জ্বলদর্চি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ২২৫

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ২২৫
সম্পাদক : স্বাগতা পাণ্ডে 
সেখ সুজাউদ্দিন
সম্পাদকীয় 


ছোট্ট বন্ধুরা, 
কেমন আছো সবাই, পূজো চলে এলো। সবার মনে নিশ্চয়ই খুব আনন্দ। বৃষ্টি ধোয়া নীল আকাশ, নতুন নতুন জামা জুতো আরো কতকিছু, সবার মনের মধ্যে নিশ্চয়ই বেশ একটা খুশি খুশি ভাব। জানো তো, আমাদের এই শরৎ কালের দূর্গা পূজা কে অকাল বোধন বলা হয়। কেননা শ্রীরামচন্দ্র রাবণ বধের আগে এই শরৎ কালেই মা দূর্গার আবাহন করেছিলেন। দূর্গা পূজায় একশো আট টা পদ্ম ফুল লাগে। রামচন্দ্র একশো আট টা পদ্ম ফুল দিয়েই যখন পূজায় বসেছেন, তখন মা দূর্গা শ্রীরামচন্দ্রের পরীক্ষা নেবার জন্য করেছেন কি একটা ফুল মায়া বলে লুকিয়ে ফেলেছিলেন। এদিকে শ্রীরামচন্দ্র  একশো আট টা পদ্ম ফুলের একটা কম হয়ে যাওয়াতে, করলেন কি তীর দিয়ে নিজের একটা চোখ তুলে ফেলে সেটাই দেবীকে নিবেদন করবেন ভেবে নিয়ে, তীর তুলে ধরলেন, কারণ শ্রীরামচন্দ্রের সুন্দর দুটি চোখ কে ও তো পদ্মলোচন বলা হয়। তখন মা দূর্গা নিজে এসে শ্রীরামচন্দ্র কে বারণ করলেন আর তাঁকে আশির্বাদ ও করলেন। এটা হলো আমাদের দূর্গা পূজার পৌরাণিক কাহিনী। 
ভালো থাকো সবাই। অনেক ভালবাসা নিও। ইতি তোমাদের স্বাগতা দি
🍂

শরৎ এলো 
চিন্ময় দাশ 

শরৎ এলে মেঘেরা উধাও আকাশ নীল 
শরৎ এলে মেলবে ডানা শঙ্খচিল 
শরৎ এলে ফুল ফোটাবে কাশের বন 
শরৎ এলে ছুটির বাঁশি উধাও মন
শরৎ এলে একটি ছুটে নদীর পাড় 
শরৎ এলে শিউলিতলায় ফুল বাহার 
শরৎ এলে ঘাসের ডগায় হিমের ফোঁটা 
শরৎ এলে চু-কিত্-কিত্ ফুর্তি লোটা 
শরৎ এলে খাতা-পেনসিল দূর হোকগা
শরৎ এলে গড়বে কুমোর মা দুগ্গা 
শরৎ মানেই মায়ের পূজা ঢাক বাদ্যি 
ঘরে তখন আটকে রাখে কার সাধ্যি! 
                                -- কার সাধ্যি ? ??
চিত্র: সোহা মাল

গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ 
আটত্রিশ পর্ব

রতনতনু ঘাটী

গগনজ্যোতি স্কুলের টিফিন ব্রেকের সময় হেডস্যার চললেন মাঠের শেডের কাজ দেখতে। সঙ্গে চললেন মুকুলকৃষ্ণবাবু এবং দেবোপমস্যার। দূর থেকে মাঠের শেডের দিকে তাকিয়ে হেডস্যার আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘দেবোপম, দ্যাখো, দ্যাখো, আমাদের স্কুলের খেলার মাঠের মাথার উপর শেড তো হয়েই গেছে?’ মুকুলবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দেখুন মুকুলবাবু, এক্ষুনি একবার কনট্রাকক্টর মনোজবাবুকে ফোন করে আমাদের তরফ থেকে ধন্যবাদ জানানো দরকার। উনি রাতেও কর্মীদের দিয়ে কাজ করে আমাদের স্কুলের মান রাখলেন!’

   ফোন করে মনোজ চাকলাদারকে ধরলেন মুকুলবাবু। ওদিক থেকে মনোজবাবুর গলা ভেসে এল, ‘হ্যালো। বলুন মুকুলস্যার?’

   মুকুলবাবু বললেন, ‘আপনি তো মশাই একেবারে মিরাকল করে দিলেন। এই ধরুন, আমার কাছে আমাদের হেডস্যার আছেন! কথা বলুন!’

   হেডস্যার ফোনটা নিয়ে বলে উঠলেন, ‘মনোজবাবু, আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ জানাব ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। এখন তাকিয়ে দেখছি, আমাদের স্কুলের মাঠের মাথার উপরের শেডটা প্রায় কমপ্লিট করে ফেলেছেন। কেমন করে এই অসাধ্যসাধন করলেন মশাই?’

   মনোজ চাকলাদারের গলায় খানিক বিনয়ের ঢেউ খেলে গেল। বললেন, ‘স্যার, আমি আমার কাজটা মনোযোগ দিয়ে করার চেষ্টা করেছি। আপনাদের ক্রিকেট ম্যাচের ফাইনাল তারিখের আগে শেডের কাজ শেষ করে ফেলতে হবে, এই ছিল আমার অ্যাম্বিশান। এর মধ্যে একদিন আমাদের নবীনগঞ্জের ডি এম সাহেবের অফিসে একটা কাজে যেতে হয়েছিল। উনি আমাকে দেখে বলে উঠলেন, ‘মনোজবাবু, এখন দেখছি, আমাদের জেলা স্পোর্টস অডিটোরিয়ামের কাজটা শুরু হলে, আপনাকে বাদ দিতে পারব না দেখছি! আপনি গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠের মাথার উপরের শেডের কাজটা এত তাড়াতাড়ি সমাধা করে ফেলবেন আমরা তো স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি?’ 

   ‘আমার লক্ষ্য ছিল, এই কাজটা যাতে ডেটের আগে তুলে দিতে পারি, তা হলে আপনারা সকলে পরে একটা বড় কাজ দেওয়ার ব্যাপারে ভরসা করতে পারবেন, এই আশায়। আমার সে চেষ্টা সফল হয়েছে।’

   ডি এম সাহেব বললেন, ‘আমি আজই একরকম ডিসিশান নিয়ে ফেলেছি, আমাদের জেলা স্পোর্টস অডিটোরিয়ামের কাজটা আপনার কোম্পানির হাতেই তুলে দেব। তা হলে কাজের অগ্রগতি নিয়ে আপনার পিছনে পড়ে থাকতে হবে না।’

   ‘সে আপনি স্যার যতখানি ভরসা করার করবেন। আমি আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে আপনাকে খুশি করার চেষ্টা করব।’

   এদিক থেকে হেডস্যার আনন্দের গলায় বলে উঠলেন, ‘মনোজবাবু, আপনি একবার এখনই আমাদের স্কুলে চলে আসুন! আমরা সকলে স্কুলের মাঠেই দাঁড়িয়ে আপনার জন্যে অপেক্ষা করছি! প্লিজ!’ 

   মিনিট দশেকও সময় কাটেনি, মনোজ চাকলাদার মোটর সাইকেলে চড়ে এসে পৌঁছলেন স্কুলের মাঠে। তাঁর চোখে-মুখে ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া ছেলের মতো আনন্দ আর গর্ব উপচে পড়ছে। হেডস্যার এগিয়ে গেলেন মনোজ চাকলাদারের দিকে। ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলেন হ্যান্ডশেকের জন্যে। বললেন, ‘মনোজবাবু, আপনি সত্যিই মিরাকল করলেন। এখন চলুন, সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিই, শেডের কোন দিকে দেওয়া হবে আমাদের ‘নিখিলমনোহর স্টেডিয়ামের’ বোর্ডটা?’ 

   দেবোপমস্যার বললেন, ‘আমার তো মনে হয় মাঠের সামনের দিকটায় বড় রাস্তার দিকে মুখ করে সাইনবোর্ডটা লাগানো ঠিক হবে। তা হলে দূর থেকে স্পষ্ট দেখাও যাবে আমাদের স্টেডিয়ামের নামটা।’

   হেডস্যার মুকুলবাবুর মুখেরদিকে তাকিয়ে অনুমতির অপেক্ষা করতে লাগলেন। মুকুলবাবু বললেন, ‘দেবোপমের কথাটাই ঠিক বলে আমারও মনে হচ্ছে স্যার। ওটাই ঠিক জায়গা।’

   হেডস্যারও ঘাড় নেড়ে সায় দিয়ে দিলেন। এতক্ষণে ভূগোলের ভুবনস্যার এবং ইতিহাসের অনুলেখাম্যাম চলে এলেন মাঠের একেবারে মাঝখানে। তাঁদের চোখও আনন্দে জ্বলজ্বল করছে। ভুবনস্যার হেডস্যারকে বললেন, ‘আমরা ক্লাসে না গিয়েই চলে এলাম স্যার! আমাদের মাঠের মাথার শেডের কাজ কমপ্লিট হয়ে গেছে? কী আনন্দ!’

   অনুলেখাম্যাম বললেন দেবোপমস্যারকে, ‘স্যার, আজ বিকেলে আমাদের মাঠেই ক্রিকেটের কোচিং হোক না। দারুণ হবে!’

   হেডস্যারের দিকে তাকিয়ে অনুমতির অপেক্ষা করতে লাগলেন দেবোপমস্যার। তাঁরও মন এরকম একটা কিছু চাইছিল। সেকথা আন্দাজ করতে পেরে হেডস্যার বললেন, ‘তাই হবে। তবে তার আগে আমাদের স্টেডিয়ামের সাইন বোর্ডটা টাঙিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে। মনোজচাকলাদারকে বললেন, ‘মনোজবাবু, আপনার লোকজনকে দিয়ে বোর্ডটা মাঠের শেডের উপরের দিকে লাগানোর ব্যবস্থা করে ফেলুন!’

   মনোজবাবু কর্মীদের লিডারকে ডেকে সেরকম নির্দেশ দিলেন। ওঁরা হইহই করে একদল লোক চললেন অ্যাসেম্বলি হলের দিকে। অ্যাসেম্বলি হলের ভিতর থেকে ওঁদের ঢুকে পড়তে দেখে ঘণ্টিদাদুর মারফত ছাত্রছাত্রীরাও এসে জড়ো হতে শুরু করল অ্যাসেম্বলি হলে। অত লম্বা সাইনবোর্ডটা সকলে মিলে ধরাধরি করে বের করে মাঠের দিকে নিয়ে চললেন। ছাত্ররাও অতি উৎসাহী হয়ে কেউ-কেউ বোর্ডটা নিয়ে যেতে হাত লাগাল। 

   স্টাফরুম থেকে স্যার এবং ম্যামরাও বেরিয়ে এলেন। সকলের আগে চললেন ফিজিক্সের যাদবমোহনস্যার। তাঁর পাশে বাংলার গীতিকাম্যাম, ইংরেজির লতিকাম্যাম। দেবারতিম্যাম, কনকলতাম্যাম—সকলে স্কুলের এমন আনন্দের দিনে চুপ করে স্টাফরুমে থাকাতে চাইলেন না।

   মনোজবাবুর লোকদের সঙ্গে স্কুলের ছাত্ররাও সাইনবোর্ডটা নিয়ে চলে গেলেন শেডের নীচে। হেডস্যার আজ যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছেন। কয়েকটা বাঁশের লম্বা খুঁটি পুঁতে মোটা কাঁছি দিয়ে বেঁধে বোর্ডটাকে তোলার ব্যবস্থা করতে লাগলেন। খানিক দূরে দাঁড়িয়ে সেদিকে অপলকে তাকিয়ে ছিলেন মুকুলকৃষ্ণবাবু। হেডস্যার এসে মুকুলবাবুর পাশটিতে দাঁড়ালেন। তা খেয়াল করেননি মুকুলকৃষ্ণবাবু। কিছু একটা কথা বলতে গিয়েও থমকে গেলেন হেডস্যার। দেখলেন, মুকুলবাবু তখন ভীষণ আবেগে ভাসছেন যেন! ভাসবারই তো কথা! মুকুলবাবু শাঁখাপোতা গ্রামের পৈতৃক ভিটে-বাড়ি বিক্রি করে গগনজ্যোতি স্কুলকে মাঠের মাথার উপর শেড তৈরির টাকা এনে দিয়েছেন। তাঁরই পিতৃদেবের নামে আজ স্টেডিয়াম গড়ে উঠেছে। সেই সাইনবোর্ডের দিকে তাকিয়ে এখন আবেগে মুকুলবাবুর চোখ দুটো আনন্দে ছলছল করে উঠল। সে দৃশ্য হেডস্যারের চোখ এড়াল না। হেডস্যার মুকুলবাবুর দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর হাত দুটো ধরে বললেন, ‘মুকুলকৃষ্ণবাবু, সবই আপানার পৈতৃক টাকার অনুদানে গড়ে উঠল! আপনি না পাশে থাকলে, এ সম্ভব হত না।’

   আবেগের গলায় মুকুলবাবু বললেন, ‘জানেন তো নবনীতস্যার, আমি সাইনবোর্ডটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটু আগে কী দেখলাম দেখলাম বলুন তো?’

   নবনীতস্যার বললেন, ‘কী?’

   ‘আমি দেখলাম, ওই সাইনবোর্ডটার সামনে উঁচুতে আমার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। বাঁ হাতটা রোদ আড়াল করে যেমন করে বাবা রাস্তায় হাঁটতেন, অমন করে বাবা রোদ আড়াল করে সাইনবোর্ডটার দিকে তাকিয়ে আছেন।’ বলে ধুতির খুঁটে চোখের জল মুছলেন মুকুলবাবু।

   ততক্ষণে সাইনবোর্ডটা শেডের মাথায় তুলে বেঁধে ফেলার কাজ চলছে। আজ গগনজ্যোতি স্কুলে অঘোষিত ছুটি হয়ে গেছে যেন। ক্লাস এইটের এ-সেকশানের রোরো মজুমদার, হর্ষা মণ্ডল, দীক্ষা সেন দাঁড়িয়ে আছে উপরের দিকে তাকিয়ে। বি-সেকশানের মায়ামি দেব, বিজন বসুরায়, চিত্রাক্ষ সেন এবং সি-সেকশানের তাহিরা দত্ত, রকি দেববর্মা, সারিন দাসও ঠিক সাইনবোর্ডটার নীচে। ডি-সেকশানের রুচিকা গুপ্ত, অর্ক ধাড়া, ইরাবান বিষয়ী, চন্দ্রেশ সূত্রধর—সব ক্রিকেটারই স্কুল মাঠের মাঝখানে।

   হঠাৎ এদিক-ওদিক তাকিয়ে মুকুলকৃষ্ণ স্যার হেডস্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘নবনীতস্যার, আজ ক্লাস এইটের লোকন দাসকে দেখতে পাচ্ছি না কেন? ওর কোনও খোঁজ পেয়েছেন? ওর দিদি কোমন আছে?’

   পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন দেবোপমস্যার। হেডস্যার দেবোপমস্যারের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন। দেবোপমস্যার মুকুলবাবুর কথাগুলো শুনেছিলেন। ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘না স্যার, আজ তো লোকনের খোঁজ নেওয়া হয়নি! ভুল হয়ে গেছে স্যার!’

   সঙ্গে-সঙ্গে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়েছিল সি-সেকশানের বিপ্লব দোলুই। যে বিপ্লব ক্রিকেট ম্যাচের স্কোর বোর্ডে খেলার ফলাফল লেখে। হেডস্যার হাত নেড়ে বিপ্লবকে ডাকলেন। বিপ্লব ছুটে আসতে হেডস্যার বললেন, ‘তুই লোকন দাসের বাড়িটা চিনিস তো? বিজনডিহি গ্রামে। চট করে ওর বাড়ি গিয়ে একবার খোঁজ নিয়ে আয় তো, লোকন স্কুলে আসেনি কেন?’

   বিপ্লব ঘাড় নেড়ে তক্ষুনি বলল, ‘আমি যাচ্ছি স্যার!’

   দেবোপমস্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার সাইকেল আছে তো?’

   ‘না স্যার, আমার তো সাইকেল নেই!’ বিপ্লব কাঁচুমাচু মুখে বলল।

   দেবোপমস্যার তাঁর নিজের সাইকেলের চাবিটা বিপ্লবের হাতে দিয়ে বললেন, ‘যাও, তুমি আমার সাইকেলে চড়ে গিয়ে লোকনের খবর নিয়ে এসো!’

   বিপ্লব সাঁইসাঁই করে সাইকেল নিয়ে চলে গেল বিজনডিহি গ্রামে লোকনের বাড়ির দিকে। নবনীতস্যারের মুখটা কিছুক্ষণের জন্যে একটু মলিন হয়ে উঠল ঠিকই। তারপর কাজের মধ্যে ঝাঁপ দিলেন তিনি।

   মুকুলকৃষ্ণবাবুর মুখটাও বিষণ্ণ হয়ে উঠল। তিনি লোকনের ক্রিকেটের ভক্ত। লোকনকে বৈভব সূর্যবংশীর সঙ্গে তুলনা করেন। বলা যেতে পারে, মুকুলবাবু লোকনের ফ্যান।

   এদিকে গোটা গগনজ্যোতি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে একজনও কেউ ক্লাসরুমে বসে নেই। থাকবেই বা কেন? আজ তাদের স্কুলের মস্ত আনন্দের দিন। তাদের স্কুলের মাঠের মাথায় মস্ত উঁচু শেড তৈরি হয়ে গেছে। আর ঝড়-বৃষ্টি-রোদে স্কুলের খেলাধুলো এবং যে-কোনও অনুষ্ঠানে কোনও অসুবিধে হবে না। হেডস্যার তো এ কথাই বলেছিলেন সেদিন প্রেয়ারের পর। বলেছিলেন, ‘গোটা নবীনগঞ্জ জেলার মধ্যে আমাদের গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠেই একমাত্র অমন শেড তৈরি হচ্ছে। আর কোনও স্কুলেই এমনটি দেখতে পাওয়া যাবে না।’ সত্যিই তাই!

   সাইনবোর্ডটি টাঙানো হয়ে যেতেই হেডস্যার মুকুলকৃষ্ণবাবুর হাত ধরে বড় রাস্তার দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁদের সঙ্গে-সঙ্গে গেলেন ভূগোলের ভুবনস্যার আর জীবনবিজ্ঞানের মনোজেশস্যারও। সকলে উঁচু বড় রাস্তা থেকে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন কেমন সুন্দর দেখাচ্ছে! কী মনে হতে মুকুলকৃষ্ণবাবু দু’ হাত জোড় করে স্কুলের মাঠের শেডের মাথার দিকে তাকিয়ে প্রণাম করলেন। ভিতরে-ভিতরে তিনিও হেডস্যারের মতো আনন্দে আত্মহারা। আর-একজনও আনন্দে ফুটছেন যেন। মুখ ফুটে বলতে পারছেন না শুধু। তিনি আর কেউ নন, তিনি দেবোপমস্যার।

   এমন সময় দেবোপমস্যার ডান দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, ‘স্যার, ওই তো বিপ্লব আসছে!’

   হেডস্যারকে দেখে বিপ্লব স্যারের সামনে এসে সাইকেল থেকে নেমে পড়ল। হেডস্যার ব্যস্ত হয়ে বিপ্লবকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী গো বিপ্লব, লোকনের সঙ্গে দেখা হল? লোকনের দিদি কেমন আছে?’

   বিপ্লব বলল, ‘আমি যখন গেলাম, লোকন দিদির কপালে জলপট্টি দিচ্ছে। দিদির খুব জ্বর। সেই জন্যে লোকন আজ স্কুলে আসতে পারেনি। লোকন বলল, ‘হেডস্যারকে বলিস, দিদির জ্বর কমে গেলে আমি স্কুলে যাব। দিদিকে একা বাড়িতে রেখে কেমন করে স্কুলে যাই তুই বল বিপ্লব?’

   মুকুলকৃষ্ণবাবু হেডস্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘স্যার, আপনি যদি বলেন, তা হলে আমি একবার বরং লোকনের বাড়ি যাই। গিয়ে দেখি, ওর কী সাহায্য লাগে?’ তারপর স্বগতোক্তির গলায় মুকুলবাবু বললেন, ‘একা ওইটুকু ছেলে! কী করে একজন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে? ওর টাকাপয়সাও আছে কিনা জানি না! যাই, গিয়ে একবার দেখি? আমাদের সাইনবোর্ড তো টাঙানো হয়ে গেল।’

    ‘এখন শেডের যেটুকু কাজ বাকি আছে, আমাকে করে ফেলতে দিন! আঠারো নভেম্বরের মধ্যে আমি শেডের কাজ পুরোপুরি শেষ করে আপনাদের হাতে তুলে দেব স্যার, কোনও চিন্তা করবেন না।’ হেডস্যারের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে মনোজ চাকলাদার মিটিমিটি হাসতে লাগলেন।

   হেডস্যার সমস্ত শিক্ষক এবং ম্যাম আর ছাত্রছাত্রীদের বললেন, ‘সকলে যে-যার ক্লাসে চলে যান। আমাদের ক্লাস শুরু হবে।’

   মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘আমি এখন লোকনের বাড়ি যাচ্ছি স্যার! দেখি ওকে কী কী সাহায্য করা যায়। আমি দরকার হলে আপনাকে ফোন করব স্যার!’ এ কথা বলে মুকুলকৃষ্ণবাবু বিজনডিহি গ্রামের দিকে লোকনের বাড়ইতে রওনা হয়ে গেলেন।

   হেডস্যার তাঁর রুমের দিকে হাঁটা দিলেন। ছাত্রছাত্রীরা ক্লাসের দিকে এগিয়ে চলল। মাঠের উপর শেচ হয়ে যাওয়ার ফলে এখন আর রোদ নেউ স্কুলের মাঠে। হেডস্যার তাঁর রুমের দিকে এগিয়ে যেতে-যেতে একবার মাঠের দিকে তাকালেন। থমকে গিয়ে কী যেন ভাবলেন খানিক। মনে-মনে ভাবলেন, তা হলে নভেম্বরের উনত্রিশ আর তিরিশ তারিখে গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচের ফাইনাল আয়োজন করে ফেলতে হবে। 

(এর পর ৩৯ পর্ব) 

 মনের পাঠশালা 9

দীপালি সাহু 

অনুপ্রেরণা  নাকি নীরব ক্লান্তি 

একদিন অর্ণব স্কুলের অনুষ্ঠানে খুব মন দিয়ে বক্তৃতাটা শুনছিল।
হলঘর ভরে ছিল মানুষের উচ্ছ্বাস। মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তা বলছিলেন—
"Dream Bigger."
"Push Harder."
"Become the Best Version of Yourself."
প্রতিটি বাক্যের পর হাততালি পড়ছিল।
অর্ণবেরও মনে হচ্ছিল, এ যেন তার জন্যই বলা হচ্ছে।
সে বাড়ি ফিরল এক অদ্ভুত উত্তেজনা নিয়ে।
সেদিন রাতে নতুন একটি ডায়েরি খুলল। প্রথম পাতায় লিখল—
"আমি আমার জীবন বদলে দেব।"
পরের দিন খুব ভোরে উঠল। পরিকল্পনা করল। সময়সূচি বানাল। নতুন লক্ষ্য স্থির করল।
মনে হচ্ছিল, এতদিন সে ঘুমিয়ে ছিল, আজ যেন সত্যিই জেগে উঠেছে।
কিন্তু কয়েক দিন পরে সব কিছু বদলে গেল।
ডায়েরির পাতা আর প্রতিদিন খোলা হলো না।
ভোরবেলার অ্যালার্ম কয়েকবার বাজার পর বন্ধ করে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
কিছু লক্ষ্য পূরণ হলো না।কাজ অসম্পূর্ণ থাকতে লাগল।
আর তখনই অদ্ভুত এক নীরব ক্লান্তি তাকে ঘিরে ধরল।
যে কথাগুলো একদিন তাকে উড়তে শিখিয়েছিল, সেই কথাগুলোই এখন তার কানে অন্যরকম শোনাতে লাগল।
"তুমি এখনও সেখানে পৌঁছাতে পারনি।"
"তুমি যথেষ্ট চেষ্টা করছ না।"
"সবাই এগিয়ে যাচ্ছে।"
"তুমি ব্যর্থ হয়ে যাবে " ওর ভয় হতে লাগল। তার কল্পিত সংস্করণ হলো - 
একজন নিখুঁত মানুষ।
যে কখনও ক্লান্ত হয় না।
যে কখনও ব্যর্থ হয় না।
যে সবসময় আত্মবিশ্বাসী।
যে সবকিছু পারে।
আর সেই নিখুঁত মানুষটার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের বাস্তব সত্তাটাকে তার খুব ছোট মনে হচ্ছিল। যে কথাগুলো একসময় অনুপ্রেরণা দিয়েছিল, সেগুলোই এখন অদৃশ্য এক বোঝা হয়ে কাঁধে চেপে বসে থাকলো।

আসলে মোটিভেশন অনেকটা আতশবাজির মতো—এক মুহূর্তে আকাশ আলোকিত করে, কিন্তু সেই আলো চিরকাল থাকে না। জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যায় আতশবাজির ঝলক নয়, বরং প্রদীপের স্থির আলো।
প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস, নিজের সীমাবদ্ধতাকে গ্রহণ করার সাহস, ধীরে ধীরে এগিয়ে চলার ধৈর্য—এসবই দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের ভিত্তি। আত্মবিকাশের জন্য প্রথমে আত্মগ্রহণ প্রয়োজন।  এর পিছনে  মনস্তত্ত্বকে বুঝতে ও চক্রবুহ্য থেকে বেরুতে পরের পর্বে চোখ রেখো।

ক্যুইজ ২৪ 

১. হাঁদা- ভোঁদা, বাঁটুল দি গ্রেট কোন কার্টুনিস্ট এর তৈরী অমর চরিত্র? 
2. পাঠশালা ও টোলের মধ্যে পার্থক্য কি? 
৩. রাজা রামমোহন রায় এর ছদ্মনাম কি ছিল? 
৪. ভারতের বৃহত্তম হিমবাহের নাম কি? 
৫. কোন পাখি উড়ন্ত অবস্থাতে ও উড়তে পারে? 

গত সপ্তাহের ক্যুইজ এর উত্তর: 


১. আন আইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট 
2. দারা, সুজা, মুরাদ ও ঔরঙ্গজেব 
৩. স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় 
৪. শ্রীলঙ্কা ভি মান্য 
৫. কেরালা

Post a Comment

0 Comments