি ঠাণ্ডামনিকে মেদিনীপুর কুইজ কেন্দ্র সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে কোলাঘাটে।
ঠাণ্ডা মাথায় বিপক্ষের রক্ষণকে খুন করার স্বপ্ন দেখেন ঠাণ্ডামনি। মেদিনীপুরের বুকে বয়ে চলা রূপনারায়ণের অববাহিকা অঞ্চল থেকে বিশ্বমঞ্চে পদার্পণ -- এক অভাবনীয় সাফ্যলের খেরোখাতা তাঁর সংগ্রহে। এই তো সবে শুরু। আরও এগোতে হবে। আঁধার কাটিয়ে আলোর জোয়ারে দৃপ্ত পদসঞ্চারণ চাইছে মেদিনীপুরের জনগণ।
🍂
0 Comments