জ্বলদর্চি

দুর্গাছাতু/ভাস্করব্রত পতি

বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১৪৬

দুর্গাছাতু

ভাস্করব্রত পতি

দুর্গাপূজার মুখে পাওয়া যায় বলেই এই ছাতুর নাম দুর্গাছাতু বা দুগ্গাছাতু। মূলতঃ ভাদ্র আশ্বিন মাসে এদের দেখা মেলে রাঢ়বঙ্গের ও জঙ্গলমহলের লালমাটির শালবনে আর দক্ষিণবঙ্গের ভিজে স্যাঁতসেঁতে ছায়াঘেরা মাটিতে। বর্ষার শেষপ্রহরে, বিশেষ করে একটানা বৃষ্টির রেশ কমার পর ঝলমলে রোদ উঠলে এই দুর্গাছাতুর দেখা মেলে প্রকৃতিতে।  

অঞ্চলভেদে কোথাও কোথাও বলা হয় 'কাড়ান ছাতু' বা 'কাড়াহান ছাতু'। আসলে জঙ্গল থেকে এই ছাতু কুড়িয়ে এনে বাজারে আনলেই তা নেওয়ার জন্য রসনাপ্রিয়দের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। তাই এহেন নামকরণ বলে অনেকের অভিমত। যেহেতু পরবের সময় পাওয়া যায়, তাই 'পরব ছাতু'ও বলা হয়। আবার জন্মাষ্টমীর পর থেকেই বাজারে ভালো পরিমাণ আমদানি হয় এবং রাধাষ্টমীর সময়েও প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। তাই লোকজনের মুখে এটি 'অষ্টমী ছাতু' নামেও পরিচিত। 

জঙ্গলের মধ্যেকার লাল ল্যাটেরাইট মাটির বুকে অনেকটা জায়গা জুড়ে মাটি ভেদ করে সাদা হয়ে ফোটে এই ছাতু। তাছাড়া জঙ্গলের উইঢিপির পাশেও জন্মায়। তাই এর আরেক নাম ‘আড়ানি ছাতু’। উইঢিপির আশপাশের জায়গাকে বলা হয় 'আড়ানি'। এই ছাতু জন্মানোর অন্যতম আদর্শ জায়গা। তাই এহেন নামকরণ। অনেকের মতে, এই 'আড়ানি ছাতু' থেকে পরবর্তীতে অপভ্রংশ হয়ে 'কাড়ানি ছাতু' বা 'কাড়ান ছাতু' হয়েছে। জঙ্গলমহলের ঝুমুর গানেও এই কাড়ান ছাতুর কথা পাই --
'রিমঝিম রিমঝিম নামল শ্রাবণ, মন যে আকুল ব্যাকুল রে,
শাল পিয়ালের বনের মাঝে, কাড়ান ছাতু ফুটল রে।
চল গো সখী, চল গো বনে, ঝুড়ি-কাটারি হাতে নিয়ে,
কাড়ান ছাতু কুড়িয়ে আনব, লালমাটির ওই পথ দিয়ে।
উই ঢিবির ওই পাশে দেখ, সাদা ছাতা হাসছে রে,
পাতার আড়ালে লুকিয়ে তারা, সুবাস ছড়াতে চাইছে রে।
কাড়ান ছাতুর মিষ্টি গন্ধে, মনটা আমার নেচে ওঠে,
বর্ষার এই আশিস পেয়ে, বনের মুখে হাসি ফোটে।
চল গো সখী, চল গো বনে, ঝুড়ি-কাটারি হাতে নিয়ে...
হাটের দিনে বিক্রি হবে, দু-পয়সা আসবে ঘরে,
নইলে সখী রাঁধব ঘরে, তেল-মশলা ভালো করে।
গরম ভাতে কাড়ান ছাতু, অমৃত যে লাগবে খেতে,
সাঁওতালপাড়ার এমন সুখ, আর কি পাবি এই জগতে?
রিমঝিম রিমঝিম নামল শ্রাবণ, মন যে আকুল ব্যাকুল রে,
শাল পিয়ালের বনের মাঝে, কাড়ান ছাতু ফুটল রে।
কাড়ান ছাতু ফুটল রে...আমাদের মনে আনন্দ আর ধরল না রে!'
দুর্গাছাতু সংগ্রহ করেছেন সাহড়দা গ্রামের অর্চনা সন্মিগ্রাহী

দুর্গাছাতু বা দুর্গা কাড়ান বা আউলি কাড়ানের বিজ্ঞানসম্মত নাম Termitomyces Heimii। এটি Lyophyllaceae পরিবারের অন্তর্গত। ফরাসি ছত্রাক বিশেষজ্ঞ Roger Heim এর নামানুসারে ভারতীয় উদ্ভিদবিদ কে নটরাজন এটির নামকরণ করেছিলেন ১৯৭৯ তে। মধ্যপ্রদেশে এই ছাতুকে বলে Deemak Phuto বা Deemak Pehari (অর্থাৎ Termite Mushroom)। ওড়িশায় পরিচিত ভারণ্ডা ছাতু নামে। দার্জিলিং ও সিকিমের লোকজনের কাছে কালুঙ্গে নামে পরিচিত।

‘আশ্বিনা টানের দিনে, 
পরব ছাতুর পার্বণী! 
আইস্‌বে জামাই রাত্যেঁ, 
কাড়ান ছাতু দিব উয়ার পাত্যেঁ’... 
এ গান জঙ্গলমহলের। এ গান গরিবগুর্বো মানুষের। জঙ্গলের মানুষের জীবনের সাথে জঙ্গলের কাড়ান ছাতুর যে আত্মিক সম্পর্ক, তা মোটেও ফেলনা নয়। এই কাড়ান ছাতুই আলোচ্য দুর্গাছাতু। এটি একটি অন্যতম সুস্বাদু এবং দুর্লভ ছাতু, যা প্রাকৃতিকভাবেই পরিবেশে জন্মায়। কাড়ান ছাতু সংগ্রহ করতে একশ্রেণীর মানুষ ভোরবেলায় হাজির হন জঙ্গলে। সংগৃহীত সেই ছাতু বিক্রি করে কিছুটা অর্থের মুখ দেখে তাঁরা। বাজারে তা বিকোয় ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা কেজি হিসেবে। পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ার প্রান্তিক মানুষের কাছে এই ছাতু খুবই পরিচিত। বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে তাঁদের কিছু আর্থিক প্রাপ্তিযোগ ঘটে এই ছাতুকে কেন্দ্র করে। 

এটি অবশ্য সারাবছর মেলে না। বছরের এই নির্দিষ্ট সময়েই কেবলমাত্র পাওয়া যায়। ফলে এর চাহিদা আকাশছোঁয়া। শহরের লোকজনের কাছে এর স্বাদ আহরণের সুযোগ তেমন একটা জোটে না। গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে এই ছাতুর গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। ফলে বাজারে যখন একে বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হয়, তখন দামের নিরিখে তা বহুলচর্চিত খাসিমাংসের চেয়েও দামি ও মহার্ঘ্য হয়ে ওঠে। স্বাভাবিকভাবেই এই কাড়ান ছাতুর জন্য কাড়াকাড়ি পড়ে ছাতুপ্রেমীদের মধ্যে।

পরিণত দুর্গাছাতু সাদা রঙের ছাতার মতো দেখতে। এদের উপরিভাগ কিছুটা কালচে ধূসর বর্ণের। সাধারণত এই ছাতু পুরোপুরি ফুটে যাওয়ার আগে 'কুঁড়ি' অবস্থাতেই সংগ্রহ করা হয় প্রকৃতি থেকে। আসলে ছাতু ফুটে গেলে তা নরম হয়ে যায়। ল্যাতলেতে হয়ে পচে যায়। তাছাড়া রোদ লেগে তাতে পোকা ধরে যায়। প্রতি ১০০ গ্রাম দুর্গাছাতুর মধ্যে  প্রোটিন থাকে ২৫-৩৫ গ্রাম, ভিটামিন ৫৭-৬০ গ্রাম, মিনারেল ৫-৬ গ্রাম, ফ্যাট ৪-৬ গ্রাম এবং শর্করা থাকে। আর রাঁধুনিদের হাতের যাদুতে দুর্গাছাতু দিয়ে ডিনার টেবিলের রেসিপি তো রীতিমতো আকর্ষণীয়।
🍂

Post a Comment

0 Comments